সুব্রত রুজ
দক্ষিণবঙ্গের মিষ্টি নিয়ে একটা লেখা লিখব বলে অনেকদিন ধরেই মনস্থ করেছি। কিন্তু স্বভাব-আলসেমির কারণে টুকরো টুকরো লেখা ইতিউতি লিখি; আবার বিছানায় কান্নিক মেরে শুয়ে পড়ি। কদিন আগে কম্পু খুলে ভীম নাগের ওপর লেখা একখানা নোটে চোখ পড়তে সেটা পড়তে আরম্ভ করলাম। পড়তে পড়তে কেমন ঘোর লেগে গেল। কখন যে কিবোর্ডে হাত চলতে শুরু করেছে, নিজেও টের পাইনি। ঘোর কাটল একবারে কুক কেলভির ঘড়ি প্রথম পর্ব শেষ করে।
আমার মতো কুঁড়ে এমন একটানে হাজারখানেক শব্দ লিখে ফেলল, প্রথমটা নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। নিজের লেখা নিজেই বারচারেক পড়ে মনে হল, যাঁর লেখা তিনিই হয়তো লেখালেন।
লেখাটা ‘রসেবশে’তে পোস্টিয়েছিলাম। প্রথম কিস্তিতেই বন্ধুরা যে পরিমাণ কেয়াবাত, আফরিন, সাবাস দিলেন, তাতে করে ছাতি তো ছাতি, ঘাড়, গলা, পেট সব ছাপ্পান্ন ইঞ্চি হয়ে একবারে গ্যাসবেলুন। উৎসাহের চোটে দিলাম আর দুটো পর্ব নামিয়ে।
প্রশান্তদা ছন্দে গেঁথে যা একখানা পিঠচাপড়ানি দিলেন, মা মেরির কসম, আইএসও ৯০০০ পেলেও এতখানি আনন্দ হত না।
বন্ধুরা আবদার করতে লাগলেন, ‘নাল্পে সুখমস্তু। আরও কিছু নাবাও দেখি বাছা।’ অতএব গা ঝাড়া দিয়ে উঠলাম। এতখানি ভালোবাসা আর ভরসা করেন সবাই? জান কবুল।
আদা জল-টল খেয়ে কোমর বেঁধে আদ্যিকালের কড়া তাড়ু নামিয়ে তো ফেললাম; কিন্তু মিষ্টি নিয়ে লেখালিখি করা কি আর ছেলের হাতের মোয়া? মিষ্টি নিয়ে লেখালিখি করা সোজা কাজ নয়, কারণ মিষ্টির ইতিহাস এবং ভূগোল দুই-ই নানা প্যাঁচপয়জারে ভর্তি। মিষ্টি খাওয়া ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে, এ বলা শিবের অসাধ্যি। সভ্যতার পথে মানুষ যত এগিয়েছে, জিভকে তুষ্ট করার সাধনাও তত বেশি করেছে। মিষ্টতার সাধনার প্রাচীনতম অস্ত্র ছিল মধু। পরবর্তী কালে এল আখের রস; কিছুদিন পরে গুড়; তারপরে মিষ্টান্ন।
এদিকে মিষ্টান্ন কথাটাকে সন্ধিবিচ্ছেদ করলে পাই, মিষ্ট + অন্ন। অন্নকে মিষ্ট করেই মিষ্টান্নের পথচলা শুরু। প্রথমে আখের রস বা গুড় ও চাল সরাসরি যুক্ত হত। বন্ধু কল্পনা টুডু জানিয়েছেন, সাঁওতালদের উৎসব ও আচারে গুড়ভাত একটা প্রধান উপকরণ এবং এর বয়েস কয়েক হাজার বছর। শতদ্রু ব্যানার্জিও মহারাষ্ট্রে সুগন্ধী চাল, আখের রস, সাদা তিল, মশলা ও সিদ্ধিপাতা যোগে একরকম ভাত খাওয়ার কথা লিখেছেন। এও প্রাচীন। এরপর এল চালগুঁড়ো ও গুড় দিয়ে মোদক।
মানুষ দুধ খেতে শিখেছে এগারো হাজার বছর আগে। দুধ খেতে শেখার পরে দুধ, গুড় ও চাল দিয়ে পায়েস তৈরি হল। মোদক ও পায়েস, এই দুটোই বোধহয় প্রাচীনতম মিষ্টি।
বৈদিক যুগ থেকে আস্তে আস্তে মিষ্টির বৈচিত্র্য বাড়ল। গুড় থেকে চিনি তৈরি হল। দুধ মেরে তৈরি হল খোয়া, ক্ষীর, ছানা। মিষ্টির কারিগরিতে চাল বা চালগুঁড়ো ছাড়াও গমের গুঁড়ো, আটা, ময়দা, সুজি, বেসন, যোগ হল। নানা পারমুটেশন কম্বিনেশনে নিত্যনতুন মিষ্টি তৈরি হতে লাগল। বাংলাদেশে এখন কিছু না হলে শ-খানেক মিষ্টি পাওয়া যায়।
মিষ্টির বৈচিত্র্য বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জটিলতা। অনেক মিষ্টিরই দশা পরশুরাম-কৃত ভূশুণ্ডীর মাঠের সেই পেতনির মতো। তিন প্রজন্মে তিনজনের স্ত্রী। একই জিনিস ভিন্ন ভিন্ন কারিগরের হাতে ভিন্ন ভিন্ন চেহারা নিয়েছে এবং সবাই সত্যজিত-কৃত জটায়ুর মতো তুড়িলাফ দিচ্ছেন, ‘ওটা আম্মার।’ এতসব জট ছাড়িয়ে সুতো বের করতে যতখানি হিম্মত এবং পাণ্ডিত্য লাগে, আমার নেই। একটা কারণ আমি মোদকসন্তান হলেও মিষ্টি বাবদে নেহাতই ইতরজন। বাপ-দাদা-আমি, তিন প্রজন্ম তাড়ু ফেলে কলম ধরেছে।
অতএব, যদ শ্রুতং, তন্মুদ্রিতং।
শ্রুতি বাবদে অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছি, কিন্তু দুজনের কথা না উল্লেখ করলে মহাপাতক হবে। প্রথমজন আঙুরবালা দাসী, আমার দিদিমা। আমার মাতামহ ছিলেন ভীম নাগ মশায়ের ঘরের ভাগনে আর মাতামহী শ্রীরামপুরের প্রখ্যাত মোদকসন্তান মহেশ দাসের কন্যা। কাজেই দুই খানদানি পরিবারের তথা কলকাতার মোদকমহলের যেসব গল্প দিদিমার ঝুলিতে মজুত ছিল, তার পরিমাণ নেহাত ফেলনা নয়। কমবয়েসে এসব কাহিনির গুরুত্ব বুঝিনি। যখন বোঝার মতো বোধ হল তখন দিদিমার যথেষ্ট বয়েস হয়ে গেছে, স্মৃতি প্রতারণা করছে। ওই বিরাট খাজানার যেটুকু গুঁড়োগাঁড়া অবশিষ্ট আছে, সেটুকুই পাঠকের পাতে তুলে দেব।
দ্বিতীয়জন আমার মাতৃদেবী। মা নিজেই কারিগর, এবং এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আগে বা এখনও মোদককুলে যাদের মিষ্টির দোকান, তাদের বাড়ির মহিলারা নেপথ্যে অনেকখানি শ্রম দান করে থাকেন। ফলত কারিগরি বাবদে দক্ষতায় অনেক মহিলা পুরুষদের কান কাটতে পারেন। মাতৃকুল জাতব্যবসায় ধরে রেখেছেন এবং মা অনেককাল সেই দোকানের কাজ করেছেন। মা অসম্ভব ভালো গুড়ের কাজ জানেন এবং যতদিন ক্ষমতা ও উৎসাহ ছিল বছরভর নানারকম মিষ্টান্ন প্রস্তুত করে তাঁর দুই পুত্রের মনোরঞ্জন করেছেন। মায়ের চ্যালাগিরি করেছি, উপরম্তু বেশ কয়েকবছর মামাবাড়িতে অন্তেবাসী ছিলাম। চোখের সামনে অনেক মিষ্টি তৈরি হতে দেখেছি। ফলত আমার মিষ্টির কারিগরি সম্পর্কে আবছা একটা ধারণা তৈরি হয়নি, এটা বললে সত্যের অপলাপ হবে।
মা ও মামাবাড়ির অবদান ছাড়া এ লেখা হতই না। কাজেই এই লেখায় পরশুরামের উদোর মতো বারবার মা ও মামাদের কথা এলে পাঠক-পাঠিকা নিজগুণে মার্জনা করবেন। এই লেখা মূলত দক্ষিণবঙ্গের মিষ্টি নিয়ে। যেসব মিষ্টি বদনসিবির কারণে আস্বাদন করতে পারিনি বা যার প্রস্তুতপ্রণালী জানা নেই, সেগুলো এড়িয়ে গেছি, কারণ বইপড়া বিদ্যা পাঠকের পাতে তুলে দেওয়া ঘোর অনৈতিক বলে আমি মনে করি।
মাতৃচরণ বন্দনা করে বন্ধুদের ভালোবাসা পাথেয় করে কড়াই চাপালাম। এবার দেখা যাক কদ্দুর কী নামাতে পারি। পাঠকের রসনা, থুড়ি বাসনাতৃপ্তি হলে শ্রম সার্থক।
সুব্রত রুজ
subrataruj1.dgp@gmail.com
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন