দশম অধ্যায়

কমলেশ কুমার

মাওবাদীদের এসব খামখেয়ালিপনা একদম ভাল লাগে না বীতরাগের। আজ সকাল পর্যন্ত কথা ছিল লোধাশুলির জঙ্গলে অপহৃত ওসি যতীন দত্তকে মুক্তি দেবে ওরা। সেইমতো পুলিশ পোস্টিং থেকে যাবতীয় কাজকর্ম সেরে রেখেছিল বীতরাগ। হঠাৎ কিছুক্ষণ আগে সংবাদমাধ্যমের কাছে ওরা জানিয়েছে ঝিটকার জঙ্গলের পাঁচ কিলোমিটার ভিতরে একটা পোড়ো কালীমন্দিরের সামনে কাজটা সম্পন্ন করা হবে। তার উপর একগুচ্ছ শর্ত চাপিয়েছে। পুলিশকে কালীমন্দির থেকে পাঁচশো মিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। দুলাল হেমব্রমকে কোনওভাবে হাত-পা বেঁধে কিংবা মুখ চাপা দিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না। কোনওরকম আর্মস সঙ্গে নেওয়া যাবে না। মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে না। জঙ্গলে একটার জায়গায় দুটো পুলিশভ্যান ঢোকানো যাবে না। আটজন পুলিশকর্মীর বেশি ওরা থাকতে দেবে না।

অথচ বীতরাগ নিশ্চিত যে, অসংখ্য গ্রামবাসীর ভিড়ে মাওবাদী ইনফর্মাররা ঘুরে বেড়াবে। পুলিশের সমস্ত গতিবিধি ওদের কাছে লাইভ টেলিকাস্ট করবে তারা।

মাথার ভিতরটা দপদপ করতে থাকে বীতরাগের। কিন্তু রেগে গিয়ে কোনও সমস্যার সমাধান করা যায় না। বীতরাগ খুব ভাল মতোই জানে যে, সেই প্রকৃত বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে এসিটা ষোলোয় নামিয়ে আনল ও। তারপর টেলিফোন থেকে রিসিভারটা তুলে ডায়াল করল এসপি রঞ্জন ত্রিপাঠীকে, ওপ্রান্তে এস পি সাহেব ফোন ধরতেই বীতরাগ বলল, ''স্যার, ওদের যত বীরত্ব তো বন্দুকের নলে। আপনি নিশ্চয়ই মানবেন যে, অপরাধীদের কোনও ধর্ম, বর্ণ, সামাজিক অবস্থান, কিংবা পার্টির পোর্টফোলিও হয় না। একটা জঘন্যতম অপরাধ করল ওরা। আমাদের দু'জন কর্মীকে ডিমলিশ করে বেরিয়ে গেল। একজনকে দু'দিন ধরে আটকে রেখে অজস্র টালবাহানা করল। এই বন্দুকের নল কিন্তু যে-কোনওদিন যে-কোনও মানুষের দিকে ঘুরে যেতে পারে। তাহলে তো দেশে বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রেখে কোনও লাভ নেই।''

রঞ্জন ত্রিপাঠী বীতরাগের পূর্ব ইতিহাস সবটা জানেন। কেন ওকে জঙ্গলমহলে স্পেশাল পোস্টিং দিয়ে পাঠানো হয়েছে সেটাও তিনি জানেন। উনি চাকরিজীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছেছেন। অনেক দুর্ধর্ষ অভিজ্ঞতা ওঁর ঝুলিতে। বীতরাগের বয়স কম। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনও ষড়যন্ত্র চলতে দেখলে যে-কোনও দায়িত্বশীল অফিসার ফুঁসে ওঠেন, বীতরাগও যে তার ব্যতিক্রম হবে না, সেটা খুব ভাল মতোই জানেন রঞ্জন ত্রিপাঠী। খুব শান্ত গলায় ফোনের অপর প্রান্তে তিনি বললেন, ''তুমি এনকাউন্টারের পক্ষে তো? আমি জানি সেটা। রাতের অন্ধকারে তোমার স্পেশাল টিমকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলে তুমি যে ওদের একটা বড় অংশকে তছনছ করে দিয়ে চলে আসতে পারবে, সেটা আমি খুব ভাল মতো জানি।'' একটু থেমে ত্রিপাঠী সাহেব গলাটা খাদে নামিয়ে বললেন, ''কিন্তু তারপর? তারপরের অংশটা একবার ভাবো! এই রাজ্যের একদল লোক জনস্বার্থ মামলা করবে এনকাউন্টারের বিপক্ষে। সংবাদ-মাধ্যমগুলো পুরোপুরি সরকারের বিরোধিতায় রাস্তায় নেমে যাবে। শয়ে শয়ে মানুষ নাকিকান্না কাঁদতে-কাঁদতে মানবাধিকার কমিশনে যাবে। এদেশের ফুটেজখোর বিপ্লবী-কবিরা কবিতার বন্যা বইয়ে দেবে। এনকাউন্টারের সব দিক বিচার করতে দলে-দলে আসবে বায়োলজি, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রির বিশেষজ্ঞরা। কোন পজিশন থেকে ফায়ারিং হয়েছে, কেন এলোপাথারি গুলি চালিয়েছে কোন পক্ষ, আদৌ তা প্রয়োজন ছিল কি না সেই সব তথ্য ও নমুনা সংগ্রহ করবে তারা। তারপর পুলিশের কাছে রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে। সিএম স্যার তোমাকে আর আমাকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ডেকে পাঠাবেন। শোকজ তো খাবই, সাসপেন্ড হয়ে যাওয়াও অত্যাশ্চর্য কিছু হবে না।''

বীতরাগ সামান্য একটু সময় চুপ থেকে বলল, ''আমি তখন ভারতীয় মার্কোস বাহিনীতে। ছদ্মবেশের সুবিধার জন্য আমাদের মুখ-ভর্তি দাড়ি। যে কারণে, জঙ্গিরা আমাদের দাড়িওয়ালা ফৌজি বলে ডাকত। মেরিটাইম ওয়ারফেয়ার আর অ্যাম্ফিবিয়াস অপারেশনের জন্য বিখ্যাত বলেই মার্কোসকে কাশ্মীরে উলার লেকে পাঠানো হল। ওপর মহলের মূল উদ্দেশ্য ছিল, সেখান দিয়ে কোনও জঙ্গি অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করলে যে-কোনও মূল্যে তাকে রুখে দেওয়া। তখন ছিল গ্রীষ্মকাল। পাকিস্তান হয়ে জঙ্গিরা নতুন করে অনুপ্রবেশ করা শুরু করেছে ভারতে। এর মধ্যেই দলের কাছে খবর আসে, বান্দিপোরার কাছে পুত্তুশাহি গ্রামের মধ্যে একটা বাড়িতে আত্মগোপন করে রয়েছে তিন আলকায়দা জঙ্গি। আমার তখন পোস্টিং ওখানে ছিল না, বারামুলায় ছিলাম আমি। কিন্তু, জঙ্গিদমন অভিযানের সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি ছিলাম না। টিমের সঙ্গে বান্দিপোরায় যোগ দিতে কমান্ডিং অফিসারের অনুমতি চাইলাম। তা মিলেও গেল। কালবিলম্ব না করে, পুত্তুশাহিতে পৌঁছে যাই আমরা। দেখলাম, একটা বিশাল বাড়িতে লুকিয়ে রয়েছে জঙ্গিরা। বাড়িটাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে কমান্ডো বাহিনী। আমি এবং আর একজন কমান্ডো পাশের বাড়ির ছাদে উঠি। বুঝতে পারি, কোনওভাবে অনুপ্রবেশকারীদের ওই বাড়ি থেকে টেনে বের করতে হবে। আমি ছিলাম দলের বিস্ফোরক-বিশেষজ্ঞ...''

