সুব্রত রুজ

আর-একটির কথা বলে মিষ্টান্ন পর্ব ইতি করি। হালুয়া। হালুয়া খুব পুরোনো মিষ্টি। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে লেখা কিতাব-আল-তাবিক বইতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
হালুয়ার জন্মস্থান মধ্য এশিয়ায়। প্রথম হালুয়া তৈরি হয়েছিল আটা, ঘি, চিনি বা গুড় দিয়ে। পরে তাতে নানারকম মেওয়া ও তিলজাতীয় বীজ মেশানোর চল হয়।
ভারতে আটা ও সুজি এ দুরকম বেস দিয়ে হালুয়া সর্বাধিক প্রচলিত। এতে বাদাম কিশমিশ, তিলভাজা যোগ করে পেস্তা বাদাম দিয়ে গার্নিশ করা হয়।
সুজির হালুয়া তো সবাই করেন। এ হালুয়া করা সহজ। সুজি ঘিয়ে ভেজে জল ও অল্প দুধ দিয়ে ফুটিয়ে চিনি দিয়ে নেড়েচেড়ে নামিয়ে নিলেই তৈরি। তারপর ইচ্ছামতো কিশমিশ বাদাম পেস্তা দিয়ে সাজানো।
ফলের মধ্যে লাউয়ের পায়েস যেমন হয়, লাউ ঝিরি ঝিরি করে কেটে ঘিয়ে ভেজে চিনি দিয়ে হালুয়াও করা হয়। গাজরের হালুয়া তো মোটামুটি সবাই জানেন। গাজর মিহি করে কেটে সুজির হালুয়ার মতোই পাক করতে হয়। এটা পাঞ্জাব অঞ্চলের মিষ্টি। পাঞ্জাবিদের লস্যির মতো এই মিষ্টিটাও বাঙালিরা আপন করে নিয়েছেন। বাদামের হালুয়াও হয়। বাদাম বেটে ঘিয়ে ভেজে চিনির পাক করে তার হালুয়া।
মুলতানের সোহন হালুয়া পৃথিবীবিখ্যাত। ভারতে এ হালুয়া নিয়ে আসেন সম্রাট হুমায়ুন। শের শাহের তাড়া খেয়ে তিনি পারস্যে পালিয়েছিলেন। শের শাহের মৃত্যুর পর ফিরে আসেন। সঙ্গে করে এ হালুয়ার রেসিপি নিয়ে আসেন। পাঞ্জাবে গেলে এর স্বাদ পাবেন। এ হালুয়া মুলতানে হয় ভুট্টার আটা দিয়ে, পাঞ্জাবে গমের আটা। যতটা আটা, ততটা ঘি, তার দুই-তৃতীয়াংশ চিনি। চিনিকে রস করে নিতে হয়। ভুট্টার আটা মেখে জলে ভিজিয়ে সারারাত ফেলে রাখা হয়। তারপর জলটা ফেলে ভালো করে চটকে নেওয়া হয়। আটা তখন সারারাত জলে ভিজে নরম থ্যাসথ্যাসে হয়ে গেছে। তাতে আরও একটু জল দিয়ে প্রায় তরল করে ফেলা হল। এবার যতটা আটা, ততটা ঘি নিয়ে কড়ায় চাপিয়ে গরম করে তাতে একটু একটু করে আটাগোলা ফেলে ক্রমাগত নেড়ে নেওয়া হল। কখনও আটা আগে দিয়ে তাতে ঘি মেশানো হয়। আস্তে আস্তে মিশ্রণটা ঘন হয়ে আসবে। তখন চিনির রস মিশিয়ে নিতে হবে। মিশ্রণটা শেষে চটচটে হয়ে গিয়ে পাত্রের গা থেকে ছেড়ে ছেড়ে যাবে। এবার এলাচ দারচিনি দিয়ে ইচ্ছামতো তিল বাদাম কিশমিশ নারকেলভাজা ছড়িয়ে নামিয়ে পাত্রে রেখে ঠান্ডা করে নেওয়া। কেউ এতে ক্যারামেল, কেউ জাফরান ভেজানো দুধ দেন। তাতে রংটা বেশ খোলতাই হয়। পাঞ্জাবের গুরুদ্বারে প্রসাদ হিসাবে খারা হালুয়া তৈরি হয়। এ হালুয়া মকাই আটার বদলে গমের আটা দিয়ে তৈরি হয়। এতে গমের আটা, দেশি ঘি ও চিনি থাকে। প্রস্তুতপ্রণালী সোহন হালুয়ার মতোই। পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানার সুজির হালুয়ার স্বাদ অসাধারণ। ওখানকার লুধিয়ানভি ঘি একটা কারণ হতে পারে।
শবেবরাতের অপরিহার্য অঙ্গ হল ডালের হালুয়া। ডালের হালুয়া সম্ভবত কলকাতা ও ঢাকায় উত্তরপ্রদেশের খানদানি মুসলিমরা আমদানি করেন এবং সেখান থেকে বাংলার বাদবাকি অংশে ছড়িয়ে পড়ে। মুগডাল ও গুড় সহযোগে একরকম হালুয়া বা পায়েস ভারতের উত্তর ও দক্ষিণ উভয় অংশেই রমরম করে চলে। তিনহাজার বছর ধরে মিষ্টি হিসাবে মুগডাল ও গুড় উভয়েরই ব্যবহার চলছে। সেই হিসাবে মুগডালের হালুয়ার বয়েস কম নয় বলেই মনে হয়।
মুগডালের হালুয়া করতে হলে মুগডাল সারারাত ধরে জলে ভিজিয়ে রেখে সকালে বেটে নিতে হবে। এবার দুধ দিয়ে ডালবাটাকে সেদ্ধ করে ঘন করে নিয়ে চিনি বা গুড় মিশিয়ে একবারে থকথকে করে ফেলতে হবে। এবার এলাচ, বাদামকুচি, পেস্তাকুচি দিয়ে নামিয়ে পরাতে বা ট্রেতে ঢেলে ঠান্ডা করে নিলেই মুগডালের হালুয়া তৈরি। বুটডালের হালুয়ার প্রস্তুতপ্রণালী একইরকম।
বাঙালিদের প্রিয় সুজির হালুয়া হল মোহনভোগ। সমপরিমাণ ঘি ও সুজি নিয়ে তার অর্ধেক বা একটু বেশি চিনি নিয়ে তারপর অগ্নিপক্ক করে অতঃপর দুধ ছিটিয়ে ছিটিয়ে সেদ্ধ করা। এনতার কিশমিশ আর এলাচ বাদাম পেস্তা উদার হাতে ছড়ানো। এই মোহনভোগ গোল করে পাকিয়ে হয় সুজির লাড়ু। এতে খোয়াও থাকে। সুজির লাড়ু করতে হলে আগে চিনিটা রস করে নিলে ভালো হয়। এবার সুজি, বাদাম, কিশমিশ ঘিয়ে ভেজে একটুখানি দুধ ছিটিয়ে সুজিটা শুকনো শুকনো করে সেদ্ধ করে নিয়ে এবার রসটা একটু একটু করে মিশিয়ে নিতে হবে। এবার খোয়া দিয়ে নেড়েচেড়ে আরও একটু ঘি দিয়ে হাতে করে বেঁধে নিতে হয়। ওপরে একটু বাদাম পেস্তার গয়না। এ মিষ্টি যাঁরা আস্বাদন করেছেন তাঁদের আর পুনর্জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন