সন্দেশ পর্ব

সুব্রত রুজ

map

সন্দেশ কথার অ্রর্থ সংবাদ বা খবর। আগেকার দিনে মানুষ আত্মীয়বাড়ি গেলে হাতে করে একটু মিষ্টি নিয়ে যেত বা কোনও সুখবর পাঠালে সঙ্গে মিষ্টি পাঠাত। সেখান থেকে সন্দেশ। ‘রসবতী’ জানাচ্ছে প্রাক-সন্দেশ কালে এই কাজটি করত নতুন গুড়। যার জন্য নতুন গুড়ের নাম ছিল নববার্তা।

সন্দেশ পুরোটাই কলকাতা তথা হুগলির অবদান। ওড়িয়ারা ছানা আবিষ্কার করলেও সন্দেশ তৈরির কারিগরিতে কলকাতার কাছে এক ডজন গোল খাবেন। কলকাতা সন্দেশে নাম করলেও কারিগররা বেশির ভাগই হুগলির। হুগলি জেলার দুধ তথা ছানা ও আখ তথা চিনির গুণমান খুব উত্তম হওয়ার কারণে এখানকার সন্দেশের মান ও কারিগরি খুব উন্নত মানের ছিল। এখনও হুগলির সন্দেশ বললে চন্দননগর, রিষড়া ও জনাইয়ের নাম প্রথমেই আসবে। তারকেশ্বরের আশপাশ, আরামবাগ, এরাও পিছিয়ে নেই।

সন্দেশের মূল উপাদান হল ছানা ও চিনি। ছানা ভালো করে বেটে চিনি দিয়ে মেখে তাকে উনুনে কড়ায় চাপিয়ে তাড়ু দিয়ে মেখে মেখে সন্দেশে রূপান্তরিত করতে হয়।

সন্দেশ বানানো এমন কিছু শক্ত কাজ না। অনেকেই বাড়িতে সুস্বাদু সন্দেশ বানিয়ে থাকেন। সন্দেশের স্বাদ ও টেক্সচার নির্ভর করে মূলত দুটি বিষয়ের উপর; ছানা ও চিনির অনুপাত এবং আঁচের কায়দা। কতখানি আঁচে কতক্ষণ তাড়ু চালাতে হবে তার ওপরেই কারিগরের ওস্তাদি দাঁড়িয়ে আছে।

সন্দেশে ছানা ও চিনির অনুপাত কী হবে তা নিয়ে মিষ্টান্ন পাক বইতে একটি খাসা গাইডলাইন আছে।

মিষ্টান্ন পাক অনুসারে ছানা ও চিনির বারোটি অনুপাত আছে। আড়াই সের ছানায় আধ পোয়া চিনি (মোটামুটি এক কেজি ছানায় একশো গ্রাম) থেকে শুরু করে একশো গ্রাম ছানায় এক কেজি চিনি অবধি আছে (নির্ঘাত আগেকার সেই জোড়া মন্ডা)। তবে থাম্বরুল হল কেজিতে আড়াইশো গ্রাম। এবার সন্দেশ অনুযায়ী কমবেশি হবে। শীতকালে যখন গুড় দেওয়া হয় তখন চিনির পরিমাণ কমে।

সন্দেশ দুরকমের, নরম পাক ও কড়াপাক। নামেই মালুম, নরম পাক সন্দেশ কম নাড়া, ফলে টেক্সচার নরম; কড়াপাক বেশি নাড়া, ফলে শক্ত। কতক্ষণ পাক করা হচ্ছে তার ওপরে ও কিছুটা আঁচের কায়দায় এই ফারাকটা করা হয়। ছানা ও চিনির অনুপাতও একটা কায়দা। সন্দেশ পাক হয়ে গেলে বারকোশে ফেলে তাকে ঠান্ডা করে নিয়ে অতঃপর কাঠের ছাঁচে ফেলে আকৃতি দেওয়া। কারিগরি লবজে ‘সন্নেশ বাঁদা’। ছাঁচ অনুসারে শাঁক সন্দেশ, আতা সন্দেশ এসব নাম দেওয়া হয়। এ ছাড়াও অনেক সন্দেশ আছে যাদের নাম নেই।

সন্দেশের প্রচুর প্রকারভেদ আছে এবং অনেকসময়েই দেখা যায় একই সন্দেশ নানা জায়গায় নানা নামে চলছে। কিছু কিছু নামকরা সন্দেশ আছে যাদের আবিষ্কর্তা কে এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে। আবার কিছু ওস্তাদ কারিগর একই সন্দেশকে নতুন রূপ দিয়েছেন। এসব কাজিয়া ছেড়ে কয়েকটা বিশিষ্ট সন্দেশ নিয়ে আলোচনা করা যাক।

আম সন্দেশ: মূলত নরম পাক। আম আকৃতির ছাঁচে বাঁধা। ফুড কালার দিয়ে সবুজ রং ও আম-আদা দিয়ে আমের গন্ধ আনা হয়। সব দোকানেই পাওয়া যায়।

রাতাবি: রাতাবি কড়াপাক। একটু গোলাপি আতর দেওয়া থাকে। কিছুটা বড়ো প্যাঁড়ার মতো। কলকাতা, হুগলি আর চব্বিশ পরগনাতেই বেশি চলে।

গোলাপি প্যাঁড়া: নামেই প্যাঁড়া, আসলে নরম পাক বা কড়াপাকের সন্দেশ। আকৃতির জন্য এমন নাম। এতেও গোলাপি আতর থাকে। ওপরে একটি গোলাপের পাপড়ি দেওয়া।

ডবলডেকার: নরম পাকের মিষ্টি। দুটো স্তরে এই মিষ্টিটা তৈরি করা হয়। নিচেরটা সাদা নরম পাক, ওপরে যে-কোনো গন্ধওয়ালা একটা স্তর। অনেক দোকানে ওপরের স্তরটায় কোকো দেওয়া থাকে। মামাদের দোকানেও অন্তত চল্লিশ বছর ধরে কোকো দিয়ে ডবলডেকার হতে দেখছি। ইদানীং চকোলেট সন্দেশ রসগোল্লার হিড়িক উঠলেও সন্দেশে চকোলেটের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। সুইস রোল অনেক পুরোনো মিষ্টি। এর মধ্যিখানটাও চকোলেটের। নরম পাকের সন্দেশ পাটায় বিছিয়ে মাঝে চকোলেট দেওয়া নরম পাক গোল করে রেখে সাদা সন্দেশ দিয়ে মুড়ে দিলে অনেকটা কাটা কলাগাছের মতো দেখতে হয়। এবারে রুচি অনুসারে সরু মোটা কেটে নেওয়া। হাওড়ার এক বিশিষ্ট দোকানে বছর দশ-এগারো আগেই গলানো চকোলেটে ডোবানো সন্দেশ খেয়েছি। ইদানীং অনেক দোকানেই খুব ভালো চকোলেট সন্দেশ তৈরি হচ্ছে। কিছুদিন আগে সুইস রোলের আদলে তৈরি একটা মিষ্টি খেয়েছি যার তিনটে স্তর : ওপরে কাজু পেস্তা মেশানো নরম পাক, তার নিচে চকলেট, তার নিচে সেন্টেড খোয়া। দোকানি নাম বললেন পেস্তা ফিয়েস্তা। ভালো লাগল। এখন অনেক নতুন সন্দেশ তৈরি হচ্ছে। এটা সুলক্ষণ।

ভাপা সন্দেশ: এই সন্দেশে ছানা ও চিনির অনুপাত কেজিতে একশো গ্রাম। ছানা ও চিনি একটু দুধ দিয়ে মেখে তারপর ট্রে-তে পেতে স্টিমে ভাপানো। রানিগঞ্জ-আসানসোল শিল্পাঞ্চলে এই সন্দেশের নাম চিত্তরঞ্জন। চিত্তরঞ্জন দাশ নাকি আসানসোলে এসে এই সন্দেশ খেয়ে পছন্দ করেছিলেন, তাই তাঁর নামে নাম। হতে পারে। আমার ছোটোবেলায় কলকাতার কয়েকটি বড়ো দোকান ছাড়া অন্য দোকানে ভাপা সন্দেশ হত না। আমার মামারাই রানিগঞ্জে এলে চিত্তরঞ্জন খেতে চাইতেন। এখন অবশ্য মামাদের দোকানসহ অনেক দোকানেই ভাপা সন্দেশ হচ্ছে।

জলভরা তালশাঁস: চন্দননগরের সূর্য মোদক এর আবিষ্কর্তা। জলভরা কীভাবে তৈরি হল, এ নিয়ে চমৎকার একটি গল্প আছে। অনুপম গোস্বামীর কলম ধার করি:

“স্বাতী নক্ষত্র থেকে জল পড়লে সাপের মাথায় মণি হয়, হরিণের নাভিতে কস্তুরী জমে আর ঝিনুকের পেটে মুক্তো জন্মায়।

তেমনই পৌষ/মাঘে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা পড়লে খেজুরগাছের মিষ্টি রস নামিয়ে আনে শিউলিরা আর সেই রস জ্বাল দিয়ে যে মধুর মতো নলেন গুড় তৈরি হয়, তা পেটে ভরে তৈরি হয় জলভরা।

জলভরা মিষ্টি তৈরির একটা ইতিহাস আছে, যেমন আছে রসগোল্লা বা লেডিকেনিরও। আরও বহু বহু মিষ্টিরই। আসলে মিষ্টি ব্যাপারটাই একটা বিজ্ঞান, বহু জটিল রাসায়নিক সমীকরণের মিশ্রণ। যদিও আমরা প্রায় সবাই মিষ্টি খাই, কিন্তু এর পিছনের গল্প, এর ইতিহাস, বানানোর কায়দা কজন আর খেয়াল করি? মিষ্টির অভিমান হয় না এতে, বলুন?

যেখানে বাঙালি আর মিষ্টি প্রায় সমার্থক।

আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগের কথা, বাংলায় তখন ইংরেজ শাসন চালু হলেও আনাচেকানাচে দু-চারটে জমিদারি তখনও টিকে আছে বহাল তবিয়তে। আয় যেমনই হোক, আদবকায়দায়, ঠাটেবাটে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা, পুরোপুরি বর্তমান।

এমনই এক জমিদার ছিলেন ভদ্রেশ্বরের তেলিনীপাড়ার বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। বাড়ির মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পরে মেয়ে এসেছে বাপের বাড়ি জামাই নিয়ে জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে। তখন আবার জামাইঠকানো বা বউঠকানো বহু প্রথা চালু ছিল। এখন সেগুলো বোকা বোকা মনে হলেও তখন এইসব প্রথা রমরম করে চলত। সে যাই হোক, জামাইকে ঠকাতে হবে। কী করা যায়? ঠকানোও হল আবার জামাই বাবাজীবন রাগও করতে পারলেন না, এমন কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।

অনেক ভেবে তেলিনীপাড়ার জমিদারবাড়িতে তলব হল এলাকার নামকরা ময়রা সূর্যকুমার মোদকের। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হল এমন একটা মিষ্টি বানাতে হবে, যা দিয়ে জামাই ঠকানো যাবে অথচ তাঁর মানসম্মান যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়।

বহু ভাবনাচিন্তা করার পর মোদক মহাশয় একটা বিশাল আকারের মিষ্টি বানালেন, যার ভেতরে জল ভরা থাকে, অথচ বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনও উপায়ই নেই। সেই মিষ্টি দেওয়া হল জামাইয়ের পাতে। মিষ্টিতে মাতোয়ারা জামাই সেই মিষ্টি হাতে নিয়ে দিলেন বিশাল এক কামড়। আর যেই না কামড়ানো, মিষ্টির ভেতরের লুকোনো জল বেরিয়ে এসে ভিজিয়ে দিল জামাইয়ের সাধের গরদের পাঞ্জাবি। জামাই অপ্রস্তুত। হো হো করে হেসে উঠলেন শালা-শালিদের দল। ঘোমটার আড়ালে হাসিতে ভরে উঠল শাশুড়িদের মুখ আর জমিদারবাবু গোঁফে দিলেন তা।

জন্ম হল জলভরার। তখন ১৮১৮ সাল।

বহুদিন একচেটিয়াভাবে সূর্য মোদক ময়রা জলভরার আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন তাঁদের হাতে, কিন্তু পরবর্তীকালে সেই দোকান ভাগ হয়ে যায়। সবাই যে আসল দোকানের উত্তরাধিকারী সেটা প্রমাণ করতেই এত ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে জলভরার কোয়ালিটির দিক থেকে নজর চলে যায় অন্যদিকে।

তার ফলে অন্যান্য মিষ্টির দোকান সূর্য মোদকের কারিগরদের ভাঙিয়ে নিয়ে আসে আর বানাতে থাকে এই মিষ্টি। এখন বাবা পঞ্চানন মিষ্টান্ন ভান্ডার, মৃত্যুঞ্জয় মিষ্টান্ন ভান্ডার, চন্দননগর আর চুঁচুড়ার, জলভরা বানাচ্ছে আর তার কোয়ালিটি সূর্য মোদকের থেকে ভালো বই খারাপ নয়।

জন্মকথা তো জানা গেল। আসুন, দেখি কীভাবে বানায় এই মিষ্টি।

গোরুর দুধের ছানা চাই এতে। না হলে ছানা মোলায়েম হবে না। সেই ছানা ডলে ডলে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কণায় ভেঙে ফেলতে হবে। তারপর দিতে হবে ছানায় পাক। ক্রমাগত নেড়ে নেড়ে আর মিষ্টি মিশিয়ে তাকে তৈরি করতে হবে নরম তুলতুলে। এবার সেই সন্দেশ ছাঁচে ফেলে আঙুল দিয়ে ফুটো তৈরি করে ভরতে হবে গোলাপজল। আবার খানিকটা সন্দেশ দিয়ে ফুটোর মুখটা বন্ধ করে দিতে হবে। সন্দেশটা এতটাই সম্পৃক্ত করে বানাতে হবে যে তার আর ভেতরের জলটা শুষে নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না। এবার কিছুক্ষণ রেখে দিয়ে শুকিয়ে নিলেই তৈরি বিখ্যাত জলভরা সন্দেশ।

শীতের সময় এই সন্দেশ তার উৎকর্ষের চরম সীমায় পৌঁছোয়। অন্যান্য সময় ছানার সঙ্গে চিনি মিশিয়ে তৈরি করা হয় কড়াপাকের জলভরা আর শীতকালে ছানার সঙ্গে মেশানো হয় আসল নলেন গুড়। ছানা হয় আরও মোলায়েম, আরও মনোহর। ভেতরেও গোলাপজলের বদলে দেওয়া হয় সোনার রঙের জলের মতো পাতলা, মধুর থেকেও সুস্বাদু খেজুরের গুড়। সে গুড়ও আবার গাছ কাটার পর প্রথম পাওয়া রসের নয়। পাকা গাছের বেশ কয়েকদিন রস বেরোনোর পরে পাওয়া রসের গুড়। গুড় আসে মাজদিয়া এলাকা থেকে। অর্ডার দিয়ে নিয়ে আসতে হয় সেই গুড়।

খাটতে হয়, বুঝলেন?

অত সহজে অমৃত পাওয়া যায় না মশাই!

অনেক ইতিহাস ভূগোল জানলেন। এবার আসি জলভরা খাওয়ার পদ্ধতিতে।

আমরা মুখটা হাঁ করে গোটা মিষ্টিটা গপ করে মুখে ঢুকিয়ে ফেলি, রসগোল্লা বা আরও পাঁচরকম মিষ্টি খাওয়ার সময়। জলভরা ওভাবে খায় না দাদা। একে তো বিশাল সাইজ। একবারে মুখে ঢোকানো চাপ আছে, তারপর ওটা কায়দাও নয়।

প্রথমে মিষ্টিটা হাতে নিন। দু-চোখ ভরে দেখুন এর অপূর্ব গঠনশৈলী।

মিল পাচ্ছেন কিছুর সঙ্গে?

জানতাম পাবেন। উপরটা ভরভরন্ত, মধ্যেটা সরু আর নিচটা আবার ভরাট।

মিল পেলেন? এখনও পাননি?

আপনি মশাই বোঁদে খান বরং। জলভরা আপনার জন্য নয়।

আপনি পেয়েছেন? জানতাম।

রসিক মানুষ না হলে এসব বোঝা যার তার কম্মো নয়।

এবার ভেতরে রস খুঁজুন। ওপরটা শক্ত কিন্তু ভেতর খুঁড়লেই পাবেন টলটলে দিঘির মতো রসের অপার সাগর। থইথই করছে আপনারই জন্য।

কিন্তু ওই, ওপরের কাঠিন্যকে জয় করতে না পারলে ভেতরের রসের সন্ধান আপনি কোনোদিনই পাবেন না, কি জলভরার, কি আপনার প্রিয়ার।

এবার আলতো কামড় দিন। আস্তে, আস্তে।

চোখটা বুজে দাঁতের হালকা হালকা চাপ দিয়ে মিষ্টিটা ভাঙুন। নলেন গুড়ের রস আর মিহি ছানা গলা জড়াজড়ি করে আপনার জিভ আর টাকরাকে ছুঁয়ে, গলা বেয়ে নামতে থাকবে আর স্বর্গীয় আনন্দে ডুবে যেতে যেতেও ভেসে উঠবেন আপনি, আবার ডুবে যাবেন রসের সাগরে।

গুনগুন করে উঠুন মনের আনন্দে... আমায় ডুবাইলি রে... ”

(রান্নাবান্না আর গপ্পো : বেলতলা)

চন্দননগরের জলভরায় আগে গোলাপজলই থাকত। কলকাতার নকুড় নন্দী আর-একটু কায়দা করলেন। তিনি জলভরায় দিলেন পাতলা নলেন গুড়। কামড়ালেই কড়াপাক আর গুড়ের মিলিত স্বাদে একবারে ব্রহ্মস্বাদ। পরে কলকাতার কারিগররা নকুড় নন্দীকে অনুসরণ করেন। কলকাতার জলভরা শোয়ানো। চন্দননগরের জলভরা দাঁড়িয়ে থাকে। শীতকাল ছাড়া অন্য সময়ে গোলাপজলের বাস দেওয়া পাতলা রস ব্যবহার করা হয়।

আবার খাবো: আবার খাবো-র স্রষ্টা কে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। নবীন চন্দ্র দাস ও ভীম চন্দ্র নাগ উভয়েরই বংশজরা দাবি করেন আবার খাবো তাঁদের তৈরি।

আবার খাবো নিয়ে উইকি বলছে, একবার কাশিমবাজারের মহারানি স্বর্ণময়ী স্বাদবদলের জন্য নতুন ধরনের মিষ্টি খেতে চেয়েছিলেন। নবীনচন্দ্রের কাছে তার বরাত যায়। নবীনচন্দ্র নতুন এক প্রকারের মিষ্টি তৈরি করেন, যা খেয়ে মহারানি স্বর্ণময়ী বলেছিলেন, “আবার খাবো”। সেই থেকে মিষ্টিটা আবার খাবো নামে পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়।

‘আবার খাবো’ দুরকম রূপে পাওয়া যায়। একটাতে রসগোল্লার ওপর গোলাপজল দেওয়া নরম পাকের সন্দেশ থাকে, অন্যটায় কাজু ও পেস্তা মেশানো খোয়ার পাকের ওপর গোলাপজল দেওয়া নরম পাক থাকে। মামার বাড়িতে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী ভীম নাগ চন্দননগরের জলভরার জবাব হিসাবে কড়াপাকের ভেতর কাজু পেস্তা মেশানো খোয়ার পাক দিয়ে অমৃতকলস নামের একটা মিষ্টি বানিয়ে ছিলেন। অমৃতকলসের গঠন আর দ্বিতীয় প্রকারের আবার খাবো-র গঠন কাছাকাছি রকমের। কাজেই আমার ধারণা ভীম নাগ খোয়ার আবার খাবো তৈরি করেন, নবীন দাস রসগোল্লার। দুজনে দুভাবে তৈরি করেছেন। সময়ের হিসেবে ভীম নাগ আগে। যেটুকু শুনেছি উনি ১৮৫০ সালের কাছাকাছি সময়ে আবার খাবো তৈরি করেন। নবীন দাস তাঁর দোকান খোলেন ১৮৬৮ সালে। তবে দুরকমের মিষ্টির নামটাই যা এক। স্বাদ ও টেক্সচার-এর ফারাকে রবীন্দ্রসংগীত আর নজরুল গীতি।

মিল্ক কেক: অনেকে মিল্ক কেক আর ছানার কেক এক ভাবেন। তা কিন্তু নয়। মিল্ক কেক আর ছানার কেক দুটো আলাদা মিষ্টি। ছানার কেক হল উড়িষ্যার ছেনাপোড়া। বাইরেটা ময়দার কেকের মতো পোড়া পোড়া। মিল্ক কেক সাদা ধবধবে। মিল্ক কেকের দু-প্রকার আমি খেয়েছি। একরকম ছানা, চিনি ও দুধ মিশিয়ে খুব মিহি করে পাক করা নরম পাকের সন্দেশ। মুখে দিলে একবারে গলে যায়। এতে এলাচ ও গোলাপজলের বাস থাকে। দ্বিতীয় রকমটা কালাকাঁদ, শুধু তাড়ু দিয়ে কালাকাঁদের গ্রেনগুলোকে একটু মিহি করে দেওয়া। এর বাইরে কিছু থাকলেও আমি খাইনি।

প্রাণহরা: মোটামুটি দুশো বছর আগে ঢাকা বা তার আশপাশে প্রাণহরার জন্ম। কিন্তু এই মিষ্টির জন্মদাতা কে, সেটা অনেক খুঁজেও জানতে পারলাম না। তারাপদ রায়ের লেখায় মরণচাঁদ ঘোষ নামে একজনের কথা আছে। প্রাণহরা চমচম এসব মিষ্টির জন্য তিনি নামকরা ছিলেন। কিন্তু খোঁজপাত করে জানলাম তিনিও এর জন্মদাতা নন।

প্রাণহরার মূল উপাদান হল গোরুর দুধের ছানা, সর আর খোয়া বা মাওয়া। একজনের কাছে শুনেছি দুধ থেকে সর তুলে তারপর বাকি দুধটা ছানা কাটিয়ে ব্যবহার করা হয়। সবগুলো একসঙ্গে মেখে উনুনে পাক করে নামাবার সময় গোলাপজল, বড়ো এলাচ দিয়ে নামিয়ে তারপর হাতে করে পাকিয়ে নিলেই প্রাণহরা তৈরি। কাঁচাগোল্লার টেক্সচারের সঙ্গে এর টেক্সচারের মিল আছে।

বাস্তবিক পক্ষে প্রাণহরা খুব কম কারিগরই বানাতে পারেন, কারণ প্রাণহরা বানাতে গেলে যেটা লাগে সেটা হল অভিজ্ঞতা আর ধৈর্য। ঢিমে আঁচে অনেক্ষণ ধরে আস্তে আস্তে পাক করে প্রাণহরা করতে হয়, কারণ এতে সর থাকে। একটু উনিশ-বিশ হলে পাক পুড়ে যাবে নয়তো গন্ধ ধরে নেবে। ভালো কারিগরের অভাবে অনেক দোকান এখন প্রাণহরা বানানো বন্ধ করে দিয়েছে।

মনোহরা: মনোহরার জন্ম হুগলির জনাইয়ে। খোদ জনাইয়ে গিয়ে যেটুকু শুনেছি তাতে ভীম নাগের পিতা পরাণ চন্দ্র বা তাঁর ভাইদের কেউ এই মিষ্টির আবিষ্কারক। যিনি তথ্যটা দিলেন তিনি জানালেন ১৮২০-২১ সাল নাগাদ মনোহরা তৈরি হয়।

মনোহরা দুভাবে তৈরি হয়। এক ক্ষীর ও সর পাক করে এলাচ, পেস্তা ও গোলাপজল দিয়ে নামিয়ে গোল্লা পাকিয়ে তার ওপর ঘন চিনির রস দিয়ে মেচা সন্দেশের মতো একটা কোটিং করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ছানা, চিনি একটু দুধ দিয়ে মেখে নরম আঁচে ধীরে ধীরে পাক করে এলাচ, পেস্তা ও গোলাপজল দিয়ে নামিয়ে নিয়ে গোল্লা পাকিয়ে চিনির কোটিং। মনোহরা মাঝেমধ্যেই খাওয়া হয়। আমার কেন জানি না মনে হয় প্রাণহরাকেই চিনির কোটিং দিয়ে মনোহরা তৈরি হয়েছে। একসময় ডাবের শাঁস বেটে ছানা বা ক্ষীরে মেশানো হত। এখন আর হয় না। কারণ কারিগরের অভাব।

মনোহরার চিনির কোটিং কেন দেওয়া হয়, সে নিয়ে বেশ কিছু গল্প চালু আছে। কোনও একজন জমিদার খরিদ্দার (মতান্তরে সাহেব) পরাণ নাগকে অনুরোধ করেন এমন করে মনোহরা করতে, যাতে করে তিনি দু-দিনের রাস্তা বেয়ে কলকাতা নিয়ে যেতে পারেন। পরাণ নাগ ভেবেচিন্তে মনোহরার ওপর মেচার মতো চিনির কোটিং দিয়ে দেন, যাতে তিন-চার দিন থাকে। কেউ কেউ বলেছেন জমিদারটি স্বয়ং জনাইয়ের জমিদার জনাই বা তাঁর ভাই অনাই। যাই হোক, দুটো তথ্য পরিষ্কার; এক, মনোহরা আগে তৈরি হয়েছে, তারপর তার চিনির কোটিং। দুই, চিনির কোটিং-এর আইডিয়া মেচা সন্দেশ থেকে নেওয়া। হুবহু একই কোটিং।

জনাইয়ের মনোহরা কোনোভাবে মুর্শিদাবাদ পৌঁছোয়। পরাণ নাগ নিজেও এ মিষ্টি মুর্শিদাবাদে নিয়ে যেতে পারেন। উনি আগে মুর্শিদাবাদের নবাব দরবারে চাকরি করতেন। সেখানের নবাবরা এই মিষ্টি খেয়ে পছন্দ করেন। পরে মুর্শিদাবাদ জেলার দহগ্রামের নিকট কিরীটকোনা গ্রামের কিরীটেশ্বরী মন্দিরের কাছের কোনও দোকানে মনোহরা তৈরি হতে থাকে। জনাইয়ের ক্ষীর দেওয়া মনোহরার মতোই; ডাবের শাঁস, ক্ষীর চিনি দেওয়া, বাড়তির মধ্যে কাজুবাদাম বাটা। এখন বেলডাঙার মনোহরা খুব নাম করেছে। সহকর্মিণী সোহিনী ব্যানার্জির দৌলতে এ মনোহরাও মাঝে মাঝে জোটে। তবে বেলডাঙার মনোহরা ক্ষীরের। এখনও জনাই এবং বেলডাঙা উভয়েই নিজের মান ধরে রেখেছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%