কমলেশ কুমার
''অঘোর, আমাদের দেশের অতীত সমাজটার দিকে তাকাও, যখন চতুরাশ্রম ছিল, মুনি-ঋষিদের তপোবন ছিল, সেই সমাজটাই নাকি আদর্শ সমাজ ছিল। সেই আশ্রমে গেলেই নাকি মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক ভাব দেখা দিত। যন্ত্রসভ্যতা, কলকারখানা এসবই নাকি আমাদের বিপত্তির মূল কারণ। এসবের ফলেই আমাদের মধ্যে লোভ বেড়েছে, দেখা দিয়েছে যত সামাজিক বৈষম্য, যত অনাচার। আমরা বলতে চাই, এ সব কিছুরই মূল কারণ হল শোষণমূলক পরিকাঠামো। সামাজিক বৈষম্যই বলো, আর অনাচার বলো, সব কিছুরই মূল কারণ শোষণের উপর প্রতিষ্ঠিত এই সমাজব্যবস্থা। লোভ, হিংসা, দ্বেষ এসব নিয়ে মানুষ জন্মায়নি। সামাজিক পরিস্থিতিতে যখন বৈষম্য দেখা দিয়েছে, সেখান থেকেই লোভ, হিংসা, দ্বেষ ইত্যাদি জন্ম নিয়েছে। এসব কিছুই হল ইতিহাসের ফসল। তাই না? তোমার কী মত?''
কমলিনী কথার জালে একটা মাদকতা ছড়িয়ে দেয়। যেকোনও মানুষ সেই জালে আটকে পড়ে।
অঘোর নিজে সমাজ নিয়ে অতটা বিস্তারিত ভাবতে পারে না। ভালটাকে ভাল, খারাপটাকে খারাপ হিসেবে দেখতেই সে ভালবাসে। ওর চিন্তাশৈলী গভীরতা স্পর্শ করে না। চিন্তা করার জন্য যে পরিশ্রম করতে হয়, সেটুকুর জন্যও মন থেকে সায় পায় না অঘোর। ও যুদ্ধবিশারদ। খুব ছোট থেকেই বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওর কাজ। তত্ত্বকথার থেকে ব্যবহারিক জ্ঞানের উপর ও ভরসা রাখে বেশি।
ও দারিদ্র দেখেছে, অসহায় বৃদ্ধকে অনাহরে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছে, ছানিপড়া চোখের কম্পমান শরীরের অশক্ত আদিবাসী বৃদ্ধাকে খাবারের জন্য লড়াই করতে দেখেছে। বাচ্চাকে খুদকুঁড়ো খাওয়াতে দেখেছে। চিকিৎসার জন্য গ্রামবাসীদের একশো কিলিমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখেছে।
এই সব পুঞ্জীভূত ক্ষোভগুলো ওর হৃদয়ে বারুদের মতো সঞ্চিত হয়েছিল বলেই একদিন ও পাড়ি দিয়েছিল অন্ধ্রপ্রদেশে। সেখানে মানুষের অধিকার রক্ষায় লড়াই চালিয়েছে অনেকদিন। নিজের রাজ্যে ফিরে এসেও দেখেছে অবস্থার উন্নতি হয়নি কিছুই।
নেতাদের গালভরা কথা শুনতে শুনতে, আর প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভাসতে ভাসতে ভুখা পেটে আগুন জ্বলেছে। তাই সমাজের এইসব সুবিধাবাদী শ্রেণিটাকে নিকেশ করতে ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ও জানে, আগ্নেয়াস্ত্র ওর হাতে কথা বলে। কতবছর হয়ে গেল ওদের সঙ্গে ওঠাবসা ওর। যখন রাতে শুতে যায়, অস্ত্র জাপটে ধরে ঘুমোয়। স্বপ্নেও যাতে অধিকার রক্ষার লড়াইটা জারি রাখা যায়, তার জন্য সচেষ্ট থাকে ও সবসময়।
কিন্তু এই একটা মেয়ে কেমন যেন ওর হিসেবটাকে গোলমাল করে দিচ্ছে ক'দিন। কমলিনীর গভীর কালো দুটো চোখ, টিকাল নাক, গালে টোলপড়া হাসিটা কেন ওকে চঞ্চল করে তুলছে বারবার!
''আমাদের গঞ্জগ্রামে সামরিক বাহিনী আসছে অঘোর। ওদের ভারী বুটের আওয়াজে হয়তো বিনিদ্র রাত কেটে যাবে সাঁওতাল বাড়িগুলোর। খুব কি অত্যাচার চালাবে ওরা, অঘোর? আমাকে না পেয়ে, তোমাকে না পেয়ে, আমাদের অসংখ্য সতীর্থদের না পেয়ে, ওরা কি আমাদের পরিবারের লোকগুলোর উপর বর্বরোচিত আচরণ করবে? কী ভয়ঙ্কর হবে তাহলে সবকিছু!''
অঘোর দেখল কমলিনীর ভোরের বাতাসের মতো তরতাজা মুখের উপর জমেছে চিন্তার কালোমেঘ।
ও এতক্ষণ ল্যান্ডমাইন পেতে রাখার কৌশল শেখাচ্ছিল কমলিনীকে। বিনপুর থেকে লালগড় যাওয়ার পথে যে মোরাম রাস্তাটা সোজাসুজি জঙ্গলের দিকে ঢুকে গিয়েছে, তার পাশেই নয়ানজুলির ধারে দু'জনে কাজটা করছিল এতক্ষণ।
কমলিনীর উদ্বেগ দেখে বিশেষ চিন্তিত হল না অঘোর। ও তাকিয়ে দেখল, দুপুরের রোদে ঘেমেনেয়ে উঠেছে কমলিনী, ওর মাথাভর্তি লম্বা চুল ঘামেভিজে লেপ্টে রয়েছে কপালের সঙ্গে। ওর দিকে তাকিয়ে নিরুদ্বিগ্ন গলায় অঘোর বলল, ''লোকে বলে জীবন বাইসাইকেল চালানোর মতো একটা ব্যাপার। পড়ে যেতে না চাইলে তোমাকে সামনে চলতে হবে। কিন্তু আমি কী ভাবি জানো? আমরা যারা বন্দুকের নলে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্ন দেখি, তাদের কাছে সচল ট্রিগারের গুরুত্ব অপরিসীম। তাকে থামতে দিলে সমাজব্যবস্থায় মরচে পড়ে যাবে। তাই যতদিন ফায়ারিং স্কোয়াডের পিছনে থাকতে পারব, কাউকে ভয় পাব না কমলিনী।''
কথাটা বলে অঘোর ওর কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা রাইফেলটার উপর আলতো করে ডানহাতটা রাখল।
''কিন্তু ওরা শুনেছি জলে-জঙ্গলে খুব দক্ষ হয়। ওদের হাতে কোটি কোটি টাকার আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, যদি আমাদের সংগ্রাম ব্যর্থ হয়ে যায়? কোথায় হারিয়ে যাবে আমাদের ছোট ছোট বাচ্চাগুলো! বয়স্ক মানুষগুলো! বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলে আশ্রয়হীন হয়ে কোথায় জঙ্গলে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াবে তারা, অঘোর?''
সংগ্রামে আর বারুদের গন্ধে অঘোর কাটিয়ে দিয়েছে জীবনের বেশ কিছু বছর। কিন্তু আজ একটা উদ্ভিন্ন যুবতীর চোখের তারায়, তার মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া ভয়ের আবেশে অঘোর যেন অন্য একটা পৃথিবীর সন্ধান পাচ্ছে ধীরে ধীরে। সেই পৃথিবী ভয়হীন, শত্রুহীন। জঙ্গলমহলের সবুজ তার মনের মধ্যে কীসের এক আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে দিল হঠাৎ, বুঝতে পারছে না অঘোর, তবে ও নিজের বুকের মধ্যে টের পাচ্ছে এক আশ্চর্য দ্রিমিদ্রিমি, রক্তের মধ্যে যেন মহুলবনের নেশা জেগে উঠছে।
কমলিনীর শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে অঘোর বলল, ''যারা খুব বেশি দূরে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারে, কেবল তারাই তো খুঁজে পায় দূরে যাওয়ার রাস্তা! সাহসী হও, ঝুঁকি নাও কমলিনী, কিছুই অভিজ্ঞতার বিকল্প হতে পারে না।''
কমলিনী জানে, ভাগ্য সবসময় সাহসীদের পক্ষে, এবং ভাগ্য এমন কোনও মানুষকে সাহায্য করে না, যে-মানুষ নিজেকে সাহায্য করে না।
অঘোরের কথায় শান্তি পায় কমলিনী। হাসি হাসি মুখ নিয়ে ও বলল, ''বেশ। এবার শেখাও আমাকে ল্যান্ডমাইন। কবে কোন কাজে লেগে যায় কে বলতে পারে!''
অঘোর তাকিয়ে দেখল, লালগড়ের আকাশে মেঘ জমছে। বর্ষা কেটে ঘিয়ে শরৎ আসতে চলল, অথচ বৃষ্টির নিস্তার নেই।
ও এবার একটু গম্ভীর হল। কাজের ব্যাপারে অঘোর বরাবর সিরিয়াস, ''দ্যাখো কমলিনী, জঙ্গলমহলে এখন ল্যান্ডমাইন পেতে রাখা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। গেরিলা লড়াইয়ে ভিআইপি কিংবা টহলদার বাহিনীর উপরে আক্রমণের সহজ উপায় হল ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ। যদি আধাসামরিক বাহিনী আমাদের এলাকা দখল নিয়ে নেয় পুরোপুরি, তাহলে তাদেরও খুব সহজেই আমরা নিকেশ করতে পারব ল্যান্ডমাইনের দ্বারা।''
''আমরা কি তাহলে কাজটা শুরু করে দেব?''
কমলিনীর প্রশ্নে উৎসাহিত হয়ে অঘোর বলল, ''একদম। সূর্যদার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। রাতের অন্ধকারে নয়, দুপুরের নিস্তব্ধতায় আমরা গোটা জঙ্গলমহলের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে মাইন পুঁতে রাখার কাজ শুরু করব এবার। আমরা যে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস ব্যবহার করি, তার মেয়াদ কিন্তু অনন্তকাল। সব ল্যান্ডমাইনের সঙ্গে তিন-চার ফুট তার জুড়ে প্রস্তুত রাখব। প্রয়োজনে তাতে বড় তার জুড়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ পাঠালেই বিস্ফোরণ ঘটানো যাবে।''
অঘোর দেখল কমলিনীর ভাসা ভাসা নরম চোখ দুটো ওর কথা শুনে আগুনের গোলায় পরিণত হচ্ছে। কিসের যেন একটা অদম্য রাগ আর ঘৃণা ওর গোটা শরীর থেকে উপচে পড়তে চাইছে।
হাততালি দিয়ে উঠল কমলিনী। আদুরে গলায় অঘোরকে বলল, ''একটা বিস্ফোরণে সর্বাধিক কতজন মরতে পারে?''
''পঞ্চাশ-ষাট। কিংবা একশো-দুশো!''
অঘোরের উত্তর পেয়ে পরিতৃপ্ত হল কমলিনী। অঘোর বলে চলল, ''সিআরপিএফ আমাদের মতো করে জঙ্গলকে দেখেছে কি কোনওদিন? আমরা জঙ্গলমহলকে চিনি আমাদের হাতের তালুর মতো।''
''একটা প্রশ্ন ছিল।'' অঘোরকে মাঝপথে থামিয়ে কমলিনী বলল, ''কীভাবে মনে রাখব কোথায় কোথায় মাইন পুঁতে রাখলাম আমরা?''
কমলিনীর প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলল অঘোর, কিছুটা মজা করেই ও বলল, ''তাইতো! আমাদের সম্পত্তি, আমরাই যদি ভুলে যাই!'' একটু থেমে দুটো চোখ ছোটছোট করে ও বলল, ''কোথাও হয়তো একটা গাছ দিয়ে একটা মাইনের অবস্থান চিহ্নিত করে রাখব। কোথাও হয়তো ল্যান্ডমার্ক হবে একটা কালভার্ট। কোথাও বা পুকুরের পাড়!''
''মাসের পর মাস ঝড়-জল-শীত-তাপপ্রবাহ সহ্য করে সেগুলো কার্যকর থাকবে কীভাবে?''
কমলিনীর কথা শুনে মৃদু হাসল অঘোর, ''সেটাই তো আমার ট্যালেন্ট, সুন্দরী!''
ওর মুখে সুন্দরী শব্দটা শুনে লজ্জায় কুঁকড়ে গেল কমলিনী।
অঘোর বলে চলল, ''স্টিলের টিফিন কৌটো বা লোহার পাইপে বিস্ফোরক ভরে আমি ল্যান্ডমাইন বানাতাম অন্ধ্রে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা প্লাস্টিকে মুড়ে দিতাম, যাতে কোনওভাবে বিস্ফোরক নষ্ট না হয়। জলের মধ্যেও ফাটানো যেত সেসব মাইন।'' একটু থেমে অঘোর আবার বলল, ''ল্যান্ডমাইন বানাতে তো খুব কাঠখড় পোড়াতে হয় না। কেমিক্যাল সারকে মূল উপাদান করেই আমি সাধারণত এগুলো বানিয়ে থাকি। বারুদ আর সারের তারতম্যে শক্তির পার্থক্যটা হয়ে যায়।''
কথাটা বলে অঘোর কমলিনীর দিকে তাকাল একবার। দেখল, কমলিনী বড় বড় চোখ করে অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। ওর দিকে তাকিয়ে অঘোর প্রস্তাব দিল, ''চলো, লালগড়ের কাঁটাপাহাড়ির কাছে ভাকুয়ার জঙ্গলের দিকে চলে যাই। পাকারাস্তাটা গিয়েছে ওর খানিকটা দূর দিয়ে। ওখানে প্রবল শক্তিশালী দুটো মাইন পুঁতে রেখে আসি!''
প্রস্তাবটা মন্দ লাগল না কমলিনীর। ওদের কাছে খবর আছে, দু'তিনদিনের মধ্যেই আধাসামরিক বাহিনীর হাতে চলে যাচ্ছে জঙ্গলমহলের দায়িত্ব। ওদের চমকানোর জন্যে মাইন একটা বড় মাধ্যম হতেই পারে।
কথামতো ওরা হাঁটতে লাগল জঙ্গলের পথ ধরে। ভাকুয়া এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
অঘোর বলল, ''একবার পুঁতে দিতে পারলেই নিশ্চিন্ত। যদিও জানি, মাইন তল্লাশিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির সঙ্গে পুলিশ-কুকুরকেও কাজে লাগাচ্ছে বাহিনী। নন লিনিয়ার জাংশন ডিটেক্টর, মাইন সুইপার, ডিপ সার্চ মেটাল ডিটেক্টরের মতো সন্ধানী যন্ত্রের পাশাপাশি মাটি খোঁড়ার সরঞ্জামও কাছে রাখছে ওরা। কিন্তু সন্ধান পেলে তবে তো!''
কমলিনী বলল, ''অন্য কীভাবে আমরা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারি অঘোর? অনেকটা দূরত্ব থেকেও কি কাজটা করা সম্ভব?''
কমলিনীর উৎসাহ দেখে ভাল লাগল অঘোরের। ও বলল, ''অন্ধ্রপ্রদেশে থাকতে ব্লুটুথ দিয়ে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণের এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে আবিষ্কার করেছিলাম আমি। ওয়াইফাই ব্যবহার করেও ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ ঘটাতাম ওখানে অহরহ।''
''তাহলে এখানে কেন নয়? কোথায় পিছিয়ে আছি আমরা?''
''অন্ধরা দেখতে না পেলেও আলো তো আলোই থাকে কমলিনী, সে তো অন্ধকার হয়ে যায় না! আমাদের এখানে পরিবেশ আর পরিস্থিতি দুটোই রয়েছে যখন কাজের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করার, করব না কেন? অকর্মার কাছেও তো মাঝে মাঝে সৌভাগ্য আসে, কিন্তু কখনওই বেশিক্ষণ থাকে না। তাই, তুমি আমাকে দেখতে থাকো এবার। আমাদের অধিকারকে ফিরে পাওয়ার এই লড়াই কখনও বৃথা হতে দেব না আমি।''
মানুষ যখন নিজে থেকে বিশ্বাস করে যে সে পারবে, তখন সে সত্যিই পারবে, আর এটিই আত্মবিশ্বাস। আত্মবিশ্বাসের চওড়া একটা রাস্তা কমলিনীর জীবনে এই ক'দিনেই তৈরি করে দিয়েছে অঘোর।
কোনও মানুষের চেহারা নয়, বরং তার আত্মবিশ্বাস বলে দেয় সে কতটা সুন্দর।
এই মুহূর্তে কমলিনীর মন জুড়ে তিরতির করে একটা আনন্দের স্রোত বয়ে চলেছে। যদিও ও জানে না কেন। মনে হচ্ছিল এই গহিন অরণ্যে যদি অঘোরের হাতটা ধরে হাঁটা যেত! আনন্দকে ভাগ করলে দুটো জিনিস পাওয়া যায়, একটা হচ্ছে জ্ঞান আর অপরটা হল প্রেম। মানুষের উপর অত্যাচার আর বঞ্চনার উপত্যকা জুড়ে যাদের বাস, তাদের কাছে পৃথিবীটা এক জ্ঞানহীন মরুভূমির মতো। কিন্তু প্রেম? কমলিনী জানে, এই আপৎকালীন মুহূর্তে আদর্শবাদ ছাড়া জীবনের আর সবকিছু শূন্য। সেই আদর্শ শুধু লড়াইয়ের স্বপ্ন উসকে দেয়। নিজের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু সেই আদর্শের ছাঁচে আবদ্ধ হয়েও ওর মন জুড়ে কেন এত ভালোলাগার উথালপাতাল চলছে, বুঝতে পারে না ও।
কমলিনী মনে করে, একজন মানুষের প্রকৃত পরিমাপ হল তার আদর্শের উচ্চতা, তার অনুভূতির প্রশস্ততা, তার বিশ্বাসের গভীরতা, আর ধৈর্যের নিবিড়তা। কিন্তু এতকিছু জানা সত্বেও, অঘোরের দিকে তাকালে কেন ওরকম শিরশির করে ওঠে ওর শরীর! কেন ছেলেটা একটু আসতে দেরি করলেই চঞ্চলমতি হরিণী হয়ে ওঠে ও? তুমুল সাহসী হয়েও কেন অঘোরকে অস্ত্রহাতে দাঁড়াতে দেখলেই একটা শূন্যতা এসে গ্রাস করে ওকে? দু'জনে পাশাপাশি হেঁটে গেলে কীসের একটা আকর্ষণ মাদকতা ছড়িয়ে দেয় ওর গোটা শরীরে? এই কি তবে প্রেম! জানে না কমলিনী। ও এটাও জানে না, ওর অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনের পথে অঘোর প্রদীপ হয়ে কোনওদিন আলো জ্বালাতে পারবে কিনা!
''কমলিনী!'' অঘোরের ডাকে বাস্তবে ফিরল ও। তাকিয়ে দেখল অনেকটা রাস্তা হেঁটে চলে এসেছে ওরা। ভাকুয়ার জঙ্গল থেকে দূরের পিচের রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে। হুসহুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে বড় বড় বাস আর লরিগুলো। রাস্তার পাশে একটা মাইলফলক পোঁতা রয়েছে। অঘোর তার পাশের জায়গাটাকেই বেছে নিল মাইন রাখার জন্য। একটা ঝোপঝাড় দেখে সেখানে ঢুকে পড়ল ও।
হঠাৎ কান ঝালাপালা করে হুটার বাজতে শুরু করল পাকারাস্তার দিকে। অঘোর লাফিয়ে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল কমলিনীর পাশে। জঙ্গলের দিকে একটু সরে গেল ওরা। কমলিনী অবাক বিস্ময়ে দেখল, একটার পর একটা সামরিক বাহিনীর ভ্যান বিদ্যুৎ গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে বিনপুর ব্লক অফিসের দিকে। এই কি তবে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স? তবে কি ওরা এসেই পড়ল! এই কি তবে তাদের কনভয়!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন