কমলেশ কুমার
''শিলদা ইএফআর ক্যাম্প অ্যাটাক কেন্দ্রীয় সরকারের মাওবাদী বিরোধী গ্রিন হান্টের জবাব। আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষ, তাই অপারেশন পিস হান্ট করে দেখালাম!'' উৎফুল্ল শোনাচ্ছে মুথুকুমারনের গলা, ''হাজার মোমবাতিকে প্রজ্জ্বলিত করা যায় একটামাত্র মোমবাতির আলো দিয়ে। আমরাও জঙ্গলমহলের মাটিতে এভাবেই ফিরে ফিরে আসব, যতদিন পর্যন্ত না আমাদের সব দাবি আদায় হচ্ছে। বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। নতুন নতুন ছেলেমেয়েরা যোগ দিচ্ছে আমাদের দলে। আমাদের এই আন্দোলন চলতে থাকবে।''
জামবনির কাছে বুড়িশোলের জঙ্গলে মুথুকুমারন সংবাদমাধ্যমগুলোকে ডেকেছে আজ। গতকাল একসঙ্গে চব্বিশজন পুলিশকর্মীকে নিকেশ করা গিয়েছে বলে মুথুকুমারনের গলায় আত্মবিশ্বাসের ছাপ।
দৈনিক ভোরের বার্তা, নতুন খবর, খবর সারাবছর প্রভৃতি বহু সংবাদপত্রের সাংবাদিকরা আজ হাজির হয়েছে।
একজন সাংবাদিক ভিড়ের মধ্যে থেকে বলল, ''এইভাবে নির্বিচারে মানুষ মারা কি আপনাদের উচিত হচ্ছে!''
মুথুকুমারন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখতে গিয়েও থেমে গেল। মুখটা গামছা দিয়ে ভাল করে আড়াল করে বলল, ''রাজ্যের যে সব জায়গায় কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে, দাউ দাউ খিদের আগুন নিয়ে যে-অসহায় মানুষগুলো নতুন দিনের পথ চেয়ে বসে আছে, নিত্য-প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে রাজ্যে লজ্জাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে সেসব আপনাদের মাথাব্যথার কারণ হয় না তো! রাজ্যের দ্রুত উন্নয়ন হলে সাধারণত দারিদ্র কমে, তার সঙ্গে বিশেষ দারিদ্র দূরীকরণ কর্মসূচিরও একটা ভূমিকা থাকতে পারে, যদি সেই কর্মসূচিগুলো ভালভাবে রূপায়িত হয়। কী ধরনের নীতি ও কর্মসূচি কার্যকর হতে পারে, সেবিষয়ে বর্তমান সরকার কোনও রূপরেখা তৈরি করেছে? আপনারা সেগুলো নিয়ে ভাবেন না তো!''
''ভারতের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে মাথাপিছু আয়ের স্বল্পতার কারণে দারিদ্রের সৃষ্টি হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবল চাপও একটা অন্যতম কারণ, তাই বলে সরকারকে দোষী সাব্যস্ত করতে এরকম মাস কিলিং করবেন আপনারা?'' আর একজন সাংবাদিক বলে উঠল।
বুড়িশোলের জঙ্গল গোধূলি পার করে সন্ধের দিকে পৌঁছাচ্ছে এখন। ঝিঁঝিপোকা ডাকছে চারিদিকে। আর মিনিট তিনকে সময় আছে সাংবাদিকদের হাতে। তারপর মুথুকুমারন তার নিজের গোপন আস্তানায় ফিরে যাবে। ওকে ঘিরে আছে অঘোর হেমব্রম-সহ দশ-বারোজনের সশস্ত্র বাহিনী। সকলের চোখেমুখে উচ্ছ্বাস ফুটে বেরোচ্ছে। মুথুকুমারন জানিয়ে দিয়েছে, আপাতত এটাই শেষ সাংবাদিক সম্মেলন। কারণটা না বললেও, সাংবাদিকদের বুঝতে বাকি নেই যে, কোবরা বাহিনীর চাপে তাদের দিশাহারা অবস্থা, কিছুদিনের জন্য বস্তারের গহন জঙ্গলে গা ঢাকা দেবে সে। সিআরপিএফ ও তাদের এলিট কোবরা ফোর্স, ছত্তিশগড় রাজ্য পুলিশ ও ডিস্ট্রিক্ট রিজার্ভ গার্ডস এবং স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের প্রায় হাজারদুয়েক সদস্য ওখানে কীভাবে একজন নেতাকে খুঁজে পেতেই হিমসিম খাচ্ছে, তা সাংবাদিকরা জানে। পিপলস লিবারেশেন গেরিলা আর্মির এক নম্বর ব্যাটেলিয়নের কমান্ডার সাত্যভি হিডমা মুথুকুমারনের ইয়ারদোস্ত। তার বাহিনীর পাতা ''ইউ'' আকৃতির গোপন ফাঁদে ঢুকে কয়েকদিন আগে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত চল্লিশজন জওয়ান, গুরুতর জখম হয়েছে আরও প্রায় তিরিশজন।
ভুল গোয়েন্দা তথ্যে নিরাপত্তা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে সাত্যভির জুড়ি নেই। কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে, কিছুদিনের জন্য জঙ্গলমহলের দায়িত্ব সহদেব মুর্মূকে দিয়ে বন্ধুর ডেরায় গা'ঢাকা দিয়ে থাকতে চাইছে মুথুকুমারন।
''বিশ্বায়নকে জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছি আমরা। সামাজিক নিপীড়নের একটা রূপ হিসাবে বর্ণ প্রথাকে নিন্দা জানিয়েছি। আমরা মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতার পক্ষে। গোটা দেশের দিকে তাকালে বুঝতে পারবেন, মানুষের স্বাধীনতা লঙ্ঘন করা হচ্ছে অহরহ। সেসব নিয়েও কোনও লেখালিখি দেখি না আপনাদের। শ্রেণিশত্রুদের ধ্বংস আমাদের প্রধান লক্ষ। সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তাদের হত্যা যেমন চলছে, তেমনই চলতে থাকবে। আমরা জন আদালতে বিশ্বাসী, মানুষের দরবারে মানুষের বিচার হবে। আমাদের বিচারব্যবস্থায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করার দায়িত্ব নিয়েছি আমরা। একে একে স্কুল, রেললাইন উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটবে এবার। আপনারা প্রস্তুত থাকুন।'' মুথুকুমারনের গলায় হিমশীতল উসকানি, ''আমি আবারও বলছি, পুলিশ যেন গ্রিন হান্ট অপারেশন থেকে দূরে থাকে এবং গরিব মানুষদের সত্যিকারের বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করে। জঙ্গলমহলের মানুষদের কাছে অনুরোধ, আপনারা পুলিশ জওয়ান, সিনিয়র কর্মকর্তাদের আদেশ মান্য করবেন না, পরিবর্তে জনগণের সেনাবাহিনীতে যোগ দিন। আমরা আমাদের সেনাবাহিনীতে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।''
''কিন্তু এত মানুষের মৃত্যুর কারণ হচ্ছেন আপনারা, সেটাও তো মেনে নেওয়া যাচ্ছে না!''
একজন সাংবাদিকের কথার জবাবে সামান্য হেসে মুথুকুমারন বলল, ''মৃত্যু এক অনিবার্য সত্য। দুনিয়াতে সব সমস্যার সমাধান আছে। কিন্তু মৃত্যু থেকে বাঁচতে চাওয়ার কোনও সমাধান বেরিয়েছে কি? নির্দিষ্ট সময় হলেই মৃত্যু সংগঠিত হবে। ধরে নিন, যারা মারা যাচ্ছে, তাদের সময় সত্যিই ফুরিয়ে এসেছিল!''
''জীবন তো কয়েকটা চোখের পলকের নাম, চোখ খোলা রাখলেই জীবন, বুজলেই মৃত্যু!'' অপরিচিত এক সাংবাদিকের গলার আওয়াজ পেয়ে ঘাড় ঘোরাল মুথুকুমারন। অঘোর দেখল সেই সাংবাদিক কথাটা বলে মিটিমিটি হাসছে। হাসতে হাসতেই সে আবার বলল, ''আপনি যেখানেই অবস্থান করুন না কেন, মৃত্যু আপনাকে পাকড়াও করবেই করবে।'' একটু থেমে উদাসীন ভঙ্গিমায় সে বিড়বিড় করল, ''বস্তারের গহন অরণ্যও আপনাকে বাঁচাতে পারবে না।''
এবারে মুথুকুমারন সচকিত হয়ে উঠল। কাঁধ থেকে নামাতে যাচ্ছিল তার একে-৪৭ রাইফেলটা।
অঘোর সেই সাংবাদিককে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, ''কে আপনি?''
সেই সাংবাদিক আবার মৃদু হাসল। ধীর গলায় বলল, ''সংযমের বাঁধ ভেঙে যাওয়া মুক্তিকামী সামান্য এক মানুষ!''
বুড়িশোলের জঙ্গলে গোধূলির শেষ আলোটুকুও মরে এসেছে। উপস্থিত সকলকেই ছায়াময় অবয়বের মতো লাগছে এখন। পাখিরা দ্রুত বাসায় ফিরে আসছে। দূরের গ্রামে সন্ধ্যার শাঁখ বেজে উঠছে।
মুথুকুমারনের ইশারায় অঘোর ঝাঁপিয়ে পড়ল সাংবাদিকটার ওপর। ডানহাতের চাপে গলাটা জাপটে ধরল তার। মুথুকুমারন জোর গলায় ঘোষণা করল বাকি সকলকে দ্রুত সরে যাওয়ার জন্য। চোখের পলক ফেলার আগেই অন্য সাংবাদিকরা অদৃশ্য হয়ে গেল।
অঘোর গলার চাপ বাড়াচ্ছে লোকটার ওপর, অথচ সে নির্বিকার। ভাবলেশহীন।
মুথুকুমারনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল এবার, চিৎকার করে ও বলল ''সাংবাদিকের মিথ্যে পরিচয় দিয়ে কীভাবে ঢুকলেন আপনি এখানে? কে আপনি?''
লোকটা এখনও নিশ্চল। মাটির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, ''নো দাই সেলফ। সক্রেটিস বলেছিলেন, নিজেকে জানো। আমিও একই কথা বলছি আপনাকে, নিজেকে জানুন, তারপর না হয় আমার পরিচয় জানতে চাইবেন!''
লোকটার রহস্যময় কথা অঘোরের ভাল লাগল না। ও বন্দুকের নলটা লোকটার বুকের দিকে তাক করল, উপস্থিত গেরিলাযোদ্ধারাও অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হল, আর ঠিক সেসময়ই অন্ধকার হয়ে আসা জঙ্গলের এক কোণ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে এল। অদ্ভুতভাবে একটা গুলিও কারোর বুক কিংবা মাথা স্পর্শ করল না, ওদের অস্ত্র ধরে থাকা হাতে সেগুলো এসে বিঁধে যেতে লাগল। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল অঘোর-সহ আট-দশজন।
বুড়িশোলের জঙ্গলের দক্ষিণদিকে একটা সাঁকোর কাছে দাঁড়িয়ে ছিল সহদেব মুর্মূ, কমলিনী সরেন-সহ আরও পনেরো-কুড়িজন। গুলির শব্দ শুনে কমলিনী ছুটে পৌঁছাতে চাইল অঘোরের কাছে।
সহদেব বাধা দিল, ''উন্মুক্ত গোলাগুলির প্রান্তরে ওভাবে কেউ এগিয়ে যায় না। জীবনহানি আমাদের কাম্য নয় কমলিনী। আমরা পিছন থেকে আক্রমণ করব। কিন্তু গুলিগুলো কোথা থেকে ছুটে আসছে আগে বোঝা দরকার।''
নেতৃত্বের কথাই শেষ কথা, প্রথমদিন থেকে মেনে এসেছে কমলিনী। তাই কষ্টটা গিলে নিয়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল ও।
সকলকে অবাক করে দিয়ে গোটা বুড়িশোলের জঙ্গলে হঠাৎ হ্যালোজেনের আলো জ্বলে উঠল। বিভিন্ন দিক থেকে জ্বলে ওঠা কৃত্রিম আলোয় দিনের আলোর মতো হয়ে গেল গোটা এলাকাটা।
মাইকে ভেসে এল একটা রাশভারী কণ্ঠস্বর, ''অনেক খেলা দেখিয়েছেন মুথুকুমারন। নাউ ইওর গেম ইজ ওভার!''
অঘোর আর তার সঙ্গীরা মাটিতে পড়ে যাওয়া অস্ত্রগুলো তুলতে যাচ্ছিল বিক্ষত হাত দিয়েই, মাইকে আবার সেই বজ্রগম্ভীর গলা ভেসে এল, ''সিআরপিএফ এবং কোবরার বারোশোজন কমান্ডো পুরো অঞ্চল ঘিরে ফেলেছে। কেউ হাতে অস্ত্র তোলার চেষ্টা করবেন না।''
চারিদিক থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে আসতে লাগল জলপাই রঙের পোশাক পরা অসংখ্য জওয়ান।
মারাত্মক শক্তিশালী একটা হ্যান্ড-গ্রেনেড উড়ে এসে পড়ল মুথুকুমারনের থেকে একটু দূরে। আগুন আর ধোঁয়ায় ভর্তি হয়ে গেল চারপাশটা।
মুথুকুমারন পা দিয়ে মাটিতে তিনবার ধাক্কা মারল, সকলে অবাক হয়ে দেখল, মাটিটা ধীরে ধীরে ফাঁক হয়ে গুহার মতো আকৃতি নিল। এক লাফে সেখানে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল মুথুকুমারন।
এটা তার গোপন পথ। হাতেগোনা দু'একজন ছাড়া এপথের সন্ধান কেউ জানে না। মাটির নীচে বহু জলা-জমি পেরিয়ে এটা সোজা গিয়ে ঝাড়খণ্ডে উঠেছে।
অন্ধকার পথটার দিকে পা বাড়াতেই একটা লোক ছুটে এসে কলার ধরল মুথুকুমারনের। ব্যঙ্গের সুরে সে বলল, ''অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, ভালবাসা তখন জানলা দিয়ে পালায়। এই কথাটা জানতাম। কিন্তু আপনি পালাচ্ছেন কীসের অভাবে মুথুকুমারন?''
মুথুকুমারন এখন অস্ত্রহীন। লোকটা চেপে ধরে আছে তার গলার কাছটা।
মুথুকুমারন কোনও জবাব দিল না। ডান-পা দিয়ে দারুণ জোরে একটা ঝটকা মারল লোকটার পেটের কাছে।
সাপের মতো হিসহিস করে উঠল লোকটা, ''নিজেকে বদলাতে পারলে না মুথুকুমারন! অনেক সুযোগ দেওয়া হয়েছিল তোমাকে। তোমার জন্য তোমার ভাগ্যও বদলাতে পারল না।''
মুথুকুমারন বুঝল বীতরাগ চক্রবর্তীর হাত থেকে আজ নিস্তার নেই। ও শেষ চেষ্টা করতে গেল। প্রাণপণে একবার ডানহাতের তর্জনীটা ঢুকিয়ে দিতে গেল বীতরাগের চোখের ভেতর। বীতরাগ সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ঘাড়টা ঘুরিয়ে একটা প্রবল ঘুষি চালাল মুথুকুমারনের মুখে।
মুথুকুমারনের দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা রইল না আর। ওকে পাঁজাকোলা করে মাটির নীচে থেকে তুলে নিয়ে এল বীতরাগ।
উপরে এসে ফেলতেই কোবরা বাহিনীর পাঁচজন জওয়ান ঘিরে ধরল ওকে। রিতেশ নামে ছেলেটা প্রথম গুলিটা চালাল ওর বুক লক্ষ করে।
বীতরাগ আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, ''অসৎ আনন্দের চেয়ে পবিত্র বেদনা ভাল!''
আরও একজন জওয়ান মুথুকুমারনের মাথার খুলিতে চালিয়ে দিল একটা গুলি। কপাল আর মাথার মাঝখান দিয়ে সেটা ঢুকে গেল। ছেদড়ে গেল ওর মাথাটা।
বীতরাগ আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ''পুলিশবাহিনীকে অসহায় ভেবে অবজ্ঞা করে যাদের খুন করেছ, এই গুলিটা তাদের সঁপে দিলাম।''
বাকি তিনজন ইনস্যাস উঁচিয়ে তুবড়ির মতো গুলিবর্ষণ করতে লাগল। সাত সেকেন্ড পর যখন ওরা থামল, বীতরাগ একই কায়দায় আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, ''প্রতিনিয়ত মানুষকে ভয়ের মধ্যে রেখে যাদের জীবন নরক করে তুলেছিলে তুমি, এটা তাদের জন্য।''
ওরা তাকিয়ে দেখল, মুথুকুমারনের মুখ আর নাক দিয়ে বয়ে যাচ্ছে রক্তের স্রোত। হাতপাগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে গুলি বর্ষণে। শুধু দুটো মৃতচোখ এখনও তাকিয়ে রয়েছে নিষ্পলক।
বীতরাগ ওর সার্ভিস রিভলবারটা বের করল। আকাশের দিকে তাকিয়ে একইভাবে চিৎকার করে বলে উঠল, ''মানুষের ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থেকে তুমি নতুন দিগন্তের জন্য সাঁতার কাটতে পারবে না। নতুন দিগন্তে গিয়ে পৌঁছালেই বুঝতে পারবে, পৃথিবী আমার দেশ। সমস্ত মানবজাতি আমার ভাই। ভাল কাজ করা আমার ধর্ম।''
কথাটা বলে বীতরাগ পাগলের মতো ফায়ার করতে লাগল মুথুকুমারনের চোখদুটো লক্ষ করে।
সন্ধ্যার ঘনঘোর অন্ধকারে হ্যালোজেন সাময়িক আলো ছড়াচ্ছে ঠিকই, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কমলিনীর মনের দেউল অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। বন্ধুদের সঙ্গে অঘোরের শরীরটাও লাশ হয়ে পড়ে রয়েছে একটা ছোট্ট শালগাছের নীচে। ইচ্ছে থাকলেও কমলিনী ছুটে যেতে পারছে না ওর কাছে। সহদেবদা বলেছে, ''বিপ্লবকে এভাবে থামিয়ে দেওয়া যায় না কমলিনী। বেঁচেবর্তে থাক। দেখিস, একদিন আবার রাঙা নিশান ওড়াব আমরা।''
সশস্ত্র বাহিনীর কাছে আজ হার স্বীকার করেছে ওরা।
কমলিনী বসে পড়েছে বহু দূরের একটা নুয়ে-পড়া সাঁকোর উপর। সাঁকোটার নীচে দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে জল। অস্ত্র সরিয়ে রেখেছে ও। অন্ধকারের ছন্দের ভিতর দিয়ে স্থির কিছু শব্দ যেন ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে ওর কান। অঘোরের রেখে যাওয়া বেদনার অভিমান পর্ণমোচী গাছের পাতার মতো নেমে আসছে কমলিনীর দুটো চোখ থেকে। কমলিনী বাঁচতে চেয়েছিল অঘোরের ঘাম, অশ্রু আর শোণিতপ্রবাহে। দুটো পাগলফুল হয়ে তারার মতো আলো ছড়াতে চেয়েছিল ওরা। বারুদ কুয়াশার উপত্যকায় দাঁড়িয়ে ধূপের ধোঁয়ায় ভরিয়ে দিতে চেয়েছিল জঙ্গলমহলের ছায়াময় চরাচর।
ও দূরে তাকিয়ে দেখল, ওদের সতীর্থ বন্ধুদের দেহগুলো ঘিরে উল্লাসে মেতে উঠেছে ভারতীয় সেনা আর রাজ্য পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা।
কমলিনী জানে, স্রোতস্বিনীর মতো নতুন করে জঙ্গলের বুকে প্রতিবাদ জন্মাবে আবার। রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু, বিরোধিতা, প্রবঞ্চনা আর অবিশ্রান্ত অত্যাচার থেকে একদিন সমাধিখুঁড়ে উঠে আসবে বিপ্লব। অঘোরের ঔরসে যে এখন শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে কমলিনীর গর্ভে। ''ছেলে হলে নাম দেব বিপ্লব, মেয়ে হলে অগ্নিবীণা।'' কথাটা অঘোরকে বলার সুযোগটুকুও পায়নি কমলিনী।
সামনের দিকে ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকাল ও। দেখল, আনন্দ-আগুন গায়ে মেখে রাষ্ট্র বিজয় উদযাপন করছে।
অন্ধকারের তারাদের সঙ্গে এক অদম্য মৃত্যুপণ বুকে নিয়ে, নিজের গর্ভরক্ষক হয়ে আগামীর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে নিঃসাড় বসে রইল কমলিনী।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন