কমলেশ কুমার
''প্রতিশোধ নেওয়ার মধ্যে একটা অনুপ্রেরণা আছে, তাই না অঘোর? যাদের জন্য আমার বাবা কাকা আত্মীয়স্বজনদের চরম ক্ষতি হয়ে গেল, সেইসব লোকেদের চরম শাস্তি পেতে দেখলে মনের ভেতর কেমন যেন একটা শিরশিরে আনন্দের স্রোত বয়ে যায়, তাই না? নিজের কিংবা নিজের বন্ধুদের প্রতিমুহূর্তে বিপদে ফেলছে যারা, তাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়া কেবলমাত্র অধিকারই নয়, এটা পরম কর্তব্য বলে আমি মনে করি।' কমলিনীর কথা শুনে অঘোর নতুন করে ভাবতে শেখে এখন।
অঘোর বোঝে, ওর নিজের মধ্যে শুধু নিষ্ঠুরতাটুকু ছিল এতদিন, অন্ধ্রপ্রদেশে থাকার সময় বহু মানুষের চোখের জল ওর মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বেলেছিল, শাসকশ্রেণির উন্মাদ-উল্লাসকে বন্দুকের নল দিয়ে দমন করতে পারলে ও সাময়িক আনন্দ পেত। কিন্তু এই মেয়েটার চিন্তাভাবনা একেবারেই আলাদা। প্রতিটা প্রতিশোধ আর প্রতি-আক্রমণের স্বপক্ষে ওর খুব কঠোর কিছু যুক্তি থাকে। প্রতিটা অ্যাকশনের পিছনে ওর নিজস্ব অভিমতটা কেউ খণ্ডন করতে পারে না।
অঘোরের মনে পড়ে অন্ধ্রপ্রদেশে নেতৃত্ব দেওয়ার দিনগুলোর কথা। দেশে মাওবাদী উত্থানে অন্ধ্রপ্রদেশের গহন জঙ্গলের ভূমিকা বলে শেষ করা যায় না। ওখান থেকে অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে মাওবাদীরা। ক্রমশ মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, ওড়িশা, বিহার, ঝাড়খণ্ডে তারা ঘাঁটি গাড়ে। মাওবাদীদের আরও দুটো শক্ত ঘাঁটি ছিল সুকমা আর গড়চিরোলিতে। কাজের সূত্রে অঘোরকে প্রায়ই যেতে হত ওখানে। ওখানকার গহন জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে থাকত মাওবাদী স্কোয়াড সদস্যরা। অনেক সময় তাদের মারণ আক্রমণের মুখে পড়ে নাজেহাল অবস্থা হত পুলিশ আর সিআরপিএফ বাহিনীর।
অঘোরের মনে আছে মাওবাদী-বাহিনীর অন্ধ্রপ্রদেশের থিগালামেত্তা জঙ্গলে একবার লড়াইয়ের কথা। মুন্নাইয়া কাশ্যপ নামে একটা মেয়ে নেতৃত্বে ছিল সেবার। ওদের সঙ্গে অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের বিশেষ দল গ্রেহাউন্ড বাহিনীর প্রবল লড়াই বাঁধল। গুলির লড়াই চলেছিল দীর্ঘক্ষণ। বেশ কিছুক্ষণ এমন চলার পর গ্রেহাউন্ড বাহিনীর তেরো জন সদস্যকে প্রাণে মেরে দিতে সক্ষম হয় মাওবাদীরা। প্রবল লড়াইয়ে প্রাণ যায় সাতজন মাওবাদীরও। তাদের দেহ জঙ্গল থেকেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে গ্রেহাউন্ড বাহিনী। সেই পুলিশি এনকাউন্টারে মুন্নাইয়া মারা যায়। তেইশ বছর বয়স ছিল মেয়েটার। ওর চোখেও আগুনের ফুলকি দেখেছিল অঘোর। ওর হাতেও মারণাস্ত্র কথা বলত। গেরিলাযুদ্ধে উচ্চপ্রশিক্ষিত মুন্নাইয়া শুধু যুদ্ধটুকুই করতে পারত, কমলিনীর মতো এতটা গুছিয়ে কথা বলতে পারত না।
আচ্ছা, যদি কোনওদিন মুন্নাইয়ার মতোই অবস্থা হয় কমলিনীরও! ওদের এই যোদ্ধাজীবনের অস্তিত্বটুকু বড়ই সাময়িক। জঙ্গল ওদের আপন করে নিলেও, প্রশাসন ওদের চিরশত্রু। গোপনে গুপ্তঘাতক কখন যে ফাঁদ পেতে থাকবে, সময়ের ভগ্নাংশে জীবনটা কোন গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাবে কিংবা পুলিশি জুলুমের মুখে পড়ে শরীরটা একটা মাংসপিণ্ডে পরিণত হবে কেউই বলতে পারে না।
কথাগুলো ভাবলেই একটা মনখারাপের তরঙ্গ অঘোরের গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। মনুষের দুঃখ দেখতে দেখতে ওর মস্তিষ্কের আবেগের কুঠুরিটা বহুবছর আগেই রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কমলিনীর সঙ্গে আলাপের পরে, ওর অস্ত্রপ্রশিক্ষণের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে কোথায় যেন একটা তাল কেটেছে সেটা ও বেশ বুঝতে পারে। বনেজঙ্গলে কমলিনীর সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর সময়, ওর সঙ্গে কথা বলার সময় কেমন যেন একটা নরম অনুভূতির সৃষ্টি হয় আঘোরের মনে। কমলিনী যখন প্রাণ খুলে হাসে, খলবল করে বন্যার জলের মতো ভাসিয়ে দেওয়া কথা বলে, ওর দিকে নিগূঢ় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে, অঘোরের মনে হয় এই পৃথিবীতে মৃত্যুও বড় তুচ্ছ। তখন শুধু কমলিনীকে একবার স্পর্শ করতে ইচ্ছে করে ওর। ওর নরম ঠোঁট দুটোর ওপর আঙুলটা রাখতে ইচ্ছে করে অঘোরের।
গোপীবল্লভপুর থেকে বাইশ কিলোমিটার দূরে হাতিবাড়ির অপূর্ব সৌন্দর্যের মধ্যে ওরা দু'জন দাঁড়িয়ে রয়েছে এখন। পাশ দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে সুবর্ণরেখা নদী। নদীর কাছে এলে মানুষের হৃদয় নাকি আরও মহৎ হয়ে যায়, মানুষকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে, কিছুদিন আগেই বলেছিল কমলিনী।
কমলিনীর সব কথা অঘোর বুঝতে পারে না। কেমন যেন হেঁয়ালির মতো মনে হয়। এই যে ওরা দু'জন আজ সূর্যদার নির্দেশে একটা বিশেষ কাজ নিয়ে ছদ্মবেশে হাতিবাড়ি এসেছে, তাতেও কমলিনীর হাজার হেঁয়ালি ছিল।
কমলিনী বলেছিল, ''সুবর্ণরেখার সামনে দাঁড়ালে বুকের মধ্যে প্রেম-পিরিতি উথলে ওঠে অঘোর। তেমন যদি সত্যিই হয়, কী করব তখন?''
অঘোর কোনও কথা বলতে পারেনি। শুধু ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো বের করে হেসেছিল।
সুবর্ণরেখা নদীর তীরে একটা বিশেষ জায়গা আজ ওদের টার্গেট। ওদিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল অঘোর আর কমলিনী। পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছিল ওরা। নদীর চরে কোনও জনমনিষ্যি নেই। দু'একজন জেলে নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরছিল।
হাঁটতে-হাঁটতে মাঝে মাঝে কমলিনীর হাতটা অঘোরের হাতে ঠেকে যাচ্ছিল, অঘোর একটু বিব্রত বোধ করলেও, কমলিনী ওর হাতটা সরিয়ে নেওয়ার কোনও চেষ্টাই করছিল না। অঘোর দেখল, মেঘনীল বিকেলের মতো কমলিনীর মুখটা স্বচ্ছ লাগছে এখন। আকাশ থেকে কমলা রঙের একটা আভা এসে পড়েছে ওর মুখে। অঘোর জানে, মেয়েদের এই আলোতেই পাত্রপক্ষ পছন্দ করে, তাই এই আলোকে কনে দেখা আলো বলে।
কমলিনীর দুটো চোখ দূরের সুবর্ণরেখায় স্থিরভাবে নিবদ্ধ ছিল।
অঘোর জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিল না। বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে কমলিনীকে দেখছিল।
দীর্ঘ নিস্তব্ধতার পরে কমলিনী মুখ খুলল, ''জানো অঘোর, সুবর্ণরেখা নামটির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে সোনার কথা। অনেকেই মনে করে এই নদীর জলে মিশে রয়েছে সোনার কণা। এই নদীর উৎপত্তি কোথায় সে তো তুমি জানোই!''
''রাঁচির পিস্কা গ্রামে।''
''হ্যাঁ। শোনা যায়, বহুদিন আগে ঝাড়খণ্ডের পিস্কা গ্রামে সোনার খনি ছিল। সোনার খনির কাছে ছিল বলেই এই নদীর নাম সুবর্ণরেখা। অনেকেরই বিশ্বাস, সোনার খনি থেকে সোনা মিশে যায় নদীতে। বর্ষায় যখন দু'কূল ভেসে যায় এই নদীর, অনেকেই ভাবে, নদীর দুই পাড়ে বালির সঙ্গে বোধহয় সোনাও মিশে গেল। এখনও অনেকে নদীতে জল কমলে বালি থেকে সোনা খুঁজতে থাকে।''
অঘোর অতিসাধারণ একটি ছেলে। এত তত্ত্ব-তথ্য ওর মাথায় থাকে না। কিন্তু কমলিনীর প্রতিটা বিষয়ে ব্যাখ্যা, ছোট ছোট জ্ঞানগর্ভ কথা শুনে ওর বারবার মনে হয় এরকম মেয়ের হাতে অস্ত্র মানায় না। পড়াশোনা করে ইস্কুলের দিদিমণি হলে ঠিক হত বোধহয়।
অঘোর এক যুদ্ধহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে তখন। ওদের আদিবাসী মহল্লার প্রতিটা মানুষ তাদের অধিকার ফিরে পায় যদি সেদিন! রাস্তাঘাট, পানীয়জল, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরিষেবায় জঙ্গলমহলে রূপোর কাঠি ছুঁইয়ে দেয় যদি কেউ! রাতের আকাশজুড়ে বারুদের ধোঁয়া ভেসে বেড়াবে না সেদিন, এক অনাহূত দিনের স্বপ্ন নিয়ে যদি কমলিনী ফিরে আসে আবার! ওর হাতে থাকবে চক-ডাস্টার। সামনে জঙ্গলমহলের দু-মুঠো খেতে-পাওয়া অসংখ্য বাচ্চার দল!
যদিও কমলিনী নিজে চেয়েছিল পুলিশ হতে। কিছুদিন আগেই অঘোরকে জানিয়েছে ও। পুলিশের খাকি উর্দি ওর নাকি রাতের স্বপ্নে ফিরে ফিরে আসে। এই একটা জায়গাতেই কমলিনীকে সমর্থন করতে পারে না অঘোর। অঘোরের কাছে পুলিশ মানে দুঃশাসনের অসহিষু�তা, মিথ্যাচার আর প্রবঞ্চনা।
দিনকাল নিশ্চয়ই পাল্টাবে। ওদের সংগ্রাম একদিন নিশ্চয়ই সফল হবে, ভাবল অঘোর।
''এই নদীর জলের উৎস কী, জানো অঘোর?'' কমলিনীর প্রশ্নে চমক ভাঙল ওর। ওর উত্তরের অপেক্ষা না করেই কমলিনী বলে চলল, ''হুড্রু জলপ্রপাত। ওখান থেকে ঝাড়খণ্ডের সিংভূম জেলা দিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুর হয়ে ওড়িশায় প্রবেশ করেছে। এরপর এটা বঙ্গোপসাগরে মিশেছে।'' একটু থেমে কমলিনী আবার বলল, ''হুড্রু জলপ্রপাত তুমি দেখেছ, অঘোর?''
''হ্যাঁ।''
''আমিও দেখেছি জানো! সহদেবদার সঙ্গে একবার গিয়েছিলাম সংগঠনের কিছু কাজে। তখনই দেখেছিলাম।''
অঘোর দেখল, কিশোরীবেলার মেয়েদের মতো দামালপনা জেগে উঠছে কমলিনীর সর্বাঙ্গে। এমন প্রাণোচ্ছল টুনটুনি পাখির মতো মেয়েরা শরীরে বিষবাষ্প নিয়ে যে-কোনওদিন ঘুরে বেড়াতে পারে না, সেটা বুঝতে পারে অঘোর, আবার অঘোর এটাও জানে যে, বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে এইসব মেয়েরা কেমন খেপে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে ওর চেয়ে নৃশংস যে আর কেউ হবে না, সেটাও তো ওর নিজের চোখেই দেখা।
আজকে খোকা সৎপতি নামে এক রেশন ডিলারের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এসেছে ওরা। ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ, একদিকে বরাদ্দের তুলনায় কম পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে রেশন, অন্যদিকে বাকি সামগ্রী চড়া দামে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে খোলা বাজারে। ঘটনার কথা বারবার জানানো হয়েছে আধিকারিকদের। তাদের একটাই কথা, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পাচার হওয়ার আগে হাতে-নাতে রেশন সামগ্রীবোঝাই মিনিডোর একবার আটকেছিল গ্রামের মানুষ। গাড়ি আটকে বিক্ষোভ চলেছিল। কিন্তু অন্ধকার কাটেনি।
সূর্যদার নির্দেশে ওরা দু'জন আজকে এসেছে হাতিবাড়িতে।
সূর্যদা বলেছে, ''খোকা সৎপতির মতো মানুষরা শ্রেণিশত্রু। ওদের চিহ্নিত করতে হবে। যারা গরিবদের টাকা গায়েব করে নিজেরা রাজপ্রাসাদ বানাচ্ছে, তাদের একটাকেও বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।''
সুবর্ণরেখা নদীর তীরে একটা বালির বড়সড় গুদামঘর আছে, নদীর চর থেকে তুলে নেওয়া বালি ওখানে থেকে সারা রাজ্যে বিক্রি করে কয়েকজন। তার পাশেই রয়েছে খোকা সৎপতির বিরাট একটা বাংলোবাড়ি।
সূর্যদা বলেছে, ''ওবাড়িতে খোকা সৎপতি থাকে না। ওখানে থাকে লোককে ঠকিয়ে সঞ্চয় করে রাখা রেশনের উদ্বৃত্ত মাল। তোরা গিয়ে ভাল করে দেখে আয়। লোকটাকে প্রাণে মেরে দেওয়ার আগে সত্যতা বিচার করে নেওয়াটা খুব জরুরি।''
সুবর্ণরেখার ধারে এখন গোধূলির রংমশাল। কমলিনী দু'চোখ ভরে উপভোগ করছে সেসব। ও মনের পাতা জুড়ে লিখে রাখছে সহস্র রঙিন দৃশ্যাবলী।
কমলিনী জানে একবার ডুবতে শুরু করলে ফিরে আসার রাস্তাটা কতটা কঠিন। একটা বিপর্যয় এসে ধাক্কা দিলেও সেই শোক সামলে ওঠা যায় না। তাও, অঘোরের জন্য বুকের গভীরে কোথাও কি সলতে পাকিয়ে প্রস্তুত থাকছে ও? যদি কোনওদিন অঘোর আসে! ওর বুকের মধ্যে প্রবেশ করে যদি জ্বেলে দেয় হাজারটা মোমবাতি!
অঘোর যখন কমলিনীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন ও মনে মনে অস্থির হয়ে ওঠে কেন! কেন সে হাজারটা কথা ভাবতে থাকে তখন! কেন তাকিয়ে আছে, এখন কেন তাকাচ্ছে না, তাকিয়ে সে কী ভাবছে, এইসব উলোঝুলো প্রশ্নে কেন বিধ্বস্ত হয়ে যায় কমলিনী!
এমনিতে ও খুবই সাহসী মেয়ে। তাও অঘোর সামনে এলেই কেমন যেন একটা বিপন্নতা ঘিরে ধরে ওকে। কেমন যেন একটা ভয় কাজ করে। অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করলেও কোথায় যেন একটা দ্বিধা এসে জড়ো হয়। মনে হয়, যদি কোনও ভুল করে ফেলে ও! যদি অঘোর ছেড়ে চলে যায় ওকে!
আরও একটা চিন্তা ওর মাথায় পাক খেয়ে চলে সবসময়। ওদের আন্দোলন তো একদিন শেষ হবেই। হয়তো সুদিন আসবে জঙ্গলমহলে। সেদিন কি অঘোর ভুলে যাবে ওকে! অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে সুখে ঘর-সংসার করবে ও?
কমলিনী তাকিয়ে দেখল দূরের সুবর্ণরেখায় সন্ধ্যা নেমে আসছে। জীবন আর প্রকৃতি স্থবির হয়ে যায় এরকম মনোরম আবেশে। কমলিনীর মতো প্রকৃতিও যেন ঢেলে দিয়েছে এক ব্যথাবিহ্বল অনুরাগ। পশ্চিম আকাশ অপরূপ রূপাঞ্জলিতে ছেয়ে উঠল হঠাৎ। দেখে মনে হতেই পারে, কোনাও অভিজ্ঞ চিত্রকর তার রঙের ভাণ্ডার উজাড় করে পরম যত্নে এঁকে দিয়েছে রঙিন দৃশ্যাবলী।
অঘোর দেখল, অস্তগামী সূর্যের নিস্তেজ আলোর ছটা এসে পড়েছে দূরে তাকিয়ে-থাকা কমলিনীর মুখের ওপর। পাখিরা দ্রুত বাসায় ফিরে আসছে। হাতিবাড়ির ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠছে দ্রুত। কুপি, হ্যারিকেন, প্রদীপের আলোয় মেতে উঠছে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষজন।
কাঁচাবাড়িগুলো থেকে উঠে আসা কুণ্ডলীপাকানো ধোঁয়া, তুলসীতলার প্রদীপ, ঝিঁঝিপোকার ডাক বাতাসকে যেন একটা অপরূপ স্নিগ্ধতা দিচ্ছে। সেই স্নিগ্ধতার মধ্যে দু'জন আদিবাসী যুবক-যুবতী পরস্পরের প্রতি অনেক আকাঙ্ক্ষা আর ভালবাসার মায়াজাল বিস্তার করে দাঁড়িয়ে রইল সুবর্ণরেখার নির্জন বালিতটের উপর।
একটা মালবোঝাই বিশাল লরি ঠিক সেসময়েই গোঁ-গোঁ আওয়াজ করতে করতে খোকা সৎপতির রাজপ্রাসাদ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে পাকারাস্তায় উঠে এল। চকিতে সতর্কতা অবলম্বন করল কমলিনী আর অঘোর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন