চতুর্থ অধ্যায়

কমলেশ কুমার

''অন্ধকার কখনও অন্ধকারকে দূরীভূত করতে পারে না। শুধুমাত্র আলোই পারে অন্ধকারকে দূর করতে। তাই তো ও সি সাহেব?'' কথাটা বলে খ্যাকখ্যাক করে হাসতে লাগল সহদেব মুর্মূ।

অপহৃত ওসি যতীন দত্ত বুঝলেন, তিনি এখন উপহাসেরই পাত্র বটে। সাঁকরাইল থানায় যেসময় এরা হামলা চালায়, উনি তখন নিজের কোয়ার্টারে স্নান-খাওয়া সারছিলেন। হঠাৎ গুলির শব্দ কানে যায়। ইনটেলিজেন্সের থেকে খবর আগেই ছিল, কিন্তু পরিকাঠামোগত অসংখ্য সমস্যা থাকায় কোনও সতর্কতা নেওয়া যায়নি।

দুটো হাত, আর পা'দুটো মোটা দড়িতে বাঁধা অবস্থাতেই যতীন দত্ত বললেন, ''কিন্তু আমাকে পণবন্দি করা হল কেন, সেটাই তো বুঝতে পারছি না!''

কথাটা শুনে পাশে দাঁড়ানো শিবু বাস্কে হো-হো করে হেসে উঠল। ওর হাসির রেশ যেন থামতেই চাইছিল না। খানিকক্ষণ হেসে নিয়ে শিবু বলল, ''তাহলে আপনার অফিসের বলাই, কিংবা মেজবাবু রতন হাওলাদারের মতো আপনাকেও খতম করে দিলে ভালো হত বলছেন?''

শিবুর কথা শুনে সহদেব, জগদীশ, জয়ন্ত সকলেই শব্দ করে হেসে উঠল।

যতীন দত্তের গা-মাথা টলমল করছে এখন। পুরো মুখচোখ বেঁধে দিয়ে সেই যে বিকেলে নিয়ে এসে এই ঘরটাতে ঢোকানো হল ওঁকে, তারপর থেকে উনি জলস্পর্শ করেননি। তার কারণ মূলত দুটো। এক ভয়ে, আর দুই ঘৃণায়। চোখের সামনে উনি দুই সহকর্মীকে খুন হয়ে যেতে দেখেছেন আজ। জলের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে ওঁকেও যে হত্যা করা হবে না, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। আর দ্বিতীয়ত প্রবল ঘৃণা জন্মেছে এদের উপর। তোমার দাবিদাওয়া কিছু থাকতেই পারে, সরকারের সঙ্গে বসে আলোচনা করা যেতে পারে এব্যাপারে, কিন্তু সেই মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে মনে করিয়ে দিয়ে তুমি কারোর গলা কেটে দিতে পারো না। এ আবার কী ধরনের বিপ্লব!

''আমরা তো ফুলের মতো সূর্যের আলোতে ফুটতে পারি না ও সি সাহেব, বরং অন্ধকারে নক্ষত্রের মতো আলো ছড়াতে ভালবাসি।'' যতীন দত্তের মনের কথাটা যেন পড়ে ফেলল সহদেব মুর্মূ, ''আপনার সরকারকে বহু বছর ধরে আমাদের যৎসামান্য চাওয়াটুকু জানিয়ে এসেছি স্যার। কোনও ফল হয়নি। আচ্ছা আপনিই বলুন না, সাঁকরাইল থানায় আপনি এসেছেন কত বছর হল?''

কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না যতীনের, তাও সংক্ষেপে তিনি বললেন, ''তিন বছর।''

''আপনার কি একবারও মনে হয়নি, এই তিনবছরে জঙ্গলমহলের মানুষকে শুধুমাত্র কুত্তা ভেবে এসেছে আপনার সরকার?'' গলার ঝাঁঝ বাড়তে লাগল সহদেবের, ''আপনার কি একবারের জন্যেও মনে হয়নি এখানে খাদ্য, পানীয়, যোগাযোগ কিংবা চিকিৎসার অভাবে মানুষগুলো বছরের পর বছর নিঃশেষিত হয়ে চলেছে! আপনার সরকার যদি সামান্যতম নজর দিত এদিকে, আপনাদের এইভাবে মরতে হত না আজ।''

''বিজ্ঞের মতো ভালই তো কথা বলছেন! জানেন যখন সবটাই, আমাদের মতো নিরীহ অফিসারদের মারছেন কেন তাহলে?''

''নিরীহ!'' ব্যঙ্গের ছলে কথাটা বলে সহদেব জয়ন্তর দিকে তাকিয়ে বলল, ''এই, ওসি নিজেকে নিরীহ বলছে রে!''

জয়ন্ত, শিবুরা কোনও কথা বলল না। শুধু নিরীহ শব্দটাকে বারবার মুখে উচ্চারণ করতে লাগল, আর বিকট চিৎকার করে হাসতে লাগল।

এসব বড় বিরক্তিকর লাগছে যতীনের। কিন্তু উনি জানেন, পণবন্দিকে বহু চাপ সহ্য করতে হয়, যুদ্ধের আসামীর মতো মুখ বুজে থাকতে হয় সব সময়, জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে হাইফেনের মতো দুলতে হয়।

ওরা আজ যখন নিজের কোয়ার্টার থেকে তুলে নিয়ে এল যতীনকে, যতীন এতটাই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন যে, প্রথমে মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বের হচ্ছিল না। গলা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত তিন-চারটে কাপড় জড়ানো ছিল বলে ওরা বাইক নিয়ে কোন পথে গেল, কোন দিকে বাঁক নিল, কিছুই বুঝতে পারেননি উনি। শুধু মোটর সাইকেলের ঝাঁকুনির অনুভূতিটুকু টের পাচ্ছিলেন। এদিকের রাস্তাঘাট চরম খারাপ। বহু বছর আগের পিচ উঠে গিয়ে ধুলোমাটি হয়ে গিয়েছে এখন। সেখানে জল জমে কাদা হয়, কোথাও-কোথাও মোরামের লালমাটি বছরের পর বছর রোদে আর বৃষ্টির জলে তার কাঠিন্য হারিয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই হাঁটু সমান জলে ভর্তি হয়ে যায় চারপাশ। সেখান দিয়ে হেঁটে যাতায়াত করাই বিপজ্জনক, তো সাইকেল-মোটর সাইকেল!

যদিও এই এলাকার সব গলিঘুঁজি, জঙ্গল, পথঘাট, সাঁকো নিজের হাতের তালুর মতোই চেনেন যতীন, তাও কোন পথ ধরে যে ওরা নিয়ে এল তাঁকে, যতীন বুঝতে পারেননি। একেবারে টিনের চালের ছাওয়া এই ঘরটাতে ঢুকিয়ে যখন তাঁর মুখ থেকে কাপড়গুলো খুলে দেওয়া হল, যতীনের চোখ দুটো ধাঁধিয়ে গিয়েছিল প্রথমে।

যতীন তাকিয়ে দেখেছিলেন, ঘরে একটাও জানলা নেই। শুধু টিনের চালের কাঠামোর ফাঁক গলে একটু একটু আলো আসছিল। হাতঘড়িটাও ওরা পরে আসার সুযোগ দেয়নি, ঘরেও কোনও ঘড়ি না থাকায় সময় সম্বন্ধে কিছুই আঁচ করতে পারছিলেন না উনি।

''লোকে বলে খারাপ সময়, অর্থাৎ জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর পরেই নাকি থাকে উজ্জ্বল হয়ে ওঠার গল্পগুলো। আপনিও কি তাই মনে করেন ও সি সাহেব?'' সহদেবের গলার আওয়াজে চমকে উঠলেন যতীন।

কিছু বলার আগেই সহদেব আবার বলল, ''শয়তানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হলে আপনাকে অন্ধকার চিনতেই হবে। জানেন তো এটা?'' সামান্য একটু বিরতি দিয়ে সহদেব আবার বলল, ''আপনার সরকার বাহাদুর তো একটা মূর্তিমান শয়তান! ভয়ানক একটা খেলায় মেতেছে ওরা। মানুষকে শোষণ করতে করতে, বঞ্চিত করতে করতে শেষ সীমাটাও বোধহয় লঙ্ঘন করে ফেলেছে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তো বেড়ালও বাঘ হয়ে যায়, আর আমরা তো মানুষ! বছরের পর বছর অত্যাচার সহ্য করে এবার আমরাও ঘুরে দাঁড়িয়েছি।''

যতীন দেখলেন সহদেবের গলাটা আত্মবিশ্বাস আর আবেগে ভরপুর। ছেলেটার নাম যে সহদেব, সেটা উনি আগে জানতেন না। অন্য ছেলেগুলোর মুখ থেকে শুনে আন্দাজ করেছেন।

যতীন গলাটা খাদে নামিয়ে খুব শান্তভাবে প্রশ্ন করলেন, ''আমাকে নিয়ে কী পরিকল্পনা আপনাদের? আমাকে কি মেরেই ফেলবেন?''

সহদেবের গলাটাও একটু শান্ত শোনাল এবার, ''ও সি সাহেব, আমরা বিনা কারণে মানুষ খুন করি না। আপনার যে দুজন সহকর্মীকে আজ খুন হতে হয়েছে, আপনি নিজেও জানেন, তারা কী মারাত্মক অপরাধী। কনস্টেবল বলাই তো ঘুষ খেয়ে খেয়ে একটা টাকার কুমির হয়ে উঠেছিল, আর রতন হাওলাদার ছিল সরকারের চামচা। উঠতে-বসতে হেনস্তা করত এলাকার গরিবগুর্বোদের।''

যতীন প্রথমে কোনও কথা বলল না, পরে একটু চিন্তা করে বলল, ''আমরা সরকারের চাকর। সরকারের তৈরি করা রূপরেখা মতোই তো আমাদের হাঁটতে হবে!''

কথাটা শুনে চিৎকার করে উঠল জগদীশ, ''তাহলে প্রাণটাও হাতে করেই হাঁটবেন!''

এখন আর আগের মতো অতটাও ভয় করছে না যতীনের। ধীরে ধীরে যেন আত্মবিশ্বাসটা ফিরে আসছে। টিনের চালের দিকে তাকিয়ে ঘরে উপস্থিত সকলের উদ্দেশে উনি বললেন, ''আমাকে নিয়ে কী পরিকল্পনা বললেন না তো!''

সহদেবই জবাব দিল কথাটার, ''খুব ছোট্ট। আপনার সরকারের কাছে সেটা নস্যি। এক, আমাদের সহযোদ্ধা দুলাল হেমব্রমকে জেল থেকে ছেড়ে দিতে হবে। আর দুই, আপনাদের অ্যাডিশনাল পুলিশ কমিশনার বীতরাগ চক্রবর্তীকে একটু সাবধানে বুঝেশুনে চলাফেরা করতে বলতে হবে। রাতবিরেতে ওরকম গাঁ-গঞ্জে হামলা করতে আসা যাবে না।''

যতীন বুঝলেন, দুটো দাবির কোনওটাই ন্যায়সঙ্গত নয়। কারণ দুলাল হেমব্রম তিনটে খুনের অপরাধী। নয়াগ্রামের এক রেশন ডিলারকে বোম মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল ও, এ এস পি বীতরাগ স্যার তিনদিনের মধ্যে লোধাশুলির জঙ্গল থেকে অ্যারেস্ট করেন ওকে। আর দ্বিতীয় দাবিটা তো আরও ভয়ঙ্কর। বীতরাগ চক্রবর্তীকে জেলায় নিয়ে আসাই হয়েছে মাওবাদী দমনের জন্য, তাঁর ডানা সরকার কখনওই ছাঁটবে না।

রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের কমান্ড্যান্ট পদে দু'বছর কাজ করেন বীতরাগ স্যার। তারপর ডায়মন্ড হারবারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে উনি বছর তিনেক কাজ করেছেন। যতীন জানেন, গৌরবের কখনও নীরবতা হয় না। এটি একটি কণ্ঠস্বর, যার হৃদয় এবং আত্মা আছে। সত্য ও সাহসই এর ভিত্তি। এটি অপরাধীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এবং সত্য কথা বলবে। কারণ প্রতিটি মহান ব্যক্তি সর্বদা যা করে, তা অন্যরা করতে ভয় পায়। বীতরাগ স্যার সেই বিরল প্রজাতির একজন অফিসার, যাঁর চরিত্রটি হল সিনিয়র-জুনিয়র সব অফিসারদের প্রতিদিনের সমস্ত পছন্দের যোগফল। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে তিনি সেই দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছেন, যা তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে।

''কী হল ও সি সাহেব! কথা বলছেন না যে!'' জয়ন্ত নামে ছেলেটার গলার আওয়াজে চমক ভাঙল যতীনের। টিনের চাল আর দেওয়ালের মাঝখানে চোখ রেখে তিনি দেখলেন, আলোটা মরে এসেছে প্রায়। তার মানে সন্ধে হয়ে এল। বাইরে পাখির কলকাকলি শোনা যাচ্ছে। তার মানে এই ঘরটাও কোনও জঙ্গলের মধ্যেই হবে। কোথায় এটা? লোধাশুলি? নাকি ভোন্ডুডিহি! নাকি ছাতিনাশোলের ধুধু মাঠের মধ্যে কোথাও?

কিছুই বুঝতে পারছিলেন না যতীন। ক্লান্তি এসে ভিড় করছিল। হাত আর পায়ের বাঁধনটা এখনও যে কেন খোলেনি ওরা, যতীন জানেন না। একটা তক্তার উপর বসে দেওয়ালে হেলান দিয়ে এতক্ষণ কথা বলছিলেন উনি, শুতে ইচ্ছে করছে। খিদেও পেয়েছে চরম। তবে সবকিছুকে ছাড়িয়ে প্রকট হয়ে উঠছে নিজের জীবন নিয়ে উৎকণ্ঠা।

উনি জানেন, এতক্ষণ মিডিয়ার মাধ্যমে গোটা দেশ জেনে গিয়েছে এ-খবর। সাঁকরাইল থানার ওসিকে পণবন্দি করে নিয়ে গিয়েছে মাওবাদীরা। এই খবরটা জানতে পারলে বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী, দশ বছরের মেয়েটার কী অবস্থা হবে তা খুব ভালোই বুঝতে পারছেন যতীন দত্ত, কিন্তু তিনি অসহায়, খাঁচায় বন্দি বাঘের যেমন করার কিছুই থাকে না, যতীনের অবস্থাও এখন তাই-ই। মৃত্যু যতটা না ক্ষতিকারক, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হল মৃত্যু ভয়। মৃত্যু জীবনের বিপরীত নয়, এটা যে জীবনেরই একটা অংশ, সেটা খুব ভাল করেই জানেন যতীন। কিন্তু এমন মৃত্যু উনি সত্যিই চাননি। কেউ কি চায় এমন মৃত্যু!

''খেয়ে নিন অফিসার, আপনার কিছু হয়ে গেলে ওপর মহলের কাছে মুখ দেখানোর পথ থাকবে না। অন্তত জলটুকু তো খান!''

কথাটা শুনে যতীন কিছু জবাব দিলেন না, শুধু ব্যঙ্গের সুরে বললেন, ''ওপর মহল! আপনাদেরও ওপর-নিচ হয় বুঝি!''

যতীনের কথা শুনে সহদেবের চোখটা ধক করে জ্বলে উঠল একবার। চিবিয়ে-চিবিয়ে ও বলল, ''মৃত্যু ভয় বুদ্ধিমত্তার লক্ষ্মণ। শুধু নির্বোধদেরই মৃত্যু ভয় থাকে না। জানেন তো ও সি সাহেব! আপনি আসলে আপনার সরকারি ঔদ্ধত্যটাই পেয়েছেন। তাই এমন কথা বলতে পারলেন।''

যতীন দেখলেন, তর্ক করা বৃথা। তাই অনুরোধের সুরে বললেন, ''হাত-পায়ের বাঁধনগুলো খুলে দিন না ভাই!''

''দুঃখিত। ওপর মহলের নির্দেশ নেই।''

যতীন দেখল ঘরটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছে পুরোপুরি। শিবু, জগদীশ, জয়ন্ত, সহদেবদের ছায়ামূর্তির মতো লাগছে এখন। দেওয়ালের গায়ে একটা সুইচে হাত দিয়ে আলোটা জ্বেলে দিল সহদেব। জিরো পাওয়ারের যে নাইট ল্যাম্পটা জ্বলল, সেটা ঘরের অন্ধকারকে দূর করতে পারল না।

যতীনের কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না একদম। চারপাশে চোখ বুলিয়ে তিনি দেখলেন, ঘরের এক কোণে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ৭.৬৫ এম এম ক্যালিবারের বেশ কিছু দিশি পিস্তল, যেগুলো অল্প পাল্লায় ব্যবহারে প্রায় বিলিতি পিস্তলের মতোই কার্যকরী। রয়েছে বেশ কিছু পাইপগান। এই পিস্তলের পাল্লা বড়জোর পঁচিশ ফুট। তবে পনেরো ফুটের মধ্যে মারণ-ক্ষমতা যথেষ্ট।

যতীন জানেন, আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে হাতে একটা ঝাঁকুনি লাগে। এটাকে রিকয়েল বলে পুলিশি পরিভাষায়। অভ্যস্তরা সেই ধাক্কা সামলে ঠিকঠাক নিশানা করতে পারে। কিন্তু রিকয়েল সামলাতে না পারলে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। অস্ট্রিয়ার একটা নামজাদা বন্দুক তৈরির সংস্থার বানানো পিস্তলে যেভাবে রিকয়েল কমানো হয়েছে, প্রায় একই ধরনের কারিগরি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে মুঙ্গেরের এই মডেলে। ফলে, আনাড়ি লোকও এই পিস্তল চালাতে পারবে অনায়াসে। কিন্তু মাওবাদীদের হাতে এত অস্ত্রশস্ত্রের জোগান আসছে কোত্থেকে সেটা ভেবেই অবাক হচ্ছিলেন যতীন দত্ত।

এই ভাবনাটাও বোধহয় ধরে ফেলল সহদেব। ও বলল, ''আপনাদের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপের বাবার ক্ষমতা নেই এইসব অস্ত্রের সন্ধান পায়, কেন জানেন ও সি সাহেব? আমাদের সঙ্গে গোটা জঙ্গলমহলের মানুষের সমর্থন আছে। হাজার চেষ্টা করলেও আপনারা তাই আমাদের কার্যকলাপ ধরতে পারবেন না।''

একটু বিরতি দিয়ে সহদেব আবার বলল, ''সুস্পষ্ট চিন্তাভাবনায় বুদ্ধির চেয়ে সাহসের প্রয়োজন অনেক বেশি। আর আমাদের সেটা আছে। ভাববেন না, বন্দুক কাঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছি বলে আমরা মুখ্যুসুখ্যু সবাই। পেটে বিদ্যেও আছে কিছুটা।'' যতীন দেখলেন, ঘরের ম্রিয়মাণ আলোয় সহদেবের চোখদুটো প্রায় বুজে এল। কিছুটা গর্ব মিশিয়ে আদুরে গলায় ও বলল, ''আমি এম এস সি, ইকনমিক্স। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি।''

কথাটা শুনে যতীন তক্তা থেকে পড়েই যাচ্ছিলেন আর একটু হলে। কিন্তু সহদেবের পরের বাক্যটা শুনে মনে মনে কঠোর হয়ে উঠলেন তিনি, ''জঙ্গলমহলের ঈশ্বর মুথুকুমারনকে ধরতে আপনাদের মতো কুত্তার বাচ্চাদের চারবার জন্ম নিয়ে আসতে হবে!''

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%