সুব্রত রুজ

মানুষের জিভ যে ক-টা স্বাদ গ্রহণ করতে পারে, মিষ্টতা তার অন্যতম। মানুষ মিষ্টি খেতে শিখেছিল প্রকৃতির কাছ থেকে। আজ থেকে পনেরো হাজার বছরেরও আগে মানুষ প্রকৃতির কোলে আখ এবং মধুর সন্ধান পায়। মধুর ব্যবহার অতি প্রাচীন এবং আমার ধারণা মধু আগে আবিষ্কৃত হয়েছিল। আখ পরে। বইপত্র ঘেঁটে যেটুকু জেনেছি, আখ আমাদের উপমহাদেশেই প্রথম জন্মেছিল। মানুষ প্রথমে কাঁচা আখটাই চিবিয়ে খেত, পরে পাথরে ছেঁচে রস বার করার কায়দা বার করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গুড় তৈরির কায়দাকানুন আবিষ্কার করে ফ্যালে। গুড়ের বয়েস পনেরো হাজার বছর হলেও ভারতে কবে থেকে গুড় তৈরি হচ্ছে সেটা সঠিকভাবে বলা শক্ত। যেটুকু জেনেছি মেসোপটেমিয়রা বহুকাল ধরে খেজুর রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানাত। ভারতীয়রা সম্ভবত ‘মেসো’ মশাইদের কাছ থেকেই গুড় তৈরির কায়দা শিখে নেয়। মেহেরগড়ের সময় থেকেই ইন্দো-ইরাক বাণিজ্যসম্পর্ক ছিল। সেটা ধরলে ভারতে যে হাজার নয়েক বছর আগে গুড় ছিলই, সেটা চোখ বুজে বলা যায়।
বংভূমের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদা ও বর্ধমান জেলাকে এককালে গৌড় বলা হত এবং অনেকের মতে এ অঞ্চলে প্রচুর গুড় উৎপাদন হত বলে গুড় থেকে গৌড় নাম হয়েছে। কথাটা একবারে ফেলে দেওয়ার মতো না। আমিই দেখেছি এইসব অঞ্চলে আমার ছোটোবেলায়, আজ থেকে বছর চল্লিশেক আগে প্রচুর আখচাষ হত, তাল ও খেজুরগাছেরও কমতি ছিল না, এবং বছরে দুবার আমাদের গ্রামে গুড়ের শাল বসত। আখ বা খেজুরের রস নৌকা আকৃতির বড়ো বড়ো কড়ায় জ্বাল দেওয়া হত এবং আমরা কিছু ছানাপোনা তন্ময় হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেদিকে তাকিয়ে থাকতাম। সাদা জলের মতো রস ফুটতে ফুটতে ধীরে ধীরে লালচে রং ধরত; গুড়ের সুগন্ধে চৌদিক মাত হয়ে যেত। শিউলিরা কাঠের পোলো খেলার ব্যাটের মতো দেখতে তাড়ু নিয়ে সেই রসকে ক্রমাগত নাড়াতেন। শেষে ওস্তাদ শিউলি কাঠের হাতা দিয়ে সেই রস তুলে একটা বড়ো কড়ায় রাখতেন। ঠান্ডা হলে ছোটো ছোটো হাঁড়িতে সেই গুড় ভরা হত।
আখের গুড় তিনবার তোলা হত। সবশেষে যে গুড় তোলা হত, ফুটে ফুটে ফুটে সে তখন গজ গতি প্রাপ্ত হয়েছে। তিন ফুটের চায়ের যতটা কদর, এই গজ গতি গুড়েরও তাই। প্রথম কাটের স্বর্ণকেশী তৃতীয় কাটে সুমেরে পরিণত হয়েছে। সেই কালাচাঁদকে কোন ফেয়ারনেস ক্রিমের ছোঁয়ায় শ্যামচাঁদ করে তোলা হত, সে রহস্য অজানাই থেকে গেছে। সেই ঘন আঠার মতো পদার্থকে মাটিতে গর্ত করে কাপড় পেতে বা টিনের ছাঁচে ফেলে দিয়ে ঘণ্টাখানেক রেখে দিলেই গুড় জমে থান ইট। একেই আমরা ভেলি বলে চিনি।
খেজুর গুড়েরও দু-ফুট হয়। প্রথম ফুট পয়রা (পয়লা থেকে), দ্বিতীয় ফুট পাটালি (পট্ট বা পাটা থেকে)। পয়রা গুড় তরল অবস্থাতেই তুলে নেওয়া হয়। পাটালি গুড় আর-একটু ফুটিয়ে ঘন করা হয়। ঘন, কারণ এটা বাঁশের চাটাইয়ের ওপর কাপড় পেতে তাতে ফেলে পাটার আকৃতি দেওয়া হয়। বাটি আকারের ছাঁচে ফেললে তাকে বলে লবাত বা নবাত।
এ ছাড়া আছে নলেন ও জিরেন। নলেন গুড় মানে গাছের প্রথম গুড়; জিরেন মানে ক-হাঁড়ি গুড় নামিয়ে গাছকে দিন তিনেক বিশ্রাম বা জিরেন দিয়ে ফের কামিয়ে বার করা গুড়। প্রতিটির আলাদা বৈশিষ্ট্য, আলাদা স্বাদ।
তালগুড় আমাদের গ্রামে হত না। তাই তৈরি হতে দেখিনি। একজন তালপাটালি বিক্রি করতে আসতেন। তালগুড় খেতে খারাপ না, তবে দক্ষিণেই বেশি চলে। ওখানে তালগাছের ছড়াছড়ি। কাঁচামাল সহজলভ্য বলে চলনও বেশি।
মিষ্টি তৈরিতে আখ ও খেজুর, এই দুরকম গুড়ই ব্যবহার করা হয়। আখের গুড় বাতাসা, দেশি চিনি, মুড়কি, টানা লাড়ু এইসবের কাজে লাগে। সন্দেশে, মুড়কিতে আর মোয়ায় লাগে খেজুর গুড়। খেজুর গুড়ের বাদশা হল নলেন। বড়ো নামজাদা কারিগররা এই গুড়ই ব্যবহার করেন। তারপর কদর জিরেনের, তারপর পয়রা।
গুড় তৈরি করা ভয়ানক কঠিন কাজ। যেটুকু বুঝেছি, গুড় তৈরির সময় উনুনে ঠিক কতটা আঁচ থাকবে; রস ঠিক কতটা ঘন হয়ে এলে আঁচ কমিয়ে নাড়তে হবে, এইসব আন্দাজ রপ্ত করতে গেলে হাঁটার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাড়ু ধরতে হবে, এবং অন্তত তিনটে পুরুষে; নচেৎ গুড়তত্ত্ব গুহায় নিহিত। খেজুর রসের ব্যাপার তো আরও কঠিন। আঁচের একটুখানি উনিশ-বিশে গুড়ের চরিত্রটাই পালটে যেতে পারে। এমনকী কড়ায় তাড়ু কতখানি জোর দিয়ে চালাতে হবে, সেটাও নাকি একটা ফ্যাক্টর। তবে এতখানি সূক্ষ্ম পার্থক্য যেসব রসিকজন ধরতে পারতেন তাঁরা আজ বিলুপ্ত। লাস্ট অফ দি টাইটানস যে কজন বেঁচে আছেন, তাঁরা মধুমেহ ও বয়েসের ভারে অথর্ব।
গুড় নিয়ে এত কথা বলার কারণ একটাই। প্রথমত, গুড় ও সন্দেশ একবারে রাধাকৃষ্ণের মতো পরষ্পর সম্পৃক্ত। পিঠের গল্পও একই। চিনির এই রমরমার যুগেও খেজুর গুড়ের আবেদন মিষ্টান্নরসিকদের কাছে বেড়েছে বই কমেনি। নলেন গুড়ের সন্দেশ বাদ দিয়ে শীতকাল? ইলিশ ছাড়া বর্ষা।
দ্বিতীয়ত, গুড়ের পাক তৈরি করা খুব কঠিন কাজ। আমি আচ্ছা আচ্ছা কারিগরকে গুড়সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়ে নাকের জলে চোখের জলে হতে দেখেছি। আখের গুড়ে ঠিক কতটা জল মিশিয়ে কতখানি আঁচে ফোটাতে হবে; গুড় ঠিক কতটা ঘন হবে, এ জিনিস রপ্ত করতে হলে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা চাই। মাকে দেখেছি গুড়ের পাক ফুটে ওঠার পর হাতা দিয়ে সেই মিশ্রণ একটুখানি তুলে ফুট দুই ওপর থেকে কড়ায় ফেলতে। কীরকম একটা সরু সুতোর মতো হয়ে সেই মিশ্রণ আবার কড়ায় ফেরত আসত এবং সেটা দেখে মা আবার সামান্য পরিমাণ জল দিতেন বা কড়া নামিয়ে দিতেন। গুড় ও রসের ঘনত্ব বোঝার এই কায়দাকে বলে তার। একতার মানে পাতলা রস, তারপর দু তার, তিনতার, চারতার। চারতারের রস খুব মোটা, দানাদারের রস। দেড় তার, সোয়া দু-তার, এসবও আছে। অনেক বছর মায়ের চেলাগিরি করে এবং হাতে-কলমে কাজ করেও মার মতো রসের চরিত্র বোঝার কায়দা আমার অনায়ত্ত থেকে গেছে। এ জিনিস শিখতে গেলে প্রফেশনাল লেভেলের অভিজ্ঞতা চাই। জিনও মনে হয় একটা ফ্যাক্টর। খেজুর গুড়ের ব্যাপার তো বলেইছি। গুড়ের মান ও কারিগরের দক্ষতা, এই দুটোর চূড়ান্ত তালমিল না হলেই সব্বোনাশ। গুড়ের সন্দেশ পোড়া চকোলেটের সন্দেশে রূপান্তরিত হবে।
গুড়ের বয়েস আগেই বলেছি পনেরো হাজার বছর, কিন্তু চিনিও কম পুরোনো নয়। চিনির আদি নাম শর্করা। সেটা থেকে হিন্দিতে শক্কর, ইংরিজিতে সুক্রোজ ও সুগার।
বাংলায় চিনি এসেছে চিনি অর্থাৎ চিনদেশি অর্থে। আজ থেকে আড়াইশো বছর আগে কলকাতা থেকে একটু দূরে টং আছু বলে এক চৈনিক ভদ্র চিনির কারখানা খোলেন। তার এন্ড প্রোডাক্ট হল টেবিল সুগার। তাকেই আমরা চিনি নাম দিয়েছি। মোটামুটি তখন থেকেই আমরা চিনিকলে বানানো চিনি খাই। আগে কিন্তু চিনি হাতে বানানো হত। কাশীবাসী ব্রাহ্মণেরা হাজার তিনেক বছর ধরেই শর্করা তৈরিতে বিশেষ পারঙ্গম ছিলেন। বয়স্কদের কাছে শুনেছি দিশি চিনি যেমন একটু লালচে, কাশীর চিনি বা মিছরি কলের চিনির মতো অতখানি না হলেও মোটামুটি সাদা ছিল।
দেশীয় প্রথায় গুড় থেকে চিনি ঠিক কী পদ্ধতিতে বানানো হয়, সেটা বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় বাংলা ১৩০৫ (ইং ১৮৯৮) সালে লেখা তাঁর মিষ্টান্ন-পাক নামক বইতে চমৎকার লিখে গেছেন। দিদিমার মুখেও শুনেছি অনেক খানদানি মোদক বংশের শুরুয়াত হয়েছিল দেলো চিনির কারবার দিয়ে। দেলো চিনির বর্ণনাও ওঁর কাছে শুনেছি, কিন্তু জিনিসটা ঠিক কী বস্তু বুঝতে পারিনি। মনে হল জিনিসটা বিগুড় (প্রাচীন কালের বড়ো দানার চিনি) জাতীয় কিছু, দেখতে অনেকটা তালমিছরির মতো। তবে তালমিছরির মতো এত মোটা দানা না।
মিষ্টান্ন-পাক অনুযায়ী গুড় জলে ফুটিয়ে ইস্ট জাতীয় কিছু দিয়ে গেঁজিয়ে তার ওপর পুকুরের শ্যাওলা দিয়ে ঢেকে কয়েকদিন রাখতে হবে। সেই মিশ্রণ ভালোভাবে গেঁজে উঠলে ওপর থেকে গেঁজানো অংশটা তুলে নিয়ে আবার দুধজল দিয়ে ফুটিয়ে দিলে দুধের ফেনার সঙ্গে গুড়ের গাদ বা নোংরা ভেসে ওঠে। কয়েকবার সেই গাদ তুলে নিলে বাকি অংশটাকে ঘন করে পাটায় ফেলে জমিয়ে তারপর সেই ডেলা চিনি গুঁড়ো করে চিনি তৈরি করতে হবে। এই চিনির রং কিন্তু কলের চিনির মতো ধবধবে সাদা না, ঈষৎ বাদামি। একেই আমরা দেশি চিনি নামে চিনি। এভাবে কয়েকবার চিনি তোলার পর যেটা পড়ে থাকে তাকে বলে ভুরা। চিনিকলে ওই অবশেষকে বলে মোলাসেজ। ভুরা আগে খাওয়া হত, এ ছাড়া গৌড়ী নামক সুরা সম্ভবত ভুরা দিয়েই তৈরি হত। (এখনও মোলাসেজ থেকে রাম তৈরি হয়।) চিনির বদলে ভুরা দিয়ে লোক ঠকানোর কারবারও ভালোরকম চলত। হীরে মালিনীর লবজে, “অন্য লোকে ভুরা দেয়, ভাগ্যে আমি চিনি।”
হাতে বানানো চিনি এখনও চলছে। দশকর্মার দোকানে এ চিনি দিশি চিনি নামে বিক্রি হয়। এর প্রধান কারণ কলের চিনি পুজো-আচ্চায় চলে না। কলে চিনি বানানোর সময় গুড় পাতলা করে তাকে ফিল্টার করা হয় এবং ফিল্টারটি আগে ছিল চারকোল বা কাঠকয়লার, পরে অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম অস্থিশর্করা ও তারও পরে রক্তশর্করা আসে এবং বলাই বাহুল্য শর্করাগুলির উৎস হল গো-মহিষ আদি পশু। তারপর ছোঁয়াছুঁয়ির বিচার আছে। ফলে আদি প্রথায় বানানো দেশি চিনি দিয়ে ঠাকুরের জাত বাঁচানো হয়, যদিও কলের চিনি দিয়ে বানানো সন্দেশ দিব্যি এন্ট্রি পাস পেয়ে গেছে।
কলের চিনি আসার পরে সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছে সন্দেশের এবং কলের চিনি না হলে স্পঞ্জ রসগোল্লার যে জন্ম হত না, এ ব্যাপারে আমার অন্তত কোনও সন্দেহ নেই। কলের চিনির দানা বা ক্রিস্টালগুলো সমান, অশুদ্ধি নেই বললেই হয়। কলে বানানো বলে প্রতিটি ব্যাচের মান প্রায় এক এবং রসের রং একবারে স্বচ্ছ। একদম পাতলা রসও উচ্চ মানের হয়।
মিছরির কথায় মনে পড়ল; মিছরি নামটি মিশ্র নামক ব্রাহ্মণদের নামের অপভ্রংশ হলেও হতে পারে। মিছরির জন্ম ইরানে নাকি ভারতে, তা নিয়ে মতবিরোধ আছে।
মিছরি বানাতে হলে হাঁড়িতে গরম জলে চিনি গুলে একটি সম্পৃক্ত দ্রবণ বানিয়ে তার মধ্যে একটি সুতো বা কাঠি ঝুলিয়ে দিলেই দেখা যাবে জল ঠান্ডা হচ্ছে আর সুতো বা কাঠিকে ধরে দানা দানা মিছরি জমে উঠছে। ওই গরমজলে গোলাপি আতর, বড়ো এলাচ, গোলাপজলও মেশানো হয় এবং হালকা গোলাপি সে মিছরি আক্ষরিক অর্থেই দেবভোগ্য। মিছরি কৃষ্ণের প্রিয় ভোগ।
আগে একরকম সন্দেশ তৈরি হত, তা বিশুদ্ধ চিনির ডেলা। চিনি গলিয়ে ঘন করে সেই ঘন রস আঠা আঠা হয়ে এলে তাই দিয়ে বানানো সন্দেশ। ঘন রসের গোল্লা ঈষৎ গরম গরমেই কাঠের বারকোশে ঘুঁটে দেওয়ার কায়দায় থ্যাপ করে ছুড়ে মেরে যে বস্তুটি তৈরি হল, তার দুটোকে সামান্য ময়দার অনুপান দিয়ে জোড়া লাগালে এই বস্তুটাই জোড়া সন্দেশ বা জোড়া মন্ডা। এ মিষ্টি জোড়া মন্ডা নামে এখনও পাওয়া যায়, যদিও এখনকার জোড়ামন্ডায় ছানা থাকে। দুর্গাপুজোর বিজয়ার যাত্রা বা ঠাকুরের ঘট ভাসানের আগে জোড়া মন্ডাটি অত্যাবশ্যক।
দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরি হয় বলে ভট্টাচার্য মশায়রা অনেক বছর ধরে ছানার মিষ্টি অশাস্ত্রীয় জ্ঞানে বর্জন করেছিলেন এবং ওই চিনির ডেলা মার্কা সন্দেশ খেয়ে জাত রক্ষা করতেন। চুপিচুপি বলে রাখি, এখনকার জোড়া সন্দেশ কিন্তু কলের চিনির। দেশি চিনিতে বানানো সন্দেশ বা জোড়া মন্ডা আমি দেখিনি, তবে গুড়ের মিষ্টি তৈরি দেখেছি, নিজের হাতে অল্পস্বল্প বানিয়েছি বলে আদি জোড়া মন্ডা কেমন ছিল ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারি।
ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরীর ‘রোমন্থন’ বইতে একটা চমৎকার গল্প আছে। বরিশালের যে স্কুলে উনি পড়তেন, সেখানে টিফিনের সময় কিছু টিফিন স্কুল থেকেই দেওয়া হত। সবচেয়ে জনপ্রিয় আইটেম ছিল এই জোড়া মন্ডা বা জোড়া সন্দেশ। তাতে ছানা নেই বললেই চলে, প্রায় সবটাই চিনি। সহপাঠীরা ওঁকে উৎসাহ দিত, ‘খাইয়া দেখ, সাইধ্য মেশডো।’ চল্লিশ-বেয়াল্লিশ বছর আগে এই মন্ডা সজ্ঞানে যখন খাই তখন আমি নেহাত শিশু। প্রথমবার সেই কর্পূরগন্ধী চিনির ডেলা খেয়ে আমারও মনে হয়েছিল, ‘সাইধ্য মেশডো।’
এখনকার জোড়া মন্ডায় অবশ্য অনেকখানি ছানা থাকে। ওই চিনির ডেলা এখন লোপ পেয়েছে। বাঁকুড়া ও গুসকরার জোড়া মন্ডার নাম আছে।
মধু মিষ্টি হিসাবে বড়োভাই, কিন্তু মধু নিয়ে আলোচনা এখানে নিরর্থক। মধু কাঁচাই খেতে হয়। গুড়ের মতো অগ্নিপক্ক করতে গেলেই ফটাস। কাজেই ঋষিরা যতই ‘মধুবাতা ঋতায়তে’ অথবা ‘মধ্বাভাবে গুড়ং দদ্যাৎ’ বলে চেঁচান না কেন, মিষ্টান্নে মধু বিবর্জিতা। মধুর একটাই সান্ত্বনা পুরস্কার, কুনাফা হালুয়া (আরব্য রজনী পশ্য, এখনকার কুনাফা চিনি ভ্যাদভ্যাদে) এবং প্যানকেক মধু মাখিয়ে খেতে হয়। প্যানকেকের বেলায় মধুর অভাবে মেপল সিরাপ চলে, কুনাফা হালুয়ার বেলা মধু ছাড়া অন্য বিকল্প নেই।
ওঁ মধু। চিনির একটা ছোট্ট গল্প বলে শেষ করি। জনৈক পিপীলিকা দেশভ্রমণ করতে গেছিল। যখন ফিরে এল তখন সবাই তার বেড়ানোর গল্প শুনতে এল। পিঁপড়ে বলে, যেখানে যাই চিনি, কেবল চিনি। ঠাকুরমা বুঝলেন, পিঁপড়ে চিনির কৌটোর তলায় চাপা পড়ে ছিল, ফলে সারাক্ষণ চিনির রসে অন্ধ হয়ে থাকত।
ইদানীং মধুমেহর বাড়াবাড়ি দেখে আমার নিজেদের সেই চিনির রসে অন্ধ পিঁপড়ের মতোই লাগে। যত সুগার, তত মিষ্টির দোকান। ইদানীং সুগার-ফ্রি মিষ্টিও বেরিয়ে গেছে। অতএব চালাও পানসি বেলঘরিয়া।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন