কমলেশ কুমার
''বিশ্বাস শব্দটা আছে বলেই এক পায়ের ওপর ভরসা করে আমরা অন্য পা সামনে বাড়াই।'' মুথুকুমারনের মুখ আজ শ্রাবণের মেঘের মতো গম্ভীর। রাজ্য পুলিশ আর কোবরা বাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণে ওদের লুকিয়ে থাকার জায়গাটুকুও যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। তবুও আজকের বৈঠকটার গুরুত্ব অপরিসীম। গিধনির ঘন জঙ্গলে আজ ওদের গোপন আস্তানা। যেখানে ওরা রয়েছে, তার থেকে ঠিক আড়াই কিলোমিটার দূরে ঝাড়খণ্ডের সীমানা। মুথুকুমারনের নির্দেশে দলের সব সক্রিয় কর্মীরা উপস্থিত হয়েছে আজ। প্রত্যেকেই ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছে। পুলিশ বা কোবরাকে না, ভয় মুথুকুমারনকে। দলের এক বা একাধিক ব্যক্তি গদ্দারি করেছে নিজের দলের সঙ্গে। ওদের বহু গোপন তথ্য পুলিশ জেনে গিয়েছে। জেনে গিয়েছে বলেই অপারেশন সিএম সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। যদিও সব ব্যর্থতার মধ্যেও একটাই আশার আলো অঘোর আর তার সঙ্গীরা কমলিনীকে লকআপ থেকে তুলে আনতে পেরেছে। অঘোর আর কমলিনী দূরে দূরে বসেছে আজ। চোখাচোখি হলেও কথা বলবার মতো পরিস্থিতি নেই এখন।
''বুদ্ধিমান মানুষ বুঝতে পারে কাকে সে বিশ্বাস করবে, এবং বন্ধু বানাবে। মূর্খরা তা পারে না। আমি জানি না, আমি নিজে কোন শ্রেণিতে পড়ছি।'' মুথুকুমারনের গলার আঁচ টের পেয়ে সব সদস্য থমথমে মুখ নিয়ে বসে রয়েছে। আজ প্রত্যেকের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। মুথুকুমারনের নির্দেশ, এখন থেকে যে-কোনও দিন, যে-কোনও সময় ফায়ারিংয়ের অর্ডার দেওয়া হতে পারে। পুলিশবাহিনীকে সামনে পেলেই গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিতে বলা হয়েছে। স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করা এখন সম্পূর্ণ অর্থহীন।
''সত্যিকার বিশ্বাস সব সময় ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। এর ফলাফল যদিও সুদূরপ্রসারী, কিন্তু একে সময় নিয়ে গড়ে তুলতে হয়,'' মুথুকুমারনের গলা বিষধর সাপের মতো শোনাচ্ছে এখন। দলের মধ্যেই কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এটা পরিষ্কার, কিন্তু সেটা কে, বুঝতে পারছে না কেউই। কেউ এটাও বুঝতে পারছে না যে, বিশ্বাসঘাতকের জন্য কী শাস্তি অপেক্ষা করে আছে।
মুথুকুমারন না থেমে আবার বলল, ''আমি আমার দলের সদস্যদের নিজের পরিবারের লোকেদের মতো ভাবি। বলা ভাল, পরিবারের চেয়েও বেশি। নিজের মাকে আমি দেখিনি তেত্রিশ বছর। যাদের হয়ে কথা বলার কেউ নেই, অসহায়-আর্ত মানুষ, যাদের ওপর দিয়ে দেশ প্রতিদিন বুলডোজার চালায়, আমি তাদের গলার স্বর হয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম, আমি ভেবেছিলাম, নিজের মা-দাদা-পরিবার-পরিজনকে ছেড়ে এলেও সারা দেশের অসংখ্য নির্যাতিত মানুষকে আমি আমার বৃহত্তর পরিবার করে তুলতে পারব। বলতে দ্বিধা নেই, রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আমি তা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু...'' শেষ শব্দটা বলে নিজের দু'হাতের তালুতে মারাত্মক এক চাপড় মারল মুথুকুমারন। সেই শব্দে গাছের ডালে বসে থাকা পাখিরা ভয়ে উড়ে গেল। প্রতিটা সদস্য আসন্ন বিপদের আন্দাজ করে প্রমাদ গুনছিল। অঘোরের চোখেও খেলা করে যাচ্ছিল সন্দেহের ছায়া। কমলিনীর দু'চোখেও ফুটে উঠছিল দোষীকে শাস্তি দেওয়ার উদগ্র বাসনা।
''আমরা একটা অনিশ্চিত জগতে বাস করি বন্ধুরা। আমরা এমনি এমনি বলে দিতে পারি না যে, কাউকে আমরা বিশ্বাস করি। কারণ সেই ব্যক্তিকে বিশ্বাসের জায়গাটা অর্জন করতে হয়। আমাদের দলের কর্মকাণ্ডের প্রাথমিক শর্তই হল বিশ্বাস। যেখানে শয়ে-শয়ে গ্রামবাসী নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও, পুলিশের লাঠি আর বন্দুকের খোঁচা খেয়েও একটা কথা মুখ দিয়ে বের করে না, সেখানে আমার দলের কেউ বা কারা আমাদের বহু গোপন তথ্য নির্বিচারে পুলিশকে পাচার করছে। বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে কোনও দল গড়ে উঠলে তার ফল হয় সুদূরপ্রসারী। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস একটা টিমের সব সদস্যকে তাদের সেরাটা দিয়ে কাজ করতে উৎসাহ দেয়। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা একটা ফনাতোলা সাপের মতো। যে-কোনও মুহূর্তে যে-কাউকে নির্বিচারে ছোবল মারতে পারে সে।'' গলায় চরম অসন্তোষ নিয়ে বলে চলেছে মুথুকুমারন, ''মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বপ্রিয় সেনকে এত কাছ থেকে পাওয়ার সুযোগ আর কোনওদিন পাব না আমরা। লাভ তো কিছু হলই না, উল্টে মেদিনীপুর-বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার অসংখ্য সাধারণ গরিব মানুষ পুলিশের রোষের মুখে পড়ে গেল। আমাদের না পেয়ে কীভাবে বাহিনী অত্যাচার চালাচ্ছে তাদের ওপর, একবার ভাবতে পারছ?'' অসহায় শোনাল মুথুকুমারনের গলা। একবারের জন্য থেমে আবার শুরু হল লাভা উৎগীরণ , ''এত বছরের অভিজ্ঞতার দারুণ একটা শিক্ষা হল আমার, বিশ্বাস করতে হলে এমন কাউকে বিশ্বাস করো, যার মধ্যে নীতি আছে। যার মুখের কথা আর হাতের কাজ আলাদা নয়। যার জিভ আর মস্তিষ্ক একই কথা বলে। আবার বিশ্বাস অর্জন করতে গেলেও এমনভাবে কথা বলো, যেন মানুষ তা সহজেই বুঝতে পারে।''
হঠাৎ চোখ দুটো ছোট ছোট করে সামনে বসে-থাকা সব সদস্যদের মধ্যে কাকে যেন খুঁজতে লাগল মুথুকুমারন। তারপর একজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ''এমএলএ সুজয় সরেনকে যেদিন নিকেশ করার ছক করি আমরা, তোমাকে সেই সভায় কী বলে পাঠানো হয়েছিল বেলু মাহাতো?''
হঠাৎ বেলু মাহাতোকে প্রশ্ন করার ধরন দেখে চমকে গেল সকলে। অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে ওর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল সবাই।
গিধনির জঙ্গলে পাখিরাও যেন কিচিরমিচির করতে ভুলে গিয়েছে আজ। থমথমে পরিবেশের মধ্যে এখন পিন পড়লেও তার আওয়াজ শোনা যাবে।
''বেলু!'' চিৎকার করে উঠল মুথুকুমারন।
বেলু মাহাতো উঠে দাঁড়াল। কথা জড়িয়ে আসছিল ওর। জিভটা যেন আঠা দিয়ে কেউ আটকে দিয়েছে। দুটো হাত জোড়া করে কোনওরকমে থেমে থেমে বলতে লাগল, ''আবেন আমাকে এমএলএর বক্তব্য শুনতে পাঠিয়েছিল। বলে দিয়েছিল, জয়ন্ত আর খগেন স্পটে ঢুকে গুলি চালানোর পর সুজয় সরেন মরল কিনা দেখেই যেন চলে আসি আমি। আবেন যেমনটা বলেছিল, আমি তো তেমনটাই করেছিলাম সূর্যদা!''
''না। করোনি।'' বজ্রগম্ভীর শোনাল মুথুকুমারনের গলা, ''বিশ্বাসী মানুষ অন্যদের চেয়ে সুখী হয়, কারণ তারা অন্যদের চেয়ে বেশি নীতি মেনে চলে। তুমি কোন নীতি মেনে চলো বেলু মাহাতো?''
মুথুকুমারনের কথার উত্তাপের সামনে পড়ে ইঁদুরের মতো কিচকিচ করে উঠল বেলু, ''আমার দোষটা কোথায়, সেটাই তো বুঝতে পারছি না সূর্যদা!''
''তোমাকে আগের দিনও জিজ্ঞাসা করা হল, কোনও সন্দেহজনক কিছু সেদিন দেখেছিলে কিনা!''
''সত্যিই তো দেখিনি!''
''মিথ্যে বলছ তুমি। একশো ভাগ মিথ্যে বলছ।'' ক্রমশ কঠোরতর হচ্ছে মুথুকুমারনের গলা, ''সেদিন ধানশোল প্রাইমারি স্কুলের কাছে চায়ের দোকানটার সামনে একটা পাগলকে ঘুরঘুর করতে দেখেছিলে তুমি। সকলেই দেখেছিল তাকে। যে-লোকটা নিজেকে মীরকাশিম বলে পরিচয় দেয়। ফুলাকেন্দুর করম উৎসবেও সে উপস্থিত ছিল। জিন্দালদের মাঠে মুখ্যমন্ত্রীর সভাতেও সে উপস্থিত ছিল। জয়ন্ত আর খগেন সুজয় সরেনকে মারতে স্পটে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে সে দোকানটার পিছনদিকে চলে যায়। কী, ঠিক বলছি!'' বড় রহস্যময় লাগছে মুথুকুমারনের গলা, ''কেবল বুদ্ধিমান লোকেরাই বুঝতে পারে যে, বুদ্ধিমান হওয়ার চেয়ে সুখী হওয়া ভাল। আমি বুদ্ধিমান আর সুখী কোনওটাই নই। তেত্রিশ বছর ধরে পালিয়ে-পালিয়ে বেড়ানো একটা লোক আমি। গোটা দেশের চোখে ফেরারি-আসামি। রাতের অন্ধকারে আমার পথ চিনতে অসুবিধা হয় না বেলু মাহাতো, সেখানে তোমার মতো দু'একটা আগাছাকে পা দিয়ে মাড়িয়ে যেতেও আমার কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।'' একটু দম নিয়ে মুথুকুমারন আবার বলল, ''আমাদের জয়ন্ত আর খগেনকে সেদিন গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল অন্য কেউ নয়, বীতরাগ চক্রবর্তী, যার এখন পোশাকি নাম মীরকাশিম। এই বীতরাগ চক্রবর্তীর জন্যই জেড প্লাস ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পাওয়া মুখ্যমন্ত্রীও কনভয় থেকে মাঝরাস্তায় নেমে পড়ে একটা মিষ্টির দোকানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ফাঁকা কনভয় কলকাতার উদ্দেশে রওনা করিয়ে আমাদের সম্পূর্ণ বোকা বানানো হয়েছিল। যে মীরকাশিমের জন্য করম উৎসব থেকে কমলিনীকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। তোমার তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই বসিরের বারুদ ভর্তি ট্রাকটাকে মাইন দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল সেই মীরকাশিমই। আমাদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা কেন্দ্রীয় সরকারের অপারেশন গ্রিন হান্টের সম্পূর্ণ নেতৃত্বে আনা হচ্ছে এই বীতরাগ চক্রবর্তীকেই। যেখানে সিআরপিএফের আইজি এপি মহেশ্বর নিজে উপস্থিত, তাঁর ডানাও ছেঁটে দেওয়া হচ্ছে বীতরাগের জন্য। আর...''
রাগে যেন ফেটে পড়ছে মুথুকুমারন।
''আর?'' সকলে সমস্বরে জানতে চাইল। কারোর যেন তর সইছে না এখন।
চোখে আগুনের দৃষ্টি নিয়ে মুথুকুমারন বেলু মাহাতোর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর জামার পকেট থেকে ছোট্ট সাদা রঙের একটা ফোন বের করে নিয়ে এসে বলল, ''এটা বেলু মাহাতোর বাড়ির দেওয়ালের নীচে থেকে পাওয়া গেছে। পাওয়া যেত না হয়তো, যদি না ওর মাটির দেওয়ালটা ইঁদুরে গর্ত করে দিত। প্রথম দিন থেকেই ওর উপর আমার সন্দেহ ছিল। যেদিন ও বলল, সুজয় সরেনের সভায় সন্দেহজনক কাউকেই দেখেনি ও, সেদিন সন্দেহটা আরও জোরদার হল আমার। কারণ সেদিন সভা চলতে চলতেই সব খবর পাচ্ছিলাম আমি। আর খবরগুলো আমাকে দিচ্ছিল অন্য কেউ নয়, ওই চায়ের দোকানের মালিক বীরেন সাঁতরা, যে প্রথম থেকেই আমার অন্ধভক্ত। সেদিন ও শুধু আমার কথাতেই সন্ধে পর্যন্ত দোকানটা খুলে রেখেছিল। এসব কিছুর কারণেই বেলু মাহাতোকে চোখে-চোখে রাখার জন্য লোক লাগিয়েছিলাম আমি। বাকি তথ্যটুকু এই ফোন থেকেই পেয়ে গেলাম। প্রতিদিন অন্তত দু'বার করে বীতরাগ চক্রবর্তীকে কল করা হয়েছে এই ফোন থেকে।''
খানিকটা হতাশ শোনাল মুথুকুমারনের গলা, ''চালাকি সব কিছুতেই করা যায়, কিন্তু কোনও কিছুর জন্যই চালাকি যথেষ্ট নয় বেলু!''
বেলু তাকিয়ে দেখল, সকলে ক্ষুধার্ত পশুর মতো তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সূর্যদার একটা নির্দেশের জন্য অপেক্ষায় ওরা। বেলু জানে, ওদের দলে বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম কী। মুখটা ভয়ে কালো হয়ে গিয়েছে ওর। দু'কানের পাশ দিয়ে দরদর করে ঘাম নেমে আসছে। গায়ে উত্তাপ বেড়ে চলেছে ক্রমশ। গোটা শরীরটা পাক দিয়ে দিয়ে উঠছে যেন।
হঠাৎ কাটা কলাগাছের মতো মুথুকুমারনের পায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল বেলু, কিছু বলতে যাচ্ছিল ও, কিন্তু সশব্দে একটা লাথি মেরে বেলুকে সামনে থেকে সরিয়ে দিল মুথুকুমারন। ওর লাথিটা বেলুর নাকে গিয়ে পড়াতে নাক ফেটে গলগল করে রক্ত ঝরতে শুরু হল।
মুথুকুমারন বাংলা আর হিন্দি মিশিয়ে কেটে কেটে বলল, ''টাকার জন্যে বিকিয়ে গেলে বেলু মাহাতো? কত টাকা দিয়েছে ওরা তোমাকে? পাঁচ হাজার? দশ হাজার? একলাখ? একবার ভাবো তো, জঙ্গলমহলের না-খেতে পাওয়া মানুষগুলোর কথা! ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর কথা! অসুস্থ, অভুক্ত বুড়ো-বুড়িগুলোর কথা! যারা শত লাঞ্ছনা সহ্য করেও আমাদের সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর!''
বেলু থরথর করে কাঁপতে লাগল। কান্নাভেজা গলায় ও বলল, ''আর একটা সুযোগ দাও সূর্যদা। নিজেকে পাল্টে ফেলার আর একটা সুযোগ!''
নিস্পৃহ লাগল মুথুকুমারনের গলা। অঘোরের দিকে তাকিয়ে ও বলল, ''শিলদা ক্যাম্প অ্যাটাক আমরা কবে করছি অঘোর?''
''সামনের পনেরো তারিখ সূর্যদা, বিকেলের দিকে!'' উত্তেজিত গলায় অঘোর বলল।
''তার মানে হাতে আর দিন দশেক।'' ফোনটা বেলুর দিকে বাড়িয়ে ধরে মুথুকুমারন বলল, ''নাও। তোমার পেয়ারের অফিসারকে ফোন করো এখন। বলো, আগামী পনেরো তারিখ মুথুকুমারন তার দলবল নিয়ে দুপুরের দিকে মিটিংয়ে বসবে পাঞ্জাশোলের জঙ্গলে। তারা যেন ফোর্স নিয়ে ঘিরে ফেলে এলাকাটা!''
বেলু মাহাতো কী করবে বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে ফোনটা ধরল। কাঁপা-কাঁপা হাতে বীতরাগ চক্রবর্তীর নম্বরটা ডায়াল করল ও। রিং হচ্ছে। একবার,দু'বার, তিনবার...
এসপি রঞ্জন ত্রিপাঠী স্যারের ঘরে এখন গোপন বৈঠক বসেছে। ডিজি স্যার নিজে উপস্থিত আছেন। সিআরপিএফের আইজি এপি মহেশ্বর এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের অ্যাডিশনাল পুলিশ সুপার বীতরাগ চক্রবর্তী নিজেদের মধ্যে আগামীর কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনায় মগ্ন। সেন্টার টেবিলে চারজনের সামনে চারটে চায়ের কাপ রাখা।
কাপে চুমুক দিয়ে ডিজি স্যার বললেন, ''যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি, আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ বাতি!' লাইনটার অর্থ জানো বীতরাগ?''
বীতরাগ স্মিত হেসে বলল, ''ছোটবেলায় ভাবসম্প্রসারণ করতাম স্যার, অপ্রয়োজনে জিনিস অপচয় করলে, প্রয়োজনে তার উপকারিতা থেকে বঞ্চিত হতে হবে।''
''তুমি আমাদের ডিপার্টমেন্টের একটা রত্ন। তোমাকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করলে আমাদেরও এই দশাই হবে।'' কথাটা বলে হো হো করে হেসে উঠলেন ডিজি।
বীতরাগ লজ্জিত মুখে তাকিয়ে রইল। ডিজি বলে চললেন, ''দ্যাখো বীতরাগ, তুমি নিশ্চয়ই জানো, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে, শান্তি স্থাপন করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করা হয়েছিল!''
ডিজির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ত্রিপাঠী স্যার বললেন, ''এমনকি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেও বহু চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দুরাত্মারা যুদ্ধ করতেই বদ্ধপরিকর ছিল।''
''একদমই তাই। আর এরকম অবস্থায় হিংসার আশ্রয় নিয়ে তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়াটাই অবশ্য-কর্তব্য বলে মনে করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ।'' ডিজি স্যার বলে চললেন, ''আমরাও সেই পন্থাই অবলম্বন করব। গেরিলা-যোদ্ধাদের আর কোনওভাবেই টলারেট করা যাবে না। যারা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রাণ কেড়ে নিতে উদ্যত হওয়ার সাহস দেখাতে পারে, তাদের ঝাড়েবংশে ধ্বংস করে দিতে আমাদেরও হাত কাঁপা উচিত নয়। এপি মহেশ্বর সাহেব সঙ্গে রয়েছেন। ওঁকে সবরকম সহায়তা দেবে তুমি। অপারেশন গ্রিন হান্টের সমস্ত খুঁটিনাটি আজ থেকে তুমিই দেখবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব নিজে ফোন করে এমনটাই জানিয়েছেন আমাকে।'' একটু থেমে ডিজি স্যার আবার বললেন, ''আজ বিকেলেই প্রেসকনফারেন্স করব আমি। মুথুকুমারনের মাথার দাম দিচ্ছি দশ লক্ষ টাকা, অঘোর হেমব্রম আর সহদেব মুর্মূর মাথার দাম দিচ্ছি যথাক্রমে পাঁচ লাখ আর দু'লাখ!''
বীতরাগের মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠাতে সাময়িক ছেদ পড়ল কথায়। তিনবার রিং হল ফোনটার। পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ও ডিজিকে বলল, ''সরি স্যার। ফোনটা রিসিভ করছি একবার। আমার ইনফর্মার বেলু মাহাতো ফোন করছে।''
''স্যার!'' ভয়ার্ত শোনাল বেলুর গলা, ''আগামী পনেরো তারিখ মুথুকুমারন তার দলবল নিয়ে দুপুরের দিকে মিটিংয়ে বসবে পাঞ্জাশোলের জঙ্গলে। আপনি ফোর্স নিয়ে এলে সকলকে একসঙ্গে পেয়ে যাবেন।''
কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফোনের ভিতর থেকেই তিনবার গুলির আওয়াজ পেল বীতরাগ। ফোনের মধ্যে থেকে ভেসে এল প্রবল এক আর্তনাদ। আওয়াজটা পৌঁছেছে ঘরে উপস্থিত অন্য সদস্যদের কানেও।
এপি মহেশ্বর অবাক হয়ে বললেন, ''কী হল! ফায়ারিংয়ের আওয়াজ পেলাম মনে হচ্ছে!''
বীতরাগ ম্লান মুখে বলল, ''আমাদের লড়াইটা আর একটু কঠিন হয়ে গেল স্যার। আমার অন্যতম ইনফর্মারকে জানে মেরে দিল ওরা।''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন