কমলেশ কুমার
মাথার উপরে সূর্যটা তার প্রবল বিক্রম দেখাতে ব্যস্ত এখন। আগুনের লেলিহান শিখা যেন মাথার ঘিলু পর্যন্ত শুকিয়ে দিতে চাইছে। ভবেশের চায়ের দোকান প্রায় শুনশান। আর এই মাঝদুপুরে কেই বা চা খেতে আসবে! সাঁকরাইল থানার ঠিক পাশেই ভবেশের চায়ের দোকান। পুলিশবাবুরা মাঝেমধ্যেই চায়ের অর্ডার করে বলে দুপুর পর্যন্ত দোকান খুলে রাখে ভবেশ। তারপর ঝাঁপ বন্ধ করে দুপুরে বাড়ি যায় ও। চান-খাওয়া সেরে বিকেল-বিকেল আবার এসে দোকান খোলে।
ঝাড়গ্রামের এই এলাকাটা বেশ নির্জন। সাঁকরাইল থানাটা তো ভবেশের যমপুরী বলে মনে হয়। পুরনো, রংচটা একটা বৈশিষ্ট্যহীন বাড়ি, বাড়িটার সামনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া চারটে গাড়ি, পুলিশের দুটো জলপাই রঙের জিপ দাঁড় করানো। দু'জন কনস্টেবল দরজার সামনে বসে বসে বেশিরভাগ সময়ই যে ঝিমোয়, সেটা নিজের চোখে দেখেছে ভবেশ।
ছত্তিশগড়ে সি আর পি এফের কোবরা বাহিনীর জওয়ান রাকেশ্বর সিং মানহাসকে অপহরণের পাঁচ দিন পর গ্রামবাসীদের সামনে মুক্তি দিয়েছে মাওবাদীরা। বিজাপুরের ওই মাওবাদী হামলায় নিহত হয় বাইশ জন সি আর পি এফ জওয়ান, অপহরণ করা হয় রাকেশ্বরকে।
ভবেশ শুনেছে, এই এলাকাতেও নাকি মাওবাদী কার্যকলাপ বাড়ছে। সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় গ্রামের সব মানুষ একজোট হচ্ছে। আর এটা খুব সত্যি কথা, পানীয় জল, রাস্তা, বিদ্যুৎ এসবের চাহিদা মানুষের দীর্ঘদিনের। এই জমানায় মানুষ দুটো খেয়েপরেই বাঁচতে পারছে না তো, রাস্তাঘাট! শাসক দলের ওপর মানুষের ক্রোধ যে উত্তরোত্তর বাড়ছে, সেটা বেশ বুঝতে পারে ভবেশ।
ওর চায়ের দোকান হওয়ার সুবাদে বহু মানুষের নিত্য আনাগোনা এখানে। তাদের মুখেই ও কানাঘুষো শুনেছে, পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার বাছাই করা কিছু থানাতেও নাকি হামলা চালাতে পারে মাওবাদীরা।
খুব ছোট থেকে ভবেশ দেখেছে, রাজ্যের শাসক দল একের পর এক ভোটে জিতে নিজেদের লাটসাহেব ভেবে ফেলেছে। মারাত্মক এক স্বৈরাচারী মনোভাব তৈরি হয়েছে তাদের। বিভিন্ন কলকারখানায় শুধু ইউনিয়নবাজি করে, আর মালিক পক্ষের থেকে গোপনে টাকা খেয়ে লকআউট করে প্রত্যেকটা শিল্পের সর্বনাশ করেছে। শুধু নোংরা রাজনীতি, ভাইয়ে-ভাইয়ে বিরোধ লাগানো, বিপক্ষ শিবিরের লোকেদের চমকানো-ধমকানো এসবই শুধু করে গেছে ওরা। এই কারণেই গরিব মানুষগুলো রুখে দাঁড়িয়েছে এতদিন বাদে।
ভবেশ শুনেছে, অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে নাকি একজন লোক এসেছে, যে নিয়মিত সব মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছে, তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, একটা সংগঠন তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
ভবেশের মনে পড়ে, বেশ কিছুদিন আগের কথা। তখন সদ্য বাবা মারা গিয়েছে ওর। কাজকর্ম মিটলে একদিন পঞ্চায়েতে গেল ও। ওয়ারিশন সার্টিফিকেট তুলতে। প্রথম দিন ফিরিয়ে দিল পঞ্চায়েত থেকে। কেন, না সেদিন প্রধান আসেনি। দ্বিতীয় দিন আবার গেল ও। প্রধান বলল, গ্রাম সদস্যের সই করে আনলেই শুধু হবে না, তিন-চারজন সাক্ষীকেও সই করাতে হবে। তারপরের দিন ভবেশ গেল সদস্যের বাড়ি। দেখা হল না। আরও চারদিন পরপর গিয়ে দেখা হল সদস্যের সঙ্গে। সদস্য আবার পঞ্চাশ টাকা চেয়ে বসল সই দেওয়ার মজুরি বাবদ।
রাগে গা রি-রি করে উঠেছিল ভবেশের। সদ্য বাবা মারা যাওয়ার শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি তখনও ও। সেইসময় ওরকম পঞ্চায়েতের হয়রানি ওর সহ্য হয়নি। রাগটা মনে মনে এখনও রয়েই গিয়েছে ওর।
মুখের উপর সেদিন পঞ্চাশ টাকা ছুড়ে দিয়ে সইটা নিয়ে এসে পরের দিন সার্টিফিকেট তুলতে পেরেছিল ভবেশ।
এইসব সাত সতেরো ভাবতে-ভাবতেই দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করতে যাচ্ছিল ও। হঠাৎ মারাত্মক এক ঝড় উঠল। ধুলোর ঝড়। ভবেশ অবাক হয়ে লক্ষ করল, একটার পর একটা বাইক ঝড়ের গতিতে এসে থেমে যাচ্ছে সাঁকরাইল থানার সামনে। বাইকে আরোহী বাদ দিয়ে কোনওটাই দুটো, কোনওটাই একটা করে লোক রয়েছে। পিছনে বসা লোকগুলোর হাতে রয়েছে ভয়ঙ্কর সব আগ্নেয়াস্ত্র। ভবেশ এত বড়-বড় বন্দুক জীবনে কোনওদিন দেখেনি। ওর পঞ্চাশ বছর বয়স হতে চলল, এমন অভিজ্ঞতা আগে কোনওদিন হয়নি ওর।
ভবেশ এই ক'দিন কাগজে পড়ছিল বিজাপুরে মাওবাদী হামলার কথা। সি আর পি এফ জওয়ানদের গাড়ি ঘিরে ধরে ব্যাপক হামলা চালায় তারা।
কিন্তু এরা কারা! এরা কি সকলেই মাওবাদী? প্রায় প্রত্যেকের মুখ ঢাকা রয়েছে গামছা দিয়ে। আর সকলের হাতে রয়েছে বড় বড় রাইফেল। কাউকেই তো চেনা ঠেকছে না ওর। প্রথমে বাইকগুলো গুণছিল ভবেশ, একটা-দুটো করে যখন ও পনেরোতে পৌঁছে গেল, আতঙ্কে জড়সড় হয়ে ও গুণতেও ভুলে গেল।
সবকটা বাইক থানার সামনে দাঁড় করাল ওরা। প্রায় নিঃশব্দে ঢুকে পড়ল থানার ভিতরে। দু'তিন মিনিটের একটা বিরতি, তারপর শুরু হল গোলাগুলির লড়াই।
ভবেশ চরম আতঙ্কিত হয়ে দোকানের ঝাঁপ ফেলে ভিতরে ঢুকে গেল। দোকানের ডান দিকে দেওয়ালের গায়ে একটা ছোট্ট জানলা রয়েছে। তার সামনে একটা টেবিলের উপরে অনেকগুলো বয়ামে কেক, বিস্কুট, লজেন্স রাখা। ভবেশ নিজের হৃৎপিণ্ডের ধকধক আওয়াজ পাচ্ছে এখন।
কাঁপা-কাঁপা হাতে ও টেবিলটা সরিয়ে দিল একটু, তারপর জানলাটা অর্ধেক বন্ধ করে দিয়ে চোখ রাখল থানার দিকে।
বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে না কিছুই। শুধু গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। রোদের তাপ প্রচণ্ড। সূর্যের তাপে আর ধুলোর ঝড়ে গোটা চৌহদ্দিটা কেমন যেন ধোঁয়া-ধোঁয়া লাগছে এখন। নাকে এসে লাগছিল বারুদের বিশ্রী কটু গন্ধ। ভবেশের দমবন্ধ হয়ে আসছিল।
বিস্ফারিত চোখে ও দেখল, বলাই নামে কনস্টেবলটাকে টানতে টানতে বের করে আনছে মুখঢাকা তিনটে লোক। রাস্তার উপর ছুড়ে ফেলে দিল বলাইকে। তারপর একজন হাতে ধরা বন্দুকটা ওর বুকের দিকে তাক করল। কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তিন-চার সেকেন্ডের মধ্যে বলাইকে ঝাঁঝরা করে দিল ওরা। একজন লোক পকেট থেকে বের করে নিয়ে এল ভাঁজ করে রাখা বেশ কিছু পোস্টার। সেগুলো বলাইয়ের মাথা আর পায়ের নিচে রেখে দিল লোকটা।
ভবেশ দেখল, বলাইয়ের শরীরটা কাটা মুরগির মতো প্রথমে কেঁপে-কেঁপে উঠল কিছুক্ষণ, তারপর তিরতির করতে করতে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে গেল।
বলাই নিস্তেজ হয়ে পড়তেই ভিতর থেকে আরও চারজন বেরিয়ে এল। অবাক চোখে ভবেশ দেখল, থানার মেজবাবু রতন হাওলাদার সঙ্গে রয়েছে ওদের। রতনবাবু সকাল-বিকেল মিলিয়ে খান পনেরোবার চা খান ভবেশের কাছে। দারুণ খাতির ওর সঙ্গে। মেজবাবুকে ওরা রাস্তার মাঝখানে হাঁটুমুড়ে বসাল। কিছু বলতে যাচ্ছিলেন বোধহয় মেজবাবু, একটা লোক সজোরে চড় মারল মেজবাবুর গালে। তারপর একজন মেজবাবুর মুখটা সাদাকাপড় জড়িয়ে দিল। ওরকম অবস্থাতেই বসে রইলেন মেজবাবু। একজন লোক থানার ভিতর থেকে বিদ্যুৎগতিতে বেরিয়ে এল। তার হাতে ধরা রয়েছে একটা বিশাল চকচকে টাঙ্গি। সেটার সজোরে কোপ বসিয়ে দিল মেজবাবুর ঘাড় লক্ষ করে।
আর তাকিয়ে থাকতে পারল না ভবেশ। বসে পড়ল ওর দোকানের মেঝের উপরে। তারপর হাঁফাতে লাগল প্রচণ্ড। কেমন যেন গা'টা গুলিয়ে গুলিয়ে উঠছে। গোটা শরীর ভিজে গিয়েছে ঘামে। বমি-বমি ভাবটা কাটছে না কোনওমতে। ওই অবস্থাতেই ভবেশ বসে রইল প্রায় মিনিট পাঁচেক। থানার ভিতরে পুলিশ কী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, ও জানে না। পুলিশও কেন এনকাউন্টার করছে না, কিংবা সত্যিই করছে কিনা, এখানে বসে সেটা জানাও প্রায় অসম্ভব।
কিছুটা সময় ওইভাবেই কেটে গেল ভবেশের। রক্ত সকলের শরীরেই আছে, তবুও সামনা সামনি রক্ত দেখলে বোধহয় মানুষের নরকযন্ত্রণা উঠে আসে। মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে যাওয়ার একটা অনুভূতি এনে দিতে রক্ত অনুঘটকের মতো কাজ করে।
বাইরে প্রবল বেগে বাইকগুলো চলতে শুরু করল আবার। ধোঁয়া আর ধুলোয় ভর্তি হয়ে গেল চারপাশ। কম্পমান পায়ে উঠে দাঁড়াল ভবেশ। জানলা দিয়ে পুনরায় চোখ রাখল ও। দেখল, কনস্টেবল আর মেজবাবুর শরীরদুটো ওভাবেই পড়ে রয়েছে রাস্তায়। লাল কালিতে লেখা অসংখ্য কাগজের পোস্টার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ওদের পাশে।
'মাওবাদ জিন্দাবাদ' ধ্বনি দিতে দিতে যেভাবে বাইকগুলো এসেছিল, সেভাবেই চলে যেতে লাগল। প্রতিটা বাইকে বন্দুক উঁচিয়ে বসে রয়েছে পিছনের লোকগুলো।
ভবেশ ভাবল, এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য এভাবেই শেষ হল বোধহয়, কিন্তু ওকে ভুল প্রমাণ করে থানা থেকে বেরিয়ে এল আরও একটা দল। মুখঢাকা মোটাসোটা একটা লোককে ধরে-ধরে বের করে আনল তারা। লোকটার পরনে খাকি রঙের পোশাক দেখে তাকে চিনতে পারল ভবেশ। সাঁকরাইল থানার ও সি যতীন দত্ত।
বুকটা কেঁপে উঠল ভবেশের। তাহলে যতীনবাবুকেও কি ওরা এভাবেই খুন করবে! এভাবেই কি তাহলে গোটা একটা থানার সব অফিসার-কর্মীদের প্রাণে মেরে উল্লাস করবে ওরা?
দমবন্ধ করা সেই দৃশ্যের মধ্যে স্নায়ু শক্ত রাখতে চেষ্টা করল ভবেশ। ও দেখল, একজন বাইকের উপরে বসে স্টার্ট দিল বাইকে। পিছনে একজন যতীনবাবুকে নিয়ে সেই বাইকে উঠে বসল। ভবেশ বুঝল বিজাপুরে হামলার মতোই এখানেও মাওবাদীরা একজনকে অপহরণ করে নিজেদের কাছে রেখে দিতে চাইছে। পণবন্দির সুবিধা অনেক। কাল থেকেই হয়তো সরকারের সঙ্গে দর কষাকষি শুরু করবে ওরা। নিশ্চিতভাবেই কোনও কিছুর বিনিময়ে ওরা হয়তো যতীনবাবুকে ছাড়বে, দাবিদাওয়া না মেটাতে পারলে খতম করে দেওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়। সরকারপক্ষ কি পারবে যতীনবাবুর প্রাণের বিনিময়ে কোনও কিছুর সঙ্গে আপস করতে! এটা সত্যিই অজানা ভবেশের। ভবেশ দেখল যতীনবাবাবুকে পিছন থেকে জাপটে ধরে রইল একজন। তারপর বাইকটা স্টার্ট দেওয়া হল। ভবেশের বোধহয় অবাক হওয়ার আরও বাকি ছিল। কারণ, ও খুব ভাল করে নিরীক্ষণ করে বুঝতে পারল, এই বাইক আরোহী কিন্তু পুরুষ নয়, মহিলা। জলপাই রঙের সালোয়ার কামিজ পরে মুখঢাকা ছিল বলে বোধহয় বুঝতে পারেনি এতক্ষণ। খুব বেশি বয়স নয় সম্ভবত মেয়েটার।
'মাওবাদ জিন্দাবাদ!' ধ্বনিতে ঢাকা পড়ে গেল চারপাশ।
ভবেশ দেখল সাঁকরাইল থানার সামনে আর একটাও বাইক রইল না। গোটা এলাকাটাকে নিস্তব্ধ করে দিয়ে বাইকগুলো কেশিয়াপোতার মোড় থেকে গুপ্তমণি হয়ে পশ্চিম দিকে চলে যেতে লাগল। খুব সম্ভবত বম্বে রোড ধরে ওরা ঝাড়গ্রামের দিকে চলে যাবে এবার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন