নারকেল পর্ব

সুব্রত রুজ

map

রান্নাই হোক আর মিষ্টিই হোক, নারকেল বাঙালি হেঁশেলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। বহু পুরোনো মিষ্টি আনন্দনাড়ু তৈরি হয় চালগুঁড়ো, গুড় আর মিহি করে কাটা নারকেল দিয়ে। কাটা নারকেল, কারণ অতদিন আগে কুরনি ছিল না। পরে কুরনি এল, কিন্তু আনন্দনাড়ুর নারকেল কাটাই রয়ে গেছে।

কুরনি আসার পর গুড় দিয়ে নারকেল নাড়ু হল, আর গুড় নারকেলের পাক বা ছাঁই পিঠে বানানোর কাজে লাগল। এসব আগে লিখেছি। এখন চিনি ও নারকেলের পাক নিয়ে আলোচনা করব।

রসকরা: চিনির রস করে তাতে কোরানো নারকেল দিয়ে মাঝারি আঁচে আস্তে আস্তে নেড়ে পাক ঘন হয়ে এলে এলাচগুঁড়ো কর্পূর দিয়ে নামিয়ে একটু ঠান্ডা করে হালকা গরম থাকতে থাকতে পাকিয়ে নিলেই রসকরার নাড়ু তৈরি।

রসকরা করার সময় দুটো ব্যাপারে সাবধান থাকতে হয়; এক, নারকেল কোরানোর সময় একদম ওপরের লাল স্তরটা যেন বাদ যায়, নচেৎ রসকরা ধবধবে সাদা হবে না, একটু কালচে মেরে যাবে। গুড়পাকে এই সমস্যাটা নেই, সবটাই কালাচাঁদ।

দ্বিতীয়ত, চিনির রস করার সময় একটু দুধ দিয়ে দিলে চিনির গাদটা ভেসে উঠবে। গাদটা ফেলে দিয়ে রসে একটু একটু করে নারকেল কোরা দিয়ে ক্রমাগত নেড়ে যেতে হবে। তলায় চিট ধরে গেলে কিন্তু বর্ণে গন্ধে প্রাণে দোলা লাগার বদলে প্রাণপাখি খাঁচাছাড়া হতে চাইবে।

রসকরা বহু পুরোনো মিষ্টি। ধর্মমঙ্গল (১৭১০-১১ খ্রিঃ) বইতে পদ্মচিনি ও গঙ্গাজল নাড়ুর উল্লেখ আছে। চিনি ও নারকেল বাটা মিশিয়ে পাক করে মিহি করে গুঁড়িয়ে নিলে পদ্মচিনি ও পাকিয়ে নাড়ু বানালে গঙ্গাজলি নাড়ু হত। পদ্মচিনি গুঁড়ো করার আগে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হত বা পরে রোদ খাওয়ানো হত কি না সেটা সঠিক জানা নেই। ছোটোবেলায় খেয়েছি, কিন্তু তৈরি হতে দেখিনি। এক প্রবীণার কাছে জিনিসটা তৈরির বিবরণ শুনেছি। এই চিনি নাকি মাসখানেক রেখে খাওয়া যেত, সেই আন্দাজে মনে হয় রোদ খাওয়ানো হত। এটা ওপার বাংলাতে খুব চালু ছিল এবং ওখানে নাকি এখনও লক্ষ্মীপুজোর দিন পদ্মচিনি মা লক্ষ্মীকে ভোগ দেওয়া হয়। চৈতন্যচরিতামৃতে আছে এই গঙ্গাজল নাড়ু বা রসকরা চৈতন্য মহাপ্রভুর (১৪৭৮-১৫৩৩) বিশেষ প্রিয় ছিল।

চন্দ্রপুলি: নারকেলকোরা মিহি করে বেটে সঙ্গে খোয়া মিশিয়ে রসকরার মতো করে পাক করলেই চন্দ্রপুলি হবে। চন্দ্রপুলি পাক করার সময় রসকরার উলটো পদ্ধতিতে খোয়া নারকেলের পাকে একটু একটু করে রস যোগ করতে হয়। অভিজ্ঞ কারিগররা সরাসরি চিনি দিয়ে নাড়তে থাকেন। নারকেল আর চিনির অনুপাত কেজিতে তিনশো থেকে পাঁচশো গ্রাম। খোয়া মোটামুটি তিনশো গ্রাম। পাক হয়ে গেলে কাঠের অর্ধচন্দ্রাকৃতি ছাঁচে ফেলে বাঁধা হয়। আকৃতির জন্যই এই নাম। পদ্মাপুরাণে(১৪৮৫ খ্রিঃ) আছে বেহুলার বিয়েতে নাকি এই মিষ্টি খাওয়ানো হয়েছিল। সে ধরলে এই মিষ্টির বয়েস পাঁচশো বছরেরও বেশি। তার বেশিও হতে পারে। কারণ এসব গল্প মুখে মুখে অনেকদিন চলেছে, তারপর লেখা হয়েছে।

নারকেল ছাপা: নারকেল মিহি করে প্রথমে দুধটা চিপে বের করে নেওয়া হয়। কারণ আমার জানা নেই। অতঃপর এক কেজি চিনিতে তিনশো গ্রাম নারকেল বাটা দিয়ে পাক করে গোল করে ছাঁচে ফেলে বাঁধা, নয়তো হাতে চ্যাপটা করে নেওয়া। ছাঁচে ফেললে ছাপা, না ফেললে তক্তি। পুজোর মাসে গোটা কলকাতায় হাজারে হাজারে এই মিষ্টি বাঁধা হয়। আমরা কিশোরবয়সে গামলা গামলা নারকেল ছাপা বেঁধেছি। চিনির ভাগ বেশি থাকায় শুকোবার পর এক্কেরে সিতুমিঁয়ার বয়ানে ‘চহার মগজ শিকস্তন’। কিন্তু এটা ছেলেবেলায় খুব প্রিয় ছিল। কর্পূরগন্ধী এই মিষ্টি নিশ্চয় অন্যদেরও প্রিয়, নইলে এত বিক্রি হয় কেন? পুজোর মিষ্টি হিসাবে এটা বহু জায়গায় চলে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%