অষ্টাদশ অধ্যায়

কমলেশ কুমার

খোকা সৎপতি সরেস লোক। গত কয়েক মাসে সরকার বেশকিছু রেশন ডিলারকে শোকজ করেছে। কাউকে সাসপেন্ড করেছে। কাউকে টার্মিনেট করা হয়েছে। গ্রেপ্তারও করা হয়েছে কাউকে-কাউকে। কিন্তু খোকা সৎপতি শিঙিমাছের মতো বারবার সরকারের হাত থেকে পিছলে বেরিয়ে গিয়েছে। সে বড়ই গভীর জলের মাছ।

সরকার যখন অন্য ডিলারদের চমকাতে-ধমকাতে ব্যস্ত, খোকাবাবু গায়ে নামাবলী চাপিয়ে হাতিবাড়ির মোড়ে খঞ্জনি বাজিয়ে কীর্তনের দল পরিচালনা করেছে। লোকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেই বলেছে, ''সবটাই তপাই দেখে। আমি তো ঈশ্বরের হাতের কণামাত্র। এই জগতে ঈশ্বরভক্তি ছাড়া আর তো সবই ঠুনকো গো!''

তপাই খোকা সৎপতির নিয়মিত কাজের লোক। বাড়ির কাজ থেকে বাইরের কাজ, সবটাই ও দেখে। খোকা শুধু মাঝেমধ্যে একটু খোঁজখবর নেয়। নিয়মিত খোঁজখবরও নিতে পারে না।

আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী, সাধারণলোক সকলকে ও একটা কথাই বলে, ''শ্রীকৃষ্ণের সুযোগ্য প্রতিনিধি হতে হবে। এই জগতে কৃষ্ণনাম ছাড়া আর সকলই বৃথা গো! ভগবানের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে।''

কেউ কেউ তাকে রেশন নিয়ে কোনও প্রশ্ন করলে বলে, ''জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে গভীরভাবে নিমজ্জিত সকল মানবজাতি। অহঙ্কার করা তাকে মানায় না। পেট চালানোর কারণে আমি ক্ষুদ্র একটা ব্যাবসা করি ঠিকই, কিন্তু সেটা ওই শুধু পেট চালানোর কারণেই। ভক্তিযুক্ত ভগবৎ-সেবা ছাড়া আর কোনও উপায়েই জড়বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে বৈকুণ্ঠে উত্তীর্ণ হওয়া যায় না গো!''

তবে ভেতরকার গল্প অন্য। লোকে বলে, খোকা সৎপতি ভয়ঙ্কর ঘোরেল মাল। মৃত ব্যক্তিদের পরিবার থেকে রেশনকার্ডগুলো যৎসামান্য মূল্যে কিনে নেয় ও, তারপর সেই কার্ডে নিজেই মাল তোলে, পরে সেগুলো রাতের অন্ধকারে পাচারও করে দেয়। কেরোসিনের সঙ্গে নাকি নিয়ম করে গোমূত্র মেশায়। চিনিতে মেশায় কেজি-কেজি নুন। তাছাড়া মাপে কম দেওয়া, স্টকে মাল থাকা সত্ত্বেও নেই বলে গ্রাহকদের ভাগিয়ে দেওয়া এরকম হাজার অভিযোগ ওর বিরুদ্ধে আছে।

খোকা জানে, পেটের খিদে মানুষকে ছোটলোক বানিয়ে ছাড়ে। রেশন ডিলারের গুদামঘরে বস্তা বস্তা চাল পড়ে আছে দেখে পেটের খিদে চোখের খিদেতে রূপান্তরিত হয়। সব একসঙ্গে পেতে চায় মানুষ।

''হ্যাঁ রে, এই পোড়াদেশে সবাই কি আর পেটপুরে খেয়েপরে বেঁচে থাকতে পারে, বল! তাহলে দরকারটাই বা কী বেঁচে থাকার! মরে যা না, বাপ আমার! তবে মরে যাওয়ার আগে রেশন-কার্ডটা অন্তত আমাকে দিয়ে যাস!'' মনের মধ্যে এই কথাগুলো বুড়বুড়ি কাটলেও খোকা সৎপতি অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি বলে কথাগুলো বলতে পারে না, তার বদলে সে বলে, ''কৃষ্ণভাবনায় রুচি এলে খাদ্যভাবনায় এমনিতেই অরুচি এসে যাবে গো! নানা রকম সুস্বাদু খাবার খেয়ে ক্ষুধার নিবৃত্তি হলে যেমন আজেবাজে জিনিস খাবার ইচ্ছে থাকে না, তেমনই কৃষ্ণভক্তির স্বাদে পরিতৃপ্ত মন আর কিছুই চায় না।'' কথাটা বলে সকলের উদ্দেশে খোকা দু'হাত উপরে তুলে গলাটা ভাসিয়ে দিয়ে বলে, ''বলো, গৌর হরিবল বলো, জয় গৌর নিতাই, নিত্যানন্দ-মহাপ্রভু...''।

তবে এই যে এতএত অভিযোগ ওর বিরুদ্ধে, তার থেকে মুক্তি পেতে খোকা সৎপতিকে সেলামিও কম দিতে হয়নি! খাদ্য দপ্তরের আধিকারিকদের অল্প মূল্যে কেনা যায় না, তারা এক-একটা রাঘববোয়াল। খাদ্য দপ্তরে থেকেও তারা খাদ্য খেয়ে বাঁচে না, টাকা খেয়ে বেঁচে থাকে, বা বলা ভাল, টাকাই তাদের পরম খাদ্য।

তবে সকলে নয় অবশ্যই। আর সকলে নয় বলেই খোকা সৎপতির বিপদটা আরও বেড়ে গিয়েছে।

কয়েকদিন আগের ঘটনা। তপাই চাল পাচারের উদ্দেশ্যে দু'ট্রাক মাল গাড়িতে বোঝাই করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। সন্ধ্যার ঘনাঘনি তখন। স্থানীয়রা কোথা থেকে উদয় হল হঠাৎ, বোঝা গেল না। রেশনের চাল আটকে হঠাৎ বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করল ওরা।

নেহাত মানুষ মারলে জেল-হাজত হয়ে যাবে তাই, নইলে খোকার ইচ্ছে করছিল, ওর বিদেশি মেশিনটা দিয়ে সবকটার পাকস্থলিতে তিনটে করে দানা ঠুসে দিতে।

ঘটনাটা জানাজানি হতেই স্থানীয় আরও লোকজন এমনভাবে ভিড় জমাতে শুরু করল, যেন পালগিন্নির ধিরিঙ্গি মেয়েটা সাঁতরাবাড়ির ছোটছেলের সঙ্গে লটকে ছেঁড়াঘুড়ির মতো বাতাসে পতপত করে ভেসে গিয়েছে। আর সেটাই তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করছে সকলে!

উপায়ন্তর না দেখে, খোকা সৎপতিকে এলাকা ছেড়ে পালাতে হয় সাময়িক। তবে যাওয়ার আগে ওর হাতে পোষমানা অফিসারদের খবর পাঠিয়ে ডেকে নিতেও ভোলে না।

খাদ্য দপ্তরের তিনজন ইন্সপেক্টর পনপন করে ছুটে এসেছিল ঘটনাস্থলে। গম্ভীর মুখে এমনভাবে চারপাশটা দেখছিল প্রথমে, সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখে রা কাটতে পারছিল না। তার কিছুক্ষণ পর ওরা গুদামে ঢোকে। মুঠোভরে খানিকটা চাল নিয়ে এসে বলেছিল, ''বেশিরভাগই গন্ধ আর পোকায় কাটা চাল। ভুলটা আমাদেরই। কিছু বস্তা পুরনো চাল ভুলবশত ওঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেগুলোই উনি ব্লক অফিসে ফেরত দিতে যাচ্ছিলেন।'' ডেপুটি কালেক্টর ম্যাজিস্ট্রেটের মদপর্যাদার একজন অফিসার উপস্থিত দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ''সরেজমিনে তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা খুঁজে পেলে যে-কোনও দুর্নীতিবাজ রেশন ডিলারদের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছি আমরা। এমনকি তার লাইসেন্সও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।'' কথাটা বলে সেই অফিসার তপাইকে দেখিয়ে বলেছিল, ''তবে তপাইবাবু, আই মিন, তাঁর মালিক খোকা সৎপতি সম্পূর্ণ নির্দোষ। কোনও চালই উনি বাজারে বেচতে যাচ্ছিলেন না। যাচ্ছিলেন পোকায়কাটা চালগুলো ব্লক অফিসে ফেরত দিতে।''

এসব নাটক যখন হাতিবাড়ির চৌমাথায় ঘটছে, খোকা সৎপতি চলে গিয়েছে কেন্দুগাড়ির কোনও কীর্তন-বাড়িতে।

সেখানে গিয়ে সে বক্তব্য রাখছে, ''ভগবান হচ্ছেন অবিসংবাদিত পরমেশ্বর। তাঁর সমস্ত লীলাই অপ্রাকৃত। মানুষের উচিত এই সত্যকে সুদৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে উপলব্ধি করে ভগবদগীতার জ্ঞান লাভ করা।''

খোকা সৎপতির সেসব ঘটনাগুলো মনে পড়লে একটু মজাই হয়। শুধু নাটকের ভোজবাজিতেই জীবন কেটে গেল যেন ওর। রাতে একশো গ্রাম মিহি চালের ভাত, মাংসের স্টু দিয়ে খেয়ে এতক্ষণ একটা ছোট্ট সরুকাঠি নিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছিল ও, দিনের আলোয় সকলের সামনে নিজেকে নিরামিষভোজী দেখালেও, রাতে একটু চিকেন-মাটন না খেলে কি আর শরীর টেকে!

হঠাৎ মনে পড়াতে ফ্রিজ থেকে একটু আমচুর বের করে চাকুম-চুকুম করে খেতে লাগল। আমচুর খোকার বড় প্রিয়। বাড়িতে আর কোনও জনমনিষ্যি না থাকলে রাতে ঘুম আসতে চায় না। বাধ্য হয়ে খড়গপুর থেকে মেয়ে ভাড়া করে আনতে হয়। তারও হ্যাপা অনেক। রাতে তাদের স্পেশাল গাড়িতে চাপিয়ে এনে ভোর থাকতে-থাকতেই বিদায় করতে হয়। সে বাড়াভাতেও একদিন ছাই দিচ্ছিল রঘু দফাদারের ছোট ছেলেটা। সে নাকি সৈনিক হবে বলে ভোর থাকতেই ছুটতে বেরোয়। পড়বি তো পড়, চম্পাকলির সামনেই পড়ল সেদিন। এমন ড্যাবড্যাবে চোখ নিয়ে চম্পাকলির দিকে তাকাচ্ছিল ও, যেন শ্রীদেবী বোম্বে থেকে পায়ে হেঁটে বেড়াতে এসেছে হাতিবাড়িতে।

খোকা সৎপতি ম্যানেজ মাস্টার। চম্পাকলির দিকে তাকিয়ে রঘু দফাদারের ছোট ছেলেকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছিল, ''আজ রাতে তোমাকে কৃষ্ণপ্রেমে দীক্ষিত করে দিলাম মা, আমার প্রতিটি মন্ত্র নিজের মনেই উচ্চারণ করো তুমি, নচেৎ ভগবানের আজ্ঞার অবহেলা করা হবে। অপ্রতিহতভাবে ভগবৎ সেবাতেই চিরজীবন নিয়োজিত থেকো কন্যে!''

ছেলেটা কী ভেবেছিল খোকা বোঝেনি ঠিকই, তবে চম্পাকলি খোকাকে একবার পটাস করে চোখ মেরে ফিক করে হেসে গাড়িতে উঠে বসেছিল।

আমচুর চিবোতে ভালো লাগছিল না আর। ফ্রিজ থেকে একটা বিয়ারের বোতল বের করে নিয়ে এল খোকা সৎপতি। বিভিন্ন ঋতুতে ওর নেশা বদলে-বদলে যায়। বছরের বেশিরভাগ সময় চলে বিয়ার। শুধু দুর্গাপুজোর মরসুমে হুইস্কি খায় ও। আর শীতে রাম।

ছিপি খুলতে খুলতে খোকা ভাবছিল, যদি খোঁজ নেওয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে গোটা মেদিনীপুর শহরে এক কোটি টাকার ওপরে দেশি মদ বিক্রি হয় সারা বছরে। এর ওপরে লাইসেন্সবিহীন দেশি মদের ঠেকগুলোর বিক্রি তো আছেই। সবটা যদি যোগ করা হয়, তাহলে বিদেশি মদকে একাই হারিয়ে দেবে বাংলা মদ।

খোকার বাংলা মদও চলে মাঝে মাঝে।

তবে বিদেশি মদের কিছু ব্র্যান্ড ওর সর্বাধিক পছন্দের। খোকা লক্ষ করে দেখেছে, মহিলা ক্রেতাদের মধ্যে অবশ্য দেশি মদ এখনও সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি। মেয়েছেলেদের এখনও প্রথম পছন্দ ফ্লেভার্ড ভদকা আর জিন।

কথাগুলো ভাবতে-ভাবতেই খোকা সৎপতির মাথায় বিদ্যুৎ ঝিলিকের মতো একটা চিন্তা খেলে গেল। রেশন দোকানের মতোই যদি মদের দোকানও খোলা যায় কয়েকটা! নামে-বেনামে। তাহলে তো আরও লাভ। কালকেই তপাইকে বলতে হবে।

হাতিবাড়ির আশেপাশে অন্যান্য রেশনডিলারদের কথা ভাবছিল খোকা। রত্নীগাড়িয়ার হেতু মাইতি কয়েক দিন আগে রিক্সায় চাপিয়ে রেশনের গম পাচার করছিল, গ্রামবাসীরা রিক্সাটাকে আটক করে বেধড়ক মারে হেতুকে। খোকা ভাবছিল, ওর কি ব্রেনটা হাঁটুতে থাকে না কি রে বাবা!

বিয়ারটা একটু বেশি পেটে না পড়লে মেজাজটা ঠিক ছাড়ে না খোকার। ঢকঢক করে জল খাওয়ার মতো বোতলটা উপুড় করে গলায় ঢেলে দিল ও, তারপর আবার ভাবতে লাগল মদের উপকারিতা নিয়ে।

কিছুদিন ধরে মাল খেতে বসে বড্ড উলফাল চিন্তা মাথায় আসছে খোকার। এই যেমন এখন ও ভাবছে বিশ্বকাপ ফুটবলের কথা। ওই একটা সময়েতেই ও শুধু টিভির সামনে গ্যাঁট হয়ে বসে। মাসখানেক বাড়ি ছেড়ে বেরোয় না। বাইরে প্রচার করে দেয় ওর অসুস্থতার কথা। জার্মানি ওর প্রিয় দল। বিশ্বকাপের সময় ওর মদ চাই-ই-চাই। টুর্নামেন্ট চলাকালীন টিভির সামনে বসে একটু ঢুকুঢুকু খেলে কেমন যেন ওর স্টেডিয়ামের ভিতরে আছে বলে মনে হয়। যারা অ্যালকোহল ফ্রি বিয়ার খেতে পছন্দ করে, তাদের মনে মনে দুয়ো দেয় ও। কানের নীচে ঠাস করে একটা চড় কষাতে ইচ্ছে করে তাদের।

কয়েক মাস যাবৎ আবার রাতপার্টির বেলেল্লাপনা বেড়েছে এলাকায়। কথায় কথায় তারা কচাৎ কচাৎ করে গলা কেটে রাস্তাঘাটে ফেলে রেখে দিচ্ছে লোকজনকে।

খোকা ভাবল, সরকার এমন নুয়ে পড়া মনোভাব দেখালে সবারই ঘাড়ের উপর গর্দান নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মুশকিল হয়ে পড়বে। বিশেষ করে ওর মতো ভণ্ড সাধকদের।

এই তো ক'দিন আগেই বাগবিন্ধা গ্রামের খবরটা মনে পড়লে এখনও গায়ে কাঁটা দেয় খোকা সৎপতির। কারণ ওই দিনেই মাওবাদী অধ্যুষিত ওই বাগবিন্ধা গ্রামে হামলা চালায় মাওবাদীরা। প্রকাশ্য দিনের আলোয় গ্রামে ঢুকে মাওবাদীরা গুলি করে হত্যা করেছিল পঞ্চায়েতের একজন মহিলা প্রধান সহ ছ'জন নেতাকর্মীকে। সেই নৃশংস হত্যালীলা চোখের সামনে দেখার পর আর ঠিক থাকতে পারেনি গ্রামের অন্যান্য বাসিন্দারা। রাতারাতিই ভিটেমাটি ছেড়ে গ্রাম ফাঁকা করে পালিয়ে বেঁচেছিল অচলা, শম্ভুনাথ, কালাচাঁদ, ভূতনাথ ও জগবন্ধুর মতো প্রায় তিরিশটি পরিবারের শ'খানেক সদস্য। তাদের মধ্যে কালাচাঁদ রেশনডিলার ছিল। খোকার মতোই। কানাঘুষো শোনা যায়, ও-ও নাকি ব্যাবসার খাতিরে একটু ইটিসপিটিস করত।

তাই খোকা মনে করে, আধা সামরিক বাহিনীই ঠিক। যেমন বুনো ওল, তেমনি বাঘা তেঁতুল। সবকটাকে ফায়ারিংয়ে ঝাঁঝরা করে দিক ওরা, এটাই ও মনেমনে চায়।

সমস্যা আরও একটা। রাজ্যের বিরোধী দল শক্তিশালী হচ্ছে। সুচেতনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী দলই সরকার গড়বে বলে আশা প্রকাশ করছে অনেকেই। সকলের যেটা আশা, খোকা সৎপতির সেখানেই আশঙ্কা। সিঁদুরে মেঘ দেখছে ও। এত বড় ব্যবসা নির্ঝঞ্ঝাট চালিয়ে নিয়ে যেতে সরকারেরও একটা প্রচ্ছন্ন ভূমিকা থাকে বৈকি! এখনকার তৈলাক্ত অফিসারদের যদি বদলি করে দেয় নতুন সরকার এসে! এসব ভেবেই এক-একদিন রাতে ঘুম আসতে চায় না খোকার।

আরও একটা বিয়ারের বোতল শেষ করার অভিপ্রায়ে ফ্রিজের দিকে টলমল পায়ে যাচ্ছিল ও, তার আগেই দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল। রাত এখন প্রায় বারোটা। এখন আবার কে রে বাবা! কান খাড়া করে খোকা শুনল, তপাই ডাকছে ওকে, ''খোকাদা, ও খোকাদা, একবার দরজাটা খুলে দাও না! খুব দরকার!''

মুখ থেকে একটা গালাগাল বের করতে গিয়েও আটকে নিল ও। কিন্তু, তপাইয়ের গলাটা কেমন খ্যানখ্যানে শোনাল না! লোকে ভূত দেখলে ওরকম গলার স্বর বেরোয়, কিংবা ভূতের নিজের গলার আওয়াজ বোধহয় ওরকমই হয়।

ঘর থেকেই খোকা বলল, ''কী হল বে! রাতে কি একটু ঘুমোতেও দিবি না!''

বাইরে দাঁড়িয়ে যেন তর সইছিল না তপাইয়ের। দুমাদুম দরজাটা পিটছিল ও।

লুঙ্গির ওপর একটা নামাবলী চাপিয়ে খোকা সৎপতি দরজা খুলে দ্রুত বাইরে এসে দেখল তিনটে লোক গামছায় মুখঢাকা অবস্থায় রিভলভার তাক করে ওর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। খোকা ভাল করে লক্ষ করে দেখল, ব্যাটাছেলে দু'জন, একজন আবার মেয়েছেলে।

ওদের দেখেই খোকার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তপাই কান্নাজড়ানো গলায় বলল, ''আমাকে ওরা জোর করে তুলে এনে তোমাকে ডাকতে বলল খোকাদা। বলল, নাহলে আমাকেও জানে মেরে দেবে!''

খোকা জোড়হাত করল। একটু পিছিয়ে ঘরে আসতে গেল। দ্রুত পালিয়ে যাওয়ারও ছক কষল একবার। ওদের সঙ্গে টাকার রফা করার কথাটাও মাথায় এল। কিন্তু কোনও কিছুরই সুযোগ না দিয়ে মেয়েটা বলল, ''তোমাদের মতো শয়তানরা সমাজের শ্রেণিশত্রু। বেঁচে থাকলে দুর্গন্ধ বেরোবে সমাজে। তাই ছুটি দিতে এলাম তোমায়।''

কথাটা বলা শেষ হতেই রিভলভার থেকে ধেয়ে আসা একটা বিদ্যুতের শলাকা খোকা সৎপতির চোখের উপরটা দিয়ে মাথায় গিয়ে গেঁথে গেল। প্রথমে একটা, তারপর তিনদিক থেকে তিনটে। সাময়িক একটু কষ্ট হল খোকার। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এল চারপাশে। চাপচাপ যন্ত্রণার মধ্যে খোকার শেষবারের জন্য মনে হল অন্ধকারের রংটাও বোধহয় বড্ড লাল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%