পিষ্টক পর্ব

সুব্রত রুজ

map

কথাতেই আছে পিঠে-পায়েস। পিষ্টক বা পিঠে পায়েসের মতোই প্রাচীন খাদ্য। পিঠের বয়েস কত ঠিক করে বলা খুব কঠিন। আন্দাজ পাঁচ হাজার বছর বা তারও বেশি হতে পারে, কারণ সিন্ধু সভ্যতার সময়ও পিঠে জাতীয় খাদ্য ছিল। প্রশান্ত ভট্টাচার্য পুরোডাশের উল্লেখ করেছেন। সেও খুব পুরোনো। বৈদিক যুগের। যবের গুঁড়ো গুড় দিয়ে মেখে সেঁকা। এও পিঠেই। আর একটা ছিল অপূপ। যবের গুঁড়ো খামি করে চাটুতে ঘি মাখিয়ে সরুচাকলির মতো করে ভাজা।

পিঠেকে বাঙালি বিশেষ প্রীতি ও শ্রদ্ধার চোখে দ্যাখে। অগ্রহায়ণ মাসে বাড়িতে ধান আসে; সেখান থেকে চাল হয়। অতঃপর নতুন চাল, দুধ, গুড়, ফলমূলাদি একসঙ্গে মেখে দেবতার উদ্দেশে নিবেদন করা হয়। আর পৌষের শেষ দিনে পিঠে-পরব। নানারকম চালের পিঠে তৈরি করে প্রথমে দেবতাকে, তারপর কাকপক্ষীকে, অতঃপর নিজেদের নিবেদন করা হয়।

নিজেদের নিবেদন করা হয় শুনে অবাক হওয়ার কিছু নেই। গোদা বাংলায় পেটপুজো বলি, কথাটাকে গুরুত্ব দিই না, কিন্তু বাবার কাছে শুনেছি প্রাচীন আজীবক ধর্মে এই ধরনের একটা রীতি ছিল।

পিঠের বহু প্রকার। মূল উপকরণ চালের গুঁড়ো, নারকেল, তিল, সুজি, ময়দা, গুড় ও চিনি। তবে সুজি, চিনি এসব বড়োজোর দুহাজার বছর আগে যোগ হয়েছে। আগে গুড়, নারকেল, তিল এসব দিয়েই বানানো হত।

পিঠে আমি নিজের হাতে বানিয়েছি; বাড়িতে তৈরি করতে তো দেখেইছি। এসব দেখে আমার ধারণা হয়েছে প্রাচীন আমলে গুড়, চালগুঁড়ো ও তিল বা নারকেল একসঙ্গে মিশিয়ে তেলে ভেজে যে পিঠে তৈরি হয়েছিল, সেটাই পিঠের আদি রূপ। রাঢ় বাংলায় যা আরশে ও অন্যত্র গুড়পিঠে নামে বেঁচে আছে। আরশের বিশদ বিবরণ একটু পরে আসবে।

আসকে পিঠে খুব পুরোনো। দেখতে অনেকটা দক্ষিণী ইডলির মতো। আসকে করতে গেলে বিশেষ ধরনের মাটির সরা লাগে। তাওয়ার গভীরতা একটু বেশি হলে যা দাঁড়াবে, তেমনি। তার ওপর মাটির তৈরি ঢাকনি। জিনিসটা সেট হিসাবে তৈরি হয়। এবার হালকা গরম জলে চালগুঁড়ো তেলেভাজার ব্যাটারের মতো মেখে নিয়ে বড়ো সরায় তেল মাখিয়ে একটু ব্যাটার ঢেলে ছোটো সরা চাপা দিতে হয়। মিনিট দুই রাখলেই আসকে তৈরি। এরই রকমফের চিতই পিঠে।

