কমলেশ কুমার
লোধাশুলি জঙ্গলের ভিতরে ভিতরে অনেকগুলো গ্রাম বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে আছে। নেকড়াবিন্ধা,জামুয়া, পেনেয়াভাঙ্গা, পূর্নাডিহি গ্রামগুলো ম্যাপের বাইরে থাকা অনাবিষ্কৃত এক-একটা উপত্যকা যেন। দূরবর্তী দ্বীপে মানুষ তাও ইচ্ছে হলে পৌঁছাতে পারে, কিন্তু অনাবিষ্কৃত কোনও চরে কীভাবে পৌঁছাবে মানুষ! তাই এখানে পর্যটক কিংবা পুলিশ-প্রশাসনের পদধূলি পড়ে না। কোবরা বাহিনী আসার পর থেকে ছবিটা একটু বদলেছে। হঠাৎ-হঠাৎ দলবেঁধে তারা দামাল হাতির মতো ঢুকে পড়ে তছনছ করে যাচ্ছে গোটা গ্রাম।
এসব জুলুমবাজি আটকাতে, আর কয়েকজন মাওবাদী সহকর্মীর রহস্যমৃত্যু ঘিরে দানা-বাঁধা সন্দেহের নিরসন করতে আজ মুথুকুমারন একটা বৈঠক ডেকেছে জামুয়া গ্রামের শেষপ্রান্তে। শুধু এই দুটো কারণেই নয় অবশ্য, আরও গভীর একটা কারণ রয়েছে ওদের একত্রিত হওয়ার।
জামুয়া গ্রামটার আদি থেকে অন্ত সবটাই জঙ্গল। যেখানে জঙ্গল আরও গভীর হচ্ছে, সেখানেই রয়েছে বহুদিন আগের একটা পোড়ো মন্দির। ছাদ ধ্বসে গিয়েছে তার। ইটের পাঁজরগুলো শুধু সময়ের সঙ্গে লড়াই করে এখনও টিকে রয়েছে কয়েকটা। এখন গভীর রাত। তাই সাপখোপে ঘেরা মন্দিরের দিকে ডেরা বাঁধেনি ওরা। একটু পাশে ছোট্ট একফালি ফাঁকা জমিতে বসেছে সকলে। মুথুকুমারন একটা চেয়ার নিয়ে বসেছে। চেয়ারটা আনা হয়েছে জামুয়ার দশরথ সর্দারের বাড়ি থেকে। গোটা পাঁচেক মোমবাতি আর একটা হ্যারিকেন থেকে যেটুকু আলো আসে, তাই দিয়ে অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে।
''সহজ কথাটা এবার খুব পরিষ্কার করেই বলি।'' বলতে শুরু করল মুথুকুমারন, ''রাজ্য প্রশাসন আর কোবরা যেভাবে অত্যাচার শুরু করেছে, আমাদের হাতগুটিয়ে বসে থাকার সময় আর নেই। দুটো পরিকল্পনা ভেবে রেখেছি আমি। তোমাদের সেগুলো সফল করতে হবে। ইতিমধ্যেই আমাদের অ্যাকশন স্কোয়াড খোকা সৎপতির মতো জালি মানুষকে মার্ডার করে উচিত শিক্ষা দিয়েছে। এই অভিযান চলতেই থাকবে। অন্যদিকে আমাদের আরও বড় স্বার্থের কথা ভেবে দুটো কঠিন কাজের দায়িত্ব নিতে হবে। কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। মাওবাদের অভিধানে অসম্ভব শব্দটা নেই। যাইহোক, এখন দুটো পরিকল্পনা মন দিয়ে শোনো। শিলদায় ই এফ আর ক্যাম্প হয়েছে। কিছুদিন যাবৎ ওখানে বাহিনীকে রেখেছে রাজ্য সরকার। আমাদের সশস্ত্র স্কোয়াড হামলা চালাবে শিলদা ক্যাম্পে। ওদের দুরমুশ করে বেরিয়ে আসতে হবে। কী? পারবে না!''
মুথুকুমারন কথাটা বলে সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে সবার অভিব্যক্তিটা বোঝার চেষ্টা করল।
এতবড় একটা আহ্বানের জন্য বোধহয় প্রস্তুত ছিল না সকলে, হঠাৎ একটা ধাক্কা লাগলে যেমন হয়, মানুষ কী বলবে কথা খুঁজে পায় না, সেরকমই চুপ করে রইল সকলে। শুধু অঘোর হেমব্রম বলল, ''পারব সূর্যদা। তুমি বিস্তারিত বলো কী করতে হবে।''
মুথুকুমারন বলল, ''সাবাশ! এই তো চাই বেটা। প্রথম কাজ হবে আমাদের একশো জন বাছাইকরা ছেলেমেয়ে নিয়ে একটা বাহিনী তৈরি করা। তাদের নিয়মিত ট্রেনিং করাবে তোমার মতো আর্মড-ট্রেনাররা। সময় বেশি নিলে হবে না। আমি চাই দিন কুড়ির মধ্যেই হামলাটা চালাতে।''
একটু থেমে মুথুকুমারন আবার বলল, ''ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল, মানে তোমরা যাকে ই এফ আর বলো, তাদের ব্যাটেলিয়ান যে কতটা নোংরা তোমরা শুনলে অবাক হবে। হয়তো খবরটা জানো অনেকেই। গত পরশু ভোরের দিকে বছর আঠাশের এক যুবতীর চিৎকার শুনে আশপাশের আবাসনের লোকজন ছুটে আসে। আসে কর্মরত জওয়ানরাও। তারপর বয়স্ক এক অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ডারের ঘর থেকে যুবতীকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। ওই যুবতী জানিয়েছে, বাবার চাকরি চলে যাবে বলে ভয় দেখিয়ে তাকে ডেকেছিল ই এফ আরের ওই আধিকারিক। তার নিরাপত্তায় থাকা রাইফেলম্যান দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে যুবতীকে নিয়ে আসা হয়। তারপর জোর করে তাকে মদ্যপানে বাধ্য করায় ওই আধিকারিক। যুবতী বেহুঁশ হয়ে পড়লে তাকে ধর্ষণ করা হয়। ওদের প্রতিটা জওয়ান মদ্যপ। তারা যে-চোখে মেয়েদের দিকে তাকায়, তা বলার নয়। আমাদের এদিকের কোবরা বাহিনীও তাই। মদ ওদের প্রিয় পানীয়। ওটা ছাড়া রাতে ঘুমোয় না ওরা। অথচ ওদের হাতেই জঙ্গলমহলের ভার। যদিও ওই যুবতীর কথা শুনে বিভাগীয় তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওসবের জন্য আমাদের অপেক্ষা থাকবে না। পরিকল্পনা প্রস্তুত করছি। তোমরা বাহিনী তৈরি রাখো। শিলদা ক্যাম্পের ভিতরের ছবিটা কিছুদিন ধরে স্টাডি করতে হবে তোমাদের। ক্যাম্পটা খুব ঘিঞ্জি জায়গায়। আবেন গতকাল গিয়ে দেখে এসেছে। ক্যাম্পটার পাশে দোকানপাট, স্বাস্থ্যকেন্দ্র সবই রয়েছে। আমাদের যেটা করতে হবে, ঢোকা-বেরোনোর রাস্তাগুলোর ডিটেলসটা সংগ্রহ করা। ক্যাম্পের ভেতরকার কাজকর্ম, দিনে-রাতের পুরো রুটিন এগুলো সম্পূর্ণ জোগাড় করতে হবে। খবর নিয়ে জেনেছি, মোহিনী নামে একটা মেয়ে ওদের প্রতিদিন সকালে দুধ-ছানা দিতে যায়। কানাই আর লক্ষ্মী নামে দু'জন স্বামী-স্ত্রী রাতদিন রান্না করে ওদের। আমার প্ল্যান অনুযায়ী আগে ওদের সঙ্গে একটা রফা করে নিতে হবে। ভেতরকার সব খবর ওরা পাচার করবে আমাদের। পরশু থেকেই যদি কাজে লেগে যায় ওরা, দিন পনেরো ধরে সব তথ্য আমরা পেতে পারি। সেটা অ্যানালিসিস করে আমি হামলার ছক তৈরি করব। হামলার দু'দিন আগে থেকে রেকি করতে হবে। তবে প্রাথমিকভাবে ভেবেছি, ক্যাম্পে ঢুকেই এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে হবে তোমাদের। তাঁবু করে থাকা জওয়ানদের ক্যাম্পের ভিতর ঘিরে ধরে প্রত্যেককে মার্ডার করার পর বাইরে থেকে আগুন লাগিয়ে দিতে হবে। এটা খুব সত্যি কথা যে, ওরাও হাতগুটিয়ে বসে থাকবে না। ওরাও নিশ্চয়ই এনকাউন্টার করবে। আমাদের যদি বাহিনীতে একশো জন থাকে, দু'চারটে আমাদেরও মারা যাবে। যে-কোনও মৃত্যুই দুঃখের। কিন্তু মাটি বাঁচানোর এই লড়াইয়ে তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ শহীদ হতে কি খুব আপত্তি করবে?''
''না সূর্যদা।'' সম্মিলিতভাবে সকলে বলে উঠল।
মুথুকুমারন দেখল, উদ্দীপনার অন্ত নেই ওদের। সকলের চোখমুখের ভাষাই বলে দিচ্ছে কাজটা ওরা একশোভাগ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করতে পারবে। নতুন দিন আসছে সামনে। শোষকের কালো হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে ওরা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে জঙ্গলমহলের মাটিতে।
মুথুকুমারন বলল, ''সবকটা জওয়ানকে খতম করলে একটা উপরি-পাওনা হবে আমাদের। আমরা যদি লুটপাট চালাতে পারি, তাহলে বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্র আমরা আমাদের অধিকারে নিয়ে আসতে পারব। যার মধ্যে এস এল আর, ইনস্যাস, নাইন এমএম পিস্তল ছাড়াও প্রচুর কার্বাইন পাব আমরা। যেগুলো আমাদের সংগঠনের জন্য আগামী দিনে কাজে লাগবে। মনে রেখো কমরেডস, অন্যের আচরণের জন্য নিজের অভ্যন্তরীণ শান্তি নষ্ট না হতে দেওয়াই উচিত। কোবরা বাহিনীর জওয়ানরা আমাদের অসহায় গ্রামবাসীদের উপর অত্যাচার যেমন চালাচ্ছে, তার পাল্টা আমরাও দেওয়ার জন্য প্রস্তুত এখন। বীরের পরীক্ষা হয় যুদ্ধের ময়দানে, আর বন্ধুর পরীক্ষা হয় বিপদের সময়। সুতরাং সকলে সকলের দুর্দিনে পাশে থেকে যুদ্ধের ময়দানে জয়লাভ করে এসো এটুকুই চাইব।''
অঘোর বলল, ''এবার দ্বিতীয় প্রস্তাবটা বলো সূর্যদা।''
''বলছি। এটা এখনও শেষ হয়নি। প্রথম প্রশ্ন হল, আমাদের বাহিনীতে একশো জন সদস্য থাকলে সকলকেই অস্ত্র রাখতে হবে সঙ্গে। সুতরাং বিপুল একটা অস্ত্রের জোগান দরকার আমাদের। এত অস্ত্র আমরা পাব কোথা থেকে? এবিষয়ে আমার সঙ্গে জৈশ-ই-মহম্মদের মুখপাত্র রবিউল আল হিলালের কথা হয়েছে। ওরা জানিয়েছে, জৈশ জঙ্গিরা সক্রিয় হয়ে উঠে জঙ্গি কার্যকলাপের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছে। ভারতে আক্রমণ চালাতে চাইছে ওরা। এখন তিরিশ জনের একটা জঙ্গি টিম তৈরি করেছে জৈশ। যেখানে তাদের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে ভারতে অনুপ্রবেশ করে হামলা করার জন্য। আফগানিস্তানে থাকা জৈশ জঙ্গিদের এখানে নিয়ে আসা হচ্ছে গোটা পরিকল্পনাটিকে বাস্তবায়িত করার জন্য। কাশ্মীরে হামলা চালাতে তালিবানদের সাহায্য চেয়েছে জৈশ। জম্মু-কাশ্মীর-সহ সীমান্তবর্তী একাধিক এলাকায় ঢুকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটানো ও নানা ধরনের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের জন্য জোরদার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। কোন পথে ভারতে ঢোকা যাবে, কোন পথে গেলে বিপদের আশঙ্কা কম সেসবই জঙ্গিদের শেখানো হচ্ছে। ওরা যদি অত বড় পরিসরে ভাবতে পারে, আমরাও পারব না কেন? সড়কপথে আমাদের কাছে কয়েকশো কুইন্টাল বারুদ, আর কয়েক হাজার আগ্নেয়াস্ত্র পাঠাচ্ছে তারা। এসে যাবে কয়েক দিনের মধ্যেই। আমরা নিশ্চয়ই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।''
একটু থেমে একটা তালপাতার পাখা হাতে তুলে নিল মুথুকুমারন। বাতাস ভারী হয়ে আছে। গাছের পাতাগুলো পর্যন্ত নড়ছে না আজ। পাখায় হাওয়া খেতে খেতে মুথুকুমারন বলল, ''দ্বিতীয় প্রসঙ্গে আসি। আমরা এমএলএ সুজয় সরেনের ওপর অ্যাটাক করতে জয়ন্ত সর্দার আর খগেন মাহাতোকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু অদ্ভুতভাবে পুলিশি উপস্থিতি ছাড়াই দু'জনকেই কেউ বা কারা লুকিয়ে গুলি চালায়। এটা বড্ড রহস্য আমার কাছে। আবেনকে দায়িত্ব দিলাম, সত্যিকারের খুনিকে ধরার জন্য। যে-কায়দায় ওদের দু'জনকে মারা হয়েছে, সেই একইভাবে ওদেরও ঝাঁঝরা করে দিয়ে আসতে হবে।''
আবেন হাঁসদা বলল, ''সূর্যদা, সেদিন সুজয় সরেনের মিটিংয়ে আমাদের একজন প্রতিনিধি হাজির ছিল। বেলু মাহাতো। আমার কথাতেই ও শ্রোতা সেজে চেয়ারে বসে ছিল। চারপাশের সবকিছু লক্ষ করার ভার ছিল ওর ওপর।''
দুলাল হেমব্রম বলল, ''বেলু মাহাতো আজ তো এখানে উপস্থিত রয়েছে। ও নিজের মুখেই বলুক না সেদিনের সব ঘটনাটার কথা!''
বেলু মহাতো প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সবটুকু বর্ণনা দিল। এমএলএ সুজয় সরেনের আসা থেকে মঞ্চে গিয়ে বসা পর্যন্ত। মাওবাদী বিরোধী কথাবার্তা বলে কেমনভাবে সে জনগণকে একত্রিত করার প্রয়াস চালাচ্ছিল, সেটাও বাদ দিল না। তারপর বাইক নিয়ে জয়ন্ত সর্দার আর খগেন মাহাতো যখন এল, তাদের দেখে এমএলএর অভিব্যক্তির কথাটা বলতেও ভুলল না। ওরা এমএলএর দিকে গুলি চালাতে গিয়ে কেমনভাবে ওদের দু'জনের দিকেই ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে এল, তারও পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করল।
এই জায়গায় এসে ওকে থামাল মুথুকুমারন, বলল, ''এরকম ঘটনা এবারেই প্রথম নয়। পুলিশের এনকাউন্টার ছাড়াও সন্দেহজনকভাবে মারা গেছে আমাদের আর এক দায়িত্বশীল কমরেড জগদীশ কিস্কু। ওর মাথার পিছনদিকে তিনবার ফায়ার করা হয়। সেই ক্ষত আমার এখনও শুকোয়নি। কারণ ছাড়া কীভাবে মারা যাচ্ছে আমাদের ছেলেরা? যেখানে বাহিনীর কোনও জওয়ান উপস্থিত নেই, পুলিশের লোক নেই চারিদিকে, কারা মারছে তবে ওদের! নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকে কেউ নয়!'' একটু উত্তেজিত শোনাল মুথুকুমারনের গলা, আবেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ''খোঁজখবর করো। ভাল করে খোঁজ লাগাও। সেদিন ওখানে আর কে উপস্থিত ছিল! আচ্ছা বেলু, একটু ভাল করে মনে করার চেষ্টা করো তো, কোনও সন্দেহজনক ব্যক্তিকে দেখোনি তো সেদিন ওখানে!''
বেলু মাহাতো মাথা চুলকাল, চোখ পিটপিট করল। দুটো ঠোঁট জিভ দিয়ে চেটে নিয়ে বলল, ''না সূর্যদা। চোখে পড়ার মতো তো কেউ ছিল না ওখানে!''
দুলাল হেমব্রম ঝাঁঝিয়ে উঠল, ''গুলিগুলো কি তাহলে হাওয়ায় ভেসে ভেসে এল? ওরকম এলোপাথাড়ি গুলি চলল দু'জনের উপর, আর তুমি বলছ কিছুই দেখোনি!''
বেলু বলল, ''আবেন আমাকে একটা সময় পরে চলে আসতে বলেছিল। যে-মুহূর্তে গোলাগুলি চলতে শুরু করে, লোকে ভয়ে যে যেদিকে পারে ছুট লাগায়। আমার বাইকটা জঙ্গলের মধ্যে রাখা ছিল। আমি বেশ কিছুটা ছুটে এসে বাইকে স্টার্ট দিই।''
মুথুকুমারন ওর বক্তব্যে খুশি হল না বোঝা গেল। ডানহাতের তর্জনী দিয়ে কপালে দু'বার টোকা দিয়ে বলল, ''ভাল করে ভাবো তো, সম্পূর্ণ অচেনা কাউকে দেখতে পেয়েছিলে কিনা!''
''দর্শকদের মধ্যে বিভিন্ন গ্রাম থেকে কিছুজন এসেছিল...''
''আন্দাজ কতজন হবে?''
''খুব বেশি ছিল না সূর্যদা। ওই পঁচিশ-তিরিশ জন!''
''তাদের সকলকে চেনো তুমি?''
''হ্যাঁ। মুখচেনা তো সকলেই। ধানশোলের লোকই বেশি ছিল। তবে, পিন্ড্রাশোল, করকেটা, ভোন্ডুডিহি থেকেও কয়েকজন এসেছিল।''
''গ্রামবাসীদের ভিড়ে মিশে পুলিশের লোক ছিল না তুমি নিশ্চিত?''
''হ্যাঁ সূর্যদা। আমি নিশ্চিত। সেদিন ওখানে পুলিশের লোক কেউ ছিল না।''
''কোনও রিক্সাওলা, বাদামওলা, লজেন্সওলা, বা এই ধরনের কেউ ঘুরঘুর করছিল?''
বেলু মাহাতো পুনরায় মাথা চুলকে বলল, ''না তো সূর্যদা!''
অন্ধকারের গাঢ়ত্ব বাড়ছে চারপাশে। আবেন হাঁসদা দেখল, মুথুকুমারন গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। এসময় ওদের চুপচাপ থাকার নির্দেশ দেওয়া আছে।
অঘোর মোমবাতিগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখল, ওগুলোও প্রায় শেষের দিকে। খানিক্ষণ পরেই ওগুলো নিভে যাবে। তারপর আরও অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে চারিদিকে। গাছের পাতাগুলো নিথর। গুমোট একটা গরমে দমবন্ধ হয়ে আসছে। বাইরের লোকের কাছে জঙ্গল যতই সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ হোক না কেন, ওদের একঘেয়েই লাগে কখনও কখনও। আবার এটাও ঠিক, জঙ্গলই ওদের আশ্রয়দাতা।
এই নিঃসাড় নীরবতার মধ্যেই জামুয়ার দিক থেকে মাদলের শব্দ ভেসে এল হঠাৎ। প্রথমে ধীরে ধীরে, তারপর উচ্চস্বরে। এত গভীর রাতে মাদল বাজার কথা নয়। মুহূর্তের মধ্যে সচকিত হয়ে উঠল সকলে। কোবরা বাহিনী বা রাজ্য পুলিশ তার মানে হানা দিয়েছে জঙ্গলে। গ্রামবাসীরা সাবধান করছে ওদের। ক্ষিপ্র বাঘের মতো ওরা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। মুথুকুমারন পা দিয়ে দ্রুত নিভিয়ে দিল সব মোমবাতিগুলো। তারপর কালবিলম্ব না করে নিঃশব্দে গভীরতর জঙ্গলের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল ওরা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন