কমলেশ কুমার
চারু মজুমদার মাও-সে-তুং-য়ের অনুগামী ছিলেন। তিনি মনে করতেন ভারতের কৃষক এবং গরিব মানুষদের মাও-সে-তুং-য়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে শ্রেণি-শত্রুদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করা প্রয়োজন। তার কারণ, তারাই সর্বহারা কৃষক শ্রমিকদের শোষণ করে। তিনি নকশালবাড়ি আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার লেখনীর মাধ্যমে। তার বিখ্যাত আট দলিল নকশাল মতাদর্শের ভিত্তি রচনা করে।
এসব তথ্য কমলিনীর জানার কথা নয়। তবুও ও জানে কারণ, সহদেবদা ওদের নিয়মিত ক্লাস নেয়।
সহদেবদা বলে, ''একটি অযৌক্তিক পৃথিবী হজম করে নেওয়া যায় শুধু বই কাছে থাকলে।''
সহদেবদা গরিব মানুষের অধিকার রক্ষায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়। প্রচুর পড়াশোনা ওর। কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে ওর নিত্য যাতায়াত।
সহদেবদা আরও বলে, ''বই আমাদের শেখায় কীভাবে জীবনযাপন করা যায়। কীভাবে মুক্ত হওয়া যায়, কীভাবে কম ভয় পেতে হয়, আর কীভাবে প্রশান্তি অর্জন করতে হয়।''
নুড়িশোলের আদিবাসী পাড়ার মারাংবুরু ক্লাবের পিছনে জঙ্গলে ঘেরা ঘরটার মধ্যে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে প্রতিদিন ক্লাস নেয় সহদেবদা। ইতিহাস আর জীবন সংগ্রামের গল্প শোনায় ও। ক্লাস নিতে নিতে সহদেবদার চোখদুটো কখনও আগুনের মতো গনগন করে ওঠে, কখনও কখনও ব্যথায় কাতর হয়ে ভরে ওঠে জলে।
সহদেবদার মুখেই কমলিনী শুনেছে, নকশাল শব্দটা এসেছে পশ্চিমবঙ্গের একটা ছোট্টগ্রাম 'নকশালবাড়ি' থেকে। বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী যে কোনওদিনই বিপ্লবের পথে এগোবে না এটা পার্টির অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন সময় আলোচিত ও বিতর্কিত হয়ে আসছিল। দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় নিয়ন্ত্রক নেতৃত্বের পরিষ্কার বার্তা ছিল, 'এই সমাজব্যবস্থার মধ্যেও মানুষকে উপকার দেওয়া সম্ভব'।
এর বিরুদ্ধ চিন্তাধারা তখন থেকেই সক্রিয় ছিল, যারা মনে করত বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন না করলে, মানুষকে কোনও স্থায়ী উপকার দেওয়া সম্ভব নয়।
সহদেবদা বলেছে, ১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলনের কথা। পুলিশের গুলিতে বহু প্রাণ বলিদানের কথা। যেভাবে এতগুলো প্রাণের বিনিময়ে একশো গ্রাম গম আর পঞ্চাশ গ্রাম চালের পরিবর্তে আন্দোলনটিকে নষ্ট করে দেওয়া হল তাদের কথাও। কাজেই নকশালবাড়ির কৃষক বিদ্রোহ ওই বিরুদ্ধ চিন্তার ধারাবাহিক ফল। তাই এই আন্দোলনটাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে নিষেধ করেছে সহদেবদা। প্রকৃতপক্ষে, নকশালবাড়ির ঘটনা দলের ওই মানসিকতার বিরুদ্ধে যে প্রথম সদর্থক আন্দোলন, সেটাও জলের মতো বুঝিয়ে দিয়েছে ও।
একদিনই শুধু মুথুকুমারন এসেছিল কমলিনীদের ক্লাসে। ধানি কিস্কু, আবেন হাঁসদা, লক্ষ্মীরতন মাহাত, কমলিনী সরেন তখন এক মনে সহদেব মুর্মূর কথা শুনছিল। বাইরে ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন। ঝড়ের দাপটে হ্যারিকেনটাও নিভু-নিভু হয়ে আসছিল। হঠাৎ বন্ধ দরজায় সাতবার টোকা দিতেই ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়েছিল সহদেবদা। গলা নামিয়ে দু'ঠোঁটের মাঝখান দিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, সূর্যদা এসেছে। চুপচাপ থাকিস তোরা। ওর বক্তব্যটা মন দিয়ে শুনিস সকলে।
কথাটা বলে দরজাটা খুলে দিয়েছিল সহদেবদা। কমলিনী দেখেছিল ছিপছিপে গড়নের বেশ লম্বা একজন মানুষ মুখটা গামছা দিয়ে ঢেকে ঘরে ঢুকল। তার কাঁধে ঝুলছে একটা এ কে-৪৭। প্রায়ান্ধকার ঘরে কেউই সেদিন মুথুকুমারনের মুখটা দেখতে পায়নি, বা বলা ভাল, দেখার চেষ্টাও করেনি। তবে সকলে তার ভাঙা ভাঙা বাংলা, ওড়িয়া, আর সাঁওতালি ভাষায় মেশানো বক্তব্যটা দারুণ মনোযোগ দিয়ে শুনেছিল।
মুথুকুমারন বলেছিল, ''আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভারতে একটা কমিউনিস্ট প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। যে-গণতন্ত্র মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, সে-গণতন্ত্র এই দেশে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না।''
কমলিনী দেখেছিল, কথাটা বলার সময় মুথুকুমারনের সারা শরীরটা কেমন তিরতির করে কাঁপছিল। বাইরে ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল সেদিন। টিনের ছাদ আর দেওয়ালের মাঝখানে বাঁশের কাঠামোর ভিতর দিয়ে আলো এসে পড়ছিল মুথুকুমারনের শরীরে।
মুখঢাকা অবস্থাতেই সে আবার বলেছিল, ''তোমরা জানো মাওবাদীদের প্রতি স্থানীয় জনগণের সমর্থন আছে বলেই আমরা এত বছর ধরে টিকে আছি। মাওবাদীদের সশস্ত্র বাহিনীতে কতজন যোদ্ধা আছে তা সঠিকভাবে না বলতে পারলেও ধরে নাও কুড়ি হাজার আর্মড ক্যাডার নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে দেশে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য।''
কথাটা বলে থেমেছিল মুথুকুমারন। বজ্রপাত আর বৃষ্টির মাঝখানে পড়ে তার গলাটা ভেসে যাচ্ছিল অন্ধকারাবৃত জঙ্গলে। কমলিনী চমকে-চমকে উঠছিল তার গলা শুনে।
বজ্রপাত আর অন্ধকারের একটা আলাদা ক্ষমতা আছে। বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে হয়ে চলা বজ্রপাতে যে তাপ সঞ্চারিত হয়, তা সূর্যের তাপের বহুগুণ। এর ফলে বাতাসে ভীষণ পরিমাণে কম্পনের সৃষ্টি হয়। মুথুকুমারনও সেদিন রাতের জঙ্গলমহলে মিশিয়ে দিয়েছিল বিদ্যুৎ আর স্বপ্নের এক অনবদ্য প্রবাহ। কমলিনীর বারবার মনে হচ্ছিল, মুথুকুমারন যেন নব্য ভারতের এক আদর্শ স্বপ্ন-সওদাগর।
একটু বিরতি নিয়ে মুথুকুমারন আবার বলেছিল, ''গত কয়েক বছর ধরে আমরা বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়েছে, যাতে আমরা নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বেশ ক্ষয়ক্ষতি করতে পেরেছি। চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই, ছত্তিশগড়ে আধা-সামরিক বাহিনীর একটি দলকে অ্যামবুশ করে পঁচাত্তর জন সৈন্যকে হত্যা করেছি। তিন বছর আগে ওখানেই আরেকটি অভিযানে আমরা পঞ্চান্নজন পুলিশ অফিসারকে খতম করেছিলাম।''
সহদেবদা একটা পুরনো তেবড়ে যাওয়া জলের বোতল বাড়িয়ে দিয়েছিল মুথুকুমারনের দিকে। সেই জলটুকু খেয়ে সে আবার বলেছিল, ''গত বছর আমরা লালগড়ে আমাদের কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পেরেছি। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় লালগড় এলাকাকে আমরা ভারতের প্রথম 'মুক্ত এলাকা' ঘোষণা করবই। গোটা দেশে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ না হলে আমরা আক্রমণ আরও জোরদার করব। তোমরা জানো, বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞা করেছে বিদ্রোহীরা সহিংস আন্দোলন বন্ধ করে শান্তি আলোচনা শুরু না করলে আমাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে নিক। কিন্তু আমরা শেষ হয়ে যাওয়ার আগে আমাদের রক্তাক্ত সংগ্রাম দিয়ে এই দেশকে ধনতন্ত্রবাদী হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে যাব।''
কমলিনী দেখেছিল, প্রতিজ্ঞায় আর কঠোরতায়, আবেগে আর চঞ্চলতায় কেঁপে কেঁপে উঠছিল মুথুকুমারন।
সেদিনের ক্লাস শেষের পার্টিমিটিংয়েই ঠিক হয়েছিল, সরকারের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের সুবিধাভোগী শ্রেণিটাকেও শেষ করে দিতে হবে। যে বা যারা অবহেলিত দরিদ্র মানুষদের নিয়ে কায়েমী স্বার্থের খেলা খেলছে, এক এক করে তাদের বুকে আর মাথায় বিঁধিয়ে দিতে হবে তিনটে করে বুলেট। চোখের বদলে চোখ, হাতের বদলে হাত, গুলির পরিবর্তে গুলি এই হবে তাদের সংগ্রামের আগামীদিনের রূপরেখা, বলেছিল মুথুকুমারন।
সেই মতো পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল অনেক। সাঁকরাইল থানা আক্রমণ সেই অনেক পরিকল্পনারই একটি ফলাফল।
গেরিলা যুদ্ধের সারকথা শিখতে হয়েছে কমলিনীকে। জঙ্গলের মতো প্রবল প্রতিকূল অঞ্চলে প্রয়োজনে ঘাপটি মেরে থেকে বাহিনীর মোকাবিলা কীভাবে করতে হবে তা অত্যন্ত কঠিন প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে শিখে নিতে হচ্ছে ওকে। গুলি চালানো কিংবা দেশি-বিদেশি অস্ত্রশস্ত্রের তালিম নেওয়ার পাশাপাশি ওকে শেখানো হচ্ছে বিস্ফোরক খুঁজে বের করা কিংবা জঙ্গলে কঠিন সময়ে টিকে থাকার কৌশল। সেই সঙ্গে রণকৌশল কীভাবে ছকতে হবে, শেখানো হচ্ছে তাও। সব মিলিয়ে শারীরিক সক্ষমতার চূড়ান্ত অবস্থায় থাকার পাশাপাশি মানসিক ভাবেও ওকে শক্তিশালী থাকতে হচ্ছে।
গেরিলা যুদ্ধের তালিম দেওয়ার জন্য সহদেবদা একটা ছেলেকে এনেছে সম্প্রতি। ওর নাম অঘোর হেমব্রম। অঘোর কমলিনীর চেয়ে বয়সে খুব সামান্যই বড়, কিন্তু কথায়-বার্তায়-চালচলনে এবং পেশাদারিত্বে তুখোড়। অস্ত্রচালনাবিদ্যায় মারাত্মক পারদর্শী ও। ক্ষিপ্রতায় নেকড়েকেও ছাপিয়ে যাবে বোধহয়। ও-ই হাতেধরে শেখাচ্ছে কমলিনীকে। ধানি কিস্কু প্রাথমিক জ্ঞানটুকু দিয়ে দিয়েছিল আগেই। কিন্তু কমলিনী বুঝেছে, যেকোনও কিছু শেখাটাই প্রবাহিণী নদীর মতো। প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে অজস্র বাঁকবদল আসবে তার শরীরে। কমলিনীরও এসেছে।
সাঁকরাইল থানা অপরেশনের মূল দায়িত্ব সহদেবদা কমলিনীকে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ওকে বৃত্তের মতো আগলে ছিল অঘোর। সেদিন পুরো ঘটনাটার জন্য ওরা পনেরো মিনিট বরাদ্দ রেখেছিল। যদিও বারো মিনিট সাতচল্লিশ সেকেন্ডের মাথায় সবকিছু তছনছ করে দিয়ে ওসিকে নিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল ওরা।
এই একমাসে কমলিনীকে শুধু বাইক নয়, ভারী যানবাহন চালানও শিখতে হয়েছে। ট্রাক, কিংবা লরি, বাস কিংবা বাইক ওর হাতের জাদুতে কথা বলে এখন।
ওদের ক্লাসরুমেই সাঁকরাইল থানার ওসি যতীন দত্তকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। গত কাল বিকেলে যখন থেকে তাকে এনে রাখা হয়েছে, তারপর থেকে সে দাঁতে কুটোটিও কাটেনি। কাল সহদেবদার নির্দেশে লক্ষ্মীরতন, শিবু আর জগদীশ সারারাত পাহারা দিয়েছে অফিসারকে। আজ সকালে জগদীশকে একটা জরুরি কাজে গোপীবল্লভপুর পাঠিয়েছে সহদেবদা। এবেলাটা কমলিনীকেই সামলাতে হবে। মুখ ঢেকে রাখাটা ওদের কাজকর্মের প্রধান শর্ত। সেভাবেই ওরা তিন-চারজন ঘোরাঘুরি করছে। অফিসার তক্তার উপর চোখ বন্ধ করে শুয়ে রয়েছে। তার হাতদুটো কাল রাতে খুলে দেওয়া হলেও পা দুটো বাঁধাই রয়েছে এখনও।
অহেতুক খেজুরে-আলাপ কমলিনীর পছন্দ নয়, তবুও ওসিকে খাওয়ানোটা ওদের উচিত কর্তব্যের মধ্যে পড়ে বলে খুব নিচু গলায় ও বলল, ''স্যার, একটু চা আর ডিমটোস্ট দিই, খেয়ে নিন!''
কমলিনীর গলার আওয়াজে যতীন দত্ত চোখ মেলে তাকালেন। খুব নিস্পৃহ গলায় জবাব দিলেন, ''আপনাদের ওপর মহলের কথাবার্তা এগোলো? আমাকে কবে ছাড়া হবে শুনতে পাচ্ছেন কিছু?''
কমলিনী গলায় উদাসীনতা ফুটিয়ে বলল, ''ওসব দেখার দায়িত্ব তো আমার নয়! দলের সিনিয়ররা আছেন।''
ওসি চুপ করে রইলেন একটু। তারপর ব্যঙ্গের স্বরে বললেন, ''আপনার কী দায়িত্ব তাহলে? দলের অ্যাকশন স্কোয়াড সামলানো?''
কমলিনী মৃদু হেসে বলল, ''একদম ঠিক ধরেছেন অফিসার। আমি অ্যাকশন স্কোয়াডের সদস্য।''
অফিসার গলা নামালেন। খুব নরম স্বরে বললেন, ''তোমাকে দেখে যেটুকু বুঝছি বেশি বয়স নয় তোমার, কেন অস্ত্র তুলে নিলে হাতে? পড়াশোনা করতে পারতে! ইচ্ছে হলে চাকরি-বাকরি। নিদেনপক্ষে সংসার!''
একমুহূর্ত ভাবল কমলিনী, তারপর জবাবে বলল, ''এই ছোট্ট জীবনে হাজার ভুল করেছি আমি। হাজারবার হোঁচট খেয়েছি এবং সেটা নিয়ে আমি গর্বিত। প্রত্যেকটা ভুল, প্রত্যেকবার হোঁচট খাওয়া আমাকে গড়ে তুলেছে আরও শক্তিশালী, আরও পরিণত করে।'' একটু থেমে কমলিনী আবার বলল, ''ভাতের জন্য কোনওদিন লড়াই দেখেছেন স্যার? বাবাকে আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যেতে, মাকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে কিংবা ভাইকে খিদের জ্বালায় ছটফট করতে দেখেছেন কোনও দিন? খাবারের অভাবে পিঁপড়ের ডিম খেয়ে উল্লাস করতে দেখেছেন কোনও পরিবারকে? গাছের পাতা, শাক, ইঁদুর ঝলসানো খেয়ে দিনযাপন করতে দেখেছেন কাউকে কোনও দিন? দেখেননি। তাই আপনি সত্যিই বুঝবেন না কেন হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছি আমি।''
যতীন দত্ত দেখলেন মেয়েটার গলায় মারাত্মক ঝাঁঝ থাকলেও কোথায় যেন একটা ব্যথার ঝঙ্কার খেলা করে যাচ্ছে। ওর গলার কাছের শিরাগুলো ফুলেফুলে উঠছে কোনও অচেনা এক আবেগে। ওসি কিছু বললেন না। ধীরে ধীরে চোখটা বন্ধ করে নিলেন।
কমলিনীই বলতে লাগল আবার, ''ব্যর্থতা মানে হচ্ছে ব্যর্থতা কেন হয়েছে, কার কারণে হয়েছে সেগুলো কেউ জানতে চাইবে না। কেউ ব্যর্থ হলে তার যন্ত্রণা শুধু তাকেই একাকী সইতে হবে। জীবনে জেতাটাই নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে। হেরে যাওয়া মানে জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো। আমার বয়স বেশি না হলেও দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া গোষ্ঠীর লোক আমরা। জীবনের নিয়ন্ত্রণ হারাতে হারাতে শেষ সময়ে শুধু চেয়েছি একটু সাফল্যের মুখ দেখতে। আমাদের সাফল্য মানে দু'মুঠো ভাত। একটু রাস্তাঘাট, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ ব্যস, এটুকুই। আর কিচ্ছু না, স্যার!''
বিধ্বস্ত যতীন দত্ত আবার চোখ খুলে তাকালেন। মেয়েটার গলায় যেন একটা সম্মোহিনী শক্তি রয়েছে। এই কয়েক বছরে জঙ্গলমহলকে কাছ থেকে দেখেছেন উনি, জানেন মানুষের চাহিদার কথা। ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে বারবার লেখাও হচ্ছে সে-সব। কিন্তু সরকার কেন নজর দিচ্ছে না সে-সবে জানেন না তিনি।
যতীন দত্ত বললেন, ''রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম কখনও শান্তিময় দেশের ভিত্তিভূমি হতে পারে না।''
কমলিনী একটুও দেরি না করে জবাব দিল, ''ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রায় আট বছর ধরে স্বাধীনতা যুদ্ধ করার পর স্বাধীনতা লাভ করে আলজেরিয়া। একসময় ব্রিটিশ কলোনি হিসাবে থাকলেও, ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর-আরোপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়। টানা কয়েক বছর যুদ্ধের পর ফরাসি বাহিনী ও জর্জ ওয়াশিংটনের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা চার্লস কর্নওয়ালিস। এসব তো ইতিহাস আমাদের বলেছে ওসিসাহেব! ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন দেশ হিসাবে ঘোষণা করে বাংলাদেশ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়। এসব ছোটখাট তথ্য তো আমরা সকলেই জানি। তাই কী থেকে যে কী হবে, তা আপনিও জানেন না, আমিও জানি না!''
ওসি যতীন দত্ত মেয়েটির প্রজ্ঞা দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছিলেন। উনি খুব ভাল করেই জানেন যে, জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন হৃদয়েই থাকে প্রজ্ঞা। হৃদয় এবং অন্তর যেমন একে অন্যের থেকে আলাদা নয় তেমনি প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণতা একে অন্যের থেকে আলাদা নয়। তা রপ্ত করতে হয়। কঠোর অনুশীলন আর নির্জন সাধনা দিয়ে তা অর্জন করতে হয়।
মেয়েটার প্রতি শ্রদ্ধার উদ্রেক হয় ওসির। কিছু বলতে যাচ্ছিলেন তিনি, কিন্তু একটি ছেলে হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢুকল ঠিক তখনই। কাঁধ থেকে বন্দুকটা মাটিতে রাখতে রাখতে কমলিনীর দিকে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে সে বলল, ''জগদীশকে মার্ডার করে দিয়েছে কেউ! ওর ডেডবডিটা পড়ে রয়েছে কেন্দুগাড়ির মাঝের সাঁকোটার কাছে। সবকটা গুলি মাথাটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে।''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন