সুব্রত রুজ

দেবাদিদেব মহেশ্বরের মতো মিষ্টিরও দেবাদিদেব হলেন পরমান্ন বা পায়েস। অনেকদিনের পুরোনো মিষ্টি বলে এর প্রকারভেদও অনেক।
প্রথম পায়েস তৈরি হয়েছিল চাল, দুধ ও গুড় দিয়ে। চিনি আবিষ্কৃত হওয়ার পর গুড়ের জায়গায় চিনির পায়েস হল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চালের জায়গায় গমের গুঁড়ো (দালিয়া), সুজি, সেমাই, চালের গুঁড়ো এইসব উপাদান যোগ হল।
পায়েস পূর্ব ভারতে পায়েস, উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ক্ষীর ও দক্ষিণ ভারতে পায়সম নামে পরিচিত। বৈদিক আমলে ক্ষীর বলতে দুধকেই বোঝাত। উত্তরের ক্ষীর কীভাবে চালযুক্ত হয়ে পায়েস হল কে জানে। আমাদের পরিচিত ক্ষীর গাঢ় দুধ। আমাদের ক্ষীরে চাল-টাল থাকে না।
একটা গল্প বলি। বছর বিশেক আগেকার। ধানবাদের এক ভদ্রের কাছে এক দোকানের রুটি গুজিয়ার খুব নাম শুনতাম। দোকানটা একটা ধাবা; ধানবাদ থেকে টাটা যাওয়ার রাস্তার ওপরে। রুটি তো জানি, কিন্তু গুজিয়াটা কী? একটা গুজিয়া তো জানি বাঙালি দোকানের ক্ষীরকান্তি; ময়দা আর ক্ষীর দিয়ে বানানো। কিন্তু সেটা শুকনো মিষ্টি। তা দিয়ে রুটি খেতে গেলে গলায় লেগে যাবে। ধানবাদি গুজিয়া তাহলে অন্য কিছু। ওদিকে থাকি আশি কিলোমিটার দূরে। একদিন গিয়ে যে চোখে আর চেখে দেখে আসব, তার আশু সম্ভাবনা দূর অস্ত।
একদিন ধানবাদ যাওয়ার সুযোগ হল। প্রথম সুযোগেই ওই দোকানে খেতে গেলাম। অর্ডার দেওয়ার পর পেলাম দুটো হাতরুটি বা ফুলকা আর একবাটি চালের পায়েস, কুচো পেস্তা বাদাম দিয়ে সাজানো। চালের পায়েস দেখে আমি প্রথমে তো গঙ্গারাম। গুজিয়া যে চালের পায়েস হতে পারে, সুদূরতম কল্পনাতেও আসেনি। আশেপাশে চোখ চালিয়ে দেখলাম অনেকেই নিয়েছেন এবং বাটিতে রুটি ডুবিয়ে ডুবিয়ে খাচ্ছেন। দেখে আমিও একটু রুটি ছিঁড়ে পায়েসে ডুবিয়ে মুখে তুললাম। জায়ফলের গন্ধে দিল একবারে তর হয়ে গেল। কী স্বাদ! পায়েসের বাদশা বলরাম মল্লিকের পায়েস খেয়েছি। সে যদি মান্না দে হয়; এ তবে মুকেশ।
কোথাও পড়েছিলাম পায়েসের বয়েস দুহাজার বছর। একদম বাজে কথা। পায়েস তার চেয়ে অনেক পুরোনো। দানাশস্য ঘিয়ে ভেজে দুধ ও গুড় মিশিয়ে ফুটিয়ে পায়েস তৈরি করা হয়। মানুষ দুধ খেতে শিখেছে এগারো হাজার বছর আগে। পায়েস করা শিখতে নহাজার বছর লাগল? পায়েস বানানোও তো একদম সোজা। চাল, সুজি, সেমাইয়ের পায়েস তো বাড়িতে বাড়িতে হয়। অনেক বাড়িতেই রাতের খাবারের শেষপাতে একটু সুজির পায়েস বা সেমাইয়ের পায়েস থাকে।
ঋগ্বেদে আছে ‘ক্ষীরপাকম ওদনম’। ক্ষীর হল দুধ, ওদন অন্ন। মানেটা দাঁড়াল দুধে ফোটানো চাল। ঋগ্বেদের বয়েস ধরলেই তো পায়েসের বয়েস কমসে কম তিন হাজার বছর। আমার পিতৃদেব খাদ্যসংস্কৃতির ব্যাপারে কিঞ্চিৎ উৎসাহী ছিলেন। ওঁর মতে পায়েসের প্রাচীনত্বের প্রমাণ হল পায়েস আমাদের উৎসবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। অন্নপ্রাশনের সময় শিশুর মুখে অন্নের সঙ্গে পরমান্ন তুলে দেওয়া হয়। সেই পরমান্নটি বাড়ির কেউ বিশেষ শুদ্ধাচারে তৈরি করেন। হিন্দু মন্দিরের অন্নভোগ মানেই আর পাঁচটা জিনিসের সঙ্গে পায়েস থাকবেই। সহকর্মী তপন ভট্টাচার্য্য জানালেন বিষ্ণু বা কৃষ্ণের আসল ভোগ পায়েস ও সেজন্যই বৈষ্ণবদের কাছে পায়েস পরমান্ন নামে আদরণীয়। জন্মদিনে যতই কেক কাটা হোক, পায়েস কি বাদ গেছে?
সিমাই আর লাচ্চার পায়েস ও ফিরনি ছাড়া ইদ-উল-ফিতর ভাবাই যায় না। সেমাই ও লাচ্চা ইরান বা তুরস্কের দান। ময়দা মেখে পরাত বা পাটায় বড়ো করে বেলে তারপর ছুরি দিয়ে সরু সরু ফালি কেটে সেগুলো হাতে করে রোল করলে হবে সেমাই। সেমাই জিলিপির মতো পেঁচিয়ে দিলে হবে লাচ্চা। তারপর কয়েকদিন রোদ খাইয়ে শুকিয়ে নেওয়া হয়। সেমাই ঘিয়ে ভেজে দুধে ফুটিয়ে চিনি মিশিয়ে কিছু মেওয়া দিয়ে গার্নিশ করলেই সেমাইয়ের পায়েস তৈরি। এখন সেমাই ও লাচ্চা মেশিনে বানানো হয়। এর প্রস্তুতপ্রণালী একটু আলাদা।
ইদ নিয়ে একটা গল্প বলি। ১৯৯৮ সাল। সদ্য ইশকুলে যোগ দিয়েছি। ইদের পরের দিন স্টাফরুমে এক ফুটফুটে কন্যা এক ঢাউস টিফিনবক্স নিয়ে হাজির। ইদের পায়েস। এক প্রবীণা সহকর্মী তার ঢাকনা খুলতে যে খোশবাই বেরিয়ে এল, স্রেফ ওটার জন্যই আর-একবার এই মরজগতে জন্ম নেওয়া যায়। আহা, এলাচে জাফরানে মেওয়াতে মাখো মাখো সেই পায়েসের স্বাদ চোখ বুজলে এখনও টের পাই। ইদের পায়েস এর আগে পরে অনেক খেয়েছি, কিন্তু সেদিন যেন বড্ড ভালো লেগেছিল। এখনও মাঝেমধ্যে ছাত্রছাত্রীরা ইদের পায়েস খাওয়ায়। ভালোবাসায় মাখা সে পায়েসের সোয়াদই আলাদা।
ফিরনি চালগুঁড়োর পায়েস। জন্মস্থান ইরান না তুরস্ক, এ নিয়ে বিপুল তর্কাতর্কি হলেও কোনও স্থির সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। কৃষ্টি আর মিষ্টি কি আর অত ইতিহাস ভূগোল মেনে চলে? ফিরনি পরিবেশনের সময় অনেকটা মালাইয়ের মতো দেখতে হয়। তৈরির পদ্ধতি চালের পায়েসের মতোই, তবে দুধ ঘন হয়ে এলেই তুলে নিতে হবে, নচেৎ ঠান্ডা হলে খুব টেনে যাবে। এতে গোলাপজল বা মিঠা আতর ব্যবহার করা হয়। গার্নিশ করা হয় বাদাম ও পেস্তা দিয়ে। দক্ষিণ ভারতে মুগডাল গুঁড়ো দিয়ে ফিরনির কায়দায় বানানো একরকম পায়েস খেয়েছি। ওপরে খোয়ার গুঁড়ো ও পেস্তার সাজ।
দক্ষিণী পায়েসের মধ্যে কেরলের নঈ পায়সম খুব নামকরা। যে চালের পায়েস বাড়িতে হয় ওইরকমই, তবে ঘি নারকেল ও গুড়ে চপচপে। যতটা চাল, ততটা ঘি, তার দশগুণ দুধ; আর উদার হস্তে গুড় ও নারকেলভাজা ছড়ানো। আগে ডেসার্ট হিসাবে করতাম। এই পায়েস ঘৃতবহুল হওয়ায় কিঞ্চিৎ গুরুপাক। অগত্যা বর্জন করেছি।
ফলের মধ্যে আতার পায়েস খুব নামকরা। এই নামে পরশুরামের লেখা একটি চমৎকার গল্প আছে। পায়েসে গার্নিশ হিসাবে বেদানা বা আনারদানার ব্যবহার বহুল প্রচারিত। কিশমিশ, বাদাম, কাজু, মেওয়া, পেস্তা এসব তো দেওয়াই হয়। সবজির মধ্যে লাউইয়ের পায়েস, রাঙা আলুর পায়েস বহুলপ্রচলিত। গাজরের হালুয়া-পায়েস দুটোই হয়। গাজরের হালুয়া নামেই হালুয়া, আসলে পায়েসই। দুগ্ধপক্ক করতেই হবে। হালুয়ায় দুধ কম, পায়েসে বেশি।
লাউয়ের পায়েস অনেক পুরোনো। কবিকর্ণপূর পরমানন্দ সেন অনুসারে স্বয়ং শ্রীরাধিকা রাধাবল্লভের জন্য এই পায়েস তৈরি করেছিলেন। পাকপ্রণালীটি এইরকম: লাউ মিহি করে, প্রায় জিরের আকারে কেটে নিয়ে দুধ ও সামান্য জল দিয়ে সেদ্ধ করে, চিনি, মরিচ, কর্পূর দিয়ে নামাতে হবে।
এখনও লাউয়ের পায়েস হয়। ওই কাটা-বাটার ঝামেলা না করলেও হবে। গ্রেটার এসে গেছে, লাউ সটান কুরিয়ে দেওয়া হয়।
গাজরের পায়েস করার পদ্ধতি প্রায় এক। গাজর কুরে তাকে ঘিয়ে ভেজে দুগ্ধপক্ক করে চিনি দিয়ে নামিয়ে নেওয়া। ওপরে ক্ষীরের গুঁড়ো বা চাট্টি মেওয়া দিয়ে সাজানো।
তালক্ষীর বা তালের পায়েস বানানো খুব সোজা। দুধে তালের মাড়ি দিয়ে তারপর চিনি বা গুড় দিয়ে ফুটিয়ে বানানো হয়। দুধ ফুটে উঠলে একটু একটু করে তালের মাড়ি দিয়ে আঁচ কমিয়ে নেড়ে নেড়ে ঘন করে নিলেই তৈরি।
বৈষ্ণবরা কেন পায়েসকে বলেন পরমান্ন, সেটা বুঝতে হলে প্রথমে আড়াই সের দুধ নিন। তারপর কড়া চাপিয়ে একপোয়া ঘিয়ে ক-টা তেজপাতা ও কিছু মেওয়া হালকা আঁচে ভাজুন। এরপর পোয়াটাক গোবিন্দভোগ বা কামিনীভোগ চাল ওই মিশ্রণে দিয়ে নেড়েচেড়ে দুধ ঢালুন। দুধ ফুটে উঠলে হালকা হালকা নাড়তে থাকুন। একটু পরে রাবড়ির গন্ধ ছাড়লে একপো নলেন গুড় দিয়ে নেড়ে কড়া নামিয়ে একপ্রহর রেখে দিন। তারপর পরিবেশন করুন। পরমান্ন নামের সার্থকতা এক সেকেন্ডে টের পেয়ে যাবেন। সাধে কি কিষণ কানহাইয়াজি বঙ্গালে এসে মিছরি ছেড়ে পায়েস ধরেছেন?
আগে লুচি হলেই ফুর্তি বাড়ত। আমাদের বাড়িতে একরকম পায়েস হত বাসি লুচি আর ভাঙা গুড়ের বাতাসা দিয়ে। আহা অমৃত। ফ্রিজ এসে তার মৃত্যুঘণ্টা এমনিতেই বাজিয়ে দিয়েছিল, রক্তশর্করা বাকি কাজটুকু করল। লুচির পায়েস এখন পাস্ট টেন্স হয়ে গেছে। কী আর করা।
রসমালাই হল রাবড়ির মধ্যে ছোটো ছোটো রসগোল্লা ফেলে বানানো একরকম পায়েস। কেউ কেউ দুধ থেকে মালাইটা তুলে নিয়ে তারপর আগে থেকে দুধে ফোটানো রসগোল্লা যোগ করেন। অতঃপর মিঠা আতর বা গোলাপজল দিয়ে ক-টা পেস্তা বাদাম দিয়ে গার্নিশিং। কেউ কেউ রসমাধুরী বলেন। কোথাও মালাই কোফতা নামেও চলে। রসমঞ্জরীও আছে।
শেষপাতে ছানার পায়েস। ছানার পায়েস হরেকরকম ভাবে তৈরি হয়। কেউ ছানা হাতে দলে চালের আকার দিয়ে হালকা ঘৃতপক্ক করে দুধে ফেলেন, কেউ কাঁচা ছানাটাই দিয়ে দেন। মামার বাড়িতে আওটা দুধে নরম পাকের সন্দেশ হাতে করে সাবধানে মিশিয়ে নেওয়া হয়। এন্ড প্রোডাক্ট অনেকটা ফিরনির মতো দেখতে। গোলাপজল মিশিয়ে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে গার্নিশ করা। এ কাজে মুনশিয়ানা লাগে, কেন-না সন্দেশ মেলানোর সময় দুধ নড়া চলবে না। তাহলেই সন্দেশ ওপরে ভেসে উঠবে। ঘন দুধ মিছরিপক্ক, সে ভারী, সন্দেশ হালকা।
ঈশানী চক্রবর্তী ফোটানো দুধে সন্দেশ দিয়ে পায়েস করার পদ্ধতি জানিয়েছেন। এ পদ্ধতিতে পায়েস করতে আমি জীবনে একবারই দেখেছি। দুধ খুব ঢিমে আঁচে ফুটিয়ে একটু একটু করে সন্দেশ ভেঙে ভেঙে দিতে হয়। ধৈর্য ও সাবধানতা দুই-ই প্রয়োজন। অসাবধান হলেই নিচে ছাতা, ওপরে আমি।
আরও অনেকরকমের পায়েস হয়। চলতি কয়েকটার উল্লেখ করলাম।
আহা পায়েস, বাহা পায়েস,
পায়েস নানা রূপে,
পায়েসনামা বড্ড ভালো,
ঘি-দুধে চুপচুপে। (অমিত চক্রবর্তী)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন