সুব্রত রুজ

দধি বা দই অনেকদিনের পুরোনো খাদ্য। এর বয়েস নেই নেই করেও ছহাজার বছর। প্রাচীনকালের মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে এর জন্ম, এটা মোটামুটি স্বীকৃত। সবাই জানেন ল্যাকটোব্যাসিলাই গোত্রের ব্যাকটিরিয়ার কারসাজিতে দুধের চরিত্র পালটে গিয়ে দুধ গেঁজে দইয়ে পরিণত হয়। আধুনিক যুগে ল্যাকটোব্যাসিলাস সরাসরি কালচার করে দুধে মিশিয়ে দই পাতা হয়। মিষ্টির দোকানে আগের দিনের পুরোনো দই একটু তুলে রাখা হয়। সেটাই পরের দিন দুধে মিশিয়ে দই পাতা হয়। একে বলে দম্বল বা সাজা। পাকা তেঁতুল বা ভিনিগার দিয়েও দই পাতা হয়।
প্রাচীনকালে এই দই ঠিক কীভাবে পাতা হত, সেটা জানা যায়নি। মনে করা হয় কোনও একটা ফার্নজাতীয় উদ্ভিদ থেকে ল্যাকটোব্যাসিলাস দুধের সংস্পর্শে আসে এবং সেখান থেকে মানুষ দই পাতার কায়দা শিখে নেয়। এ ছাড়া পাখি বা ভেড়ার পাকস্থলীতে ঈষদুষ্ণ দুধ ঢেলে দিয়ে দই জমানোর কথাও পড়েছি। পরিচয় গুপ্ত লিখেছেন, ‘একটা শোনা কথা শেয়ার করা যাক। দই পাতার জন্য নাকি একসময় কেঁচো ব্যবহার করা হত। কেঁচোটা ছিঁড়ে নেওয়া হত যাতে দেহরস বের হয়ে আসে। এভাবে পাতা দই ভালো বসে, এমনটাই জনশ্রুতি। সত্য-মিথ্যা জানি না।’
সুজাতা দাস জানিয়েছেন, ‘এটা একদম ঠিক। আমার মায়ের মুখে শুনেছিলাম, মামার বাড়িতে একটা বিয়েতে দই জমেনি, তাই হালুইকর বাড়ির গৃহকর্তা অর্থাৎ আমার দাদুর অনুমতি নিয়ে এই পন্থা দিয়ে দই জমাট করে।’
ভারতবর্ষেও দইয়ের ব্যবহার অতি প্রাচীনকাল থেকে আছে। বৈদিক আমলে দই বা দধিকে অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হত। হিন্দুদের যে-কোনো ক্রিয়াকর্মে পঞ্চামৃত লাগেই। এই পঞ্চামৃতের পাঁচটি উপাদান হল মধু, দুগ্ধ, দধি, ঘৃত, ও গুড় বা শর্করা।
দই দুরকম। টক দই ও মিষ্টি দই বা চিনিপাতা দই। বাংলার দই গোরু ও মোষের দুধের হয়। দুধকে ফুটিয়ে অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ করে প্রথমে ঈষদুষ্ণ করে নিতে হয়। তারপর তার সঙ্গে পুরোনো দই একটু ফেটিয়ে মিশিয়ে দিয়ে সারারাত ফেলে রাখলেই দুধ দইয়ে পরিণত হয়। দোকানের দই সাধারণত মাটির গামলা বা খুলিতে বসানো হয়। ফলে দইতে একটু সোঁদা গন্ধ হয়। এখন অনেক কর্পোরেট হাউস দই বানাচ্ছেন। মেশিনে বানানো প্লাস্টিকের কাপে বসানো সে দই হয়তো অনেক বিজ্ঞানসম্মতভাবে বানানো হয়, কিন্তু আমাদের মতো পাঁড় দইখোরদের ওই পাথরের খোরা বা মাটির ভাঁড়ের গন্ধওয়ালা ক্লাসিক দই-ই প্রিয়।
প্রাচীনকালে একরকম দই ছিল দ্রগঢ়। দুধ ঘন না করেই পাতা দই। পেটরোগাদের পথ্য। এটা এখনও দগড়া বা দগুড়ে দই নামে বেঁচে আছে। এসব দই টক দই।
দুধে চিনি দিয়ে ফুটিয়ে বা নেড়ে মিশিয়ে দিলেই হয় চিনিপাতা দই। চিনিপাতা দইয়ের মধ্যে কলকাতার লাল দই, নবদ্বীপের লাল দই ও পাতিসরার ক্ষীরদই খুব নামকরা। এককালে মোল্লাচকেরও খুব নাম ছিল। চুঁচুড়ার দই খেয়ে দেখেছি, খুব ভালো। খাঁটি গোরুর দুধের দই। এককালে কাগমারি ও বগুড়ার দই নামকরা ছিল। একটি বাংলা গানে কাগমারির দইয়ের উল্লেখ আছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন জনের লেখায় হুগলি জেলার হরিপাল ও সিঙ্গুরের দইয়ের কথা এসেছে। দু-জায়গারই দই খেয়েছি। তবে সিঙ্গুরেরটা বেশি ভালো লেগেছে।
কলকাতার বাইরে নবদ্বীপ ছাড়া লাল দই আগে পাওয়া যেত না। তবে ইদানীং অনেক জায়গাতেই লাল দই তৈরি হচ্ছে। তা ছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ার কারণে নবদ্বীপের লাল দই অনেক জায়গায় সরবরাহ করা হয়।
নবদ্বীপের এক ভদ্রলোক অনেক বছর ধরে আসানসোলের কয়েকটি দোকানে দই সরবরাহ করেন। তাঁর কাছে শুনেছি লাল দই প্রথম শুরু করেন কালু ঘোষ। উইকিতে তথ্যটা আছে, কিন্তু দেখলাম নাম আছে কালী ঘোষ।
লাল দই করতে হলে মোষের দুধ একদম ঢিমে আঁচে সারারাত ধরে ফুটিয়ে যখন লাল রং ধরতে শুরু করবে তখনই নামিয়ে নিতে হবে। আঁচ বেশি হলে বা লাল রং বেশি হলে দুধের গ্রেন পালটে যাবে, আর সে দুধ দিয়ে দই বসানো যাবে না। তারপর অন্যান্য দইয়ের মতো উনুনের ধারে বসিয়ে রাখা। বর্ষায় বা হালকা শীতে দইয়ের পাত্রের ওপর শালপাতা চাপা দিয়ে তার ওপর চটের বস্তা চাপা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত তাপ বা ওম দেওয়া হয়। কলকাতার যে লাল দই, তার লাল রং আসে দুধে ক্যারামেল যোগ করে এবং এটা নিয়ে তাঁদের বিশেষ লুকোছাপা নেই। কিন্তু নবদ্বীপের লাল দইয়ে কোনও রং দেওয়া হয় না, পুরোটাই অভিজ্ঞতা ও কারিগরি ওস্তাদি। তবে নবদ্বীপের দাদা দুঃখ করলেন, ইদানীং ওখানেও ফঁকিবাজি শুরু হয়েছে। তা ছাড়া অনেকে নিজেরা লাল দই করে নবদ্বীপের দই বলে চালায়।
আসল নবদ্বীপের দই চিনতে হলে হাঁড়ি উলটে দিন। দই যদি পাথরের মতো বসে থাকে তবে সে দইয়ের নবদ্বীপত্ব নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। নবদ্বীপের দাদার কাছে শুনেছি নবদ্বীপের দই হল হাঁড়িভাঙা দই। হাঁড়ি ভেঙে ফেললেও দই যে কে সেই। শক্তিপদ রাজগুরুর পটলা সিরিজেও এমন দইয়ের কথা পড়েছি।
বাকি ভারতে টক দইটাই খাওয়া হয়। রানিগঞ্জে একটি ছোটো রাস্তা আছে, তার নাম দইগলি। ওখানে উৎকৃষ্ট দই পাওয়া যায়। তবে রাজস্থানি দোকানের দই একটু বেশি টক। বাঙালিরা একটু হালকা টক খান। দক্ষিণী দইও একটু বেশি টক।
দইয়ের মধ্যে পাকা আমের রস দিয়ে আম দই খুব জনপ্রিয়। এ ছাড়া শশা দেওয়া হয়। ইদানীং রসগোল্লা ও দইতে নানারকম ফ্লেভার নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা হচ্ছে এবং তার ফল খারাপ হচ্ছে না। দুর্গাপুর মিষ্টি মেলায় এরকম কয়েকটা দই দেখলাম। একটা দুটো মুখেও দিলাম। খারাপ না। একটা কলা ফ্লেভারের দই বেশ লাগল। কলার ফ্লেভারটা নাকি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে তৈরি হয়েছে। আমাদের যাদবপুরেও এ ধরনের কাজ অনেক বছর ধরে হচ্ছে এবং কয়েকটি বিশিষ্ট দোকানে ব্যবহারও হয়।
একটা গল্প বলি। মাটির খুলিতে যে দই বসানো হয়, সে দইয়ে একটু সোঁদা গন্ধ থাকে। দই পাতার আগে হাঁড়ি ও খুলি জলে ভেজানো হয়। অনেক দিন আগে মামাদের দোকানের জনৈক বিলাসী খরিদ্দার নাকি মেজোমামাকে বলেছিলেন ওই জলে একটু গোলাপজল যোগ করতে, যাতে করে সোঁদা গন্ধটা চলে যায়। তারপরে কী হয়েছিল সেটা জানতে চাইলে মামা মুচকি হাসতেন। তাঁর আমৃত্যু এর জবাব পাইনি।
দই খুব উপকারী খাদ্য। হজমশক্তি বাড়াতে টক দই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তা ছাড়া গরমে শরীর ঠান্ডা রাখে বলে ভারতের মতো উষ্ণ জায়গায় এর কদর হওয়া স্বাভাবিক। তবে টক দইটাই সারা ভারতে কমবেশি চলে।
দই যে কেবল দই হিসাবেই খাওয়া হয় তা নয়, জলে গুলে ঘোল, ছাস, লস্যি ও ঠান্ডাই এসব শরবত হিসাবেও খাওয়া হয়। ছাস ও ঠান্ডাইতে নানারকম মশলা দেওয়া হয়, যেমন শশার বীজ, গোলমরিচ, সবুজ লংকাবাটা, বিটনুন, এবং সামান্য সিদ্ধির পাতা। অল্প সিদ্ধির পাতা নাকি ওষুধের কাজ করে। ঘোল করতে হলে দই নুন চিনি সহযোগে জল দিয়ে গুলে নিলেই হবে। লস্যি করার সময় দইটাকে ভালো করে ফেটিয়ে নেওয়া হয়। লস্যি পাঞ্জাব অঞ্চলের খাবার, কিন্তু বাঙালিরাও একে আপন করে নিয়েছেন। পাড়ায় পাড়ায় লস্যির দোকানগুলোই তার প্রমাণ। দইয়ের শরবতে পাকা আমের রস দেওয়ার প্রথাও অনেকদিনের। উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়িগুলোতে একসময় ঠান্ডাই বেশ চলত। ইদানীং ঠান্ডাইয়ের চল কমে আসছে। তবে দু-একটি শরবতের দোকানে এখনও ঠান্ডাই চালু আছে।
দইয়ের অপর ডেরিভেটিভ হল ভাপা দই। প্রথমে টক বা মিষ্টি দই কাপড়ে ঝুলিয়ে সারারাত রেখে দিতে হবে। দইয়ের জল ঝরে একদম শক্ত হয়ে যাবে। এবার দই ফেটিয়ে তাতে ঘন দুধ দিয়ে বা কনডেনসড মিল্ক দিয়ে চিনি বা মিছরি মেশাতে হবে। অতঃপর পাত্রে বসিয়ে পাত্রটাকে হাঁড়ি বা কড়ায় জলে বসিয়ে উনুনে বসিয়ে দিয়ে হাঁড়ির মুখটা ঢাকা দিয়ে ঘণ্টাখানেক ফুটিয়ে নিলেই ভাপা দই তৈরি। খেতে অনেকটা পুডিং-এর মতো। ভাপা দইতে এলাচ, জায়ফল, আম, কলা, আনারস এসব ফলও যোগ করা হয়। এটাও এককালে জনপ্রিয় খাবার ছিল। এখন নাকি চকোলেট গলিয়ে মেশানো হচ্ছে। খেতে কেমন কে জানে?
আমার এক বন্ধুর মা মুর্শিদাবাদের অভিজাত পরিবারের সন্তান। কলেজে পড়ার সময়, মোটামুটি ১৯৮৫-৮৬ সালে ওঁকে একবার ভাপা দই করতে দেখেছিলাম। সাদা দই ফেটিয়ে খুব ঘন লাল দুধ মেশালেন। তারপর মিছরি যোগ করলেন। এলাচ দিলেন না। দইটা নিজেই পেতেছিলেন। এবার একটা মাটির পাত্রে ওই মিশ্রণটা ঢেলে একটা হাঁড়ির ওপর একটা স্টিলের চালুনি পাতলেন। চালুনির ওপর মাটির সরাটা দিয়ে তারপর একটা ভিজে মোটা কাপড় দিয়ে সবসুদ্ধ ঢেকে উনুনে চাপিয়ে দিলেন। আধঘণ্টাটাক রেখে তারপর নামিয়ে দিলেন। দুপুরে যখন ভাত খেতে বসলাম তখন দই ঠান্ডা হয়ে গেছে। ক্ষীরগন্ধী আর গোলাপি মিছরির বাসযুক্ত সে ভাপা দইয়ের স্বাদ এত বছর পরেও মুখে লেগে আছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন