কমলেশ কুমার
''কমরেডস, আমাদের প্রকৃত লড়াই শুরু হল এবার। এতদিন যা করেছ, সবটাই শ্যাডো প্র্যাকটিস, এবার সত্যিকারের ম্যাচ। চার-ছয়ের বন্যা বইয়ে দিতে না পারলে শুধু যে নিজেদের অস্তিত্বের বিলোপ হবে তাই নয়, জঙ্গলমহলের এই অভিশাপ দূর করা যাবে না কোনওদিনই।'' মুথুকুমারন আজ যথেষ্ট গম্ভীর। তাকে হাসতে খুব কমই দেখা যায়। আজ ভুরুর কাছটাও কুঁচকে আছে তার। মারাংবুরু ক্লাবের পিছনের ঘরটাতে সকলে জমায়েত হয়েছে ওরা। দুপুর দেড়টা বাজছে এখন। এখটা ডাহুক পাশের কাঁটাবন থেকে ডেকেই চলেছে একটানা। টিনের চালছাওয়া ঘরে রোদের তাপটা গনগনে আগুনের মতো নেমে আসছে। সেদিকে বিশেষ নজর নেই কারোরই। বিপদ দরজায় কড়া নাড়লে কোন গৃহস্থই বা নিশ্চিন্ত মনে চমচম খেতে পারে!
ঘর্মাক্ত মুখটা নিজের গামছা দিয়ে মুছতে মুছতে মুথুকুমারন বলল, ''সহদেব, কী খবর আছে তোমার কাছে?''
সহদেব পকেট থেকে চার ইঞ্চি সাইজের একটা ডায়েরি বের করল। তারপর মুথুকুমারনের দিকে তাকিয়ে বলল, ''পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলে মোট বিয়াল্লিশ কোম্পানি সিআরপিএফ পাঠিয়েছে কেন্দ্র। তাদের বেশিরভাগই কোবরা বাহিনীর কমান্ডো। যাদের কাছে রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। গতকাল বিকেলে পশ্চিম মেদিনীপুরে কুড়ি কোম্পানি ফোর্স ইতিমধ্যেই চলে এসেছে। তারা বিভিন্ন ব্লক ধরে ধরে পজিশন নিয়ে নেবে আগামী দু'একদিনের মধ্যে। পুরুলিয়ায় পনেরো কোম্পানি, আর বাঁকুড়ায় সাত কোম্পানি ছড়িয়ে দেওয়া হবে আজ-কাল করেই। আমার কাছে যতটুকু খবর রয়েছে সূর্যদা, রাজ্য সরকার নাকি বারবার কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার জন্য কেন্দ্রকে চাপ দিচ্ছিল। আগে থেকে রাজ্যে সংবেদনশীল এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দিয়েছে রাজ্য পুলিশের কর্তারা। আমাদের জেলাকে ইতিমধ্যেই সংবেদনশীল জেলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিআরপিএফকে বাড়তি নজর দিতে বলা হয়েছে লালগড়, বিনপুর, বেলপাহাড়ি, শালবনি, আর গোপীবল্লভপুরে। আমাদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য লালগড় আর বেলপাহাড়িকে বিশেষ নজরে রাখা হচ্ছে। ওড়িশা-বর্ডারের কারণে নজরে রাখা হচ্ছে গোপীবল্লভপুরকেও।''
মুথুকুমারন হাত তুলে থামতে বলল সহদেবকে। নিজে কিছু চিন্তা করল খানিক। তারপর স্বগতোক্তির মতো করে বলল, ''বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক এবং কার্তুজের ভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে আমাদের। আর্মস বাড়াতে হবে আরও। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের জোগান বাড়াতে হবে।'' কথাটা বলতে বলতে অঘোরের দিকে তাকিয়ে মুথুকুমারন জিজ্ঞাসা করল, ''আমাদের হাতে এখন কত কেজি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট আছে অঘোর?''
কালবিলম্ব না করে অঘোর বলল, ''দুশো কেজির কাছাকাছি।''
ধমকের সুরে মুথুকুমারন বলল, ''কাছাকাছি, মোটামুটি এসব শব্দ আমি শুনতে পছন্দ করি না অঘোর। সঠিক ফিগার বলো।''
ও কিন্তু-কিন্তু করছে দেখে মুথাকুমারন বলল, ''বিকেলের মধ্যে অবশ্যই জানিও।''
চেয়ারে একটা পায়ের উপর আর একটা পা তুলে হাতলের উপর ডানহাতটা রেখে ও আবার বলল, ''শুধু অস্ত্রশস্ত্র আমদানি করলেই হবে না, বন্দুকের ব্যারেল, গ্রেনেড-কভার আর প্রচুর ইলেকট্রিক তার স্টকে রাখতে হবে। বড়সড় নাশকতা না করতে পারলে রাজ্য আর কেন্দ্রের শিক্ষা হবে না।''
ধানি কিস্কু, খগেন মাহাতোরা এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল মুথুকুমারনের কথা। ভ্যাপসা গরমে সিদ্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। জানলাহীন ঘরে কোথাও দিয়ে এতটুকু হাওয়া আসার উপায় নেই, তবুও জঙ্গল থেকে ভেসে আসা দমকা বাতাস দরজা দিয়ে মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ে একটু স্বস্তি দিচ্ছে ওদের।
ধানি কিস্কু হতভম্বের মতো বলল, ''এতকিছুর জোগান আমরা পাব কীভাবে?''
মুথুকুমারনের বাঁদিকের ঠোঁটটা ঈষৎ হাসি হাসি হল, ''তার ব্যবস্থা করতে হবে আমাদেরই।'' সামান্য চিন্তা করে ও আবার বলল, ''উপায় অবশ্য আরও একটা আছে।''
''কী উপায়?'' আবেন, সহদেব, দুলাল একসঙ্গে প্রশ্নটা করল।
মুথুকুমারনের মুখটা আবারও একটু হাসি হাসি হয়ে উঠল, ''দু'চারদিন আগে কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সিআরপিএফ কনভয়ের ওপর হামলা চালিয়েছিল জৈশ—ই—মহম্মদের জঙ্গিরা। নিহত হয়েছিল বিয়াল্লিশজন জওয়ান।''
সকলে সমস্বরে বলল, ''জানি। জানি।''
মুথুকুমারন না থেমে বলে চলল, ''গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে পুলওয়ামা হামলার মতো ফের জম্ম-কাশ্মীরে হামলার ছক কষছে জৈশ জঙ্গিরা। এ বিষয়ে কাশ্মীরের তিন পুলিস-প্রশাসনকে সতর্ক করেছে গোয়েন্দারা। আগামী দু'দিনের মধ্যে চৌকিবাল আর সিমপাবানি জেলার তাংধার রুটে আইডি বিস্ফোরণ করার পরিকল্পনা করছে। এই হামলাটিও ফিঁদায়ে বা আত্মঘাতী জঙ্গিকে দিয়েই করানো হবে। তার জন্য সবুজ রঙের স্করপিওকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই সন্ত্রাসী হামলার জন্য কাশ্মীরের স্থানীয় যুবকদের তৈরি করছে জৈশ-ই-মহম্মদ। পাঁচ থেকে ছ'জন জঙ্গি কাশ্মীরে নাশকতা ঘটানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। শুধুমাত্র জৈশ প্রধানের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে তারা। গোয়েন্দারা জৈশের বিভিন্ন রিপোর্ট খতিয়ে দেখে বেশ কিছু তথ্য পেয়েছে। দেখা গেছে বেশ কিছু কিলোগ্রামের খেলনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। গোয়েন্দারা ওই সাংকেতিক বার্তা খতিয়ে দেখে বুঝতে পেরেছে যে, খেলনার অর্থ বিস্ফোরক এবং হামলার জন্য প্রায় পাঁচশো কিলোগ্রাম বিস্ফোরক প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছে বার্তায়।''
অঘোরের দিকে তাকিয়ে মুথুকুমারন আবার বলল, ''তোমাকে বিস্ফোরকের কথা জিজ্ঞাসা করলাম না! ওই কারণেই। শোনো ভাই, একশো-দেড়শো কেজি বিস্ফোরক দিয়ে শুধু কুত্তা তাড়ানো হবে। জঙ্গলমহলের লাটসাহেবদের তাড়াতে গেলে হাজার-হাজার কেজি বিস্ফোরক প্রস্তুত রাখতে হবে।''
গলায় জড়ানো গামছাটা দিয়ে মুখটা পুনরায় মুছে নিল মুথুকুমারন। তারপর খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, ''গোয়েন্দা সূত্রে জানা যাচ্ছে, সেনারা যদি কাশ্মীরিদের ওপর অত্যাচার বন্ধ না করে তবে এই হামলা চলতে থাকবে। জৈশ লিখেছে, 'এই লড়াইটি হল তোমার আর আমার। এসো, যুদ্ধ করো। আমরা প্রস্তুত। এটা সবে শুরু হয়েছে, এখনও অনেক কিছু বাকি।' সুতরাং বুঝতে পারছো আশা করি, আমি কী বলতে চাইছি? দ্যাখো, জৈশের নীতির সঙ্গে আমাদের নীতি কোনওদিনই মিলবে না। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে দেখতে পাবে, ওদের আর আমাদের লড়াইটা কোথাও গিয়ে এক। সেই মাটির লড়াই। অত্যাচারিতদের রুখে দাঁড়ানোর লড়াই। তাই প্রয়োজনে আমি জৈশেরও সমর্থন নেব। সেক্ষেত্রে অস্ত্রশস্ত্র-গোলাবারুদের বিপুল ভাণ্ডার গড়ে তুলতে পারব আমরা।''
মুথুকুমারন না-থেমে বলে চলল, ''মাওবাদীদের শক্তি সম্পর্কে সরকারের সঠিক ধারণা নেই। সত্তরের দশকে নকশাল আন্দোলন আর আজকের মাওবাদী আন্দোলনের শক্তির মধ্যে ব্যবধান আকাশ-পাতাল। ২০০৪ সালে নকশালদের তিনটি শাখা একত্রিত হবার পর আমাদের শক্তি কোথায় পৌঁছেছে তা সরকার পক্ষ জানে না। এখন কুড়ি হাজার প্রশিক্ষিত যুবক-যুবতী রয়েছে আমাদের, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত গেরিলা বাহিনী তারা। আমাদের পেছনে আছে সমর্থক বাহিনী। এখন মাওবাদীদের স্রেফ আইনশৃঙ্খলা সমস্যা বলে হালকা ভাবে নেওয়া মারাত্মক ভুল হবে সরকারের।''
মুথুকুমারনকে মাঝপথে থামিয়ে সহদেব মুর্মু বলল, ''সম্ভবত সরকার সেই ভুলটা করেনি বলেই বিয়াল্লিশ কোম্পানি প্যারামিলিটারি পাঠাল সূর্যদা।''
''জানি। এটাও জানি যে, মাওবাদী সহিংসতার মোকাবিলায় কেন্দ্র ও রাজ্য দীর্ঘমেয়াদী এক স্ট্র্যাটিজি নিতে চলেছে। কেউ কেউ মনে করছে, রাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়াতে হবে। নিরাপত্তা কর্মীর সংখ্যা কম বলে কেন্দ্রীয় সংরক্ষিত পুলিশ বাহিনী, সিআরপিএফ, নিজেদের এবং সাধারণ নাগরিকদের বাঁচাতে আত্মরক্ষামূলক কৌশল নিচ্ছে। সেসব কথা শুনে আমার বেশ মজাই লাগে। বাহিনী যত হাবুডুবু খাবে, আমাদের তত লাভ।''
মুথুকুমারনের কথা শুনে সকলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
''তবে আমি মনে করি সিআরপিএফের ট্রেনিং পদ্ধতিতেও গলদ আছে। বিশেষত অঞ্চল-নির্ভর গেরিলা যুদ্ধ কৌশলে তারা অপারগ।'' সহদেব বলল।
খগেন মাহাতো বলল, ''আবার এটাও দেখা যাচ্ছে, নাগাল্যান্ড-মণিপুরের মতো জঙ্গি উপদ্রুত রাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাতে নিরাপত্তা কর্মীর সংখ্যা যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও আশানুরূপ ফল পাচ্ছে না কেন্দ্র। সুতরাং কী হলে যে কী হবে, বলা মুশকিল। তাই আমাদের উচিত নির্ভয়ে কাজ করে যাওয়া।''
ওদের কথা শুনে সন্তুষ্ট হল মুথুকুমারন, ''ছত্তিশগড়ের রাজনন্দনগাঁও জেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকদিন আগে অন্তত সাতজন মাওবাদীর মৃত্যু হয়েছে। মহারাষ্ট্র সীমান্তের শেরপার ও সীতাগোটা এলাকার মধ্যবর্তী জঙ্গলে গুলির লড়াইয়ে বেশ কিছু পুলিশ আর মাওবাদী মারা গেল। এ সপ্তাহেই ছত্তিশগড়ের বস্তার জেলায় সংঘর্ষে মারা গেছে অন্তত সাতজন মাওবাদী। এদের মধ্যে তিনজন মহিলাও রয়েছে। এসব দেখে কি আমরা পিছিয়ে আসব তাহলে?''
এতক্ষণ বাধ্য ছাত্রীর মতো সবার কথা শুনছিল কমলিনী। মুথুকুমারনের শেষ কথাটা শুনে ও আর চুপ থাকতে না-পেরে বলল, ''ডলার-ইউরো উপার্জন করে লোকজনকে ছেঁড়া লাল কাঁথার স্বপ্ন বেচার কারবারিদের চিহ্নিত করছি আমরা, কোটি কোটি টাকা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স করা আর সব কাজে বাধা দেওয়া এনজিওদের চিনে রাখছি আমরা। ভারতের সব শ্রেণিশত্রুদের দাগিয়ে খতম করে দিন সূর্যদা। যারা এই খতমকে সমর্থন করবে তারা আমাদের শ্রেণি। যারা বিরোধিতা করবে তারা শ্রেণিশত্রু। প্রয়োজনে তাদেরও খতম করে দেব।''
মুথুকুমারন দেখল, কমলিনীর দু'চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। এই অগ্নিকুণ্ডের সংস্পর্শে এলে যে-কোনও শ্রেণিশত্রু যে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, তা বেশ বুঝতে পারছে মুথুকুমারন।
কমলিনী আবার বলল, ''নকশাল বা সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা যাদের আদর্শ, তারা শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখে, সমাজতন্ত্র যাদের আগ্রহের বিষয় নকশাল আন্দোলন তাদের কাছে আরাধ্য। আমরা জানি শ্রেণিশত্রু কারা।''
কথাটা বলে হঠাৎই চুপ করে গেল কমলিনী। কী যেন একটা মনে পড়ে যাওয়াতে সঙ্কুচিত হয়ে গেল ও। ওর মনে পড়ল নকশাল আন্দোলনের একটা মূল শর্ত। আজকের মতোই রোমাঞ্চকর ঘটনার খবর প্রকাশিত হত তখনও। ইতিহাস পড়ে সেসব জেনেছে কমলিনী। সুন্দরবনে নকশালের নেতৃত্বে দারুণ সব সশস্ত্র সংগ্রাম চলছে তখন, খবর প্রকাশিত হত গেরিলা দল গঠনের, ক'দিনের মধ্যে একটি ছেলে তেমনি একটা গেরিলা ইউনিটের সদস্য হতে চলেছে। সে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসত একটি মেয়েকে। কিন্তু তার কাছে তখন বিপ্লবটাই প্রাধান্য পেয়েছিল। সুকান্ত ভট্টাচার্যের 'প্রিয়তমাসু' কবিতাটা অনুপ্রাণিত করত তাদের। তাদের কাছে জীবন-যৌবন, স্মৃতি, ভালোবাসা সবকিছু মিথ্যা ছিল, শুধু কৃষকের সমর্থনে বিপ্লবটুকু ছিল সত্যি। নকশালরা মনে করত, প্রেম একটা বুর্জোয়া ভাববিলাস, বিপ্লবীদের কাছে যা অবশ্য বর্জনীয়।
এখানেই দোটানায় পড়ে যায় কমলিনী, তবে কি ও বিপ্লবের উপযুক্ত নয়? যে আগুনের আঁচে নিজেকে পোড়ালে স্বপ্নাবিষ্ট হওয়া যায়, এগিয়ে যাওয়া যায় এক সুঠাম ভবিষ্যতের দিকে, সেখান থেকে কি পশ্চাদপসরণ ঘটছে ওর!
কমলিনী দেখল সূর্যদা আবার বলতে শুরু করেছে, ''চারু মজুমদার বলে গেছেন, ভারতবর্ষের বিপ্লবী জনতা কমিউনিস্ট আন্দোলনে বারবার সংগ্রাম করেছেন, অসীম আত্মত্যাগ স্বীকার করেছেন, জীবন দিয়েছেন। পুন্নাপ্রা ভায়ালার বীর শহীদরা, তেলেঙ্গানার বীর সংগ্রামীরা, ভারতের প্রতিটি প্রদেশের শ্রমিক ও কৃষক সংগ্রামীরা বহু জীবন দান করে যে ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন সেই ঐতিহ্য বহন করে নিয়ে যেতে হবে আমাদের, আমরা তারই উত্তরসাধক। যে কমিউনিস্ট পার্টির নাম করে কায়ুরের বীরেরা ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন, সেই কমিউনিস্ট পার্টিরই প্রতিনিধি আমরা, সেই মহান ঐতিহ্যকে বহন করার জন্যই আজ আমাদের প্রয়োজন সেই মহান অভিজ্ঞতার সারসঙ্কলন করা এবং ভুল চিন্তাগুলির বিরুদ্ধে তীব্রতম শ্রেণিঘৃণার সৃষ্টি করা। কমরেডস, মনে রেখো, ভারতবর্ষে কৃষক জনতা বারবার সংগ্রাম করেছে, বহু ত্যাগ স্বীকার করেছে, বহু শহীদের দেশ এই ভারতবর্ষ। ভারতবর্ষের বিপ্লবী কৃষককে, দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষককে শ্রদ্ধা করতে শেখো; তাদের ওপর ভরসা রাখলে কোনওদিন পথের ভুল হবে না।''
ঘরে উপস্থিত সকলে লক্ষ করল মুথুকুমারনের গলা দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি ঝরে পড়ছে, ''দুশো বছরের পরাধীন ও শোষিত ভারতবর্ষে ছাত্র ও যুবকরাই হচ্ছেন শিক্ষিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। সাম্রাজ্যবাদী শোষণ জনগণকে ব্যাপকভাবে অশিক্ষিত ও অন্ধ করে রেখেছে। তাই বিপ্লবী আন্দোলনে এই শিক্ষিত সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শতসহস্র শহীদ আজ আহ্বান জানাচ্ছেন তাঁদের কাছে, আজ দিন এসেছে এই রক্তের ঋণ শোধ করবার, দিন এসেছে সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল শোষকশ্রেণিকে ধ্বংস করার।'' একটু থেমে মুথুকুমারন আবার বলল, ''জীবনে চলার পথে বাধা আসতেই পারে, তাই বলে থেমে যাওয়ার কোনও অবকাশ নেই, যেখানে বাধা আসবে সেখান থেকেই আবার শুরু করতে হবে আমাদের। যে জাতি তার বাচ্চাদের বিড়ালের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়, তারা সিংহের সঙ্গে লড়াই করা কীভাবে শিখবে? তাই আমাদের হাঁটাচলা হবে সিংহের মতো। শুধু গর্জন করা নয়, শ্রেণিশত্রুর টুঁটি ছিঁড়ে ধুলোয় মিশিয়ে দেব তার মাথা। অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গে আমাদের অধিকারের লড়াই চলছে চলবে!''
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল মুথুকুমারন। ওকে দেখে সকলেই উঠে দাঁড়াল। মুথুকুমারন পুনরায় বলল, ''প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প উড়িয়ে দেব আমরা। এমএলএ সুজয় সরেনের মতো পুলিশের চামচা আর আমাদের শ্রেণিশত্রুদের খুব তাড়াতাড়ি নিকেশ করতে হবে। আজ রাতে কোর কমিটির মিটিং ডাকছি আমি। সামনে শুধুই এগিয়ে যাওয়ার দিন। সকলে সমস্বরে বলো, মাওবাদ জিন্দাবাদ!''
ঘরে উপস্থিত সকলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দু'হাত তুলে চিৎকার করে বলে উঠল, ''মাওবাদ জিন্দাবাদ!''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন