বিংশ অধ্যায়

কমলেশ কুমার

ভাদ্র মাসের শুক্ল একাদশী তিথিতে করমপুজো হয়। আজ সেই দিন। সাতদিন আগে থেকে কমলিনীর মতো মেয়েরা ভোরবেলায় শালের দাঁতন কাঠি ভেঙে রেখেছে। নদী বা পুকুরে স্নান করে বাঁশ দিয়ে বোনা ছোট টুপা ও ডালায় বালি ভর্তি করেছে ওরা। আজ সকালে গ্রামের শেষমাথায় গিয়ে ডালাগুলোকে রেখে জাওয়া গান গাইতে গাইতে তিন পাক ঘুরেছে। গ্রামের পুরুষেরা শাল গাছের ডাল ভেঙে এনেছে। গ্রামের বয়স্করা ফুলাকেন্দুর বড় অশ্বত্থতলায় দুটো করম ডাল এনে পুঁতে রেখেছে, এই ডালদুটোকেই এখন করম ঠাকুর হিসেবে পুজো করা হবে। গাছতলার চারপাশে ছোটখাট মেলাও বসেছে। কমলিনীর মতো যুবতী মেয়েরা সারাদিন উপোস করে ছিল আজ। সন্ধ্যার পরে থালায় ফুল, ফল নৈবেদ্য সাজিয়ে পুজো দেবে ওরা। করম উৎসবের জন্য আজ সারারাত ধরে ভাদরিয়া ঝুমুর গান আর যৌথ নাচ হবে। চলবে কাল ভোরে সূর্য ওঠার আগে পর্যন্ত। এই নাচে শুধুমাত্র অবিবাহিতা আর প্রথম বছরের নববিবাহিতা মেয়েরাই অংশগ্রহণ করতে পারে। মেয়েদের পরনে থাকে গামছা কিংবা শাড়ি।

কমলিনী আজ রুপোর গয়না পরেছে। কপালে ঝুলছে টিকলি। নাকে নথ। দুটো কানে ঝালর দেওয়া দুল। মাথার পিছনদিকে জংলা বুনোফুল লাগিয়ে বড় মোহময়ী লাগছে ওকে।

কমলিনী জানে, আদিবাসী ওঁরাও সম্প্রদায়ের ধর্মচর্চা অনুযায়ী, পুরাকালে একবার অগ্নিপ্রলয় হয়েছিল, লাভার মতো আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছিল চারিদিক থেকে। সে সময় নায়েক ও সারেন নামের দুই ভাইবোন ইশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলে তাদের করম গাছের কোটরে আশ্রয় নিতে নির্দেশ দেন ভগবান। আগুনে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও করম গাছের কোনও ক্ষতি হয়নি। রক্ষা পায় নায়েক ও সারেন। সেই থেকে প্রকৃতির পুজোর মূল কেন্দ্রে থাকে করম গাছের ডাল। করম গাছকে রাজার সম্মান দেওয়া হয়। আদিবাসী সমাজের পুরোহিত অর্থাৎ পাহান নির্দিষ্ট রীতি মেনে করম ডালের পুজো দেন। এরপর থেকেই শুরু হয় উৎসব। মেলা প্রাঙ্গণে বিয়েও করেন অনেক আদিবাসী যুবক যুবতী।

বিয়ের কথা ভাবতেই কমলিনীর গোটা শরীর শিরশির করে ওঠে। ও শুনতে পাচ্ছিল গ্রামের যুবকরা দ্রিমি দ্রিমি মাদল বাজাচ্ছে।

অঘোরের আসার কথা আজ। ফুলাকেন্দুর অশ্বত্থতলা থেকে যে রাস্তাটা সোজা জঙ্গলের দিকে ঢুকে গিয়েছে, সেই মাটির রাস্তাটা ধরে বেশখানিকটা এগিয়ে এসেছে কমলিনী। অঘোর এখানেই ওর জন্য অপেক্ষা করতে বলেছে। একজন পূর্ণবয়স্ক যুবতী অপেক্ষা করছে যুদ্ধপ্রিয় একটা ছেলের জন্য। সুঠাম, যৌবনোচ্ছল এক যুবক। খানিক পরেই ওকে পুজোর জোগাড় করতে যেতে হবে। কখন অঘোর আসবে, সেটাই চিন্তার বিষয় এখন। অঘোরের জন্য সামান্য একটু রান্না করে এনেছে আজ কমলিনী। মাংস আর রুটি। অঘোর ওর সামনে বসে খাবে, ও দু'চোখ ভরে দেখবে ওকে।

কমলিনী শুনতে পাচ্ছিল দূর থেকে ভেসে আসা ভাদুগান, ''আর ভাদরে আদর বিটি/ আশ্বিনে বিদায় লো/ যাবে যাবে যাবে বিটি/ যাবে শ্বশুর ঘর লো!''

গানটা শুনে নিজের মনেই একটু লজ্জিত হল কমলিনী। যদি সত্যিই পরিস্থিতি সেরকম থাকত, মানুষের যদি একটু সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেখা যেত, কমলিনী বিয়েই করে ফেলত অঘোরকে। কিন্তু সামনে ঘোর দুর্বিপাক। অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছে ওরা, আরও বহু পথ যেতে হবে। লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালানোর কথা কমলিনী স্বপ্নেও ভাবতে পারে না।

বর্ষার জন্য নির্ধারিত দুটো মাস পেরিয়ে গিয়েছে। উৎসবের ঋতু শরৎকালকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হয়েছে ভাদ্র-আশ্বিন। বর্ষার ঘন মেঘ কখনও কখনও দেখা দিলেও পেঁজা তুলোয় ভর্তি শরতের আকাশ ফুলাকেন্দুর ফাঁকা মাঠে দাঁড়ালেই দেখা যায়।

কমলিনী দেখল, আজ উদার-প্রকৃতি দু'হাত ভরে যেন আশীর্বাদ বর্ষণ করছে আকাশ থেকে। সাদা-সাদা ছেঁড়া মেঘের দল ইতস্তত উড়ে বেড়াচ্ছে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে গোটা চরাচর।

প্রান্তিক আদিবাসী সমাজের এই একটাই বড় উৎসব। ওদের ভালবাসার করম পরব। সকলের একটাই কামনা থাকে, শস্য আর সন্তানের সমৃদ্ধি। যখন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর বর্ষার শেষে মাঠে বেড়ে ওঠে সবুজ ধান, ভেজা-ভেজা প্রকৃতিতে শরৎ এসে থেমে যায় একাকী, মানভূম, জঙ্গলমহলের সমস্ত অঞ্চলের গ্রামগঞ্জ মেতে ওঠে এই পরবে। আদিবাসী সাঁওতাল, মাহাতো, কুড়মি তো বটেই, তাদের সঙ্গে সঙ্গে এই করম উৎসবে মেতে ওঠে ওঁরাও, মুন্ডা, কামার, কুমোর, ভূমিজ প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষজনও।

কমলিনীও প্রতিনিয়ত প্রকৃতির কাছে মানবসভ্যতার মঙ্গল কামনা করে। ওদের ক্ষয়িষু� সমাজের পুষ্টির কথা চিন্তা করে। জঙ্গলমহলের বঞ্চিত মানুষগুলোর চোখের দিকে তাকাতে পারে না ও। তাকালেই ওর নিজের বাবার কথা মনে পড়ে।

পিঠের আলতো ছোঁয়ায় কমলিনী তাকিয়ে দেখল, অঘোর এসে দাঁড়িয়েছে ওর পিছনে।একটা নতুন জামা-প্যান্ট পরেছে অঘোর। গায়ে সেন্ট লাগিয়েছে। ভুরভুর করে লেবুলেবু গন্ধ উঠে আসছে ওর গা থেকে। ও আজ সম্পূর্ণ অস্ত্রহীন।

''কখন এলে কমলিনী?''

''এসেছি তো অনেকক্ষণ। বাবুরই তো পাত্তা নেই!''

অঘোর ফিচেল হাসি হেসে বলল, ''অন্ধকারে ভয় পাচ্ছিলে?''

কমলিনী দমে গেল না। হাসতে-হাসতে বলল, ''চারিদিকে উৎসবের মেজাজ। লোকজনের ভিড় থেকে বহুদূরে অন্ধকারে একটা ডাগর মেয়ে একা দাঁড়িয়ে আছে তার মানুষটার জন্য, ভয় লাগবে না, বলো?''

''কী ভাল লাগছে কমলিনী তোমার কথা শুনতে।''

''আমি কী এমন ভাল কথা বললাম!''

''ওই যে বললে, তার মানুষটার জন্য! সত্যিই তোমার মানুষ তো আমিই, বলো?''

কমলিনী কিছু বলল না। লজ্জায় আরক্ত হয়ে গেল ও। একটু জড়োসড়ো হয়ে রইল।

কাছে এগিয়ে এল অঘোর, কমলিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, ''হাতে কী ওটা? এখানেও বোমা-টোমা নিয়ে এলে নাকি!''

কমলিনী হাসল। লজ্জিত মুখে বলল, ''তোমার জন্য একটু খাবার বানিয়েছিলাম, খাবে? সামান্য একটু মাংস, আর কয়েকটা রুটি!''

অদ্ভুত একটা ভাল লাগায় অঘোরের মনটা ভরে উঠল। কমলিনীর একটা হাত ধরে ও বলল, ''আজ সারাদিন উপোস ছিল তোমার, তাও রান্না করেছ আমার জন্য?''

এবারে কমলিনী কিছু বলল না। লজ্জিত কিশোরীর মতো মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

অঘোর কমলিনীর একটা হাত ধরে বলল, ''এসো।''

যেখানে ও এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, তার সামনে দিয়ে চলে গিয়েছে একটা সরু আলপথ। ওরা দু'জনে কিছুটা হেঁটে একটা ফাঁকা মাঠে এসে বসল। চাঁদের ফ্যাটফ্যাটে সাদা আলোয় ভরে রয়েছে গোটা মাঠটা। ত্রিসীমানায় কেউ নেই এখন। উৎসবের শব্দ শোনা যাচ্ছে দূর থেকে।

''জানো কমলিনী'' অঘোর বলল, ''অন্ধ্রতে যখন থাকতাম, বোমা-বারুদের গন্ধ শুঁকতে-শুঁকতে ভেবেছিলাম এটাই আমার ভবিতব্য। কোনওদিন ভাবিনি, আমার মতো অনাথ, অস্ত্র নিয়ে বেড়ে-ওঠা একটা ছেলে প্রেমে পড়তে পারে। কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল!''

''যা হল খারাপ হল বলছ? এই নতুন সম্পর্কের জন্য তুমি কি অনুতপ্ত অঘোর?''

''না-না। কী বলছ! কতজন মানুষের এমন সৌভাগ্য হয়! একজন সুন্দরী যুবতী নিজে সারাদিন উপোস করেও তার প্রেমিকের জন্য খাবার বানিয়ে এনেছে, এ কী কম কথা! এই ভালোবাসা কি সকলে পায়, বলো?''

''ভাগ্যিস খাবার বানিয়ে আনলাম! নাহলে তো বিশ্বাসই করতে না আমি তোমায় ভালোবাসি!''

কথাটা বলেই চরম লজ্জায় পড়ে গেল কমলিনী। ও জানে, লজ্জা মেয়েদের অলংকার নয়, অস্তিত্ব। অলংকার হলে টানাটানিতে খসে পড়ে যেত। অস্তিত্ব বলেই সত্তার সঙ্গে আটকে থাকে। তাও এই রিনরিনে হাওয়ায় ঝুলে থাকা আস্ত চাঁদটার সামনে একটা যৌবনোচ্ছল মেয়ে তার বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা কথাগুলো এত সহজে বলে ফেলতে পারে!

অঘোর পরিপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকাল কমলিনীর দিকে। দেখল, ওর মাথার টিকলির ওপর চাঁদের আলো পড়ে পিছলে যাচ্ছে। নাকের নথটা চিকচিক করছে ঘাড় ঘোরালেই।

''শেষ কথাটা আর একবার বলবে কমলিনী?'' গলায় মাত্রাতিরিক্ত আবদার ফুটিয়ে বলল অঘোর।

''না। একদম না। খুব? না!'' আর কোনও কথা বলতে পারল না কমলিনী। কেমন অদ্ভুত এক ইন্দ্রিয়চেতনা ওকে অবশ করে দিতে চাইল যেন।

অঘোর সরে এল খুব কাছে। দু'হাত দিয়ে জাপটে ধরল ওকে। অঘোরের নিঃশ্বাসের আওয়াজ পাচ্ছে কমলিনী। ক্রমশ সেই নিঃশ্বাস উত্তপ্ত হয়ে উঠল। কানের লতিতে আলতো দাঁত বসাল অঘোর। কমলিনী দেখল, ওর সারা শরীরে লোমকূপগুলো খাড়া হয়ে উঠল। গোটা শরীরটা অনাস্বাদিত আবেগে ধনুকের মতো বেঁকে-বেঁকে উঠল।

অঘোর কমলিনীর ঘাড়ে দাঁত বসাল এবার। কমলিনী পাগলের মতো হয়ে উঠল। নিজে থেকেই ও টান মেরে খুলে ফেলল শাড়ির ফাঁস। সায়ার গিঁট খুলে নামিয়ে দিল নীচে। ব্লাউজের হুকগুলো পটাপট খুলে দিল অঘোর।

অঘোর দেখল, ধবধবে চাঁদের আলোয় নির্মেদ নগ্ন এক যুবতী শরীর পেতে দিল ওর জন্য। প্রবল আকাঙ্ক্ষায় মেয়েটা যেন অপেক্ষারত। তার উদাত্ত আহ্বান অগ্রাহ্য করা অঘোরের পক্ষে অসম্ভব। তাছাড়া ও কমলিনীকে প্রচণ্ড ভালবাসে।

অঘোর এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। ওর শরীর থেকে জামা-প্যান্ট-অন্তর্বাস খুলে নগ্ন হয়ে গেল পুরোপুরি।

কমলিনী তাকিয়ে দেখল, আদিম পৃথিবীর দুই মানব-মানবী এক উৎসবমুখর সন্ধ্যায় প্রস্তুত হয়েছে গোপনীয়তা পাঠে পারস্পরিক অংশগ্রহণে।

অঘোর কমলিনীর স্তনে মুখ রাখল। কমলিনী দেখল, ওর বহুদিনের সুরক্ষিত বাঁধ ভেঙে গিয়ে বন্যার জল ঢুকতে শুরু করেছে মহল্লায়। দক্ষ ক্রীড়াবিদের মতো কমলিনীর শরীরটা নিয়ে খেলতে লাগল অঘোর। ধীরে ধীরে ও নেমে এল নাভিমূলে। সেখান থেকে আরও নীচে।

কমলিনী দেখল, সুরক্ষিত উপত্যকায় আজ বর্গি হানা দিয়েছে। তার আসুরিক শক্তির কাছে লড়াই চালানো বৃথা। কমলিনী চেষ্টাও করল না কোনও বাধা দেওয়ার। আবেগে আর আন্দোলনে, আরামে আর আবেশে, ভালোলাগা আর হারিয়ে যাওয়ার নেশায় দু'চোখে জল চলে এল কমলিনীর।

রমনক্লান্ত দুই নারী-পুরুষ একটিই শরীর হয়ে শুয়ে রইল ফাঁকা মাঠে। আশ্বিনের মেঘহীন সন্ধ্যা, রুপোর থালার মতো একটা বড় চাঁদ, মৃদুমন্দ বাতাস, ঝিঁঝিপোকা আর রাতচরা পাখিরা সাক্ষী রইল তাদের প্রথম শরীরী মিলনের।

ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরল ওরা। অঘোর দেখল, কমলিনীর দু'চোখে জল। ছলছল চোখেই ও বলল, ''এই বারুদ কুয়াশার উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আমাদের দু'জনেরই জীবন খুব অনিশ্চিত অঘোর। যদি তোমার কিছু হয়ে যায় কোনওদিন, কীভাবে বাঁচব আমি?''

অঘোর কমলিনীর মাথাটা নিজের কাঁধে রাখল। একহাত দিয়ে ওকে আলিঙ্গন করে বলল, ''যখন বন্দুকে একটা বুলেটও বাকি রয়েছে, সেই অবস্থায় মরে যাওয়ার চিন্তা করা সত্যিই বড় লজ্জার। সৃজনশীলতার পিছনে সবচেয়ে বড় শত্রুটি আর কেউ নয়, সে হল মানুষের ভীতি।'' একটু থেমে অঘোর আবার বলল, ''তোমাকে আমি মনের মতো করে তৈরি করেছি কমলিনী। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত তুমি। তবুও কোনও কাজ হাজার বার চেষ্টা করে না পারলেও লজ্জা পেয়ো না। জেনো, আরও আরও চেষ্টা তোমাকে সফলতার দিকে নিয়ে যাবে।''

অঘোরের কথা শুনে কমলিনী হেসে ফেলল। চোখের জল মুছে ও বলল, ''দুষ্টু ডাকাত একটা! সবকিছু কেড়েকুড়ে নিয়ে নিলে আমার। জানো করমপুজোয় কুমারী মেয়েরা কিংবা নববিবাহিতা মেয়েরা ছাড়া নাচতে পারে না! আমার কুমারীত্ব তুমি তো হরণ করে নিলে। আমি কী করব তাহলে আজ?''

অঘোর হাসল। কমলিনীর খাবারের কৌটোটা হাতে তুলে বলল, ''ঠিক আছে। আজকেই বিয়ে করছি তোমায়। চলো। রাতে ডেরায় ফিরে বউয়ের হাতে বানানো এই রুটি-মাংসটা খেয়ে উদযাপন করব।''

কমলিনী অঘোরের কথা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ল। দু'জনে উঠে পড়ল মাঠ থেকে।

কিছুক্ষণ হাঁটার পর কমলিনী কথা বলল। সামান্য গম্ভীর শোনাল ওর গলা, ''বিয়ে মানে প্রত্যাশার মৃত্যু অঘোর। ভালবাসার মায়া শুধুমাত্র বিয়ের মাধ্যমেই কাটানো সম্ভব। আমরা পরস্পরকে ভালবাসি, এটাও যেমন সত্যি, একইভাবে আমাদের ওপর সমাজের অনেক প্রত্যাশা। সূর্যদার চোখের মণি তুমি। জঙ্গলমহলের অসহায় মানুষগুলোর জীবনে আশার আলো কে ফোটাবে আমরা ছাড়া? তাই এখনই নিজেদের সম্পর্কের কথা ভেবো না। সামনের লড়াইটা দীর্ঘ। এ লড়াই অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই।''

কথা বলতে বলতেই ওরা চলে এসেছিল ফুলাকেন্দুর অশ্বত্থ তলার কাছে। এখানে হ্যাজাক, মোমবাতি, লণ্ঠনে দিনের আলোর মতো লাগছে সবকিছু। বেশ কিছু বাদাম-জিলিপির দোকান বসেছে। মেয়েদের স্নো, শ্যাম্পু-পাউডার, মাথার ক্লিপের দোকান রয়েছে। কয়েকটা দোকান থেকে উঁকি দিচ্ছে মাদুর, শীতলপাটি, হাতপাখা।

অঘোর কমলিনীর হাতটা ছুঁয়ে বলল, ''আজ আমি আসি কমলিনী। কাল আবার দেখা হবে। খুব আনন্দ করো আজ।''

কমলিনী মাথা নাড়তেই অঘোর ধীরে ধীরে হেঁটে ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ঠিক সেই সময়ই ভিড় থেকে বেরিয়ে এল পাঁচজন মহিলা। সকলের মাথায় বুনোফুল গোঁজা। চোখে মোটা করে কাজল লাগানো। পরনে লালপাড় সাদা শাড়ি। গলায় নানাবিধ পুঁথির মালা। হাতের মাঝখান অবধি কাচের চুড়ি।

একজন ওকে দেখে গান গেয়ে উঠল, ''আর ভাদরে আদর বিটি/ আশ্বিনে বিদায় লো/ যাবে যাবে যাবে বিটি/ যাবে শ্বশুর ঘর লো!''

আর একজন ওর গায়ে পড়ে জানতে চাইল, ''হ্যাঁ লো, তোর নাম কী রে বিটি?''

থতমত খেয়ে গেল কমলিনী। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিছু একটা জানান দিল ওকে। ও পিছন দিকে হাঁটতে লাগল। দ্রুত পালাতে চাইল জায়গাটা ছেড়ে, কিন্তু পারল না। পাঁচজন তাগড়াই মহিলা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল ওকে।

একজন ওর কানের কাছে হিসহিসে গলায় বলল, ''কমলিনী সরেন। কুখ্যাত মাওবাদী নেত্রী। বহু খুনখারাপি করেছিস। এবারে শ্বশুর ঘর চল মাগী। ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট!''

রাজ্য পুলিশ আর কোবরা বাহিনীর সারি সারি জিপগুলো যখন ফুলাকেন্দু থেকে যাত্রা শুরু করল, মীরকাশিম একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হাতে জিলিপি নিয়ে বিড়বিড় করছিল, ''যে-মেয়ের মনে যত বেশি প্যাঁচ, তার জিলিপি তত প্যাঁচালো! খাও-খাও। রসেভরা জিলিপি খাও।''

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%