কমলেশ কুমার
যতীন দত্তের আজ খুব ভোরেই ঘুম ভেঙেছে। যদিও এই দু'দিন কখন দুপুর হল, কখন ভোর হল, কিছুই বুঝতে পারেননি তিনি। খাওয়া-দাওয়া ইচ্ছে করেই করেননি। নেহাত জলটুকু না খেলে শরীর ঝিমঝিম করছিল, তাই খাওয়া। মাঝে মধ্যে ওরা নিজেরা চা খাচ্ছিল। যতীন দত্তকেও খেতে অনুরোধ করছিল বারবার, তাই কয়েক কাপ চা খেয়েছেন উনি।
কাল রাতেই প্রথম খবরটা দেওয়া হয় তাকে। আজ দুপুর নাগাদ তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। জেলা পুলিশ সুপার ওদের দাবি নাকি মেনে নিয়েছে।
যতীন দত্তের মনটা একইসঙ্গে একটু খুশিখুশি, আবার একটু বিষণ্ণও। দু'দিনের যমে মানুষে টানাটানির পরে, মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখে অবশেষে মুক্তি পাচ্ছেন তিনি। এই মুক্তির স্বাদ পৃথিবীতে সকলে পায় না, খুশিটা এই কারণে।
অন্যদিকে তিনি জানেন, দুলাল হেমব্রম কতটা ভয়ঙ্কর। পুলিশের ত্রাস সে। বোমা-বারুদে সিদ্ধহস্ত। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অ্যাডিশনাল পুলিশ সুপার বীতরাগ চক্রবর্তী ওকে ধরেছিলেন। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। নিজের জীবনের বিনিময়ে দুলালকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। গোটা পুলিশ বাহিনীর কাছে এ বড় লজ্জার। তাই যতীন একটু বিষণ্ণ।
তবে এই দু'দিন ওর সঙ্গে বিশেষ খারাপ ব্যবহার করেনি মাওবাদীরা। এখানে থাকতে থাকতে আবেন হাঁসদা, সহদেব মুর্মূ, লক্ষ্মীরতন মাহাতো, জগদীশ কিস্কু, ধানি কিস্কু সবার সঙ্গেই পরিচয় হল।
জগদীশ কিস্কু নাকি আবার অচেনা কোনও মানুষের হাতে খুন হয়ে গিয়েছে পরশু সকালে। সেই নিয়ে ওদের নিজেদের মধ্যে বিরাট হইচই। কে মারল ছেলেটাকে!
আর একজনের কথা যতীন দত্তের সারাজীবন মনে থাকবে, সে হল কমলিনী সরেন। মেয়েটার বয়স কম, কিন্তু মারাত্মক অধ্যবসায়। মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, মাওবাদ সব এই বয়সেই গুলে খেয়ে ফেলেছে। কী সুন্দর সুন্দর কথা বলছিল যতীনের সঙ্গে। মেয়েটার বেশ কয়েকটা কথা মনে গেঁথে থাকবে যতীনের।
কাল বিকেলে যেমন কমলিনী বলল, ''সব ধরনের অনিশ্চয়তা, হতাশা আর বাধা সত্ত্বেও নিজের সবটুকু দিয়ে সফল হওয়ার চেষ্টাই শক্তিমান মানুষকে দুর্বলদের থেকে আলাদা করে।''
ওসি চেষ্টা করেছিলেন ওকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য একটু অনুপ্রাণিত করতে, কিন্তু কমলিনী বলল, ''হাজার মাইলের যাত্রা শুরু হয় একটি মাত্র পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে। আমরা অনেক বড় লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি স্যার। এই তো সবে যাত্রা শুরু আমার!''
ওর কথা শুনে যতীন আর কিছু বলতে পারেননি। ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন সহদেব মুর্মূর ব্যাকগ্রাউন্ড শুনেও। কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে ইকনমিক্সে মাস্টার্স ও, ভাবা যায়!
যতীন দত্ত নকশাল আন্দোলনের ইতিহাস জানেন। সে-সময় যে-ধরনের ছাত্র-যুব আন্দোলন দেখা গিয়েছিল, তা প্রায় স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে তুলনীয়। সেদিন নিজেদের অগ্রপশ্চাৎ না-ভেবে হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ-তরুণী সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। যেভাবে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার বা শ্রেণিশত্রু খতম করার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন তাঁরা, স্বাধীন ভারতে তার আর কোনও দ্বিতীয় নজির নেই। হাজারে হাজারে ছাত্র গ্রামে চলে যাচ্ছেন, কৃষকের আন্দোলনে পাশে দাঁড়াচ্ছেন - এ জিনিস তো অভাবনীয় ছিল।
চারু মজুমদার, কানু সান্যাল জঙ্গল সাঁওতালদের নেতৃত্বে সেদিনের নকশালবাড়ি আন্দোলন মোটেই ব্যর্থ হয়নি, হয়তো নেতৃত্বের দুর্বলতাই সেই আন্দোলনকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারেনি।
ঘরে ক্যাঁচ করে দরজা খোলার আওয়াজে চমক ভাঙল যতীনের। তিনি দেখলেন, কালো প্যান্ট-জামা আর মাথায় একটা টুপি পরে ঘরে ঢুকল ছিপছিপে একটা লোক। টুপিটার রংটাও মিশমিশে কালো। লোকটার গায়ের রং কালোই বলা যায়। বয়স পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। হাতে কালো মোটা ব্যান্ডের ঘড়ি। দাড়ি-গোঁফ কামানো। জুলপির কাছটা কাঁচা-পাকা চুলে ভর্তি। টুপি পরে থাকার কারণে মাথায় চুল আছে, কি নেই ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
''নমস্কার বাবু!''
যতীন দত্ত দেখলেন লোকটার বাংলা কথায় যথেষ্ট টান রয়েছে। তবে গলা শুনেই চমকে উঠলেন তিনি। তাকে চিনতে কোনও ভুল হয়নি। অসংখ্যবার এই লোকটাকে সংবাদ-মাধ্যমের কাছে মুখ খুলতে দেখা গিয়েছে। যদিও মুখটা গামছায় ঢাকা থাকে সবসময়।
যতীন প্রতিনমস্কার করলেন।
লোকটা হাসি হাসি মুখে বলল, ''আমার নাম মুথুকুমারন।''
''হ্যাঁ। চিনি আপনাকে।''
''আজ তো আপনার ছুটি!''
''ধন্যবাদ।''
''ফিরে গিয়ে আবার সরকারের চামচাগিরি করতে লাগবেন তো?'' কঠোর শোনাল মুথুকুমারনের গলা।
''চাকরি করি তো, চাকরিটা তো ছেড়েও দিতে পারব না! তাই সরকার যেমন চাইবে!'' সাহস হল সকল গুণের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, যতীন ভালমতোই জানেন, সাহস ছাড়া মানুষ অন্য কোনও ভাল কাজকে ধারাবাহিকভাবে অনুশীলন করতে পারে না। তাই সাহসে ভর করে কথাটা বলেই দিলেন উনি।
কথাটা শুনে গুম মেরে গেল মুথুকুমারন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল, ''পৃথিবীতে সবচেয়ে সাহসিকতার পরীক্ষা কী জানেন তো? পরাজিত হয়েও কষ্ট না পাওয়া। তাই ভবিষ্যতে আপনি বা আপনার ডিপার্টমেন্ট যদি খুব কষ্ট পান, সাহসিকতার দ্বারা সেটা মানিয়ে নেবেন, কেমন?''
যতীন দেখলেন মুথুকুমারনের কপালের কাছে শিরাগুলো সাময়িকভাবে ফুলে উঠল। এটা যে ওর প্রচ্ছন্ন হুমকি, সেটা যতীন দত্তের মতো একজন দুঁদে পুলিশ অফিসারের বুঝতে বাকি রইল না।
হঠাৎ যতীনকে অবাক করে দিয়ে একটা লম্বা শিস দিয়ে উঠল মুথুকুমারন। সঙ্গে সঙ্গে ঘরে এসে ঢুকল ধানি কিস্কু, আবেন হাঁসদা, আর খগেন মাহাতো।
মুথুকুমারন ইশারায় ওদের কিছু নির্দেশ দিল।
খগেন মাহাতো যতীনের কাছে এগিয়ে এসে বলল, ''পাউরুটি আর ঘুগনি আছে, খেয়ে নিয়েন! আপনার যাওয়ার সময় হয়ে এল।''
'যাওয়ার সময় হয়ে এল' কথাটা শুনে কেমন যেন একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল যতীনের গোটা শরীরে। তিনি ঘাড় নেড়ে খেতে অসম্মতির কথা জানালেন।
ওরা জোড়াজুড়ি করল না। ধানি কিস্কু একটা ব্যাগ থেকে তিনটে তিন রঙের কাপড়ের টুকরো বের করল, তারপর যতীনের কাছে এগিয়ে এসে ওর কোনও অনুমতি না নিয়েই একটা একটা করে মুখে বেঁধে দিল। দুটো হাত পিছমোড়া করে বেঁধে দিল কেউ।
নিমেষের মধ্যে যতীনের চোখের সামনেটা অন্ধকার হয়ে গেল। ওকে পুনরায় হয়তো বাইকে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে কোনও একটা জঙ্গলে। কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে, কিংবা কোথায় রাখা হয়েছিল ওকে, সে-সম্পর্কে বিন্দুবিসর্গ জানেন না যতীন।
আগের দিনও এই সময়টাতে খুব অসহায় লেগেছিল ওর। কেমন যেন অন্ধকার চতুর্দিকে। যদিও যতীন জানেন, রাত যত অন্ধকার হয়, তারাগুলো আরও উজ্জ্বল হয়।
যতীনের পাশে যে ওর গোটা ডিপার্টমেন্ট দাঁড়িয়েছে, এমনকি সরকারও, সেটা ভেবেই চোখে জল এল যতীনের।
কেউ একজন ওর গলায় দড়ি দিয়ে কিছু একটা ঝুলিয়ে দিল, তারপর দুজন লোক ওকে দু'দিকে ধরে ধরে ঘর থেকে বের করে আনল। রোদের তেজ সামান্য একটু গায়ে এসে লাগল যতীনের, খুব ভাল একটা অনুভূতি হল।
তারপর ওকে নিয়ে এসে বসিয়ে দেওয়া হল একটা বাইকের উপরে। মুহূর্তের মধ্যে বাইকটা স্টার্ট নিল। পেট্রোল আর মোবিলের সম্মিলিত একটা গন্ধ নাকে এসে লাগল যতীনের।
আবার চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাইক চলতে লাগল।
ঝিটকার জঙ্গলটা শাল-পিয়ালের ঘন পাতায় ঢাকা। বর্ষাশেষের উদাসী দুপুরের রোদ এসে পড়েছে গাছের গায়ে, আলোছায়ায় তৈরি হয়েছে এক অপূর্ব মায়া। হিংস্র জন্তু নেই। বনবিড়াল, শেয়াল, বাঁদর, নানা রকমের সাপ আর হাতিরা জঙ্গলের পথ ধরে প্রায়ই চলে আসে এখানে সদলবলে। এই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে গিয়েছে পাকা রাস্তা। রাস্তার দু'দিকে জঙ্গল। মাঝে একটা খালও রয়েছে। শালবনি থেকে লালগড় যাওয়ার পথে খালের কিছুটা আগেই একটা মোরাম রাস্তা সোজা নেমে গিয়েছে জঙ্গলের দিকে। ওটা গভীর জঙ্গলে ঢুকে গিয়েছে। ওই রাস্তাটা ধরে এগোলেই পড়বে খ্যাপাকালীর পোড়োমন্দির। কথিত আছে, বহু বছর আগে ডাকাতরা ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে খ্যাপাকালীর মন্দিরে পুজো দিয়ে তবে কাজে বেরোত।
মনোজ বসু, প্রতিম রাহা আর তিনজন কনস্টেবল পুলিশের ভ্যানটা নিয়ে দুলাল হেমব্রমকে পাশে বসিয়ে পৌঁছে গিয়েছে সাড়ে বারোটার আগেই। অনেকটা দূরে গাড়িটা পার্ক করে গাড়ির ভিতরেই বসে রয়েছে ওরা।
দুলালের কোনও হেলদোল লক্ষ করা যাচ্ছে না। ওর মাথার চুলগুলো কাঁচাপাকা। একটা তেলচিটে লুঙ্গি, আর শ্যাওলা রঙের টিশার্ট পরে বসে রয়েছে ও। ওর নখের সামনের দিকগুলো ময়লা জমে কালো হয়ে রয়েছে। চোখদুটো ঈষৎ লালচে। দুটো চোখ থেকেই ভয়ঙ্কর একটা নিষ্ঠুরতা ফুটে বেরোচ্ছে।
মনোজ আর প্রতিমরা দেখল, গ্রামের সাধারণ লোকজন কেউ আসেনি এখনও, তবে রিপোর্টারে ছয়লাপ চতুর্দিক। পাঁচ-সাতটা ওবি ভ্যান, বিভিন্ন চ্যানেলের সাংবাদিকরা ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিক। চিত্রসাংবাদিকরা ক্যামেরা তাক করে বসে রয়েছে জঙ্গলের দিকে। কখন আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ!
অবশেষে পিলপিল করে লোক জমতে শুরু করল। একটা-দুটো করে ছেলে, বুড়ো, বৌ-বাচ্চাতে ভরে উঠল কালীমন্দিরের চারপাশটা।
অতটা দূরে যাওয়ার অনুমতি নেই পুলিশের। ওদের কথামতো পাঁচশো মিটারের বেশি দূরত্বেই গাড়িটা পার্ক করেছে ওরা।
'মাওবাদী নেতা মুথুকুমারনকে লাল লাল লাল সেলাম' ধ্বনিতে হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠল চারপাশটা। সকলে হাততালি দিতে লাগল। মেয়ে-বৌরা উলুধ্বনি দিতে লাগল। মনোজ আর প্রতিমের কাছে এসব একেবারে অনভিপ্রেত ঘটনা নয়। জঙ্গলমহলে পোস্টিং পাওয়ার পর থেকে এসব নাটক বহুবার দেখেছে ওরা।
ওরা দেখল, সাংবাদিকরা হঠাৎ ছুটতে শুরু করল কালীমন্দিরটার দিকে। সেটা দেখেই আন্দাজ করা গেল, মুথুকুমারন এসে উপস্থিত হয়েছে। গাড়িতে বসেই তাকে দেখতে পেল মনোজ। ওরা গাড়ির দরজা খুলে তিনজন মিলে দুলালকে নিয়ে নেমে এল। বাকিরা অস্ত্র নিয়ে গাড়িতেই বসে রইল।
কালীমন্দিরের কাছে পায়ে হেঁটে পৌঁছে মনোজ দেখল, ওসির গলা থেকে ঝুলছে একটা পিচবোর্ড। তার উপর সাদা কাগজ চিটিয়ে লালকালিতে লেখা হয়েছে 'যুদ্ধ বন্দির মুক্তি সম্মেলন'।
সাঁকরাইল থানার ওসি যতীন দত্তকে মুখ থেকে কাপড়গুলো সরিয়ে দেওয়া হল। হাতদুটো খুলে দেওয়া হল। একটু হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন ওসি। তারপর ধীর পায়ে হেঁটে এসে মনোজ আর প্রতিমের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন।
দুলাল হেমব্রম প্রস্তুত হয়েই ছিল। বিজয়ী বীরের মতো সে মুথুকুমারনের দিকে এগিয়ে গেল।
সাংবাদিকরা ছুটে এল পুলিশের দিকে। শয়ে-শয়ে প্রশ্নবাণ ধেয়ে এল যতীন দত্তের কাছে। কেমন ছিল অভিজ্ঞতা, মাওবাদীরা কোনওরকম অত্যাচার চালিয়েছিল কিনা, কী খেয়েছেন এই দু'দিন, রাতে ঘুম হয়েছে কিনা এসবই ছিল প্রশ্নের বিষয়বস্তু।
ইশারায় ওকে চুপ থাকতে নির্দেশ দিল প্রতিম। সব সাংবাদিকরা কাছে এলে প্রতিম দৃঢ় গলায় বলল, ''যা-কিছু বলার আমাদের এস পি স্যার বলবেন। আপনারা ওঁর কাছ থেকেই সবটা শুনে নেবেন কাইন্ডলি।''
আর একটুও না দাঁড়িয়ে সকলে মিলে বোলেরোতে ওঠে গাড়িটা স্টার্ট করে দিল।
সাংবাদিকরা একটু আশাহত হলেও ছুটে গেল মুথুকুমারনের দিকে। তার কাঁধ থেকে ঝুলছে সয়ংক্রিয় রাইফেল। মুখটা শক্ত করে গামছায় বাঁধা।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুথুকুমারন বলতে শুরু করল, ''চলুন আজকের দিনটাকে আমরা উৎসর্গ করি, যাতে আমাদের সন্তানরা কালকের দিনটাকে উপভোগ করতে পারে। জানেন তো, মানুষ পরাজয়ের জন্য সৃষ্টি হয়নি। তাকে হয়তো ধ্বংস করা যায়, কিন্তু হারানো যায় না। সাঁকরাইল থানার ওসি যতীন দত্তকে যুদ্ধবন্দি বানিয়ে সরকারের কাছে এই বার্তাটাই দিতে চেয়েছিলাম আমরা। আশা করি সরকার বোকা নয়!'' একটু থেমে মুথুকুমারন আবার বলল, ''অত্যাচারী এবং অত্যাচারিত শ্রেণি সর্বদাই পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে থেকেছে, অবিরাম লড়াই চালিয়েছে, কখনও আড়ালে কখনও বা প্রকাশ্যে, প্রতিবার এ-লড়াই শেষ হয়েছে গোটা সমাজের বিপ্লবী পুনর্গঠনে অথবা দ্বন্দ্বরত শ্রেণিগুলোর সকলের ধ্বংসপ্রাপ্তিতে। সামন্ত সমাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে আধুনিক যে বুর্জোয়া সমাজ জন্ম নিয়েছে তার মধ্যে শ্রেণিবিরোধ শেষ হয়ে যায়নি। এ সমাজ শুধু প্রতিষ্ঠা করেছে নতুন শ্রেণি, অত্যাচারের নতুন অবস্থা, পুরনোর বদলে সংগ্রামের নতুন ধরণ। সুতরাং অপেক্ষা করুন, আরও অনেক খেলা বাকি রইল ভবিষ্যতের জন্য।''
আর কোনও কথা বলল না মুথুকুমারন। একটা বাইকের পিছন দিকে বসে একবার দু'হাত তুলে চিৎকার করে বলল, ''মাওবাদ জিন্দাবাদ! মাও-সে-তুং জিন্দাবাদ!''
ওকে দেখে সকলেই রণহুঙ্কার ছাড়ল একবার।
কালীমন্দিরের মাথায় একটা ভাঙা ত্রিশূল এখনও আটকানো রয়েছে। সময়ের অভিঘাতে জং পড়ে বেঁকে গিয়েছে খানিকটা। একটা কাক ওখানে বসেছিল এতক্ষণ, ওদের রণহুঙ্কারে উড়ে চলে গেল সে।
সাংবাদিকরা, আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গ্রামবাসীরা দেখল, কালীমন্দিরের পিছন দিকে ডাঁই করা রয়েছে বহু পুরনো ছাতাধরা ইটের স্তূপ, তার পাশ দিয়ে একটা সরু কাঁচা রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে আরও গভীর জঙ্গলের দিকে। মুথুকুমারন আর দুলাল হেমব্রমকে চাপিয়ে নিয়ে দশ-বারোটা মোটরসাইকেল শব্দ করে সেদিকেই চলে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন