সপ্তদশ অধ্যায়

কমলেশ কুমার

''সিদ্ধাবোনা সারাক্কা ওখানে পেশাদার ছিল হাতবোমা বানানোর কাজে। ল্যান্ডমাইন তৈরি, হাতবোমা বানানো এসব কিছু আমার সিদ্ধাবোনার কাছেই শেখা। ওর হাতে তৈরি বোমা, পেটো যেন কথা বলত। মশলার মাপ, তালছোবড়া, দড়ির বাঁধন এমনভাবে দিত, গমগম করে উঠত সলতেতে আগুন লাগালেই।'' অঘোর প্রশংসিত গলায় বলল কমলিনীকে।

ওরা আজ বেলপাহাড়ি থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরের একটা ডেরায় রয়েছে। ঝাড়খণ্ড লাগোয়া ঢাঙিকুসুম গ্রামে। পরিযায়ী জীবন ওদের। দলের নির্দেশ মতো ঘুরে ঘুরে বেড়াতে হয় কখনও পুরুলিয়া, কখনও বাঁকুড়া। তবে মেদিনীপুরেই বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয়।

ঢাঙিকুসুম গ্রামটা ছোট ছোট পাহাড় দিয়ে ঢাকা। পাহাড়ের গায়ে ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের ভেতরে রয়েছে ডুংড়ি জলপ্রপাত। ডুংড়ির পাশে একটা আস্তানায় অঘোর আর কমলিনী কাছাকাছি বসে রয়েছে। আরও কয়েকজন ছিল। একটু দূরে মোরগলড়াই দেখতে গিয়েছে ওরা।

পেটো আর হাতবোমা তৈরি করার কাজে তদারকি করতে ওদের আজ আসতে হয়েছে এখানে। সামনের দিনগুলোর জন্য বারুদের ভাণ্ডার গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছে সূর্যদা। প্রায় হাজার খানেক পেটো আর বোমা প্রস্তুত রাখতে বলেছে। অঘোরের এসব কাজে দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা প্রশ্নাতীত।

''অন্ধ্রপ্রদেশে তোমার স্কোয়াডে কোনও মেয়ে ছিল অঘোর?''

কমলিনীর প্রশ্ন শুনে সামান্য একটু চিন্তা করল অঘোর। তারপর চরম উৎসাহিত হয়ে বলল, ''হ্যাঁ। ছিল তো! মুন্নাইয়া কাশ্যপ। তেইশ বছর বয়স মেয়েটার। কিন্তু বোমা-বারুদে তুখোড় ছিল।''

''কেমন দেখতে ছিল ওকে?''

''গায়ের রং ছিল ফর্সা। মাঝারি উচ্চতা। সিক্সথ শাটার গান চালানোতে ওর জুড়ি মেলা ভার ছিল। চার-পাঁচটা ভাষা জানত মুন্নাইয়া।''

''তোমার খুব ভালো লাগত ওকে, তাই না?'' গলা নামিয়ে বলল কমলিনী।

অঘোরের উৎসাহে কোনও ভাটা নেই। চোখ দুটো বুজে হাসি হাসি মুখে ও বলল, ''ওরকম মেয়েকে ভাল না লেগে পারা যায়! আমাদের ইউনিটের সকলের কাছেই মুন্নাইয়া খুব প্রিয় ছিল।''

''তোমাকে ও খুবই পছন্দ করত, তাই না?''

''হ্যাঁ। তোমার মতোই ওকেও তো আমি অস্ত্রের বিভিন্ন কলাকৌশল শেখাতাম!''

''হাতে ধরে শেখাতে হত ওকে? আমার মতোই? নাকি দূর থেকে শেখাতে!''

''আমি যেটা শেখাই, আমার জান দিয়ে শেখাই। অস্ত্র কোনওদিন হাতে ধরে না হলে শেখানো যায়!'' অঘোরের গলায় দৃঢ়তা।

''ওকেও জান দিয়ে দিয়েছিলে তুমি?''

''মানে?''

''মানে ওকে যখন শেখাতে, ওকে তো ছুঁতেই হত, তাই না?''

কমলিনীর অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে গেল অঘোর। কী বলবে বুঝতে পারল না প্রথমে। তারপর একটু মাথা চুলকে বলল, ''কাজের সুবিধা-সুযোগ মতো যেটুকু তোমাকে ছুঁতে হয়, ওকেও হত।''

''আমাকে ছুঁতে হয়! ইচ্ছে করে ছোঁও না তাহলে!''

অঘোর আরও ঘাবড়ে গেল। কী বলা উচিত এবার বুঝে উঠতে পারল না।

বোকা-বোকা মুখ করে অঘোর বলল, ''তবে ও তোমার মতো গুছিয়ে কথা বলতে পারত না। জীবন সম্বন্ধে এত সুঠাম অভিমতও ছিল না ওর।''

কমলিনী কিছু বলল না। ডুংড়ির দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। ডুংড়ি থেকে বাতাস ছাপিয়ে একটা ছপছপ আওয়াজ ভেসে আসছে জলের, একটানা। শাল মহুয়ার জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে রুপোলি চাঁদের আলো এসে পড়েছে ওদের গোপন ডেরায়। চাঁদ কোনও অন্ধকার মানে না। সুযোগ থাকলেই সে সবকিছু আলোকিত করে ছাড়ে। পথের ধারঘেঁষে জানা-অজানা বুনোফুল অন্ধকারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।

জঙ্গল, নদী, ছোট-ছোট পাহাড়, ঝরনা, লাল মাটি ঘিরে মেদিনীপুরকে প্রকৃতি মায়াবী করে রেখেছে। এমন সৌন্দর্য অন্যান্য জেলাগুলোর কাছে ঈর্ষার কারণ।

ঝাড়গ্রামের রাজবাড়ি, চিড়িয়াখানা, ডুলুং নদীর ধার, কনকদুর্গার মন্দির, ঘাঘরা জলপ্রপাত, চিল্কিগড় যদি মেদিনীপুরের মুকুট হয়, জামবনির পরিযায়ী পাখির গ্রাম কেন্দুয়া তাহলে তার নাকের নোলক।

কমলিনী জানে, ওদের জীবনের বাস্তবতা এতটাই রূঢ় যে, বুকের মধ্যে গড়ে তোলা ভালবাসার রাজপ্রাসাদটাও অসহায় হয়ে পড়ে। তবুও অঘোরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে ও। পৃথিবীর সব নারীর ছোঁয়াচ থেকে ওকে আগলে রাখতে ইচ্ছে করে। যে-ভালবাসা না চাইতেই পাওয়া যায়, তার প্রতি কোনও মোহ থাকে না। অঘোরের অহঙ্কারী দূরত্ব, ওর সরলতা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা কমলিনীকে দিনে দিনে পাগল করে তুলছে। যুদ্ধক্ষেত্রে এটা একেবারেই সমীচীন নয়, সেটা ভালমতো জানে কমলিনী, তাও।

অঘোরের দিকে তাকিয়ে দেখল, মাথাটা নিচু করে একমনে কাজ করে যাচ্ছে ছেলেটা। পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বারুদের অসংখ্য উপকরণ।

প্রেমিককে কখনও কখনও নিজের সন্তান বলে ভাবতেও বোধহয় কার্পণ্য করে না মেয়েরা। অঘোরের মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুলে একবার হাত রাখল কমলিনী। চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল অঘোর।

কমলিনী বলল, ''মুন্নাইয়া তোমার গায়ে হাত রেখেছিল কোনওদিন?''

কমলিনীর আজ কী হয়েছে অঘোর জানে না। ও এটাও বুঝতে পারছে না, চূড়ান্ত পেশাদারি একটা কাজের ক্ষেত্রে এসব প্রশ্ন আসছেই বা কেন!

অঘোরের মনেও কোথায় যেন একটা কুলুকুলু শব্দে নদী বয়ে যাচ্ছে ক'দিন ধরে। সেই নদীর উৎসমুখ যে কমলিনী, সেটা ও ভালই টের পাচ্ছে।

''বললে না তো!''

''ঠিক মনে করতে পারছি না, জানো? তাছাড়া কাজের প্রয়োজনে গায়ে হাত তো রাখতে হতেই পারে, তাই না? বিশেষত তির ছোড়া কিংবা বন্দুকের লক্ষ্য স্থির করার সময়!''

কমলিনীর মনে পড়ল ধানি কিস্কু নিজের হাতে ওর বন্দুকের নলটা ধরে রেখে নজর ঠিক করতে বলত। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। তাও ও অঘোরের দিকে নেশাতুর চোখে তাকিয়ে বলল, ''মুন্নাইয়া কি তোমার জামা খামচে ধরত? নাকি তোমার হাতের উপরে হাত রাখত?''

একটু থেমে অঘোরকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কমলিনী আবার বলল, ''তোমরা পরস্পরকে চুমু খেয়েছিলে কোনওদিন?''

এবারে বিরক্ত হল অঘোর। বারুদের মশলা দড়িতে বাঁধতে-বাঁধতে থেমে গেল ও। কমলিনীর দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ''তোমার কি ধারণা আমি অন্ধ্রে গিয়েছিলাম ফস্টিনস্টি করতে? মেয়ে নিয়ে ভোজবাজি করে যদি জীবন কাটাতাম, তাহলে দেশের মাওবাদী স্কোয়াডের প্রতিটা রাজ্য সম্পাদক আমাকে একডাকে চিনত না। তারা চেনে আমার কাজ দিয়ে। ভরসা করে দক্ষতায়। বিশ্বাস করে আমার ক্ষিপ্রতার উপর।''

কমলিনী বুঝল, আবেগের বশবর্তী হয়ে ও একটা ভুল কথা বলে ফেলেছে, ওর আরও সতর্ক হয়ে অঘোরের সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল।

আসলে আজ সকাল থেকেই একটা চিন্তা ওকে কুরেকুরে খাচ্ছে। আজ সকালে ও বেলপাহাড়ির গাডরাসিনি পাহাড়ে গিয়েছিল একটা বিশেষ কাজে। সেখানে জোড়ায়-জোড়ায় কয়েকটা ছেলেমেয়ে এসেছিল ছোট্ট পাহাড়টাতে ট্রেক করতে। তারা এমনভাবে একে-অপরের গায়ে পড়ছিল, হাসছিল, আমোদ-আহ্লাদ করছিল যে, কমলিনীর মনের কোনও একটা দূরবর্তী কোণ যেন পুড়তে শুরু করেছিল। কেন, সেটা ও বুঝতে পারছিল না। সকাল থেকে ও আশেপাশের নিরিবিলি রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছে, পাহাড়ের নীচে নির্জন আশ্রমে কিছুটা সময় কাটিয়েছে, খাণ্ডারিনি ঝিলের ধারে বসে বসে অঘোরের কথা ভেবেছে, ওদের পরবর্তী অ্যাকশন এরিয়া কাঁকরাঝোর জঙ্গলে কয়েক ঘণ্টা সময় কাটিয়েছে, জঙ্গলে ঢোকা-বেরোনোর মুখগুলো খাতায় নোট করেছে, ঝাড়খণ্ডের সীমানা দিয়ে কীভাবে ওদের আর্মড-কমরেডরা প্রবেশ-প্রস্থান করে সেটাও বোঝার চেষ্টা করেছে। তারাফেনি ড্যাম, কানাইসর হিল,কেটকি লেক কেমনভাবে আধাসামরিক বাহিনীর দখলদারিতে চলে গিয়েছে সেটাও নিজের চোখে দেখে এসেছে ও।

''দুঃখিত অঘোর। ভুল বুঝো না আমায়। আসলে আমার মনটা ঠিক নেই আজ।'' কথাটা বলে চাঁদের আলোয় ভেসে-যাওয়া জঙ্গলটার দিকে তাকিয়ে রইল কমলিনী।

মেয়েরা যখন শক্তিরূপা হয়ে ওঠে তখন পৃথিবীতে অনেক বড় পরিবর্তন আসে। অঘোর সেই আগামীর দিনগুলো ছুঁতে পারে স্বপ্নে। ও ক্ষুদ্র বুদ্ধি দিয়ে এটুকু বুঝতে পারে, জগতের যেখানেই যে-জাতি নারীর অসম্মান করবে, সেই জাতিরই পতন নিশ্চিত। ওদের দলে মেয়েদের সম্মান অপরিসীম। ছেলে-মেয়ের কোনও তফাত করা হয় না ওদের দলে। তাই ওরাও যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক।

কমলিনীর দিকে তাকিয়ে অঘোর দেখল, গাছপাতার ফাঁক গলে কমলিনীর কপালের উপর এসে পড়েছে চাঁদের আলো। ওর চোখ দুটো কি জলে ভেজা-ভেজা এখন?

অঘোর মনে মনে বিড়বিড় করল, ''জীবন যদি রামধনু হয়, তুমি তাহলে তার রঙের বাহার, জীবনে যদি আঁধার নামে, তুমি এভাবেই চাঁদের আলো হয়ে উঠতে পারো না কমলিনী?''

কথাটা জোর গলায় বলতেই পারত ও, কিন্তু সেটা না বলে ও কমলিনীকে বলল, ''মুন্নাইয়া মারা গেছে অনেকদিন আগেই। ওখানকার গ্রেহাউন্ড পুলিশের এনকাউন্টারে। আমি ওকে বোনের মতোই ভালোবাসতাম।''

কথাটা শুনে কমলিনীর চোখটা সাময়িক খুশিতে ভরে উঠল কি? ঠিক বুঝতে পারল না অঘোর।

ও দেখল কমলিনী বিমর্ষ হয়ে তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে। এখানে বিষণ্ণতার ঘোর কাটতে না-কাটতেই নতুন ভোরের সূচনা হয়।

রাতদিন মনখারাপের উদ্বেগনগরীতে আটকে পড়া অসহায় জীব ওরা। ঈশ্বরের প্রসন্নতার আলো এসে পৌঁছায় না ওদের চোরাকুঠুরিতে। এভাবেই রোজকার বিষণ্ণতা বাড়ে ঝড়ঝঞ্ঝার মতো। একটা কাটাকুটি খেলার যাবতীয় হিসেব-নিকেশ নিয়ে বিকেলের মৌনতা মেখে দাঁড়িয়ে থাকে সোনালি দিন। মরীচিকার মতো সে সরে সরে যায় ক্রমশ।

অঘোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলল, ''সিদ্ধাবোনা সারাক্কা আমাদের শিখিয়েছিল বহুধরনের বোমার কার্যপদ্ধতি। ইম্প্যাক্ট বোমা, মেল বোমা, লেটার বোমা, ব্যাকপ্যাক বোমা, ফসফরাস বোমার মতো বিভিন্ন বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির পাঠ সহজ ভাষায় আমাদের মতো অল্পশিক্ষিত মানুষকেও বুঝিয়ে দিত সারাক্কা।'' সামান্য একটু বিরতি নিয়ে অঘোর আবার বলল, ''শক্তিশালী বিস্ফোরণ কীভাবে ঘটানো যাবে, বৈদ্যুতিন সরঞ্জামকে কীভাবে শক্তিশালী বিস্ফোরণে কাজে লাগাতে হবে, রিমোট চালিত বিস্ফোরণ কীভাবে ঘটাতে হয়, সে সব বিশদ বর্ণনা তোমাকেও শিখতে হবে কমলিনী। বিস্ফোরক আর বোমা তৈরির ক্ষেত্রে মৌলিক জ্ঞানের প্রয়োজন হয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং অস্ত্রের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ থাকতে হয়, সেসব তোমার আছে। বিস্ফোরক বানাতে গিয়ে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে তৎক্ষণাৎ কী করতে হবে, তা-ও আমি শিখিয়ে দেব তোমায়। সকলে মিলে প্রতিদিন যদি আমরা পঁচিশ-তিরিশটা করে বোমা বানিয়ে ফেলতে পারি, এক সপ্তাহের মধ্যেই সূর্যদার দেওয়া লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলতে পারব আমরা। হাতবোমা তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় বেশ কিছু রাসায়নিকদ্রব্য।'' কথাটা বলে কমলিনীর দিকে তাকিয়ে অঘোর বলল, ''এদিকে তাকাও। এই হল পটাশিয়াম নাইট্রেট, আর এই যে ফসফরাস, আর এই হল সালফার। স্প্রিন্টার হিসেবে আমরা ব্যবহার করি ছোট ছোট পেরেক, ভাঙা কাচ বা লোহার টুকরো।''

অঘোর তাকিয়ে দেখল কমলিনী কিছুই শুনছে না। তাকাচ্ছেও না ওর দিকে। ও বুঝতে পারল না, এই দিলখোলা চাঁদের আলোয় এখন কী করা উচিত ওর।

বিষণ্ণতার মধ্যেই কমলিনীর মনটা হঠাৎই নেচে উঠল। কিছুদিন ধরেই এরকম হচ্ছে। এই মনখারাপ, তো এই ভাললাগা। এই দুঃখ, তো এই আনন্দ। ও দেখল, বুনো ঝোপঝাড়ের উপর চাঁদ তার আলো দিয়ে সংসার বুনেছে। ওর কেমন যেন মনে হচ্ছে, চাঁদ তার রুপোলি আনন্দ দিয়ে ওদের মহল্লার জমাটবদ্ধ যত দুঃখ ঘুচিয়ে দেবে এবার।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পেঁজা তুলোর মতো একফালি আকাশটা দেখা যাচ্ছে। এরকম দিনেই বোধহয় মেয়েরা স্বপ্নরাজ্যের রানী হয়ে ওঠে। পুরনো বিরহ, ব্যথা-যন্ত্রণাগুলো নতুন করে সেজে উঠতে চায় প্রেমের সাজে।

কমলিনী ধীরে ধীরে এগিয়ে এল অঘোরের কাছে। অঘোর আজ সরে যাওয়ার কোনও চেষ্টাই করল না। রোমাঞ্চকর অভিযানপ্রিয় দামাল ছেলেটা ডিঙিনৌকোর মতো বাঁধা পড়ে গেল কমলিনীর বাহুডোরে। দুর্গম রহস্যভেদে যেন আজ বড় তৃষ্ণার্ত কমলিনী। ও ঠোঁটদুটো ডুবিয়ে দিল অঘোরের দুটো পুরু ঠোঁটের ভিতর। অঘোর কোনও কথা বলল না। পৃথিবীর সবকিছু ভাষা দিয়ে বোঝানো যায় না। প্রকৃতির সৃষ্টি করা এই আনন্দযজ্ঞে নীরবে শামিল হল ও।

আবেগের কথালিপি ছুঁয়ে, দু'জনে দু'জনকে আশ্রয় দিতে লাগল প্রকাণ্ড নিবিড়তায়। শতসহস্র বিক্ষোভ আর বিপ্লব পেরিয়ে, যুদ্ধক্ষেত্রের সমস্ত নিষেধাজ্ঞাকে অগ্রাহ্য করে ওরা দু'জন নক্ষত্রের মতো জেগে রইল মিটিমিটি।

মাটিতে শিকড়ের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে গাছ যেমন মাটির উর্বরতাকে পরিবর্তন ঘটায়, কমলিনীও যুদ্ধবিশারদ এক যুবকের গ্রন্থিতে-গ্রন্থিতে এভাবেই জ্বেলে দিল অনিঃশেষ এক কামনার আগুন। ন্যায়বিচার, যুক্তি আর সাহসের পাশাপাশি অঘোর চিনে নিল একটা নির্জন পৃথিবীর ঠিকানা। ক্লান্ত চরণচিহ্ন ধরে রাখতে যেখানে সে নোঙর ফেলতেই পারে ভবিষ্যতে। একটা জমজমে আনন্দ বাষ্পের মতো উঠে আসতে চাইছিল অঘোরের বুক ভেদ করে।

কতক্ষণ ওরা দু'জনে ওভাবে কাটিয়েছ জানে না। ঘোর ভাঙল রাতের জঙ্গল শনশন করে কেঁপে ওঠার শব্দে। বন্ধুরা ফিরে আসছে মোরগলড়াই দেখে। দ্রুত স্বাভাবিক হল ওরা। আবেন হাঁসদা হাঁফাতে-হাঁফাতে এসে দাঁড়াল কমলিনীর সামনে। উৎকণ্ঠা মেশানো গলায় বলল, ''তোমাদের সূর্যদা কাল সকালেই চলে যেতে বলেছে এখান থেকে। খুব তাড়াতাড়ি অ্যাকশনে নামতে হবে। আজ বিকেলে এমএলএ সুজয় সরেনকে খতম করতে গিয়েছিল জয়ন্ত সর্দার, আর খগেন মাহাতো। অজ্ঞাত পরিচয় কোনও দুষ্কৃতির হাতে দু'জনেই খুন হয়ে গেছে! সূর্যদার তলব, কাল ভোররাতে এখান থেকে বেরিয়ে যেও।''

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%