কমলেশ কুমার
পিউপাখি জোড়ায়-জোড়ায় চলে, ভাল সাঁতার জানে। লম্বা ঠোঁট জলের তলার কাদায় সেঁধিয়ে দিয়ে সামনে-পিছনে, ডানে-বাঁয়ে ঘোরাতে ওস্তাদ। প্রয়োজনে ডুবও দেয়। এক পায়ে ভর করে ঘুমোয়। বুক ও পেট সাদা রঙের, কপাল, মাথা ও ঘাড় ছাইছাই বাদামি রঙের, তার ওপর অসংখ্য সাদাটে ছোপ থাকে।
লোধাশুলির বিশাল জঙ্গলে অনেকগুলো বিল রয়েছে। সেই বিলের পাড়ে জোড়ায়-জোড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে পিউপাখিরা। কখনও কখনও মাছরাঙার মতো ডুবও দিচ্ছে।
কমলিনী দেখল, ওদের পাগুলো বেশ লম্বা, পায়ের রং কমলা-হলুদ, লম্বা নলাকার ঠোঁটের গোড়া লাল, বাকিটা কালচে ধূসর। খুব ভাল করে লক্ষ করলে বোঝা যায়, চোখের ওপর দিয়ে চওড়া সাদা একটা টান আছে। লেজের গোড়ার উপরিভাগ সাদা। লেজের আগার দিকের ওপরে সুবিন্যস্তভাবে সাদা ও কালো রেখা আড়াআড়িভাবে টানা। পালকের উপরে পিছন দিকে সাদা সাদা ছোট ছোট চৌকো ছোপ আঁকা।
লোধাশুলির জঙ্গলে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকেল নামবে। এখানে সূর্যের আলো গাছের পাতা ভেদ করে ঢুকতে পারে না খুব একটা। মাঝদুপুরের আকাশ এখান থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই। অগুনতি শালগাছ, ঋতুভেদে তাদের চেহারা কেমন পাল্টে পাল্টে যায়, মহুয়ার মাহাত্ম্য, হাতিরা কেমন করে ঢুকে পড়ে জঙ্গল থেকে গ্রামে, দূরের গ্রামগুলো শেষ গ্রীষ্মের আলো মেখে কেমন লালে লাল হয়ে ওঠে অশোক, পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়ায়, বর্ষায় কেমন করেই বা ভরভরন্ত হয়ে ওঠে এখানকার ডুলুং আর সুবর্ণরেখা, সেসবই ভাবছিল কমলিনী।
ভাবছিল এই জঙ্গলে ধীরে ধীরে নেমে আসা রাতের কথাও। অসংখ্য হাতির দল চাঁদনি রাতে সঙ্গম উপভোগ করে। তবে ওই চূড়ান্ত সঙ্গম মুহূর্তে ওরা যদি কোনও মতে বুঝতে পারে দূর থেকে কেউ লক্ষ করছে বা ক্যামেরায় ছবি তুলে রাখার ষড়যন্ত্র করছে, তাহলে ওরা কিন্তু দারুণ খেপে যায়। আর ওরা যদি একবার খেপে যায় তাহলেই সর্বনাশ। সবকিছু তছনছ করে দেয় মুহূর্তের মধ্যে।
কমলিনী দ্রুত বাস্তবে ফিরে এল। ওর মনে পড়ল ওদের আদিবাসী গ্রামগুলোর অবর্ণনীয় কষ্টের কথা। প্রায় সবকটি পরিবারের মাটির বাড়ি। সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা। এই বর্ষায় বৃষ্টিপাতের জেরে বাঁশ-কাঠের নড়বড়ে খুঁটির মাটির বাড়ি ভেঙে পড়েছে। খড়ের ছাউনি থেকে চুঁইয়ে পড়েছে বৃষ্টির জল। বেশিরভাগজনই রাতে দু'চোখের পাতা এক করতে পারেনি। বিছানা-বালিশ ভেসে গিয়েছে বৃষ্টিতে।
দুঃখ কোনও উদযাপনের বিষয় নয়, যদি হত, কমলিনী জঙ্গলমহলের বিনিদ্র রাতের সব দুঃখ একজায়গায় জড়ো করে শোকেসে সাজিয়ে রাখত।
এটুকু ওরা বুঝেছে যে, অনুরোধ-আবেদনের দিন শেষ। এবার যা কিছু করার, বন্দুকের নলের সামনেই করতে হবে। বারুদের গন্ধ এই ঝাপসা সবুজ বনভূমির রন্ধ্রেরন্ধ্রে ছড়িয়ে না দিলে ওদের মতো বঞ্চিত আদিবাসী পরিবারগুলো একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
মলানদিঘি বিলের সামনে তাই ওর প্রতিদিন আসা। ওটাই অস্থায়ীভাবে ফায়ারিং স্কোয়াড বানিয়েছে অঘোর হেমব্রম।
ছেলেটার বয়স ছাব্বিশ বছর। কমলিনীর থেকে ঠিক আড়াই বছরের বড়। অঘোরের শরীরটা মাঝারি আকৃতির, চামড়ার রং কুচকুচে কালো, চ্যাপ্টা নাক, পুরু ঠোঁট আর চুলগুলো সবটাই কোঁকড়ানো।
ও পশ্চিম মেদিনীপুরের বাসিন্দা হলেও অন্ধ্রপ্রদেশের ভিজিয়ানা জেলার চিন্তামালা গ্রামে থাকত এতদিন। সাগুমারি রাওয়ের নেতৃত্বে মাওবাদী স্কোয়াড সামলানোর দায়িত্ব ছিল ওর, সম্প্রতি মুথুকুমারন ওকে পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে এনেছে। সহদেব মুর্মূর সহযোগী হয়ে আর্মড ফোর্সের পুরো দায়িত্বটা নিজের কাঁধে নিয়েছে অঘোর।
অন্ধ্রপ্রদেশেও ও দেখেছে চরম হতাশাজনক ছবি। বর্ষাকালে চিন্তামালা গ্রামে রাস্তা বলে আর কিছু থাকত না। পুরোটাই জলের নিচে। দশকের পর দশক প্রশাসনের দরজায় ঘুরত বাসিন্দারা। বহু সাংসদ, বিধায়ক এসেছে, চলেও গেছে। তবু চিন্তামালা গ্রামে রাস্তা তৈরি হয়নি। কত প্রসূতি প্রসববেদনায় ছটফট করতে করতে রাস্তাতেই মারা গিয়েছে, কত অসুস্থ বয়স্ক মানুষ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে রাস্তাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে, তবু মাত্র পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে এগিয়ে আসেনি অন্ধ্র সরকার। তাই প্রশাসনের ওপর আর ভরসা রাখেনি গ্রামবাসীরা। নিজেদের জমিতে উৎপন্ন ধান আর ভুট্টা বিক্রি করে অস্ত্র কিনেছিল ওরা। সেগুলো দিয়ে শুরু হয়েছিল প্রশিক্ষণ। দায়িত্বে ছিল অঘোর হেমব্রম।
অঘোরের চোখদু'টো খুব উজ্জ্বল লাগে কমলিনীর। ও জানে, মানুষের চোখ তাই দেখে, যা তার মন দেখতে বলে। তাই তো একই জিনিস একেক জনের কাছে একেক রকম হয়। অঘোরের যে-চোখে সহদেবদা হিংস্রতা খুঁজে পায়, কমলিনী সেই চোখেই কেন শিশুর সরলতা দেখতে পায়, তা ও জানে না। তবে ও এটুকু বুঝেছে, অঘোরের দুটো চোখ কখনও কখনও শব্দের চেয়েও বেশি কিছু বলে ফেলে।
কমলিনীও চেষ্টা করে চোখ দিয়ে অঘোরকে সেটাই বলতে, যেটা ওর ঠোঁট বলতে ভয় পায়।
কারণ ও জানে, সবকিছুই স্বর্গীয় হয়, যদি কেউ তার নিষ্পাপ চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখে।
কিন্তু সেসব ইঙ্গিত ছেলেটা বুঝতে পারলে তবে তো!
কাঁধে আলতো চাপড় দিতেই কমলিনী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পিছনে অঘোর এসে দাঁড়িয়েছে।
সূর্যরশ্মি এখন শালগাছের জঙ্গল থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামছে মলানদিঘির বিলে। তার বুকে বিছিয়ে রয়েছে আলগা গোলাপি আভা, এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের খানিক পরেই গোধূলিলগ্ন উপভোগ করবে কমলিনী। আকাশের রক্তিম রঙে বিলের জলটাও রঙিন হয়ে উঠবে তখন।
যদিও এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পড়ন্ত বিকেলের সূর্যরশ্মি দেখার বিষয়টি বাহুল্যপূর্ণ বলে মনে হয় কমলিনীর।
অঘোর মৃদু হাসল একবার। ওর পিঠে আজ কোনও আগ্নেয়াস্ত্র ঝুলছে না। তিনটে বিভিন্ন আকৃতির ধনুক ঝুলছে সেখানে। অন্য কাঁধে তূণীরের ভিতরে গাঁথা রয়েছে অসংখ্য তির।
মলানদিঘির বিলের সামনে দাঁড়িয়ে ও বলল, ''কমলিনী আমি আজ তির ছোড়া শেখাব তোমাকে।''
''জানি তো তির ছুড়তে!''
''কিছুটা অবশ্যই জানো। আরও বিস্তারিত শিখতে হবে।'' কথাটা বলে একটা ধনুক কাঁধ থেকে নামিয়ে আনল অঘোর। কমলিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, ''তির-ধনুকের আবিষ্কার শিকার ও যুদ্ধ-ব্যবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে। মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতায় দূরের কোনও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে। মূলত ধনুকের যান্ত্রিক কৌশল, ধনুক ও তিরের কাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত পদার্থ, তিরের ফলায় ব্যবহৃত পদার্থের উপর তিরের রকমফের নির্ভর করে। তিরের ফলাটি সাধারণত তৈরি হয় ফ্লিন্ট, পাথর, ধাতু বা অন্যান্য শক্ত পদার্থের সাহায্যে।''
একটু দম নিয়ে অঘোর আবার বলল, ''ক্রসবৌ, ইংলিশ লংবৌ, কমপোসিটবৌ প্রভৃতি থাকলেও আমরা এখন আধুনিক তির-ধনুকই ব্যবহার করি। আধুনিক ধনুকগুলোও মূলত কাঠ দিয়ে তৈরি হয়। এছাড়াও ব্যবহৃত হয় কার্বন বা ফাইবার গ্লাস। এতে স্থিতিস্থাপকতা বাড়ে। এতে লাগানো তার বা পুলি যান্ত্রিক সুবিধা প্রদান করে তিরকে আরও বেশি দূরে যেতে সাহায্য করে। আধুনিক তিরগুলো তৈরি হয় অ্যালুমিনিয়াম, ফাইবার গ্লাস বা কার্বন ফাইবার দিয়ে। তিরের গোড়ার পালক তৈরি হয় টার্কি বা প্লাস্টিক দিয়ে। এই পালকের কাজ হল তিরকে সোজা যেতে সাহায্য করা।''
কথাটা বলে ছিলায় তির লাগিয়ে একটা মোক্ষম টান দিল অঘোর, ধনুক থেকে তিরটা সেকেন্ডের ভগ্নাংশে বিদ্যুৎ গতিতে বেরিয়ে গেল। মলানদিঘির বিলের উপর দিয়ে ভেসে অন্ধকার হয়ে আসা জঙ্গলের কোনও গাছের গুড়িতে গিয়ে বোধহয় ধাক্কা খেল ওটা। নিস্তব্ধ জঙ্গল থেকে একটা ধাতব শব্দ প্রতিধ্বনির মতো ভেসে বেড়াতে লাগল চারপাশে।
মাঝারি মাপের একটা ধনুক ও ধরিয়ে দিল কমলিনীর হাতে। কমলিনী সোজা হয়ে দাঁড়াল। মাটির সঙ্গে সমান্তরালে রাখল হাতটা। বাঁহাত দিয়ে ধনুকের বাঁকানো অংশটা চেপে ধরল। ডানহাত দিয়ে তিরটা রাখল ধনুকের ছিলার উপর। তিনটে আঙুল দিয়ে তিরটা টেনে নিয়ে এল ওর নিজের দিকে।
সোনালিমারার চরে যেমন শুকনো শিমুলগাছটাকে লক্ষ্যস্থল মনে করে ফুলাকেন্দুর তেতুলতলায় দাঁড়িয়ে ছুড়ে দিত একটার পর একটা গুলি, আজও ঠিক তেমনই মলানদিঘির বিলের ওপাড়ে একটা উইয়ের ঢিপি লক্ষ করে ও তিরটা ছেড়ে দিল হাত থেকে। বাতাসে একটা শনশন আওয়াজ উঠল ক্ষণিকের জন্য। অঘোর দেখল, তিরটা লক্ষ্যবস্তু ছুঁতে সক্ষম হয়েছে।
আসলে কমলিনী যখন হাতে পিস্তল কিংবা তির তুলে নেয়, ও মনে করে ওর সামনে তখন লক্ষ্যবস্তু হয়ে পথ আগলে দাঁড়িয়েছে গোটা জঙ্গলমহলের দারিদ্র, হাহাকার, বঞ্চনা, আর না-পাওয়ার ইতিবৃত্ত। গুলির আঘাতে কিংবা তিরের ফলায় ও সেসব কিছুকে ফালাফালা করে দিতে চায়। তাই খুব সহজেই ও লক্ষ্যবস্তুকে ছুঁয়ে ফেলতে সক্ষম হয়।
কমলিনী দেখল, অঘোর পুনরায় ওর ধনুক তুলে নিয়েছে হাতে। ওর দিকে তাকিয়ে অজস্র কথা বলে চলেছে ও। ধনুক হাতে এই একাকী নিঃসঙ্গ জঙ্গলে কেমন যেন মায়াবী লাগছে অঘোরকে। ক্লাস এইটে পড়ার সময় তনুজা দিদিমণি রামায়ণের গল্প বলত ওদের। বিশ্বামিত্র মুনির যজ্ঞানুষ্ঠান পাহারা দিয়েছিল রাম আর লক্ষ্মণ। রাক্ষসদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা রুখে দিয়েছিল রাম তার তির-ধনুক দিয়ে।
আজকের এই গোধূলি স্পর্শ করা মাটিতে অঘোর হেমব্রমকে সেরকমই এক মুক্তিদাতার মতো লাগছে কমলিনীর। ছেলেটা তার প্রতিজ্ঞায় অবিচল, অনুশীলনে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, কর্তব্যবোধে নিরহঙ্কার।
প্রেম মানুষের মনের সেই অনুভতি, বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনও মিল নেই, তারপরেও মানুষ প্রেমে পড়ে, কারণ বাস্তবতাকে মানুষ কখনওই সহজে মেনে নিতে পারে না। কমলিনীর জীবনে একটা রূঢ় বাস্তব থাকা সত্ত্বেও কেন যে মনের ভিতরে এমন ছলাৎ-ছলাৎ করে উঠছে এই ক'দিন ধরে, ও বুঝতে পারছে না। যদিও কমলিনী জানে, জগৎ বড় নিষ্ঠুর, আর প্রেম তো একটা জ্বলন্ত সিগারেটের মতো, যার শুরুতে আগুন এবং শেষ পরিণতি ছাই!
''কমলিনী!'' অঘোরের গলার আওয়াজে একটু কেঁপে উঠল কমলিনী।
''আমি কয়েকটা দিন ধরেই লক্ষ করছি, অনুশীলনের সময় তুমি কেমন যেন উদাস হয়ে যাচ্ছ! এটা তো ভাল কথা নয়। এমনটা কেন হচ্ছে, কমলিনী?'' অঘোরের প্রশ্নের মধ্যে একটা ঝাঁঝ থাকলেও কোথাও যেন একটা নমনীয়তার সুরও খেলা করে যাচ্ছিল। শিশুকে যেমন স্নেহ দিয়ে, বকেঝকে পড়াতে বসায় তার অভিভাবক, অনেকটা সেরকম।
কমলিনী জানে ক্ষুধা হল জঙ্গলমহলের প্রধান ব্যাধি। সেই ব্যাধি দূর করতেই তাদের সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে আবেগের ভূমিকা পুরোপুরি শূন্য, তবুও প্রেম যেন মারণব্যাধির চেয়েও ভয়ানক রোগ হয়ে ছড়িয়ে পড়তে চাইছে কমলিনীর শরীরে। কারণ মারণব্যাধি মানুষকে একবারে শেষ করে দেয়। আর প্রেম সারা জীবন তিলে তিলে ক্ষয় করে মারে মানুষকে।
''কমলিনী!''
পুনরায় অঘোরের ডাকে চমক ভাঙল ওর। সত্যি কথাটা কি ওকে বলেই দেবে! ভালোবাসাই তো পারে তালাবদ্ধ হৃদয়ের দরজা মুহূর্তের মধ্যে খুলে দিতে। এটাও ঠিক যে,পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় কষ্ট হল একতরফা ভালোবাসা। যদি অঘোর প্রত্যাখ্যান করে ওকে?
কমলিনী চুপ করে আছে দেখে অঘোরই কথা বলল আবার, ''কয়েক মাস আগে অন্ধ্রে দায়িত্বে থাকার সময় গোপন সূত্রে খবর পেয়ে জঙ্গলে তল্লাশি অভিযান চালিয়েছিল ওড়িশা পুলিশের স্পেশাল অপারেশনস গ্রুপ আর ডিস্ট্রিক্ট ভলান্টারি ফোর্সকে নিয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী। বাহিনীর উপস্থিতি টের পেতেই জঙ্গলের মধ্যে থেকে বাহিনীকে লক্ষ করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েছিলাম আমরা। বাহিনীর কয়েকজনকে খতম করে দিয়েছিলাম। কথাটা এইজন্য তোমাকে বলছি যে, অন্ধ্রের বর্ডারে যদি ওড়িশার ফোর্স ঢুকে অপরেশন চালাতে পারে, তাহলে আমাদের এখানেও ওড়িশা থেকে ফোর্স আসতে পারে।'' একটার পর একটা তির অভ্রান্ত নিশানায় ছুড়ে দিতে দিতে অঘোর বলে চলল, ''গোপীবল্লভপুরের বর্ডার পেরিয়ে গেলেই ওড়িশার চকসুরিয়াপদা। ওখান থেকে ফোর্সরা যদি তিন কিলোমিটার এলাকা কভার করে রাখে, আমাদের ভোন্ডুডিহির জঙ্গলটা সামলাতে একটু বেগ পেতে হবে। তারচেয়েও বড় কথা...''
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল অঘোর, কিন্তু তার আগেই ও প্যান্টের পকেট থেকে বের করে নিয়ে এল একটা সেমি-অটোমেটিক পিস্তল। জাদুকরের মতো তিনবার গোল হয়ে ঘুরে কমলিনীর পিছন দিকে দূরে তাক করে চার-পাঁচবার ট্রিগার চেপে দিল ও। কমলিনী কিছু বোঝার আগেই একটা লোকের ভয়ঙ্কর আর্তনাদ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল লোধাশুলির গভীর জঙ্গলে। আস্তে আস্তে আওয়াজটা কমে এল। কমলিনী পিছন দিকে ঘুরে দেখল, অনেক দূরে মোটা শালগাছের নীচে একটা লোক কাটা মুরগির মতো তিরতির করে কাঁপতে কাঁপতে থেমে গেল।
কমলিনীর দু'চোখজোড়া প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে অঘোর বলল, ''শেষ করে দিলাম। ভানু সর্দার। এমএলএ সুজয় সরেনের চামচা। গোপনে আমাদের সব খবর সংগ্রহ করে পুলিশের কাছে গিয়ে ফাঁস করছিল। প্রতিদিনই আসছিল। চোখে পড়েনি তোমার? ডেডবডিটা পড়ে থাক এখানে। শেয়ালে-কুকুরে ছিঁড়েছিঁড়ে খাক!''
কমলিনী অবাক হয়ে দেখল, গোধূলির রংমহল উজাড় করে ভেসে আছে জঙ্গলমহলের অস্তিত্বের মায়া। সিঁদুরমাখা মেঘের বন্ধু হয়ে, একটা ভয়ঙ্কর সুখের হাতছানি হয়ে, একাকীত্বের যন্ত্রণা হয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে উড়নচণ্ডী একটা ছেলে, গোধূলিকালীন স্নিগ্ধতায় জমে উঠছে কমলিনীর জীবনের ব্যথামুক্তির উপশম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন