দ্বিতীয় অধ্যায়

কমলেশ কুমার

ধানি কিস্কু দু'নলা বন্দুকটা কমলিনীর হাতে শক্ত করে ধরিয়ে দিল। বাঁহাতটা নলের সামনের দিকে নিচে ধরল কমলিনী, বন্দুকের বাঁটটা বুকের উপরে কণ্ঠার কাছে চেপে ধরল ও। ডানহাতের আঙুলগুলো দিয়ে গ্রিপটা শক্ত করে ধরল। গ্রিপের পাশ থেকে তর্জনীটা বের করে ট্রিগারের ওপরে রাখল। বাঁহাতটা দিয়ে বন্দুকটা তুলে লেন্সে চোখ রাখল কমলিনী। সামনে সোনালিমারার ফাঁকা মাঠ। বনকলমি আর দুব্বোঘাসে ভরে রয়েছে গোটা এলাকা। বাজ পড়ে শুকিয়ে যাওয়া একটা শিমুল গাছ রয়েছে মাঠের এক কোণে। কমলিনীর ওটাই টার্গেট। প্রতিদিন বিকেল হলেই ওকে ফুলাকেন্দুর তেঁতুলতলায় দাঁড়িয়ে বন্দুকের লেন্সে চোখ রেখে ওপারের শিমুল গাছটাকে তাক করতে হয়। গুলিতে-গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিতে হয় ওটাকে। দু'একটা যে মিসফায়ার হয় না, তাও নয়। তবে কমলিনী মাত্র কয়েক মাসেই অব্যর্থ নিশানা দিয়ে লোকাল কমিটির মন জয় করে ফেলেছে।

সহদেবদা ওকে বলেছে, ''কমলিনী, তুই টেস্ট ফায়ারের সংখ্যা যত বাড়াবি, তোর নিশানা তত জমকালো হবে। আমাদের আদিবাসী হতদরিদ্র শ্রেণির মহিলা প্রতিনিধি তো তুই-ই! তোকে দেখে আরও অসংখ্য মেয়ে আমাদের দলে নাম লেখাবে। শাসকের কালো হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে, শ্রেণিবৈষম্য আর ধনতন্ত্র নিপাত করতে তোর মতো ডাকাবুকো মেয়েদের যে খুব দরকার রে!''

কথাটা শুনে কোনও কথা বলতে পারেনি কমলিনী। ওর চোখটা এক অধরা স্বপ্নে চিকচিক করে উঠেছে। ও জানে, ও দিনদিন একটা বিপ্লবের অংশ হয়ে উঠছে, আর এই বিপ্লব অনিবার্যরূপে সর্বহারাশ্রেণির সমাজতান্ত্রিক বিশ্ববিপ্লবের অংশ। সহদেবদা ওকে মাও-সে -তুংয়ের গল্প শুনিয়েছে। বলেছে, মাও-সে-তুংয়ের নীতির কথা, যুদ্ধের উদ্দেশ্যই হল যুদ্ধের বিলোপসাধন। একটা যুদ্ধ করবে শোষিত শ্রেণি, অপর যুদ্ধটা শাসক শ্রেণির। শাসক শ্রেণির বাড়বাড়ন্তকে বন্ধ করতেই এই রক্তাক্ত সংগ্রাম।

এখন ফুলাকেন্দুর তেঁতুলতলাটা বড় নিঝুম হয়ে রয়েছে। শেষ বিকেলের সূর্য অলসভাবে আকাশের পশ্চিম প্রান্তে ঢলে পড়েছে। তার বিক্ষিপ্ত আবির রঙা আলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে নেমে আসছে ঝাঁকড়া তেঁতুলগাছটার মাথা থেকে।

ধানি কিস্কুর পরনে একটা শতচ্ছিন্ন গামছা। আদুল গা। পাথরে খোদাই করা শরীর যেন। গায়ে অসুরের মতো শক্তি। ওর বাড়িতে তিন ছেলে, দুই মেয়ে। ছোট মেয়েটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ে। আগে শালপাতার থালা বানিয়ে বাজারে বিক্রি করত ও, জঙ্গল জুড়ে অজস্র শালগাছ থাকায় কাঁচামালের কোনওদিন অভাব হয়নি। মূলত ওই পাতা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় ওদের গরিবগুর্বো গ্রামগুলোতে। অল্পস্বল্প থালা-বাটি তৈরি করে অনেকেই। ধানি কিস্কুও করত। কিন্তু সংগঠিত উদ্যোগ তেমন নেই সরকারের তরফে। ফলে বিপুল অংশ পড়ে নষ্ট হচ্ছে। তার উপর এখন থার্মোকলের পাতা চলে এসেছে বাজারে। কেউ আর শালপাতার থালা ব্যবহার করছে না আগের মতো। স্বভাবতই ধানির মতো আরও অনেক আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের পেটের ভাত জোগাড় করতে হিমসিম খেতে হচ্ছে।

ধানি কিস্কুর উপরে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একটা আদিবাসী মহিলা ব্রিগেড বানাতে। কমলিনী শিক্ষিত মেয়ে। খুব সহজেই ওকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নেওয়া যায়। ওকে শিখিয়ে ফেলতে পারলেই আরও অনেকে এগিয়ে আসবে এই কাজে।

বন্দুক চালানোর থেকে পড়াশোনাতেই বেশি মনোযোগী ছিল কমলিনী। নুড়িশোল হাইস্কুলের মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিকে সেরা নম্বর পায় ও। দু'চোখে অনেক স্বপ্ন ছিল ওর। পুলিশে চাকরি করবে। পুলিশের গায়ের খাকি রঙের পোশাকটা ওকে যে কত রাত্তির জাগিয়ে রেখেছিল, তা হাতে গুনে বলা যাবে না।

স্কুলের দিবাকর স্যার প্রতিটা ছেলেমেয়ের চোখে স্বপ্ন এঁকে দিতেন। বলতেন, ''অধ্যবসায় আর ধৈর্যই আনে সাফল্য, এই জঙ্গলমহলের রুক্ষ মাটিতে দাঁড়িয়ে তোমরা যারা এত মনোযোগী হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছ, তারা নিশ্চয়ই একদিন তোমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে।''

বন্দনা দিদিমণি, সুলেখা দিদিমণি, প্রভাত স্যার, দিবাকর স্যারদের বড় প্রিয় পাত্রী ছিল কমলিনী। ছোট থেকেই খুব ভাল ছাত্রী ছিল ও। বাড়িতে চরম অভাব ছিল, স্বপ্ন দেখার অন্তরায় ছিল প্রচুর, তা সত্ত্বেও কমলিনী পড়াশোনাকে অবহেলা করেনি কোনওদিন। শিক্ষক-শিক্ষিকারা ওর আগ্রহ দেখে নতুন-নতুন বই কিনে দিতেন, ক্লাসের শেষে বাড়তি সময় দিয়ে ওকে অঙ্ক-ইংরেজির অনেক জটিল বিষয় স্বচ্ছ করে দিতেন। বাড়িতে ফিরে বেশিরভাগ দিনই খাওয়া জুটত না কমলিনীর। ওর তিন ভাই খিদের জ্বালায় বাবা-মার সঙ্গে গলা তুলে ঝগড়া করত। চিৎকার করে কাঁদত, ওদের কান্না দেখে মায়ের চোখ ভরে আসত জলে, মাও বাবাকে দোষারোপ করত। বাবা ছিল চিরকালের ভাল মানুষ। কোনও তর্কে-বিতর্কে যেত না কোনওদিন। নিজের সমস্ত অপারগতা, ব্যর্থতা নিজের কাঁধে নিয়ে মলিন মুখে ঘুরে বেড়াত। কষ্ট হত কমলিনীর। কতদিন রাতে ঘুম ভেঙে গিয়ে ও দেখেছে, তালপাতার ছাউনি দেওয়া ওদের একচিলতে ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে একা বসে রয়েছে মানুষটা। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে সমস্ত চরাচর। বাবার সেদিকে হেলদোল নেই কোনও। একদিন গুটিগুটি পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল কমলিনী। দেখেছিল, পিছন থেকে বাবার পিঠটা কেঁপে-কেঁপে উঠছে। কমলিনী বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। বুঝেছিল, বাবার দু'চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। তার অসহায়তা, তার কষ্টকৃত জীবন, তার মনস্তাপ সবকিছু সেদিন নাড়িয়ে দিয়েছিল কমলিনীকে।

বাবা বলেছিল, ''বিনপুরের যে মহাজনের কাছে শালপাতা বিক্রি করতাম, সে বলেছে, আর পাতা লাগবে না। সে নাকি থার্মোকলের ব্যবসা শুরু করতে চাইছে!''

কমলিনী জানত, হাজারটা করে শালপাতা পিছু চুক্তি থাকত বাবার। তাও এমন কিছু বেশি টাকা নয়। একশো-দেড়শো বড়জোর! আর সেই শালপাতা জোগাড় করতে মানুষটা ভোরের আলো ফোটার আগে চলে যেত জঙ্গলে, দুপুরে খেতে আসত একবার, তারপর আবার ফিরত রাতে। যত হাজার শালপাতা কুড়িয়ে নিতে পারবে, তত লাভ। সেখানেও চলত প্রতিযোগিতা। কত মানুষ পেটের দায়ে অন্য কিছু উপায়ন্তর না দেখে এই কাজটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিল।

সেই কাজটাও শেষ পর্যন্ত চলে গেল বাবার! কমলিনী তখন উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছে সদ্য। ঝাড়গ্রাম কলেজে ভর্তি হয়েছে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে। ও জানত না, কীভাবে বাবাকে সান্ত্বনা দেবে, ওর ভবিষ্যৎ জীবনটাই বা কোনদিকে বইবে, সেটাও অজানা ছিল কমলিনীর।

বাবা নিজেকে ঘরবন্দি করে ফেলল পুরোপুরি, মায়ের সংসার সামলানো দায় হয়ে উঠল। কোনও রোজগার নেই পরিবারের। ভাইয়েরা খিদের জ্বালায় চিৎকার করে-করে কাঁদতে লাগল। বাধ্য হয়ে একদিন স্থানীয় এম এল এ'র সঙ্গে দেখা করল কমলিনী।

সুজয় সরেনের বাড়িতে ঢোকা দায়। পার্টি অফিসে গিয়ে সারাদিন বসে রইল ও। বিকেলের দিকে এম এল এ সুজয় সরেন দেখা করল। কমলিনী ওর দুর্দশার কথা হুবহু বর্ণনা করে গেল। ওর নিজের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ, বাবার বেকারত্ব, পরিবারের চরম দারিদ্র কোনও কিছুই বাদ রাখল না ও।

সুজয় সরেন সবটা শুনল, তারপর খুব নিস্পৃহ গলায় বলল, ''আমাদের জন্মটাই তো পোড়াদেশে রে পাগলি! যে দেশে দশ শতাংশ বাচ্চা পুষ্টির অভাবে মারা যায়, সেই দেশের উন্নতি কীভাবে সম্ভব, বল খুকি? তাছাড়া আমরা প্রবলভাবে কেন্দ্রের বঞ্চনার শিকার, কেন্দ্র আমাদের প্রাপ্য কোনওদিনই দেয় না। তাইতো আমাদের লড়াই চলছে, চলবে। সামনে ভোট আসছে, তোরা আরও এগিয়ে এলে তবেই তো আমরা সঠিক লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারব!'' আর একটাও বাড়তি কথা না বলে চলে গিয়েছিল সুজয় সরেন।

ভাঙা মন নিয়ে ফিরে এসেছিল কমলিনী। এসে দেখেছিল, লম্ফ জ্বলছে ঘরে। মাটির চার দেওয়ালের মধ্যে মুখোমুখি বসে রয়েছে ভাইয়েরা। মা থমথমে মুখ করে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে।

ও ঘরে ঢুকতেই ছোট ভাই বলেছিল, ''কুরকুট নিয়ে এসেছি দিদি আজ। কিছু না খেয়ে থাকার থেকে কুরকুট খাওয়া ভাল। তুই কি খাবি?''

কমলিনী জানত, এই কুরকুট হল এক ধরনের পিঁপড়ের ডিম। সাঁওতালি ভাষায় ওরা ডাকে 'হাও' নামে। কমলা রঙের এই পিঁপড়ে লক্ষ্য করা যায় বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, ঝাড়খণ্ডের সব জঙ্গলেই।

কুরকুট খেয়ে খিদে মেটাচ্ছে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর তথা জঙ্গলমহলের বহু মানুষ, তাও জানত কমলিনী।

ছোট ভাই আরও আগ্রহ নিয়ে বলেছিল, ''গাছের উঁচু ডালে সাদা চালের মতো দেখতে প্রচুর ডিম পেড়ে রাখে পিঁপড়েরা। আজ সারাদুপুর গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে সব পেড়ে এনেছি। পায়ের হাঁটুগুলো কেমন কেটে গেছে, দ্যাখ দিদি!''

কোনও কথা বলতে পারেনি কমলিনী। অজানা এক মনখারাপে ওর দু'চোখ ভরে উঠেছিল জলে। দেখেছিল ম্লান মুখে মা চুলোয় আগুন দিচ্ছে।

ভাই বলেছিল, ''একটু নুন মিশিয়ে কুরকুটের চাটনি তৈরি করে নাও মা। তারপর শাল পাতায় মুড়িয়ে আগুনে ঝলসে আমাদের খেতে দাও।''

হাসি হাসি মুখ নিয়ে ভাই কথাটা বললেও, কমলিনীর কান্না আর থামেনি সেদিন। নিজের মনেই সারারাত ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল ও।

তারও দিন তিনেক বাদে একদিন ভোররাতে ঘুম ভেঙে গেল কমলিনীর। দেখল বাবা ঘরে নেই। ও ভেবেছিল, দুয়ারে বসে আছে নিশ্চয়ই। দরজার হুড়কো খুলে বেরিয়ে এসেছিল বাইরে। বাবাকে সেখানেও দেখতে পায়নি ও। বাধ্য হয়ে ডেকেছিল মাকে, ভাইদের। শুরু হয়েছিল তন্নতন্ন করে খোঁজা। পাশের বাড়ির লসো, বাহাদুর, লক্ষ্মীরাম সকলেই খুঁজতে-খুঁজতে অবশেষে বাবাকে পেল। সোনালিমারার ফাঁকা মাঠে বাজ পড়ে মরে যাওয়া শিমুলগাছটার শুকনো ডাল থেকে ঝুলছিল বাবার মৃতদেহটা। প্রবল মানসিক চাপ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, অবসাদ আর মহাজনের হেনস্থার হাত থেকে বাঁচতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল বাবা। ফুলাকেন্দুর বিশাল তেঁতুলগাছটার উপর দিয়ে তখন ভোরের টকটকে লাল সূর্যটা উঁকি দিচ্ছিল। আলোর নরম আভা সেদিন ধুইয়ে দিয়ে যাচ্ছিল বাবার নিষ্প্রাণ শরীরটাকে।

সেদিনই সহদেবদা বাড়িতে দেখা করেছিল। ওকে বুঝিয়েছিল, ''মরণপণ যুদ্ধ না করে কোনও অধিকার আদায় করা যায় না কমলিনী। আলো আর বাতাসের উপরে সবার অধিকার যেমন সমান, তেমনি পৃথিবীর সকল সম্পত্তির উপর মানুষেরও অধিকার সমান।''

সেদিনই কমলিনী মনস্থির করেছিল, মাও-সে-তুং-য়ের দেখানো পথ ধরেই ও আগামী দিনে হাঁটবে। শুধু কর্তব্যপরায়ণতা আর সঠিক কাজের মাধ্যমেই যে অধিকার রক্ষিত হয় না, সেটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিল ও। বন্দুকের নলই যে ক্ষমতার উৎস, সেটাও বুঝতে শিখেছিল কমলিনী।

সেদিন থেকেই রোজ বিপ্লববাদের তালিম নিচ্ছে ও।

পিস্তল থেকে মাস্কেট পর্যন্ত প্রায় সব ধরনের অস্ত্রই ওকে চালানো শিখতে হচ্ছে। লম্বা নলযুক্ত ব্লান্ডারবাস কিংবা পিতলের তৈরি ব্যারেলযুক্ত নেভাল পিস্তল। মূলত এই অস্ত্রগুলো স্বল্প রেঞ্জের জন্য ব্যবহৃত হয়। আয়রন ব্যারেলের বন্দুক, দূরবর্তী রেঞ্জের বৈচিত্র্যময় পিস্তল, ল্যান্ডমাইন প্রতিস্থাপন সবটাই ভালোবেসে আঁকড়ে ধরেছে ও এখন।

বিকেল হলেই যখন মরা শিমুলগাছটাকে গুলি চালিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় কমলিনী, তখন ও মনে মনে দারুণ তৃপ্তি পায়। মনে হয়, ওর মৃত বাবা ওকে দু'হাত ভরে আশীর্বাদ করছে। আরও অসংখ্য লাঞ্ছিত অত্যাচারিত মানুষের সুদিনের জন্য এটাই ওর ঠিক কর্মপন্থা বলে বিশ্বাস করে ও।

ধানি কিস্কুর গলার আওয়াজে দ্রুত বর্তমানে ফেরে কমলিনী। বন্দুকে গুলি ঢোকাতে-ঢোকাতে ধানি বলল, ''জানিস বেটিয়া, মেশিনগানের ধারণাটা কার মাথায় প্রথম এসেছিল? সেটা ভাবতে গেলে চীনাদেরই কৃতিত্বটা দিতে হয়। অবশ্য, সেটায় গুলির বদলে ছিল তির, সেটা এক হাজার বছর আগের কথা। একটা আয়তাকার বাক্সের মুখে বত্রিশটা তির রেখে সেগুলোকে একটা লিভারের মাধ্যমে টেনে ছেড়ে দেওয়া হত, একসঙ্গে অনেকগুলো ফায়ার করার সেটাই ছিল প্রথম ধারণা।'' কথাটা বলে একটু থেমে, হাসি হাসি মুখ করে ধানি কিস্কু আবার বলল, ''আমি ছাই এসব জানলাম কেমন করে! দ্যাখ বেটিয়া, আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ। তির ছোড়া, আর অস্ত্রচালনা ছাড়া কিছুই পারি না আমি। এসব কথা আমাদের পার্টিক্লাসে রাতের অন্ধকারে আলোচনা করে মুথুকুমারন।''

কমলিনী একচোখ বন্ধ করে শিমুল গাছের মরা ডালটাতে একটা ফায়ার করল। ওদিকে বিকেলের আলো কমে এসেছে। পাখিরা ফিরে আসছিল বাসায়। কমলিনীর গুলির আওয়াজে তারস্বরে চিৎকার করতে-করতে উড়ে গেল ওরা।

এদিকে ফুলাকেন্দুর তেঁতুলতলাটা আবছা হয়ে আসছে ক্রমশ। গোধূলির ম্লান আলো এসে পড়েছে দূরের মাটির বাড়িগুলোর উপর।

তালপাতা দিয়ে ছাওয়া বাড়িগুলো বর্ষার জল পেয়ে ভেজা-ভেজা হয়ে রয়েছে।

কমলিনী দেখল, একজন লম্বা ছিপছিপে লোক তেঁতুলগাছটার পিছনের জঙ্গল দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে আসছে। তার মুখটা পুরোপুরি গামছায় ঢাকা। লোকটার কাঁধে ঝুলছে একটা একে-৪৭।

এই ছায়াময় অবয়বের মতো মানুষটাকে চেনে কমলিনী। যদিও মুখোমুখি পরিচয় হয়নি কোনওদিনই, তার মুখও দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবুও, এই মানুষটাই যে গোটা জঙ্গলমহলের অত্যাচারিত মানুষগুলোর ঈশ্বর, সেটা ভালো করেই জানে ও। মুথুকুমারনকে ওরা সকলে সূর্যদা নামেই ডাকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%