মিঠাই পর্ব - ৩

সুব্রত রুজ

map

বেসনের মেঠাই

বিউলি, মুগ, ছোলা ও মটর ডালের মিহি গুঁড়ো হল বেসন। বেসনের মিষ্টি বললেই মনে আসে বোঁদে আর লাড্ডু। হয় সাধারণ আকারের বোঁদে, নয় মিহি বোঁদে, যার নাম মোতিচুর।

প্রথমে বোঁদেয় আসি। বোঁদে পবনপুত্রের প্রিয় ভোগ। আদি নাম বিন্দুক। বয়েস হাজার তিনেক বছর তো বটেই, বেশিও হতে পারে। গুড়রসের বোঁদে হত কি না নিশ্চিত নই, চিনির বয়েস ধরে বললাম।

মোতিচুর, যার আদি নাম মুখামোদক বা মুদ্গমোদক বা মৌক্তিক, আরও প্রাচীন। সুলেখক শংকরের ‘রসবতী’ বইতে তেমনই ইঙ্গিত আছে। বিন্দুক ও মুখামোদকে একটা তফাত আছে। মুখামোদকের উপাদান মুগ ডাল, বিন্দুকের ছোলার ডাল বা মটর ডাল।

বোঁদে ও মোতিচুর উভয়েই আর্যাবর্তের আমদানি। বাঙালি সমাজে মৌক্তিক অতটা কলকে পায়নি, বিন্দুককে বাঙালি আপন করে নিয়েছে। বোঁদে বানানোও কিছু হাতি ঘোড়া কাজ না। ভালো মানের মিহি ছোলা বা মটর ডালের বেসনকে নুন দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে সফেদা মিশিয়ে একটু মোটা ব্যাটার করে ছান্তা দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে ঘিয়ে ফেলে ভাজা। কেউ ওই ব্যাটারে ঘি দেন, কেউ সামান্য সোডা বাই কার্ব। কেউ এমনিই ভাজেন। এরপর রসে ফেলে একটু রেখে রস ঝরিয়ে নেওয়া। ব্যস, গরম গরম বোঁদে তৈরি। গরম থাকতেই বোঁদে বা মোতিচুর গোল করে পাকিয়ে নিলেই বোঁদে বা মোতিচুরের লাড়ু বা লাড্ডু। লাড্ডুর বোঁদে একটু রসওলা হয়, নয়তো লাড্ডু বাঁধা যাবে না। খাবার বোঁদে শুকনো ঝরঝরে।

মফস্সলে বা গ্রামাঞ্চলে কাজের বাড়ি মানেই এন্তার বোঁদে। কাজেকম্মে এর ঢালাও ব্যবহার হওয়ার একটা কারণ, অন্য মিষ্টি অপেক্ষা বোঁদে তৈরির খরচ অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু ওটা গৌণ কারণ। মুখ্য কারণ হল মুড়ি-বোঁদে আর দই-বোঁদে। গরম বোঁদে আর গরম মুড়ি একসঙ্গে মেখে খেয়ে দেখুন, রসনায় উদয়শংকর-সিমকির যুগলনৃত্যের এফেক্ট টের পাবেন। আর দই বোঁদে একসঙ্গে মেখে খেলে? যদি না খেয়ে থাকেন তাহলে কলকাতার চিনিপাতা দই আর বাঁকুড়ার ঝুরো বোঁদে একসঙ্গে মেখে খান। ফের এগেন যে এই মরজগতে ফিরে আসবেন তা কমলাকান্তের মতো হলফের ওপর হলফ করে বলতে পারি। তবে আসার আগে আমায় একটা খবর দিতে ভুলবেন না যেন। আম্মো লাইনে আছি।

শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদধন্য কামারপুকুর ও মা সারদার পুণ্যভূমি জয়রামবাটিতে ধবধবে সাদা রঙের বোঁদে ও জিলিপি পাওয়া যায়। সাদা রংটা বরবটির বেসনের। আগে নাকি পালো বা পানিফলের বেসন দিয়ে তৈরি হত। কারণ? যেটুকু শুনেছি পালন-টালনে নাকি বিধবারা ময়দা দিয়ে তৈরি জিলিপি খেতেন না। বিকল্প হিসাবে প্রথমে পালো, পরে বরবটির বেসন আসে। সেটাই কি কারণ, নাকি একটু অন্য স্বাদ আনাটাই লক্ষ্য ছিল? আবার ওই অঞ্চলে প্রচুর বরবটি ফলত বা এখনও ফলে। কাজেই কাঁচামালের সহজলভ্যতা একটা কারণ হতে পারে। সাদা বোঁদে অনেক পুরোনো, রামকৃষ্ণ ঠাকুর বালকবয়সে পছন্দ করতেন। ওঁর জন্মসন ইং ১৮৩৬। বাকিটা বুঝে নিন।

মোতিচুর বাঙালি রসনায় কলকে পায়নি, কিন্তু মিহিদানার নামে সে পাগল। অনুপম গোস্বামী, আমাদের পমদা, এই কদিন আগেই লিখেছেন: “সে বহুকাল আগের কথা। ভারতে তখন ব্রিটিশ শাসন। বড়োলাট লর্ড কার্জন। সেবছর বঙ্গভঙ্গের ঠিক আগের বছর। ১৯০৪ সাল। তা লর্ডবাবুর ইচ্ছে হল বর্ধমানের জমিদার বিজয়চাঁদ মহতাবকে মহারাজা উপাধি দেওয়ার। তখন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ওঁরা। কাউকে ফাঁসি দিচ্ছেন, জেলে পুরছেন, আবার খেতাব-উপাধি এসবও বিলিয়ে যাচ্ছেন। এসবের পিছনে কী কারণ তা আপনারাও জানেন।

আমি ওদিকে যাচ্ছি না।

এদিকে বর্ধমানে তখন সাজ সাজ রব। রাজবাড়ি যাওয়ার পথে জিটি রোডের ধারে যে বিশাল গেটটা দেখা যায়, যা কার্জন গেট নামেই পরিচিত এখনও, তার নির্মাণ চলছে। খাওয়াদাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা হচ্ছে। লর্ড ক্যানিংকে চমকে দেওয়ার জন্য যেমন লেডিকেনি বানানো হয়েছিল, সেইরকমই বর্ধমান স্পেশাল কিছু মিষ্টি বানানো নিতান্তই দরকার। সাজ সাজ রব চারিদিকে।

বর্ধমানের নামকরা মিষ্টির কারিগর ভৈরবচন্দ্র নাগ মহাশয়ের ডাক পড়ল জমিদারবাড়িতে। স্পেশাল মিষ্টি চাই।

বহু ভেবেও কিছু কিনারা করতে পারছেন না নাগ মহাশয়। ভাবনায় চিন্তায় অস্থির হয়ে একদিন বেখেয়ালে বোঁদে ভাজতে গিয়ে ছাঁকনিটা নিয়ে ফেলেছেন সরু ঝুরিভাজা বানানোর। গরম ঘিয়ে সেটা দিয়ে বোঁদে ছেড়েই বুঝতে পেরেছেন নিজের ভুল। বোঁদের সাইজ হয়ে গেছে খুদে খুদে, ছোট্ট ছোট্ট। এক কর্মচারী দেখে বলল, এটা কী বানালেন বাবু, এ তো বোঁদে হয়নি, মিহিদানা হয়ে গেছে।

সৃষ্টি হল ইতিহাস। সৃষ্টি হল মিহিদানা।

আচ্ছা হয়েই গেছে যখন ভাজা, তখন এটাকে রসে ফেলে দেখা যাক। রসে ফেলে দেখলেন বেশ হয়েছে তো খেতে। কিন্তু একটু নরম। মুখে আটকে যাচ্ছে। এটাকে আরও ভালো কীভাবে করা যায়, ভাবতে বসলেন তিনি। মুচমুচে হবে, দানা দানা আলাদা থাকবে, কিন্তু মুখে দিলেই মিলিয়ে যাবে। তৈরি হল জগৎবিখ্যাত মিহিদানা।

কী করে তৈরি হল বা কী করে বানাবেন মিহিদানা?

মিহিদানার আসল উপকরণ কিন্তু চালগুঁড়ো।

চমকে গেলেন তো?

আমিও গিয়েছিলাম। একবার একাদশীর দিন মিষ্টি কিনতে গেছি। গিয়ে বলেছি ওই সরকার মিষ্টান্ন ভাণ্ডারেই, দাদা মিহিদানা দিন তো। তারপর কথায় কথায় এসেছে আজ একাদশী। তখনই জানতে পারলাম মিহিদানায় চালগুঁড়ো থাকে। এক মহিলা নিতে এসেছিলেন, তাঁকে খুলে বললেন সব কথা। আমারও জানা হয়ে গেল। খুলে বললেন বটে কী কী দিয়ে মিহিদানা বানানো হয়, কিন্তু অনুপাতটা বললেন না। আমিও হাল ছাড়ার লোক নই। আরও পাঁচ-দশটা দোকান ঘুরলাম। মিস্তিরিদের কাছে ঘুরঘুর করে তাদের খুশি করে জেনে ফেললাম এর গোপন রহস্য।

মিহিদানা বানানোর জন্য লাগে গোবিন্দভোগ/কামিনীভোগ/ সীতাশাল/কনকচূড়/বাসমতী প্রভৃতি উৎকৃষ্ট মানের চালের গুঁড়ো। আর লাগে মটর ডালের বেসন, জাফরান, ঘি আর চিনি।

৪০/৬০ অনুপাতে চালগুঁড়ো আর বেসন নিয়ে ভালো করে মেশাতে হবে। এবার তাতে এমন পরিমাণ জল মেশাতে হবে, যাতে মাখাটা শক্ত না হয় আবার নরমও না হয়। থকথকে বা মাখো মাখো হবে ব্যাপারটা। এবার এর মধ্যে মেশাতে হবে জাফরান। তার ফলে গন্ধ হবে মনমাতানো আর রংটা হবে লালচে হলুদ।

এবারেই ওস্তাদের মার। সামান্য একটু নুন আর খানিকটা ঘি মেশাতে হবে ওই মিশ্রণে।

আর পাঁচটা দোকানের মিষ্টির তুলনায় কোনও একটা বিশেষ দোকানের মিষ্টি কেন ভালো লাগে, বুঝেছেন তো?

এবার এই মিশ্রণটাকে ছোট্ট ছোট্ট ফুটোওয়ালা ছান্তায় করে গরম গাওয়া ঘিয়ে ফেলে ভাজুন। মনে রাখবেন, এটা রাজারাজড়াদের খাবার। সাদা তেলে ভাজলে এর ঐতিহ্য নষ্ট হবে পুরোপুরি। একদিন খান কিন্তু রাজাদের মতো খান।

একদিকে চিনির শিরা তৈরি করে রাখুন। হালকা পাতলা হবে রসটা। খাঁটি ঘিয়ে ভাজা মিহিদানাগুলোকে ওই রসে ফেলুন। দু-মিনিট রাখুন। তুলে নিন মিহিদানা। এর বেশি রাখলে বেশি রস ঢুকে মিহিদানা নেতিয়ে যাবে। গায়ে গায়ে লেগে দলা পাকিয়ে যাবে। ঝরঝরে হবে না।

আসল মিহিদানা হবে ঝরঝরে ভাতের মতো।

এখানেই শেষ নয়। যে পাত্রে মিহিদানা রাখবেন, সেটাকে একটু কাত করে রাখুন একদিকে। যাতে বাড়তি রস ঝরে একদিকে চলে আসে।

এবার আর কী?

বানান আর খান। আমাকেও ডাকবেন দরকার হলে।

আর-একটা খুশির খবর। ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ মিহিদানার পেটেন্ট অর্জন করেছে।” (রান্নাবান্না আর গপ্পো: বেলতলা)

পমদা মিহিদানার জন্ম নিয়ে বাজারচলতি গল্পটিই শুনিয়েছেন; কিন্তু আমার সামান্য কারিগরি জ্ঞানেও বলছি, এর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে।

প্রথমত, ভৈরব নাগ মশায় যদি ভুল করে মিহি ছান্তায় বোঁদে ছেড়েও ফেলেন, তাহলে যেটা তৈরি হবে সেটা মোতিচুর। ওঁর মতো পুরোনো কারিগর মোতিচুর চেনেন না, ইয়ে বাত কুছ হজম নেহি হুয়া।

দ্বিতীয়ত, রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল মশায়ের মতে, মোতিচুরে আগে থেকেই চালগুঁড়ি ব্যবহৃত হত। মোতিচুর মুক্তোর মতো শক্ত হত বলে এর আদি নাম মৌক্তিক। তাহলে? নাগ মশাই কি নিজের অজ্ঞাতেই মৌক্তিক তৈরি করেছিলেন?

তৃতীয়ত, বোঁদের সঙ্গে সফেদা বা চালগুঁড়ো মেশানোর ব্যাপারটা আগে থেকেই ছিল। তখনকার দিনে ঝুরো বোঁদে খাওয়ার ব্যাপক চল ছিল। ঝুরো বোঁদে বানাতে হলে তিনভাগ বেসনে একভাগ সফেদা দিতে হয়। তবেই বোঁদে ঝুরঝুরে আর মুচমুচে হবে। কাজেই মিহিদানায় চালগুঁড়ো মেশানোটা নতুন কিছু নয়।

আমার বক্তব্য, মিহিদানা হঠাৎ আবিষ্কার হয়ে যায়নি। মিহিদানা আবিষ্কারের গল্পটি কল্পনাবিলাস। নাগ মশায়ের আবিষ্কারের পিছনে যথেষ্ট পরিশ্রম ও চিন্তাভাবনা ছিল। আমার “কুক কেলভির ঘড়ি” গল্পেও দেখিয়েছি লেডিকেনি কীভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিল। প্রতিটা আবিষ্কারের পিছনেই পরিশ্রম ও চিন্তাভাবনা থাকে। বরং ওয়ান ফাইন মর্নিং মিহিদানা সীতাভোগ তৈরি হল, এটা ভাবলে তাদের স্রষ্টাকেই খাটো করা হয়।

নাগ মশায়ের বংশধররা এখনও বর্ধমানের বুকে মিহিদানা সীতাভোগ বানিয়ে চলেছেন। ওঁদের আর-একটা মিষ্টি আছে, রসগোল্লা আকারের বড়ো দানার বোঁদে। অত বড়ো সাইজ, কিন্তু ঝরঝরে।

নাগ মশায়ের পর মিহিদানা সীতাভোগের দ্বিতীয় হালুম বর্ধমানেরই গণেশ দত্ত। ওঁরই মিহিদানার নাম এখন বেশি। নিজের চোখে দেখেছি কড়া থেকেই মিহিদানা সীতাভোগ হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। নাগ মশাই জেনেই মিহিদানা বানান, আর না-জেনেই বানান, যবতক মিহিদানা রহেগা, বর্ধমান, তেরা নাম রহেগা।

বেসনের মিষ্টির মধ্যে বাঁকুড়ার মেচা সন্দেশের নাম না করলে যে ঠাকুর বেহদ্দরকমের পাপ দেবেন সে বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। এ মিষ্টি অনেক পুরোনো। মল্ল রাজাদের আমলে বাঁকুড়ার বেলেতোড় গ্রামে এর জন্ম।

আমাদের পাড়ায় বাঁকুড়ার এক মহিলা একটা ছোটো মিষ্টির দোকান চালান। কচুরি, জিলিপি, মন্ডা, মেচা, ছানার জিলিপি, রসগোল্লা পাওয়া যায়। দিদি নিজেও ওঁর দোকানের কারিগরের কাজ করেন। ওঁর বাবা মিষ্টির কারিগর ছিলেন, দিদি বাবার কাছে কাজ শিখেছেন। ওই দোকানের মিষ্টি খেতে ভালোই।

দিদির কাছে মেচা সন্দেশের যে কাহিনি শুনেছি, সেটা অনুসারে মেচার জন্ম ছানা আবিষ্কারের বহু আগে। মল্লরাজাদের আমলে এর জন্ম, এই তথ্য মিলে যায়।

মেচা দুরকমের উপাদানে তৈরি হয়। এক মুগডালের বেসন, ক্ষীর, ঘি ও চিনি অথবা ছোলার ডালের বেসন, ঘি ও চিনি।

প্রথমে মুগ বা ছোলাডালের বেসন ঘিয়ে পাক করে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। তারপর সেই মণ্ডটিকে গুঁড়ো করে ক্ষীর চিনি মিশিয়ে ফের পাক। তারপর গোল্লা পাকিয়ে ওপরে পুরু করে চিনির কোটিং দেওয়া, যাতে রেখে খাওয়া যায়, আত্মীয়বাড়ি নিয়ে যাওয়া যায়। রোদ ও চিনির আস্তরণ সংরক্ষকের কাজ করে। দশ-বারোদিন থেকে যায়।

দিদি বাবার কাছে শেখা একটা পদ্ধতি বললেন। বেসন দিয়ে সেউ ভেজে তারপর রোদে শুকিয়ে তারপর সেই সেউকে গুঁড়ো করে চিনির পাক করে মেচা বানানো। এই পদ্ধতিতে শ্রম ও জ্বালানি দুটোই বেশি লাগে। ফলে এই পদ্ধতি বাতিল হওয়ার মুখে।

দিদির তথ্য অনুসারে মুগডাল দিয়েই প্রথম মেচা বানানো হয়েছিল। কিন্তু তার দাম বেশি হওয়ায় ছোলার বেসনের ভাবনা। ছোলার মেচায় ক্ষীরও থাকে না।

মনোহরার ওপরেও মেচার পদ্ধতিতে চিনির কোটিং লাগানো থাকে। কিংবদন্তি অনুসারে মনোহরার জন্মদাতা পরাণ নাগ বা তাঁর ভাইদের কেউ। চিনির কোটিং দেওয়ার পদ্ধতিটা কীভাবে তাঁরা পেলেন কে জানে? কেউ কি মেচা খেয়েছিলেন? এর উত্তর যিনি দিতে পারতেন, সেই দিদিমা আজ অমৃতলোকে।

বেসনের মিষ্টির মধ্যে টানা লাড়ু বা সিঁড়ি লাড়ু পড়ে। বেসন দিয়ে সরু বা মোটা সেউ ভেজে গুড়ের রসে ফেলে লাড়ু পাকানো।

এটা আমার কাছে এক বিরাট প্রহেলিকা, বাঙালি কষ্ট করে বেসন মেখে সেউ ভেজে গুড়রসে ফেলে লাড়ু পাকায়, অথচ তার চেয়ে সোজা বেসনের লাড্ডু বাঙালি সমাজে অচল। ইদানীং ভুজিয়াওয়ালাদের দৌলতে বেসনের লাড্ডু একটু একটু করে বাঙালি হেঁশেলে ঢুকছে বটে, তবে ওই শখেসাধে। নিয়মিতভাবে কাউকে খেতে দেখিনি, বানানো তো দূরস্থান।

বেসনের লাড্ডু আমিও হাতে করে কখনও বানাইনি, তবে পশ্চিমা মহারাজদের দোকানে পদ্ধতিটি অনেকবার দেখেছি। শুকনো খোলায় বেসন ভেজে তারপর কড়ায় ঘি চাপিয়ে সেই বেসন অল্প অল্প করে ঘিয়ে ছাড়তে হবে। ঘিয়ে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে বেসন মণ্ড পাকিয়ে যাবে, তাকে তাড়ু দিয়ে ভেঙে দিতে হবে। ভালোভাবে ঘি বেসন মিশে গেলে কিছুক্ষণ ফেলে রেখে চিনি দিয়ে নেড়ে নিয়ে নামিয়ে নিতে হবে, অতঃপর গোল্লা পাকানো। টানা লাড়ু করার চেয়ে সোজা। মুগের লাড়ু করার পদ্ধতিও প্রায় একই রকম। মুগলাড়ু তৈরি হওয়ার পর গুঁড়ো খোয়ায় গড়িয়ে নিতে হয়।

আমার ধারণা টানা লাড়ু যেহেতু গুড়ের, সে আগে এসেছে, চিনি আবিষ্কৃত হওয়ার পরে বেসনের লাড্ডু বা মুগের লাড্ডু। ফলে যদ্দিনে এসব লাড্ডু আবিষ্কৃত হয়েছে, টানালাড়ু তদ্দিনে বাঙালি হেঁশেলে তার জায়গা পাকা করে ফেলেছে। বেসনের লাড়ু সেখানে ঢুকতে পারেনি।

মাইসোর পাক খেয়েছি, কিন্তু বানানোর কায়দা জানি না। নিজের চোখে মাইসোর পাক বানাতে দেখিনি তাই বিশদে গেলাম না। এন্ড প্রোডাক্ট অপূর্ব স্বাদের।

বেসনের রাজার গল্প দিয়ে শেষ করি। সোহন পাপড়ি বা শোনপাপড়ি। কদমার মণ্ডের কায়দায় চিনিকে গলিয়ে তাকে আস্তে আস্তে নেড়ে থকথকে মণ্ডে পরিণত করে একটু ঠান্ডা করে নিতে হবে। তারপর শুকনো খোলায় ভাজা বেসন ভালো করে ঘি দিয়ে ভেজে জল সহযোগে ফেটিয়ে নিয়ে একটি বারকোশে তাকে ঢেলে সেই মণ্ডটিকে তার মধ্যে বসিয়ে জনা চারেক জোয়ান বারকোশের চারপাশে বসে ওই মণ্ডে লাঠি ঢুকিয়ে চারদিক থেকে মারো জোয়ান হেঁইয়ো। চিনির তাল লম্বা হয়ে গেল, একপাক পেঁচিয়ে ফের মারো জোয়ান। ফের প্যাঁচ। আস্তে আস্তে বেসন মেখে মেখে লালচে চিনির মণ্ডের রং হলদে হয়, চিনির মণ্ড লম্বা লম্বা সুতোর মতো হয়ে আসে। শেষে যখন সুতো ছিঁড়তে শুরু করে, তখন পাটায় ফেলে গাওয়া ঘি, এলাচ, জায়ফল, চারমগজ দিয়ে সুবাসযুক্ত করে চৌকো চৌকো করে কাটা। মামাবাড়িতে অনেক করেছি। চিনির মণ্ডটা ভেতরে ভেতরে তখনও যথেষ্ট গরম থাকত, হাতের তালু লাল হয়ে যেত; তবু কাজটা করতে ছাড়তাম না।

শোনপাপড়ির জন্ম ইরানে, অথচ এটা বাঙালির বেহদ্দ প্রিয় মিষ্টি। ইতিহাসের ছাত্রছাত্রী কেউ থাকলে এর কারণের উৎস সন্ধানে লেগে পড়ুন। ডক্টরেট একদম বাঁধা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%