কথাগুলো বীতরাগ কেন বলতে শুরু করল হঠাৎ, এসপি বুঝতে পেরেছেন। বহুদিনের জমানো আবেগগুলো অনেকসময় মুক্তির পথ খোঁজে। আজকের এই মারাত্মক রাজনৈতিক কচলাকচলিতে ওর যে সেই গৌরব্বজ্জ্বল সোনালি দিনগুলো মনে পড়ছে, সেটা বুঝতে পেরে ত্রিপাঠী স্যার বললেন, ''জানি। আর সেটাই আর একটা কারণ ডিপার্টমেন্টের তোমাকে এখানে পাঠানোর।'' বীতরাগকে মাঝখানে না-থামিয়ে ত্রিপাঠী স্যার বললেন, ''গো অন মাই বয়। শুনতে ভাল লাগছে।''

এসপি'র উৎসাহ পেয়ে বীতরাগ আবার বলতে শুরু করল, ''বাড়ির মধ্যে সন্দেহজনক গতিবিধি নজরে আসতেই, তা লক্ষ করে দুটো তলায় গ্রেনেড ছুড়লাম আমি। কিন্তু কোনও লাভ না হওয়ায় কমান্ডিং অফিসারের নির্দেশে একটা আরডিএক্স ডিভাইস চটজলদি তৈরি করে দিলাম। আরডিএক্স বিস্ফোরণে জঙ্গিদের বাড়িটা পুরোপুরি ধ্বসে গেল। তারপর আমরা দেখলাম এক জঙ্গির দেহ বাড়ির পিছনে একটি দেওয়ালে আটকে পড়ে রয়েছে। তবে, আরও দু'জন জঙ্গির কোনও খোঁজ পাচ্ছিলাম না তখনও। তল্লাশি অভিযান চালাতে পিছনের পাঁচফুট পাঁচিল টপকে বাড়ির চত্বরে প্রবেশ করলাম আমরা।''

''ব্র্যাভো! এ তো মারাত্মক ব্যাপার!''

''হ্যাঁ স্যার। ঠিক তাই। কিছুদূর এগোতেই আমাদের দিকে এলোপাতাড়ি গুলিবৃষ্টি শুরু করল জঙ্গিরা। প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না কোনদিক থেকে গুলি আসছে। পরে দেখলাম, একটা ছোট্ট চালাঘরে ঘাপটি মেরে রয়েছে দু'জন জঙ্গি। মাথায় তখন খুন চেপে গেছে আমার। ওদের নিকেশ করাই তখন আমার একমাত্র কাজ বুঝতে পারছিলাম। এর মধ্যেই একটি খোলা জায়গায় আটকে পড়ে আমাদের দু'জন জওয়ান। জঙ্গিরা তাদের লক্ষ করেই গুলি চালাচ্ছিল। সেই ফাঁকে পিছনের দরজা দিয়ে জঙ্গিদের দিকে এগিয়ে গেলাম আমি।''

''মার্ভেলাস এক্সপেরিয়েন্স। ডোন্ট স্টপ। ক্যারি অন বীতরাগ!''

ফোনের এপ্রান্তে অতীতের বর্ণনা দিতে দিতে সেইসব দিনগুলোতে যেন হারিয়ে যাচ্ছিল ও, আবেগে-উচ্ছ্বাসে ভরে উঠছিল বীতরাগের গলা, ''জওয়ানরা আটকে পড়েছিল। না পারছিল এগোতে, না পিছোতে। আচমকা দেখি, গুলি চালাতে চালাতে দুই জঙ্গি চালাঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। আমি দ্রুত নিজেকে সরিয়ে অন্য দিক দিয়ে ওদের ঘিরে ফেলার কৌশল নিই। আমি জঙ্গিদের থেকে মাত্র সাত মিটার দূরত্বে ছিলাম। তবুও, ওরা আমাকে দেখতে পায়নি। ওরা আটকে-পড়া ওই দু'জন জওয়ানকেই শুধুমাত্র লক্ষ করেছিল। একটা সুযোগ পেয়েই পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে জঙ্গিদের গুলি চালালাম। দুজনকেই স্যুট আউট। দু'জনেই উল্টে পড়ে গেল। কিন্তু, তখনই ঘটে যায় এমন একটা মর্মান্তিক ঘটনা, যা কখনওই কল্পনা করিনি আমি। মরার আগে এক জঙ্গি আমাদের অন্য এক কমান্ডোকে লক্ষ করে গুলি চালিয়ে দেয়। আসলে আমাকেই গুলিটা করতে চেয়েছিল। মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বোধহয় তার হাতটা টলমল হয়ে গিয়েছিল একটু। গুলি এসে লাগে আমার সেই বন্ধুর বুকের ডানদিকে। সেখানে লাগানো ছিল কয়েকটা হ্যান্ড-গ্রেনেড। গ্রেনেড বিস্ফোরণ না ঘটলেও, গুলিতে তার স্প্রিন্টার ওর সারা বুকে আর মুখে ছড়িয়ে পড়ে। শ্রীনগর সামরিক হাসপাতালে তাকে ভর্তিও করা হয়েছিল, কিন্তু বাঁচানো যায়নি স্যার।''

কথাটা বলে একটু চুপ করে রইল বীতরাগ। ফোনের অপর প্রান্তে রঞ্জন ত্রিপাঠীর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। তিনিও চুপ করে রইলেন খানিকক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ''ভাল কিছু থেকে ব্যর্থ হওয়া মানে জীবন ব্যর্থ নয় বীতরাগ। হয়তো তুমি আরও ভাল কিছুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে আছো। যে-অভিজ্ঞতা নিয়ে তুমি আমাদের ডিপার্টমেন্টে কাজ করছ, সেই অভিজ্ঞতার নিরিখে আমাদের বর্তমান কর্মকাণ্ড হয়তো তোমার কাছে ব্যর্থতাই, কিন্তু এর সুফল একদিন তুমি অবশ্যই পাবে। আমরা শুধু সামনের দিকেই এগোতে পারি, আমরা নতুন দরজা খুলতে পারি, নতুন আবিষ্কার করতে পারি, কারণ আমরা কৌতুহলী। এই কৌতুহলই তো আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা!''

এসপি স্যারের কথাটা শুনে একটু মৃদু হাসল বীতরাগ। তারপর বলল, ''বাঙালির যে-সমাজ একদিন ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদীর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে অসাম্প্রদায়িক উদার মানবিক সংস্কৃতি আর রাজনীতির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তার এই দশা কীভাবে হল? আমাদের চোখের সামনেই তো এটা ঘটল। এদের নিজস্ব কোনও রাজনৈতিক দর্শন আছে বলে আপনি মনে করেন? শুধু খুনখারাপি আর ভীতির রাজনীতি। ধর্মঘট করে করে জনজীবন স্তব্ধ করে দেওয়া ছাড়া কী করতে পেরেছে ওরা? দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের অভাব নিয়ে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তারও জবাব আমার কাছে আছে। বিরোধিতা করা ভাল, কিন্তু সব জিনিসেই বিরোধিতা করা উচিত নয়। তাতে দেশের মনোবল ভেঙে যায়। দেশের মানুষের মনে একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়।''

''মার্কসবাদীরা রাষ্ট্রকে চিরন্তন বা শাশ্বত প্রতিষ্ঠান রূপে গণ্য করেন না। সমাজে সর্বপ্রথম বিভিন্ন শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। এই বিভিন্ন শ্রেণির স্বার্থের বৈপরীত্য থাকার ফলে এদের মধ্যে দ্বন্দ্বের উদ্ভব হয়।'' একটু চিন্তা করে নিয়ে ত্রিপাঠী স্যার বলে চললেন, ''সেই সংজ্ঞাকে নিরসন করার জন্য রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়।

সমাজের শাসকশ্রেণি তাদের প্রতিপত্তির জোরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে। সেজন্য মার্কসবাদীরা রাষ্ট্রকে শ্রেণি শোষণের ও শ্রেণি শাসনের যন্ত্র রূপে অভিহিত করেন।'' কথাটা বলে একটু থামলেন উনি, মৃদু হেসে আবার বললেন, '' কার্ল মার্কোসের মতে, বিপ্লব সমাজজীবনের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি সকলক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে। এজন্য বিপ্লবকে মার্কসবাদীরা ইতিহাসের চালিকা শক্তি হিসেবে গণ্য করেছেন। আর এখান থেকেই হয়তো মাওবাদীরা তাদের বিপ্লবের অনুপ্রেরণা পেয়েছে!''

কথাটা বলে শব্দ করে হেসে উঠলেন এসপি। কিন্তু বীতরাগের হাসি পেল না। দ্বন্দ্বমূলক অবস্থান নিয়ে বিড়বিড় করে ও বলল, '' এই যে প্রতিদিন মাওবাদীদের জড়ো করে নতুন করে তৎপরতা দেখাচ্ছে মুথুকুমারন, পশ্চিমবঙ্গে আর ঝাড়খণ্ডে অবস্থান বদলে ফেলছে, আলাদা আলাদা পুরুষ আর নারী গেরিলা দল তৈরি করছে, একে সিরিজের রাইফেল, এসএল আর, কারবাইন, থ্রি নট থ্রির মতো আগ্নেয়াস্ত্র, মাইন ও গোলাবারুদ রাখছে ওদের সঙ্গে, তাও ওদের সঙ্গে সমঝোতা করেই চলতে হচ্ছে আমাদের, সেটাই তো সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা স্যার!''

বীতরাগের কথা শুনে এসপি দমে গেলেন না, গলায় স্নেহ মিশিয়ে বললেন, ''আমি চাকরি জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে চলে এসেছি বীতরাগ। তোমার চেয়ে বয়সে অন্তত কুড়ি বছরের বড় আমি। আমার জীবনে আমি অনেক ঝড় দেখেছি, আর আমি শিখেছি যে, ঝড়কে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি আমার নেই। কিন্তু আমার ধৈর্য আছে, যার মাধ্যমে আমি ঝড়ের সময় পার করে ঝকঝকে আগামীর দিকে তাকাতে পারি।''

বীতরাগ একটু নমনীয় হল এবার। ফোনের রিসিভারটা অন্য কানে চেপে ধরে বলল, ''আজ তাহলে কী করব স্যার? ওরা যেমন যেমন ইনস্ট্রাকশন দিয়েছে সেভাবেই এগোব?''

''সার্টেনলি। ওদের কোনও গাইডলাইন পাল্টানোর দরকার নেই। আমাদের একটা গাড়িতে মনোজ, প্রতিম আর দু'চারটে কনস্টেবলকে দিয়ে দুলাল হেমব্রমকে পাঠিয়ে দাও। কটায় মিট করতে বলেছে যেন ওরা?''

''দুপুর একটায় স্যার।''

''ওকে, ফাইন। তুমি তোমার ফোর্সকে বলো দুপুর সাড়ে বারোটার মধ্যে ঝিটকার জঙ্গলে পৌঁছে যেতে। খুব ভাল করে ওদের কর্তব্যগুলো বুঝিয়ে দিও। ওদের দুলালকে ছাড়বে, আর আমাদের যতীন দত্তকে বুঝে নেবে। একদম হাতে-হাতে। এর অন্যথা যেন না হয়। আর ফোর্সকে আলাদা করে বলে দিও, কেউ যেন প্রেসের সামনে কোনও রকম মুখ না খোলে। প্রয়োজনে আমি আজ বিকেলে সাংবাদিক সম্মেলন করব, কিন্তু ওরা যেন একটা লাইনও কিছু না বলে। মনে রেখো, দিজ ইজ মাই স্ট্রিক্ট অর্ডার!''

ত্রিপাঠী স্যারের কথাটা শেষ হতেই হতাশা ঝরে পড়ল বীতরাগের গলায়, ''এই অপারেশনে আমি থাকছি না স্যার, তাই তো?''

কথাটা শুনে অত্যন্ত নরম হয়ে এল ত্রিপাঠী স্যারের গলা, ''আমাদের জীবনের দুটো শক্তিশালী যোদ্ধা কী জানো বীতরাগ?''

''কী স্যার?''

'ধৈর্য এবং সময়। দুটোকেই একটু সুযোগ দাও। দেখবে তোমার জীবন সোনালি আলোয় ভরে যাবে।''

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%