সুব্রত রুজ

মোরব্বা: মোরব্বার জন্ম মুঘল আমলে। মুঘলরা মিষ্টি খুব একটা পছন্দ করতেন না, শেষপাতের মুখমিষ্টিটা ফল দিয়ে চালাতেন। সেখান থেকেই হয়তো ফলের মিষ্টি তৈরির ভাবনা এসেছে। সম্রাট শাহজাহানের আমলে আগ্রা ও মথুরার হালুইকরদের হাতে এর জন্ম। কোনও নবাবের হাত ধরে এই মিষ্টি বাংলায় বীরভূমের রাজনগরে প্রথম তৈরি হয়। বাঙালিরা এই পেঠা বা মোরব্বা ভালোবেসেছে এবং বাংলার মোরব্বা হাব হিসাবে সিউড়ি যে অদ্বিতীয়, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মুর্শিদাবাদের মোরব্বার মানও বেশ ভালো। মোরব্বা নামের উৎস জানার চেষ্টা করেও পাইনি।
মোরব্বা বেল, চালকুমড়ো, আম, পেঁপে, কামরাঙা, আনারস, শতমুলী এসব ফল ও মূল দিয়ে হয়। আমাদের এখানে পটলের মোরব্বা বানিয়ে তাকে লম্বালম্বি চিরে ভেতরে নরম পাকের সন্দেশ বা খোয়া দিয়ে তৈরি পটল মিষ্টি খুব চলে। কলকাতারও কয়েকটা দোকানে করতে দেখেছি। তারকেশ্বরেও পটল মিষ্টি পাওয়া যায়।
মোরব্বার মধ্যে আমি নিজের চোখে পটল আর পেঁপের মোরব্বা তৈরি হতে দেখেছি। সে দুটোই বলছি।
আগে পটলটাকে খোসা ছাড়িয়ে বীজ বার করে চুনজলে সারারাত ফেলে রাখা হল। পরের দিন জলে ভালো করে ধুয়ে ফিটকিরি জলে আবার সেদ্ধ করে ঘণ্টা দুই ফেলে রাখা হল। এবার এক তারের রসে ফুটিয়ে সারারাত ফেলে রাখা হল। পরের দিন আবার রসে ফুটিয়ে রস গাঢ় হলে কড়া নামিয়ে রেখে একবারে ঠান্ডা করতে দেওয়া হল। পটোলের গায়ে দানাদারের মতো রস জমে গেল। এবার রস থেকে তুলে রস ঝরিয়ে ভেতরে সন্দেশ দিয়ে ট্রে-তে সাজানো। পেঁপের মোরব্বাও মোটামুটি ওরকম। শুধু কাঁচা পেঁপে লম্বা লম্বা করে কেটে নেওয়া হয়। পাকা পেঁপেরও নাকি মোরব্বা হয়, আমি কখনও খাইনি। বাকি যা খেয়েছি মনে হয় এভাবেই তৈরি। তবে পশ্চিমা পেঠায় গুলাবি আতর থাকে। আগ্রা বেড়াতে গিয়ে আংগুরি পেঠা খেয়েছি, গোল করে কাটা আর ওপরে নারকেলকোরা ছড়ানো। তবে মোরব্বা আমার খুব একটা ভালো লাগে না। বড্ড পচপচে মিষ্টি। শুনেছি আগে নাকি সাত দিন ধরে বারবার রসে ফুটিয়ে মোরব্বা বানানো হত। এখনকার মতো একবারে দুবারে রস ঘন করে ফেলত না।
এক প্রবীণ পানবিক্রেতার কাছে শুনলাম কাঁচা সুপুরিরও নাকি মোরব্বা হত এবং তা পানে দিয়ে খাওয়া হত। কাঁচা সুপুরিরও যে মোরব্বা হত আমি প্রথমবার মিষ্টান্ন পাক পড়ে জেনেছিলাম, কিন্তু কোনোদিন শুনিনি বলে ব্যাপারটাকে বিশেষ পাত্তা দিইনি; এ বইয়ে অনেক মিষ্টি আছে যা এখন লুপ্ত। কিন্তু তখন পাত্তা না দিলেও এখন কাকার কাছে শুনে ব্যাপারটা পোক্ত হল। কাকা জানালেন আগে বেনারসি পানে ওই মোরব্বা দেওয়া হত, তবে এখনও হয় কি না তিনি জানেন না। শুনে অবধি মাথা চুলকোচ্ছি, কাঁচা সুপুরি খেলে তো ভয়ানক নেশা হয়, ও বস্তুর মোরব্বা?
একটা নবাবি গল্প দিয়ে মোরব্বা পর্ব শেষ করি। এ গল্পটা আমার বহরমপুরের বন্ধু মোবারকের কাছে পেয়েছি।
মোবারকের পূর্বপুরুষদের একজন নবাব মিরজাফর বা মিরকাশিম-এর সময় একটি শাহি দাওয়াতে নিমন্ত্রিত ছিলেন। খাওয়া প্রায় শেষ, এমন সময় শাহি বাবুর্চি এক পরাত শ্বেতপাথরের টুকরো দস্তুরখানের ওপর নামিয়ে রাখল। প্রথমটা সবাই হাঁ। তারপর দু-একজন সাহস করে মুখে দিলেন। বস্তুটা তালের ফোপলের (তাল আঁটি ফেলে রাখলে ভেতরে যে বস্তুটা তৈরি হয়) মোরব্বা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন