ছানা পর্ব

সুব্রত রুজ

map

আগুনের আবিষ্কার যেমন মানুষের সভ্যতার পথে এগিয়ে চলার একটা বড়ো ধাপ, তেমনি মিষ্টির জগতে ছানার আবির্ভাবও একটা বড়ো ঘটনা। যেমন বৈপ্লবিক, তেমন বিতর্কিত। বস্তুত ছানা আসার পর মিষ্টির বৈচিত্র্য অনেকখানি বেড়ে যায় এবং সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কার হয় রসগোল্লা জাতীয় খাবার এবং সন্দেশের। ফলত মিষ্টিপ্রেমীরা হাতে স্বর্গ পান।

মিষ্টির জগতে ছানার আবির্ভাব হয়েছে অনেক পরে। মানুষ দুধের ব্যবহার শুরু করেছে মোটামুটি এগারো হাজার বছর আগে। প্রথমে দুধ, তারপর আস্তে আস্তে আসে দই, মাখন, ক্ষীর ও সর। ক্রমশ মাখন ও সর জ্বাল দিয়ে ঘি তৈরি হল।

তারও আগে থেকে মানুষ গুড় ও দানাশস্য ব্যবহার করে মিষ্টি তৈরি করতে শিখে গেছে। দুধ আসার পর আস্তে আস্তে প্রথমে পায়েস, তারপর রাবড়ি, মালাই, ক্ষীরের মিষ্টি খাওয়া শুরু হল। দানাশস্যের গুঁড়ো তো ছিলই। চিনি আবিষ্কারের পর ব্যাপারটা আরও জমল।

কিন্তু দই, মাখন, ক্ষীর ইত্যাদি ছিল দুধের স্বাভাবিক রূপ। সেখানে ছানা হল বিকৃত রূপ। দুধকে অম্ল বা অ্যাসিড দিয়ে ফুটিয়ে ছিন্ন করে অর্থাৎ কাটিয়ে ছানা তৈরি হয়।

বৈদিক আমলে ছানা ছিল না। ফলে প্রথম থেকেই ব্রাহ্মণরা দুগ্ধবিকারের ফলে উদ্ভূত ছানাকে অশাস্ত্রীয় বলে বর্জন করলেন। পুজোআচ্চায় ছানা নিষিদ্ধ হল। যদিও কালের নিয়মে ছানার মিষ্টি দেবার্চনায় এসেছে, কিন্তু সেটা অনেক পরে।

ছানা কীভাবে এল সেই নিয়ে প্রথম থেকেই বিতর্কের শুরু। প্রচলিত মতে ছানার আবির্ভাব হয় বাংলায়, হুগলি জেলায়। ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজরা হুগলির সপ্তগ্রামে পা রাখেন। এর কিছুদিন পরে ডাচরা চুঁচুড়াতে গেড়ে বসেন। ওখানে ওঁদের গির্জা ছিল। ডাচদের পাচকরা সবাই ছিলেন স্থানীয়। ডাচরা ওঁদের কটেজ চিজ বা পট চিজ তৈরি করা শিখিয়ে দেন। তার থেকে গোটা বাংলায় ছানার প্রচলন হয়। বাংলার ছানা এবং জার্মান পট চিজ যে একই বস্তু, এ সাক্ষ্য দিয়েছেন ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, স্বামী বিবেকানন্দের ছোটো ভাই। উনি ইউরোপের অনেক দেশেই ঘুরেছেন, কাজেই চশমদিদ গাওয়া।

ওদিকে ওড়িয়ারা দাবি করেন ছানা তাঁদের সৃষ্টি। এ ব্যাপারে রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য স্যান্যাল ২০১৩ সালে একটি মূল্যবান প্রবন্ধ লিখেছিলেন। রামকৃষ্ণবাবু নিজে খাদ্য-সংস্কৃতির গবেষক, তা ছাড়া জীবনের একটা বড়ো অংশ উড়িষ্যায় কাটিয়েছেন। কাজেই তাঁর সাক্ষ্য এক্ষেত্রে মূল্যবান।

রামকৃষ্ণবাবুর মতে, আজ থেকে প্রায় ছশো বছর আগে উড়িষ্যার এক গুড়িয়া বা ময়রা আকস্মিকভাবে ছানার সন্ধান পান। কথাটা এক কথায় উড়িয়ে দেওয়ার মতো না। বাসি দুধ গরম করতে গিয়ে ফেটে ছানায় পরিণত হয়েছে এ অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই কমবেশি আছে।

তবে মাত্র ছশো বছর আগে ছানার সন্ধান পাওয়া গেছে, এ কথা শুনে আমার বিচারবুদ্ধি দু-হাত জোড় করে বলল, “আই বেগ টু ডিফার মি লর্ড। এগারো হাজার বছর আগে থেকে দুধ খাওয়া চলছে, অতদিন আগে ফ্রিজ ছিল না। দুধ সংরক্ষণ করার নানা কায়দাকানুন করতে হত। বস্তুত পনির ও খোয়ার উদ্ভাবন একই প্রয়োজন-জননী-সম্ভূত; দুগ্ধ সংরক্ষণ। সেখানে মাত্র ছশো বছর আগে ছানা পাওয়া গেল? তার আগে কি দুধ কেটে যেত না?”

প্রশান্তদা অভিমত দিলেন, “শুনেছি ‘ছিন্ন’ শব্দটি থেকে ছানা কথাটা এসেছে। আবার মহাভারতে ‘সান্নায়’ কথাটি আছে, যদিও সেটি ঠিক কী, বলা হয়নি। আমার ব্যক্তিগত ধারণা ছানা ভিন্ন নামে প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। ভারতের মতো উষ্ণ দেশে দুধ কাটত না, এটা ভাবা কষ্টকর।”

মি লর্ড বললেন, হক কথা। আগেও হরদম দুধ কেটে যেত। কিন্তু সে ছানাকাটা দুধ ফেলে দেওয়া হত। সম্ভাব্য কারণ হল ভট্টাচার্যমশাইদের বিধান। রামকৃষ্ণবাবু যে গুড়িয়ার কথা বলেছেন, তিনি সম্ভবত ওই কাটা ছানাকে প্রথমবার কাজে লাগান। সেটা আকস্মিক হতে পারে না, পরীক্ষানিরীক্ষার ফল। পৃথিবীর কোনও আবিষ্কারই মাটি ফুঁড়ে শিবঠাকুর ওঠার মতো ওঠেনি। পরীক্ষানিরীক্ষা করতে করতেই তাদের জন্ম।

ছানার বয়েস অপেক্ষাকৃত নবীন হওয়াতে যাঁরা খাদ্যসাংস্কৃতিক তাঁদের একটা সুবিধা আছে। ছানার জন্ম ও ব্যবহার নিয়ে যেমন অনেক লিখিত বিবরণ আছে, তেমনি বহু খানদানি মোদক পরিবারে নানা স্মৃতি এখনও সজীব আছে। একটু রং-টং চড়ানো, তা হোক। চেষ্টা করলে সেখান থেকে আসল ঘটনা বার করা যায়।

আবার একইসঙ্গে দেখা যাচ্ছে একই মিষ্টি একাধিক কারিগরের নামে চলছে। আসলে ব্যাপারটা অনেকটা গান বা ছবি আঁকার মতো। ভালো শিল্পী কখনোই গুরুর কাছে শেখা বিদ্যা হুবহু প্রয়োগ বা পরিবেশন করেন না। তিনি তাঁর নিজস্ব বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করেন। কেউ যদি পণ্ডিত রবিশংকর ও পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের একই রাগের ওপর করা কোনও কম্পোজিশন পাশাপাশি শোনেন তাহলে আমার বক্তব্য বুঝতে অসুবিধা হবে না। দুজনেই একই গুরুর শিষ্য, অথচ বাজনায় বিস্তর তফাত আছে। গুরু বাবা আলাউদ্দিন খান যা শিখিয়েছেন, শিষ্যদ্বয় নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। রবিশংকরের বাজনায় দক্ষিণী প্রভাব একটু বেশি, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্দোর ঘরানার আমীর খানকে অনুসরণ করেছেন। ফলে ওঁদের বাজনায় মাইহার ঘরানার ছাপ আছে ঠিকই, কিন্তু দুজনের বাজনা দুই বোন। মিষ্টিতে কীভাবে এটা এসেছে সেটা যথাস্থানে বোঝাবার চেষ্টা করব।

দুধ ব্যবহার করার পর বাসি দুধ যাতে ফেটে না যায়, তাই দই বা ক্ষীর বা খোয়ায় পরিণত করে তাকে কয়েকটা দিন বাঁচিয়ে রাখার উপায় আবিষ্কৃত হয়েছিল। ছানার ব্যবহার শুরু হওয়ার পর একই শিরঃপীড়া শুরু হল। প্রায়শ দেখা গেল ছানা বিক্রেতাদের কাছে, নয় মিষ্টির দোকানে কিছুটা করে অবিক্রীত বা অব্যবহৃত ছানা রয়ে যাচ্ছে। ছোটোবেলায় দেখেছি কলকাতার রাস্তায় একটু বেলা করে এরকম অবিক্রীত ছানা নিয়ে ছানার ব্যবসায়ীরা চেঁচাচ্ছেন, ‘অ-বি-লি ছে-এ-না-আ-আ।’ এই অবিলি ছানা বেশ একটু কম দামেই বিক্রি হত। হয়তো বা একটু লোকসানেই। তবু কলকাতা বলে অবিলি ছানা বিক্রি হয়ে যেত। মফস্সলে হয়তো ফেলে দিতে হত।

দিনের পর দিন আর কত লোকসান দেওয়া যায়? বেশ কিছু মিষ্টান্নব্যবসায়ী পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করলেন কী করে ছানাকে দীর্ঘায়ু করা যায়। তার ফল এক এক করে বলছি।

ছেনাপোড়া: উড়িষ্যার ছেনাপোড়া সারা দেশে বিখ্যাত। এখানকার নয়াগড় শহরে সুদর্শন সাহু নামে এক মিষ্টান্ন বিক্রেতা আজ থেকে মোটামুটি একশো বছর আগে প্রথম ছেনাপোড়া তৈরি করেন। কথিত আছে সাহু মশায় কিছুটা অবিলি ছানাকে চিনির রস মিশিয়ে দোকানের নিভু নিভু উনুনের ওপর রেখে দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যান। সকালে এসে দোকান খুলে দেখেন ছানার তাল চমৎকার এক মিষ্টান্নে পরিণত হয়েছে।

এই গল্প ছোটোবেলায় বাবার মুখে শুনেছি। পরে কোনও একটা খবরের কাগজের আর্টিকেলে পড়েছি এবং এখন উইকিপিডিয়ায় তথ্যটি উঠে এসেছে। বিবিধ ভার্সনে একই গল্প পাওয়া যায়।

ছানাপোড়া তৈরি হয় কাঁচা ছানার সঙ্গে চিনি বা গুড় বা রস মিশিয়ে। একে সুগন্ধী করার জন্য এলাচ দেওয়া হয়। কেউ কেউ কাজু ও কিশমিশের ব্যবহারও করেন। সব উপাদান একসঙ্গে মিশিয়ে মাটির হাঁড়িতে মুখবন্ধ করে নিভন্ত বা কম আঁচে বসিয়ে দিলেই আস্তে আস্তে ওই ছানা কেকের মতো ফুলে ওঠে। সুগন্ধ বেরিয়ে এলেই বুঝতে হবে ছানাপোড়া তৈরি। ছানায় মেশানো চিনি বা গুড় পুড়ে গিয়ে ক্যারামেল হয়ে যায় এবং ছানাপোড়ার বাইরের দিকটা ঠিক কেকের মতোই বাদামি বর্ণ ধারণ করে। পোড়া চিনির একটা নিজস্ব গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং এটাই ছানাপোড়ার ইউএসপি।

আজকাল ছানাপোড়া তৈরি হয় বাটা ছানার সঙ্গে চিনি, সামান্য সুজি ও একটু এরারুট মিশিয়ে। একটু থকথকে ব্যাটার করে এলাচগুঁড়ো মিশিয়ে কেকের মতো ওভেনে দিয়ে বা বেকিং ট্রে-তে করে উনুনে চাপিয়ে সেঁকে নিলেই ছেনাপোড়া তৈরি। আমরা বাড়িতে এভাবেই তৈরি করি। উড়িষ্যার অনেক বাড়িতে এভাবেই তৈরি হয়।

বাড়িতে ছানা পোড়া করতে হলে আড়াইশো গ্রাম জল ঝরানো ছানায় একশো গ্রাম চিনি, তিরিশ গ্রাম সুজি, দু টেবলচামচ ঘি ও এক চা-চামচ বেকিং সোডা একসঙ্গে মেখে তাতে কাজু ও কিসমিসের কুচো ও এক চা-চামচ এলাচগুঁড়ো দিয়ে ওভেনে বসিয়ে দিলে পৌনে এক ঘণ্টায় হয়ে যাবে।

মামাদের দোকানে আগে ওড়িয়া কারিগররা ছানাপোড়া সরবরাহ করতেন। ১৯৯৯ সালে উড়িষ্যায় এক ভয়াবহ সাইক্লোন ধেয়ে আসে, প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। সাইক্লোনের পরবর্তী সময়ে অনেক কারিগর বাড়ি চলে গিয়েছিলেন, ফলে ছানাপোড়া সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। আমার পিঠোপিঠি মামাতো ভাই প্রবীর ঠিক করল ইলেকট্রিক ওভেনে ছানাপোড়া তৈরি করবে। সেইমতো কয়েকদিন পরীক্ষানিরীক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত বস্তু তৈরি হল। তারপর থেকে মামাদের দোকানে ইলেকট্রিক ওভেনে ছানাপোড়া তৈরি করা হয়। প্রবীর ছানাপোড়ায় এলাচের বদলে গোলাপজল, মিঠা আতর ও কেক এসেন্স মিশিয়ে একটা নতুন ধরনের সুগন্ধি ব্যবহার করে। লোকে ছানাপোড়ার এই নতুন রূপ পছন্দ করেছে।

বাবা জীবনের বেশ খানিকটা অংশ উড়িষ্যায় কাটিয়েছেন। ওঁর কাছে ছানাপোড়া তৈরি করার এক অভিনব কৌশল শুনেছিলাম।

বাবা যে পদ্ধতি বলেছিলেন তা এইরকম: প্রথমে কাঁচা শালপাতা দিয়ে গোটা চারেক বড়ো ঠোঙা বানিয়ে নিতে হবে। একটা ঠোঙায় ছানা বাটা দিয়ে সে ঠোঙা আর-একটা ঠোঙায় বসিয়ে সেটা আর-একটায় বসিয়ে ওপরের ঠোঙাটা শালপাতা দিয়ে সিল করে সবটা নিভু নিভু আঁচে বসিয়ে ধারে ধারে কয়লাগুঁড়ি দিয়ে সারারাত ফেলে রাখতে হবে। ওপরের তিনটে স্তর পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে। ভেতরে চমৎকার ছানাপোড়া। এ পদ্ধতিতে আদিবাসীরা এখনও একরকমের পিঠে করে থাকেন। ছানাপোড়ার এ পদ্ধতিটা অবশ্য হাতেকলমে পরীক্ষা করে দেখিনি। বাড়িতে ওভেনেই ছানাপোড়া হয়। এ মিষ্টিটা ওড়িয়াদের খুব প্রিয়।

কাঁচাগোল্লা: কাঁচাগোল্লা সৃষ্টির মূলেও রয়েছে ছানা সংরক্ষণ করে রাখার ভাবনা। ১৭৬০ সালে নাটোর শহরের লালবাজারের মধুসূদন পালের দোকান ছিল নাটোরের প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান। কোনও একদিন দোকানে অনেক ছানা বেঁচে যায়। ছানা নষ্টের হাত থেকে রক্ষা পেতে ছানাতে তিনি চিনির রস ঢেলে জ্বাল দিয়ে নামিয়ে রাখতে বলেন। এরপর মুখে দিয়ে দেখা যায় ওই চিনিমেশানো ছানার দারুণ স্বাদ হয়েছে।

মিষ্টি তো হল, এখন নতুন মিষ্টির নাম কী রাখা হবে, এ নিয়ে শুরু হয় চিন্তা ভাবনা। যেহেতু চিনির রসে ডোবানোর পূর্বে ছানাকে কিছুই করতে হয়নি, অর্থাৎ কাঁচা ছানাই চিনির রসে ঢালা হয়েছে, এর নাম দেওয়া হল কাঁচাগোল্লা। কাঁচাগোল্লার স্বাদ পাক করা সন্দেশকেও হার মানিয়ে দেয়। এর রয়েছে একটি মিষ্টি কাঁচা ছানার গন্ধ, যা অন্য কোনও মিষ্টিতে পাওয়া যায় না। ধীরে ধীরে মিষ্টিরসিকরা এই মিষ্টির প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন।

কাঁচাগোল্লা করতে গেলে ছানা তিন ভাগে ভাগ করতে হয়। ছানাটা একটু মোটা করে মেখে নিতে হবে। বাটা চলবে না। এবার দুভাগ ছানায় এক তারের রস ঢেলে বা চিনি দিয়ে আস্তে আস্তে নেড়ে নিতে হয়। যখন মিশ্রণটি একটু ঘন হয়ে আসবে তখন বাকি একভাগ দিয়ে নেড়েচেড়ে নিলেই কাঁচাগোল্লা তৈরি হবে। কাঁচা ছানার হালকা গন্ধটাই এর আকর্ষণ। এই মিষ্টি করতে গেলে খুব গনগনে আঁচ দিলে চলবে না, তাহলে কাঁচা ছানার গন্ধটাই চলে যাবে। এতে শীতকালে গুড়ও ব্যবহার করা হয়। কেউ এলাচ বা জায়ফল দেন, কেউ দেন না। এখনকার ভাষায় বলতে হলে এলাচ ছাড়াটা ক্লাসিক ভার্সন, অন্যটা ফর্টিফায়েড।

মাখা সন্দেশ: বনগ্রাম বা বনগাঁর বিখ্যাত সন্দেশ। অবিভক্ত ভারতের সাতক্ষীরায় এর জন্ম। দেশভাগের পর কারিগররা বনগাঁয় আশ্রয় নিলে এখানকার মাখা সন্দেশ বিখ্যাত হয়ে ওঠে। কলকাতার কাঁচাগোল্লা আর বনগাঁর মাখা সন্দেশ প্রায় একই বস্তু। আগেই যেটা বলেছি, রবিশংকর আর নিখিল ব্যানার্জি। দুটোর পার্থক্য লিখে বোঝানো শক্ত।

কাঁচাগোল্লার আরও ভার্সন আছে। প্রাণহরা নামে একরকম মিষ্টি খেয়েছি সেটা হল খোয়া ও সর মেশানো কাঁচাগোল্লা। ওপরে একটি কিশমিশ দেওয়া। একদম মিহি করে বাটা ছানার কাঁচাগোল্লাও খেয়েছি। সেটা ভালো লাগেনি। একটু গুঁড়ো গুঁড়ো ভাবটাই এর বৈশিষ্ট্য।

মিষ্টান্নপ্রিয় শতদ্রু ব্যানার্জি জানিয়েছেন, “আমার জানা মাখা সন্দেশ জৌগ্রামে পাওয়া যায়। ওখানে সাঁওতালপাড়ার একটা ছোট্ট মিষ্টির দোকানে দানাদার, মাখা সন্দেশ আর প্যাঁড়া পাওয়া যায়। কখনও কখনও বোঁদেও করে। ওখানে ছানার বদলে দুধকে ফুটিয়ে ফুটিয়ে গাঢ় করে। সেই ঘন রাবড়িসদৃশ তরলে দেওয়া হয় খোয়া ক্ষীরের গুঁড়ো আর সাদা কীসের একটা গুঁড়ো। চিনিও হতে পারে, আটাও হতে পারে। তারপর কাঠের হাতা দিয়ে অনেক্ষণ কাঠকয়লার নিভু আঁচে নাড়ে।

কেজি দরে বিক্রি করে, অনেকসময় আলুভাতের মতো করে কাঁচা শালপাতায় দেয়। পুজোয় দেওয়ার মিষ্টি হিসাবে খুবই জনপ্রিয়।”

আমার মনে হয়েছিল ওটা কালাকাঁদ হতে পারে। সে কথা বললে তিনি জানালেন, “জিনিসটা খেয়েছি নিজে, খেতে ঠিক কালাকাঁদের মতো নয়, বরং সাধারণ সন্দেশের মতো, জাস্ট খুব নরম আর মিষ্টিটা একটু কম, হালকা নোনতা। আর এখন দোকানে যেটা কালাকাঁদ বলে বিক্রি হয়, সেটার মতো টেক্সচারটা গ্র্যানুলার নয়, এটা অনেক মসৃণ সারফেসটা। তবে ভাঙলে অনেকটা নরম খোয়াক্ষীরের মতো টেক্সচারটা। আর আঠালো একেবারেই নয়।”

টেক্সচার বলতেই ব্যাপারটা খোলসা হয়ে গেছে। ব্যাপারটা শোনা। এইভাবে অনেকদিন আগে, হয়তো বা প্রাক-ছানা যুগে হুগলি জেলায় গোয়ালারা দুধ মেরে সংরক্ষণ করতেন এবং জিনিসটা মাখা সন্দেশ বলে চলত। ছানা আসার পরে কাঁচাগোল্লা আর মাখা সন্দেশ এক হয়ে যায়। এই পদ্ধতি এখনও যে চালু আছে সেটা জানা ছিল না। স্মৃতি মণ্ডল মুখার্জি জানালেন তাঁর পিত্রালয় কামারকুণ্ডু, তিনিও জানতেন না। হয়তো দু-একজন সেই সাবেকি পদ্ধতি ধরে রেখেছেন, আমরা জানি না। আগেই বলেছি মিষ্টির ব্যাপারস্যাপার বড়োই গোলমেলে।

আর এক রসিকজন শুভঙ্কর ব্যানার্জির অভিজ্ঞতা, “নলহাটেশ্বরী-তে পুজো দিতে গিয়ে মন্দিরের উলটোদিকের একটা দোকানে পূজা উপাচারের সঙ্গে মিষ্টিও কিনেছিলাম... মিষ্টি বলে যেটা দিল দোকানি সেটা দেখতে সুজির মতোন... দাম কিছুটা বেশিই নিয়েছিল, অনেকদিনের কথা আজ আর মনে নেই তবে দামটা দিয়ে আমি বিশেষ সন্তুষ্ট হইনি... সাধারণ সুজির জন্য অত দাম দিতে সত্যি বলতে কি গায়েই লেগেছিল... পুজোর পরে মিষ্টি মুখে দিয়ে দেখি সেটা আদৌ সুজি নয়... ক্ষীর জাতীয় কিছু... খেতে অতীব উমদা... পরে সম্ভবত বাড়ির জন্যও কিনে এনেছিলাম আলাদা করে... দেখতে একজ্যাক্টলি সুজির মতন কিন্তু ক্ষীর... অদ্ভুত লেগেছিল...”

এগুলো সবই প্রাচীন পদ্ধতিতে মারা দুধ। কাঁচাগোল্লার সন্দেশও আছে। দোদো আর গুপো।

দোদো সন্দেশ করতে গেলে কাঁচাগোল্লার পাক করে তারপর গোল্লা পাকিয়ে বারকোশে ওই গোল্লা চিনির মন্ডার কায়দায় থ্যাপ করে ফেলে কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। একটু টেনে গেলে এক এক করে তুলে নিয়ে একটু কাঁচা ছানা দিয়ে দুটো দুটো করে জুড়ে দিলেই দো-দো সন্দেশ। শীতকালে দোদোর পাকে নলেন গুড় পড়ে, অন্যসময় চিনি।

গুপো সন্দেশের জন্ম হুগলির গুপ্তিপাড়ায়। এককালে খুব নাম ছিল। একে বলা হত বাংলার প্রথম ব্র্যান্ডেড সন্দেশ। কলকাতায় নৌকো করে গুপ্তিপাড়া থেকে গুপো সন্দেশ চালান যেত। গুপো সন্দেশ আমার জানশোনা কোনও দোকানে বানানো হয় না, কাজেই প্রস্তুতপ্রণালী জানা নেই। জিভের আন্দাজে যেটুকু বুঝেছি এও দোদো সন্দেশের মতো কাঁচাগোল্লার পাক জোড়া দেওয়া। দিদিমার পিত্রালয়ে গুটকে সন্দেশ নামে একরকম সন্দেশ হয়, গুপোর সঙ্গে মিল আছে।

এ তো গেল কাঁচা বা মাখা ছানার কথা। এবার বাটা ছানায় আসি।

বাটা ছানা মানে হল ছানাকে হাতের তালু দিয়ে পাটায় ঘষে ঘষে একদম মিহি করে ফেলা, যাতে কোনও দানা না থাকে। মাখা সন্দেশ ছাড়া যে-কোনো ছানার মিষ্টি করতে গেলেই ছানাটি ভালো করে বেটে নেওয়া আবশ্যক। এরপর তার সঙ্গে একটা বাঁধনি দিতে হয়, নচেৎ রসে ফেললে বা ভাজলে মিষ্টি ভেঙে যাবে। এই বাঁধনি দেওয়ার জন্য ময়দা, এরারুট বা সুজির যে-কোনো একটা বা একাধিক উপাদান ব্যবহার করা হয়।

বাটা ছানার মিষ্টিকে দুরকম ভাগে ভাগ করা যায়। রসের মিষ্টি ও সন্দেশ। রসের মিষ্টি আবার দুরকম: সেদ্ধ ও ভাজা। এক এক করে আলোচনা করা যাক।

সেদ্ধ মিষ্টি: সেদ্ধ মানে ছানা বেটে বাঁধনি মিশিয়ে তারপর তাকে আকার দিয়ে জলরসে ফেলে সেদ্ধ করা। সেদ্ধ মিষ্টির মধ্যে প্রথমেই আসে রসগোল্লা।

রসগোল্লা বাংলার বাইরে বঙ্গালি মিঠাই বলে নামজাদা হলেও এর জন্ম উড়িষ্যায়। কিছুদিন আগেই জি আই ট্যাগ নিয়ে বাংলা-উড়িষ্যার দ্বন্দ্ব নিশ্চয় মনে আছে।

রসগোল্লা যে উড়িষ্যার সৃষ্টি, এ নিয়ে উইকিপেডিয়াতে চমৎকার একটি নিবন্ধ আছে। এখানে সে বিস্তৃত আলোচনায় গেলাম না। শুধু প্রয়োজনীয় কথাগুলি লিখছি।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পুরীতে ১৫১০-১৫৩৪ এই চব্বিশ বছর বাস করেছিলেন। তিনি রসগোল্লা ও সরপুরি খেয়ে খুব পছন্দ করেন। তখন রসগোল্লা ক্ষীরমোহন নামে পরিচিত ছিল। জগন্নাথ মন্দিরে লক্ষ্মীদেবীকে এই ভোগ দেওয়া হত। এসব কথা মুখের কথা না, কৃষ্ণদাস কবিরাজ রীতিমতো লিখে গেছেন।

তারপর তিনশো বছর সব চুপচাপ। ১৮৪৬-৪৭ সাল নাগাদ রানাঘাট এলাকায় একজনের কথা জানা যায়। তাঁর নাম হারাধন ময়রা। জনশ্রুতি তিনি এলাকার জমিদার পালচৌধুরিদের অনুরোধে রসগোল্লা তৈরি করেন।

রামকৃষ্ণবাবুর লেখায় পাই ১৮৬৪ সাল নাগাদ শান্তিপুরের হারাধন ময়রা পুরীতে তীর্থ করতে গেছিলেন। তিনি ক্ষীরমোহনের প্রস্তুতপ্রণালী শিখে আসেন। আবার ১৮৬৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টের কাছে ব্রজ ময়রা বলে একজন রসগোল্লা বিক্রি করতেন।

সব তথ্য মেলালে একটাই সম্ভাবনা মনে আসে। শ্রীচৈতন্যের সময়ে তো বটেই, হয়তো আরও আগে থেকে পুরীতে রসগোল্লা ছিল। হারাধন ময়রা বা ব্রজ ময়রা কেউই রসগোল্লা আবিষ্কার করেননি। তৈরি করা শিখেছিলেন। ১৮৬৪ সালে হারাধন ময়রা পুরী থেকে রসগোল্লা বানানো শিখে আসেন, এটা রামকৃষ্ণবাবু বলেই দিয়েছেন।

এবার উড়িষ্যার দাবিটা দেখা যাক। জনশ্রুতি অনুসারে পুরীধামের কাছেই পহলা বা পাহালা বলে একটি গ্রামে গোয়ালাদের বসবাস ছিল। প্রচুর দুধ উৎপাদন হত। নষ্টও হত অনেক। জগন্নাথ মন্দিরের জনৈক পুরোহিত গোয়ালাদের ছানা তৈরি করা শেখান। তিনি কোথায় ছানা তৈরি শিখলেন এ ব্যাপারে অবশ্য জনশ্রুতি নীরব। যাই হোক, পাহালা গ্রাম থেকেই ছানার ব্যবহার শুরু হয় এবং পাহালা গ্রাম ক্রমশ উড়িষ্যার মিষ্টি হাবে পরিণত হয়। রসগোল্লাও প্রথম এখানেই তৈরি হয়, এখনও যা পাহালা রসগোল্লা নামে পরিচিত।

পাহালা রসগোল্লা আমি নিজে কখনও খাইনি। কিন্তু বাবার কাছে এর বিবরণ শুনেছি। বাংলায় যে স্পঞ্জ রসগোল্লা আমরা খাই, তার চেয়ে একটু শক্ত ও ভারী। রসটাও স্পঞ্জ রসগোল্লার মতো পাতলা জলরস নয়, মোটা। কমবেশি এক তার। বাঙালি রসগোল্লার মতো তুলতুলে না। রংটাও হলদেটে বা লালচে।

রানিগঞ্জ ও বাঁকুড়া জেলার বিভিন্ন অংশে একরকম রসগোল্লা পাওয়া যায়, আমার বাবার মতানুসারে যাকে পাহালা রসগোল্লার ছোটো বোন বললেই হয়। বাবার জন্ম ১৯৩৮ সালে, টানা কুড়ি-একুশ বছর উড়িষ্যায় ছিলেন, ফলে তাঁর সাক্ষ্য উড়িয়ে দেবার মতো না।

এ মিষ্টি অনেক খেয়েছি। পাহালা রসগোল্লার যে বিবরণ বাবা দিতেন তার অনুরূপ। এতে ময়দা ও সুজি দুটোই বাঁধনি হিসাবে দেওয়া হয়, ফলে এই রসগোল্লার রংটাও বাঙালি রসগোল্লার মতো ধবধবে সাদা না, ঈষৎ লালচে। রসটাও মোটা, এক তার।

অঞ্জন চক্রবর্তী লিখেছেন, তিনি বার দুই পাহালা রসগোল্লা খেয়েছেন। নরম, মসৃণ টেক্সচারের, কিন্তু বাঙালি রসগোল্লার মতো উৎকৃষ্ট না। রংটাও একটু হলদেটে। বড়ো সাইজের রসগোল্লার ভেতরে একটি নকুলদানা থাকে। রানিগঞ্জে যে রসগোল্লা পাওয়া যায় মোটামুটি ওরকমই।

কথা হল রানিগঞ্জ বা বাঁকুড়ায় এই রসগোল্লা এল কী করে? উত্তর হল রানিগঞ্জ থেকে একটি রাস্তা চলে গেছে, যার নাম মিদনাপুর রোড। এই রাস্তাটাকে মিদনাপুর রোড বলা হলেও এই রাস্তা ধরে নাক বরাবর চলে গেলে বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলার ভেতর দিয়ে গিয়ে সোজা শ্রীক্ষেত্রে গিয়ে ওঠা যায়। আবার ওড়িয়ারাও এই রাস্তা ধরে বাংলায় আসতেন। ফলে এই রাস্তার আশেপাশের লোকেরা পাহালা রসগোল্লা বা তখনকার উড়িষ্যার আর-একটি জনপ্রিয় মিষ্টি ছেনাগুজা তৈরি শিখবেন, এটা বিচিত্র কিছু না।

তাহলে রসগোল্লার আবিষ্কারক বলে আমরা যাঁকে জানি, সেই নবীন চন্দ্র দাস কে?

নবীন চন্দ্র দাস, বাগবাজারে দোকান খোলেন ১৮৬৬ সালে। তিনি আদি প্রথায় রসগোল্লা তৈরি করতে জানতেন। কিন্তু প্রতিযোগী ময়রাদের থেকে একটা আলাদা কিছু করার তাগিদে তিনি খাঁটি গোরুর দুধের ছানায় কম মিষ্টি ও কম ময়দার বাঁধনি দিয়ে পাতলা রসে ফুটিয়ে যে রসগোল্লা তৈরি করেন তাই আজকের স্পঞ্জ রসগোল্লা। নরম তুলতুলে। রস নিংড়ে ফেলে দিলে আবার আগের আকৃতিতে ফিরে আসে। এই রসগোল্লা কীভাবে জনপ্রিয় হল তা নিয়ে একটা চমৎকার গল্প আছে।

ভগবান চন্দ্র বাগলা নামে এক কাঠের ব্যবসায়ী একদিন নবীন ময়রার দোকানের পাশ দিয়ে সপরিবারে যাচ্ছিলেন । ছোটো ছেলের জল তেষ্টা পেলে তিনি দাঁড়ালেন দোকানের সামনে জল নিতে। বাঙালি সংস্কার, শুধু জল দিতে নেই, নবীন ময়রা তাই জলের সঙ্গে একটা স্পঞ্জ রসগোল্লা দিলেন ছেলেটির হাতে ।

ছেলেটি খেয়ে পছন্দ করল। তার মুখে সেকথা শুনে আর সবাই একটা দুটো করে খেলেন। আস্তে আস্তে বাগলাবাবুর হাত ধরে স্পঞ্জ রসগোল্লা কলকাতা, ক্রমে বাংলায় ছড়িয়ে পড়ল।

রামকৃষ্ণবাবু তাঁর প্রবন্ধে স্পষ্ট লিখেছেন, ‘স্পঞ্জ রসগোল্লা আবিষ্কারের দাবিদার নবীন ময়রা, কিন্তু আদি রসগোল্লার নয় বলেই আমার মত।’ এই মত আমার বাবাও পোষণ করতেন। এঁরা দুজনেই জীবনের বেশ কিছুটা অংশ উড়িষ্যায় কাটিয়েছেন, দুরকম রসগোল্লাই খেয়েছেন। ফলে বইয়ের কচকচির অপেক্ষা এঁদের প্রত্যক্ষদর্শন অনেক মূল্যবান।

শতদ্রু ব্যানার্জি লিখেছেন, ‘যদ্দূর শুনেছি প্রাচীন রসগোল্লার পূর্বমিষ্টি (পূর্বপুরুষের মতো আর কি) হল দানাদার। পরবর্তীতে রস ও উপাদানের প্রিসিশনের গবেষণায় হঠাৎ উৎপত্তি আজকের রসগোল্লার। দাদুর কাছে শুনেছি, এমনকী ১৯৪৫-৫০ সালেও কলকাতার বাইরে গ্রামেগঞ্জে মিঠাই হিসেবে রসগোল্লার তেমন পরিচিতি ছিল না। যদিও খড়খড়ে দানাদার পাওয়া যেত।’

দানাদার আগে না রসগোল্লা আগে বলা শক্ত, কারণ দুটো প্রায় একই জিনিস। শুধু ফোটানোর ও রসের গাঢ়ত্বের তফাত। বিশদে আসছি; আর দ্বিতীয় কথাটা সত্যিই। প্রাক-রেফ্রিজারেটর যুগে স্পঞ্জ রসগোল্লা কলকাতার বাইরে খুব একটা চলত না। স্পঞ্জ রসগোল্লা একদম ফুলটুসি। একবেলা রাখলে তার রস টক হয়ে যায়। এ জিনিস চলা তখনকার দিনে মুশকিলই ছিল। ভারী রসগোল্লা আর দানাদারটাই চলত।

রসগোল্লা করতে হলে খাঁটি গোরুর দুধ চাই। এই দুধ আবার দুরকমের; মওয়া আর আ-মওয়া। মওয়া দুধ মানে মন্থিত দুধ। মন্থন করে যার ক্রিম বার করে নেওয়া হয়েছে বা ফুটিয়ে ঠান্ডা করে সর তুলে নেওয়া হয়েছে। সাদা কথায় মাটা তোলা দুধ। এই ক্রিম বা সর জ্বাল দিয়ে ঘি হয়। বাকি দুধ দিয়ে রসগোল্লা সন্দেশ বানানো হয়।

রসগোল্লা করতে হলে ছানা কাটিয়ে বেটে নিয়ে তাতে সামান্য ময়দার বাঁধনি দিয়ে গোল্লা পাকিয়ে জলরসে ফোটাতে দিতে হবে। আস্তে আস্তে গোল্লাগুলো ফুলে উঠবে। তাহলেই রসগোল্লা তৈরি। তবে যত সহজে লিখে দিলাম, ব্যাপারটা তার চেয়ে অনেক জটিল। জলরস ফুটতে ফুটতে ঘন হবে। তাতে গরম জল ঢেলে আবার রস পাতলা করে দিতে হবে। রস কতখানি ঘন হবে; উনুনে কেমন আঁচ রাখতে হবে, এসবের ওপরেই রসগোল্লার স্বাদ ও টেক্সচার নির্ভর করে। শেষে কড়া থেকে তুলে পাতলা জলরসে ফেলা। তবেই রসগোল্লায় স্পঞ্জ ভাব আসবে।

মোয়া ও আমোয়া দুধের ছানার রসগোল্লার তফাত পরিচয় গুপ্তের ভাষায়, ‘আমি শুনেছি মোয়া ছানা মানে ক্রিম তুলে নেওয়ার পর তৈরি ছানা। এই ছানার রসগোল্লা খুব নরম হয়, কিন্তু আমোয়া ছানার রসগোল্লার মতো জালিদার হয় না। আমার বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায়। কাছেই মহকুমা শহর ঘাটালের মোয়া ছানার গোল্লা আমার খুব প্রিয়। চন্দ্রকোনাতে কিন্তু আমোয়া ছানার কাজ হয় না।’

পরিচয়বাবুর কথাতেই বোঝা যাচ্ছে দুরকম দুধের রসগোল্লার ভূগোল দুরকমের। এ তফাত লিখে বোঝানোর মতো কলমের জোর আমার নেই।

বলরাম মল্লিকের সুযোগ্য উত্তরসূরি সুদীপ মল্লিক বেকড রসগোল্লা তৈরি করেছেন। কিছুটা রসমালাই গোত্রের। একটু সোঁদা গন্ধ আছে, সেটা বেকিং-এর ফল হতে পারে। দুর্গাপুরের মিষ্টি মেলায় খেলাম। বেশ লাগল। এখন মিষ্টি নিয়ে নামী দোকানগুলো নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা করছেন এবং তার ফলাফল দেখে মোদকসন্তান হিসাবে আনন্দই হচ্ছে। সুদীপ মল্লিকের মতো উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা যদি মিষ্টির ব্যবসায় আসেন, তবে আশা জাগে বইকি।

গুড় রসের রসগোল্লা তো আগেও ছিল, ইদানীং চকোলেট রসগোল্লা তৈরি হচ্ছে। তবে খেতে মন্দ নয়। মিষ্টিমেলায় যে চকোলেট রসগোল্লা খেয়েছি সেটা সাদা ছানার সাথে এক অংশ চকোলেট মেশানো ছানা দিয়ে গোল্লা পাকিয়ে তারপর রসে ফেলা। কলকাতার বিশেষ ক-টা দোকান এখন চকোলেট রসগোল্লা করছেন, তাঁদের ভিয়েনে উঁকি মারার সুযোগ এখনও হয়নি। তবে এন্ড প্রোডাক্টটি বেশ অভাবনীয়। খেতে মন্দ নয়।

কমলাভোগ আর লেবু রসগোল্লাও ভালো চলে। আমাদের ছোটোবেলায় কমলাভোগ অরেঞ্জ নামে বিখ্যাত ছিল। বিয়েবাড়ি মানেই সাদা রসগোল্লা আর অরেঞ্জ। আগে কমলাভোগে কমলালেবু ও লেবুর রস ব্যবহার করে গন্ধ আনা হত, কমলাভোগ কমলা রং করা হত জাফরান দিয়ে। পরে এল ক্যারামেল। এখন তো সিনথেটিক সেন্টের ছড়াছড়ি। দুর্গাপুর মিষ্টিমেলায় কলকাতার এক দোকান পঁচিশ-ছাব্বিশ রকম রং ও সুগন্ধের রসগোল্লা এনেছিলেন। তবে কতটা চলবে জানি না।

দানাদার: একে রসগোল্লার ছোটো বোন বলা যায়। দানাদার অনেক্ষণ ফোটাতে হয়। প্রথমে পাতলা রসে ফেললেও রসগোল্লার মতো জল ঢেলে রস বারবার পাতলা করা হয় না। ফলে রস ফুটে ফুটে একদম মোটা হয়ে যায়, দানাদারের রংটাও লালচে হয়ে যায়। ওপরটা শক্তমতো, কিন্তু ভেতরটা জালি জালি। এই টেক্সচারটা আসে আঁচ নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করা হচ্ছে তার ওপরে। রস মোটা হয়ে গেলে উনুন থেকে কড়া নামিয়ে নিয়ে একটু ঠান্ডা হলে অবাঙালিরা রস থেকে তুলে চিনির ওপর গড়িয়ে নেন। দানা দানা চিনি লেগে থাকে বলে দানাদার নামটা এসেছে। এ দানাদারের ওপরটা শুকনো। বাঙালি দানাদার রসেই থাকে। ফলে ভেজা।

চমচম: তারাপদ রায়ের পাঠকমাত্রেই পোড়াবাড়ির চমচমের নাম শুনেছেন। অধুনা বাংলাদেশের টাঙ্গাইল মহকুমার পোড়াবাড়ি এককালে চমচমের জন্য বিখ্যাত ছিল। দেশভাগের ফলে অনেক কারিগর এদেশে পালিয়ে এসে জলপাইগুড়ির বেলাকোবা নামক স্থানে আশ্রয় নেন। ধীরেন সরকার ও কালীপদ দত্তের হাত ধরে এখানে চমচম তৈরি শুরু হয় ও অচিরেই বেলাকোবার চমচম বিখ্যাত হয়ে ওঠে। আমি এ চমচম খাই ইসলামপুরে। উত্তরবঙ্গের অনেক দোকানেই বেলাকোবার চমচম পাওয়া যায়। তবে সে চমচম বেলাকোবার আমদানি না নবদ্বীপের দইয়ের মতো ইন্ডিয়া মেড ফরেন লিকার, সেটা অবশ্য জানি না।

বেলাকোবার চমচমের প্রধান বৈশিষ্ট্য তার রং ও প্রচুর খোয়াক্ষীরের ব্যবহার। ইসলামপুরে যে চমচম খেয়েছি তার বাইরেটা শক্ত, ভেতরটা জালি জালি। রস থেকে তোলার পর বাইরের কাঠিন্যের জন্য ভেতরের রসটা বেরিয়ে যেতে পারে না, কামড়ালেই খোপে খোপে রস।

দোকানির কাছে শুনলাম আগে বেলাকোবার চমচম সারারাত ধরে ঢিমে আঁচে ফুটিয়ে তৈরি করা হত। রস ফুটে ফুটে গাঢ় হত; একসময় নিচের রস পুড়ে ক্যারামেল হয়ে যেত এবং চমচম পোড়া ইটের মতো রং ধরে নিত। অবশেষে রস থেকে তুলে প্রচুর খোয়াক্ষীরে গড়িয়ে নেওয়া হত। তবে এখনকার চমচমে ক্ষীর থাকলেও আগেকার মতো সারারাত ধরে রসে ফোটানো সম্ভব হয় না। মোদকসন্তান, যা বোঝার বুঝে নিলাম। এখনকার চমচমের রংটি ক্যারামেলের ভড়কি।

উত্তরবঙ্গের দ্বিতীয় বিখ্যাত মিষ্টি হল কানসাট। এও চমচম। অবিভক্ত বাংলার শিবগঞ্জ জেলায় কানসাট অঞ্চল থেকে এই নাম। এই চমচমেরও গল্প বেলাকোবার চমচমের মতোই। দেশভাগের পর দলে দলে মিষ্টি কারিগররা মালদায় চলে আসেন। কানসাটের প্রসিদ্ধ মিষ্টি ব্যবসায়ী মহেন্দ্রনাথ সাহার পুত্র বিজয় কুমার সাহা বাবার শেখানো পথে এপারে এসে বাংলার মালদহে এসে কানসাটের যাত্রা শুরু করেন। ইসলামপুরে কানসাটও বিক্রি হয়। মালদার কানসাটও আমি খাইনি, ইসলামপুরেরটাই খেয়েছি। বেলাকোবার চমচমের মতোই। তবে রংটা বোলাকোবার চমচমের মতো গাঢ় লাল না, লালচে। আর বেলাকোবার চমচমের মতোই ক্ষীরে গড়ানো। ওপরটা একটু ফাটা ফাটা। ফুল ক্রিম গোরুর দুধ ব্যবহার করা হয়েছে। যেসব চমচম সচরাচর খেয়ে থাকি তার চেয়ে স্বাদে ও টেক্সচারে অনেকটাই আলাদা।

মালাই চমচম: বাঙালি চমচমের এই ডেরিভেটিভ পশ্চিমা মহারাজদের হাতে তৈরি। চমচম বানিয়ে তার ওপর ঘন দুধে জাফরান ভিজিয়ে ওপর থেকে সে দুধ ঢেলে দেওয়া হয়। কেউ কেউ ফুটন্ত দুধে চমচম ছেড়েই তুলে নেন। দুধ ঢুকতে যেটুকু সময় লাগে সেটা অবশ্য দেওয়া হয়। এটার আর-এক ভার্সন লর্ড চমচম। মালাই ও খোয়া দেওয়া। কোনও লর্ডের নামে নাম কে জানে? লর্ড ক্যানিং হতে পারেন। ভদ্রলোক এক নম্বর মিষ্টিখোর ছিলেন। দুধের বদলে রাবড়ি বা মালাই দিয়েও মালাই চমচম হয়। আবার চমচম লম্বালম্বি অর্ধেক কেটে মাঝে খোয়া কাজু-টাজু দেওয়া; এও খেয়েছি।

অন্ডালে রেলস্টেশনে রেলের ব্যবস্থাপনায় একটি মিষ্টির দোকান আছে। সেখানের শিবাজীর ছানার টোস্ট এককালে বিখ্যাত ছিল। জিনিসটা হল চমচম চ্যাপটা করে তৈরি করে ক্যারামেল দিয়ে লাল রং করা। তারপর লম্বালম্বি কেটে মাঝে বেশ পুরু করে মালাই। ওপরে একটি চেরির টুকরো। ছোটোবেলায় এতটাই পছন্দ করতাম যাকে বলে ‘ইসকো খা ডালা তো লাইফ জিঙ্গালালা।’ এখনও সে দোকান আছে, সে ছানার টোস্টও আছে, তবে সে স্বাদ পাই না। উপাদানের দোষ কি বয়েসের দোষ কে জানে!

মৌচাক আর ছানার টোস্ট প্রায় একই জিনিস। কেবল মৌচাকের ভেতরটা আরও জালি জালি। ১৯৯৬ সালে কল্যাণীর একটি দোকানে দেখেছি মৌচাক বলে যেটা বিক্রি হচ্ছিল সেটা গোটা চমচম। ওপরে কুচো কুচো ক্ষীর দেওয়া। একটা খেলাম। কিছুটা কানসাটের মতো লাগল। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, একই মিষ্টি সামান্য অদলবদল করে অন্য নাম দিয়ে চালানোর অনেক উদাহরণ আছে। বিশেষত সন্দেশে।

ছানার গজা: ছানার গজা উড়িষ্যার জনপ্রিয় মিষ্টি ছেনাগুজা। এটা উড়িষ্যা থেকে কীভাবে বাংলায় এসেছে সেটা রসগোল্লা অংশে বলেছি। এখন পশ্চিমবঙ্গের সব জায়গায় পাওয়া যায়।

ছানার গজা করার দুরকম পদ্ধতি আছে। প্রথমে ছানা বেটে তাতে ময়দা ও সুজির বাঁধনি দিয়ে চৌকো চৌকো করে কেটে বা হাতে গজার আকারে গড়ে মাঝারি আঁচে ঘণ্টা দুই-আড়াই ধরে দানাদারের মতো সেদ্ধ করে নিয়ে রস ঠান্ডা হলে রস থেকে তুলে রস ঝরিয়ে খোয়ার গুঁড়ো ছড়িয়ে নিলে ছানার গজা হল। ওপরটা দানাদারের মতো শক্ত, ভেতরটা জালি জালি। কানসাটের মতোই খোপে খোপে রস।

দ্বিতীয় পদ্ধতিতে গজাগুলোকে ঘিয়ে ভেজে তারপর রসে ফেলতে হয়। একটু পরে রস থেকে তুলে নেওয়া হয়।

আমি বিভিন্ন জায়গায় দুরকম পদ্ধতিতে তৈরি ছানার গজা খেয়েছি। কোন পদ্ধতিটা বেশি ভালো, এ নিয়ে ওড়িয়াদের ভেতরেই নাক সিঁটকানি আছে। পাহালা অঞ্চলে সেদ্ধ পদ্ধতি চলে এবং ওঁদের মতে ওটাই সঠিক পদ্ধতি। ভেজে ছেনাগুজা? ওই ওরা করে। দু-দিনের যুগী, বুইলেন না?

উলটোদিকের বক্তব্য, সেদ্ধ ছেনাগুজা? সে তো চৌকো চমচম। অথচ দুই পদ্ধতিই সমান জনপ্রিয়।

ছানার মুড়কি: দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় মিষ্টি। কাঁচা বা কচাবাটা (মোটা করে বাটা) ছানাকে অল্প গোলাপি আতর বা মিঠা আতর ও চিনি দিয়ে মেখে হাতে করে ছোটো ছোটো চৌকো আকার দিয়ে পাতলা রসে ফেলে সেদ্ধ করে রস থেকে তুলে আবার মোটা রসে ফেলতে হবে। রস ঠান্ডা হলে মুড়কির ওপর দানা দানা লেগে থাকবে। মুড়কি কতক্ষণ ফুটবে তার ওপর তার টেক্সচার নির্ভর করে।

মালাইচপ: রসগোল্লা বা চমচম চপের মতো আকারে গড়ে নিয়ে সেদ্ধ করে ওপরে মালাই ও খোয়া দেওয়া। এটাও জনপ্রিয় মিষ্টি।

এ ছাড়াও রসগোল্লা বা চমচমকে ভিত্তি করে আরও ক-টা মিষ্টি আছে। সবচেয়ে চেনা রসকদম। একটি দানাদারের ওপর ক্ষীরের পরত দিয়ে তার ওপর পোস্ত শুকনো খোলায় ভেজে রসে ফেলে আবার শুকিয়ে ক্ষীরের ওপর পোস্তর পরত। কোথাও কোথাও ভাজা খোয়ার পরতও দেওয়া হয়। কলকাতা বা মফস্সলের অনেক জায়গায় ক্ষীর সেউয়ের মতো আকারে চেলে নিয়ে ওপরে পরত দেওয়া হয়।

পায়েস পর্বে রসমালাইয়ের কথা আগেই বলেছি। একটি বিয়েবাড়িতে রসগোল্লাকে টমেটো স্লাইসার দিয়ে কেটে স্লাইসগুলোর মধ্যিখানে নরম পাকের সন্দেশ দেওয়া একরকম মিষ্টি খেয়েছি। নামটা মনে নেই। আবার কাজুর পাক করে তার ওপর ছানা চাপিয়ে চ্যাপটা করে সেদ্ধ করা একরকম অভিনব মিষ্টি খেয়েছি। দুর্গাপুরের বিভিন্ন দোকানে একটা মিষ্টি পাওয়া যায়, ক্ষীরের পুরে ছানা চাপিয়ে তাকে ভাপিয়ে সেদ্ধ করা। হালকা মিষ্টি। এই মিষ্টিটা বেশ জনপ্রিয়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%