প্রশান্ত ভট্টাচার্য আসকে পিঠের আর-একরকম পদ্ধতি লিখেছেন, “আসকে পিঠে, আমি যেমনটা দেখেছি, সেটা বলি। আমার দিদিমা বানাতেন। একটা মোটা মাটির ফ্ল্যাটবটম পাত্র। তার মধ্যে গোল গোল কয়াইয়ে মতো খোপ। পাঁচ-ছটা। তাতে ওই ব্যাটার বা গোলা দিতেন হাতায় করে, পাতলা ব্যাটার। যতদূর মনে পড়ে, বিউলির ডাল বাটা আর আলো চাল দিয়ে মিশ্রণটা তৈরি হত।”

এইরকম মাটির পাত্রে আসকে পিঠে করতে আমিও দেখেছি। সবচেয়ে আজব ব্যাপার, পাত্রটা দক্ষিণী অপ্পমের। এখানে এর চল হল কীভাবে কে জানে।

আসকের ব্যাপারে আরও দুটো কথা আছে। প্রথমত, আসকের চাল গুঁড়োটা সেদ্ধ চালের নাকি আতপ চালের, এ নিয়ে বৃথা গঞ্জ দাসে। এ ঝগড়া একমাত্র শাক্ত-বৈষ্ণব কলহের সঙ্গে তুলনীয়। দ্বিতীয়ত, ‘উসুম আঁচে আসকে পিঠে, কড়া আঁচে পুলি।’ আসকে বানানোর সময় আঁচটি খেয়াল রাখতে হবে। নচেৎ আসকে চিবোনোর সময় গলা দিয়ে ভৌ-উ-উ ডাক বেরিয়ে আসা অস্বাভাবিক নয়।

আসকে পিঠে গুড় দিয়ে খাওয়া হয়, কিন্তু চিতই পিঠে গুড় সবজি মাংস সবকিছু দিয়ে খাওয়া যায়।

একটা কথা মনে পড়ল। ছোটোবেলায় একটা কথা শুনতাম, ‘আসকে খায় ফোঁড় গোনে না।’ আসকে ইডলির মতো ছিদ্রযুক্ত ঠিকই, কিন্তু আসকে খেতে গেলে তার ফোঁড় গুনতে হবে কেন আজও বুঝে উঠতে পারিনি।

পুলিপিঠে সেদ্ধ পিঠে। এতে পুর থাকে। পুরটি প্রধানত গুড় ও নারকেলের পাক, তিল ও গুড়ের পাক অথবা ক্ষীর ও চিনির পাক। চিনির সঙ্গেও নারকেল বা তিলের পাক হয়। সবজি ও আলুপোস্তর পুরও বহুলপ্রচলিত। পুর হয়ে গেলে চালের গুঁড়ো গরমজলে মেখে পুর ভরে লম্বা ল্যাংচার আকারে গড়ে নিয়ে গরম জলে ফেলে সেদ্ধ করলেই পুলিপিঠে। কেউ কেউ হাঁড়িতে জল নিয়ে ওপরে একটা স্টিলের চালুনি বসিয়ে তার ওপর পিঠেগুলো রেখে ভাপে সেদ্ধ করেন। আজ গণেশ চতুর্থী। মহারাষ্ট্রের ঘরে ঘরে যে মোদক তৈরি হচ্ছে তার প্রস্তুতপ্রণালী হুবহু পুলিপিঠের মতো। শুধু গড়নটি মোমোর।

একই পিঠের হাজার রকমের নাম হয় । মা একটা পিঠে করেন, চালের গুঁড়ো মেখে ছোট্ট ছোট্ট পুলি করে ঘন দুধে ফেলা। দুধ মিষ্টি করতে তালপাটালি বা খেজুরপাটালি বা বাতাসা ব্যবহার করা হয়। মা বলেন ওর নাম দুধপুলি। পরে জানলাম ওটাই চুষি পিঠে।

গুড়-নারকেলের পুর করে ময়দা সুজি চিনি মিশিয়ে ব্যাটার করে ওই পুর ব্যাটারে ডুবিয়ে চপের মতো ঘিয়ে ভেজে রসে ফেললেই গোকুল পিঠে। কেউ কেউ খোয়ার পুরও ব্যবহার করেন।

একটা পিঠে খেয়েছিলাম গোলাপফুলের মতো দেখতে। নাম শুনলাম গোলাপ পিঠে। আমার অনুরোধে গৃহকর্ত্রী প্রস্তুতপ্রণালী দেখিয়ে দিলেন। চালগুঁড়ো রুটির মতো বেলে নিয়ে তিন জায়গায় কেটে ভাঁজ করে গোলাপফুলের আকৃতি দিয়ে পরপর তিনটে রুটি বসিয়ে সাদা তেলে ফেলে ভাজা হল; তারপর রসে ফেলা। দেখতে যতটা অনুপম, খেতে ততটা নয়।

গুড়, নারকেল, তিল, চালগুঁড়ো একসঙ্গে মেখে কলাপাতায় মুড়ে পাতুরির মতো ভাপানো পিঠেও খেয়েছি। অনেক ছোটোবেলায় খেয়েছি, নামটা মনে নেই। প্রশান্তদা জানালেন পাতপিঠে বা পাতা পিঠের অনুকরণ। পাতপিঠে করতে হলে তালের মাড়ি, চালগুঁড়ো, চিনি বা গুড় একসঙ্গে মেখে কাঁঠালপাতায় মুড়ে দিয়ে ভাপিয়ে বানানো হয়। আমাদের গ্রামে দেখেছি কাঁঠালপাতা ঠোঙার মতো মুড়ে তালমাখা ঢেলে ঠোঙার মুখটা কাঁঠালপাতা দিয়ে বন্ধ করে হাঁড়িতে জল দিয়ে ফুটিয়ে সেই হাঁড়ির মুখে একটা কাপড় পেতে তার ওপর পাতাগুলো রেখে ভাপানো হয়।

ভাপা পিঠে অনেক পুরোনো। এটা করতে গেলে চালের গুঁড়ো নিতে হবে। সেটা সেদ্ধ বা আতপ বা দুরকম মেশানো থাকতে পারে। এবার তাকে একটা পাতলা কাপড়ে পোঁটলা করে বাঁধতে হবে। এবার হাঁড়িতে জল বসিয়ে সেই জল ফুটে উঠলে পোঁটলাটা হাঁড়ির ভেতর ঝুলিয়ে দিতে হবে। পোঁটলা কিন্তু জলের ওপরে থাকবে। চাল ভাপে সেদ্ধ হবে। এবারে পাতলা গুড় ঢেলে খাওয়া। কেউ কেউ চালগুঁড়ো ও গুড় একসঙ্গে মেখে সেদ্ধ করেন। ইদানীং ভাপা পিঠে ইডলি স্ট্যান্ডে কাপড় পেতে বানানো হচ্ছে।

এরই একটু রকমফের বিক্রমপুরের বিখ্যাত বিবিখানা পিঠা। আগে খাইনি, কিছুদিন আগে নেটে বীথি জগলুলের দেওয়া রেসিপি অনুযায়ী করলাম। কেকের সঙ্গে অনেকখানি মিল আছে। রেসিপিটা এরকম:

“চালের গুঁড়া হালকা করে টেলে নিন। কেনা গুঁড়া হলে টালার দরকার নেই। চালের গুঁড়ার সঙ্গে গুঁড়া দুধ, এলাচ গুঁড়া, ঘি, ময়দা ও কোকো পাউডার ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।

ডিমের সঙ্গে লিকুইড দুধ, চিনি, লবণ ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। এইবার এই মিশ্রণের সঙ্গে চালের গুঁড়ার মিশ্রণ মিশিয়ে নিন। সবশেষে কোরানো নারকেল মেশান। বেকিং ডিশে ঘি ব্রাশ করে খামির ঢেলে প্রি-হিটেড ওভেনে ১৬০ ডিগ্রি তাপে ৪৫-৫০ মিনিট বেক করুন ।

৪৫ মিনিট পর একটি কাঠি বা টুথপিক ঢুকিয়ে দেখে নিন, কাঠিতে কিছু না লেগে থাকলে বুঝতে হবে পিঠা হয়ে গেছে। আর যদি দেখেন কাঠিতে ব্যাটার লেগে রয়েছে, তাহলে সময় আরও কিছুটা বাড়িয়ে দেবেন। ৪৫-৫০ মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা নয়।

পিঠা পুরোপুরি ঠান্ডা হলে বেকিং ডিশ উলটিয়ে সার্ভিং ডিশে বের করে নিন। ছুরি দিয়ে টুকরা করে পরিবেশন করুন।”

আসলটা নিশ্চয় আরও ভালো, তবে ফটোকপিটা নেহাত মন্দ হয়নি।

এবার আরও কয়েকটা পিঠে। চালের বদলে সেদ্ধ মুগডালের মণ্ড করে তাতে পুর ভরে তেলে ভেজে মুগপুলি করা হয়। কেউ রসে ডোবান, কেউ ভাজাটাই খান। খেতে অতি উত্তম। ডালের পুরে নুন-ঝাল, ভেতরে মিষ্টি।

শেষপাতে পাটিসাপটা। চাল ও ময়দা মিশিয়ে ব্যাটার করে দোসার মতো তাওয়ায় ফেলে ঘিয়ে ভেজে নারকেল গুড়, তিল গুড় বা খোয়ার পুর ভরে মশলা দোসার মতো মুড়ে রসে ফেলা। মা ময়দার জায়গায় বিউলি ডালবাটা ব্যবহার করেন। সেও খেতে উমদা। দিদিমা পুরে জায়ফল গুঁড়ো দিতেন। খাওয়ার আগেই জায়ফলের গন্ধে নাক ভুরভুর করে উঠত।

সিকিম ভুটানের মোমো ইদানীং বাঙালি হেঁশেলে বেশ গেড়ে বসেছে। তা বসুক, আপত্তি নেই; কিন্তু আদতে জিনিসটা তো পুলিপিঠে। পুরটা শুধু সবজি বা মাংসের, খোলটা আটা বা ময়দার।

খাদ্যরসিক শুভঙ্কর ব্যানার্জি সরুচাকলির কথা উল্লেখ করেছেন। চালগুঁড়ো আর বিউলির ডাল বেটে একসঙ্গে মিশিয়ে নুন মৌরি মিশিয়ে পাতলা ব্যাটার করে দোসার মতো ভাজা। কিন্তু সরুচাকলি জালি জালি হয়, দোসার মতো না। জিনিসটা নোনতা, কিন্তু অনুপানটি পাতলা গুড়। কেবল এটা না, সব পিঠের অনুষঙ্গ কিন্তু গুড়। পাতলা খেজুর বা এক তারের আখের গুড়।

পিঠে পরবের পরদিন বাসি পিঠে ঘৃতপক্ক করে গোলমরিচ গুড় সহযোগে খাওয়ার পর মনে হত আমি কে আর মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র কোনজনা! ফ্রিজ আসার পর ঘি ভাজা বাসি পিঠে আর লুচির পায়েসের দিন গিয়েছে। এখন খাবার বাড়লেই সোজা ফ্রিজে। আরশে, টানার লাড়ু, এদেরও আর ঊর্ধ্বগতি প্রাপ্ত হতে দেরি নেই। ফ্রিজ ছাড়া মজুত করা যেত বলেই তো এদের কদর ছিল।

দিদিমা বলতেন, ‘কালে কালে কত কী হল, পুলিপিটের ন্যাজ গজাল।’ একবার সত্যিই পুলিপিঠের ল্যাজ গজিয়ে দিয়েছিলাম। সে গল্প পরে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%