চতুর্দশ অধ্যায়

কমলেশ কুমার

আজ ভোর সাড়ে চারটে থেকে কোবরা বাহিনী তাদের কাজ শুরু করল। পশ্চিমবঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইজি এপি মহেশ্বর কমান্ডিং অফিসারদের পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, ''গুলির লড়াই চললে চলুক। আমি প্রতিদিন দেখতে চাই একাধিক মাওবাদীকে খতম করা হচ্ছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গুলির লড়াইয়ে এতদিন পর্যন্ত রাজ্য পুলিশের হাতে চোদ্দজন মাওবাদী খতম হয়েছে। আহত হয়েছে আরও তিরিশ-চল্লিশজন। আসল সংখ্যাটা এখনই নিশ্চিত করতে পারছি না। তবে এই সংখ্যাটা কিছুই না। রাজ্য ধরেধরে ওদের উপড়ে ফেলতে না পারলে দেশের হোম ডিপার্টমেন্টের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমি চাই জঙ্গলমহলে প্রতিদিন দশ-পনেরোটা করে মাওবাদী নিকেশ হোক।''

মহেশ্বরের কথা অনুযায়ী কোবরা আজ ভোরবেলাতেই এলাকায় রুটমার্চ শুরু করেছে। গভীর জঙ্গলের ভিতর সার্চলাইট ব্যবহার করে অন্ধকারেই ওরা অভিযান চালিয়েছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেয়ে সিআরপিএফের একটা দল চাঁদড়ার শুকনাখালি অঞ্চলটা ঘিরে ফেলেছিল, সেখানে মাওবাদীদের খোঁজে তল্লাশি চলেছে। ভোরের আলো না-ফুটলেও কিছু লোক বস্তা কাঁধে শালের জঙ্গলে কিছু কুড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। নিরাপত্তা বাহিনী পৌঁছানোর পর তারা সেই লোকগুলোর পরিচয় জানতে চায়, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তারা ঊর্ধশ্বাসে ছুটতে শুরু করে। তখন বাহিনী গুলি চালায়, তিনজন স্পটডেড।

কোবরাবাহিনী কুড়িজন করে এক-একটা দলে ভাগ হয়ে পাঞ্জাশোলের জঙ্গল, লোধাশুলি, ভোন্ডুডিহি, পিড়াকাটার জঙ্গলে অভিযান চালাতে শুরু করেছে। মাওবাদী নিধন ওদের উদ্দেশ্য হলেও, মুথুকুমারন ওদের প্রধান চাহিদা। রাজ্য এবং কেন্দ্র উভয়ই চাইছে মুথুকুমারনের জ্যান্ত অথবা মৃত শরীর।

নয়াগ্রামের প্রতিটা বাড়িতে-বাড়িতে ঢুকছে ওরা।

পাঞ্জাব থেকে আসা রিতেশ নামে জওয়ানটি বলল, ''মুথুকুমারন নয়াগ্রাম অথবা ভাতভাঙ্গার কোনও বাড়িতে লুকিয়ে রয়েছে, তাই আমরা সব বাড়ি সার্চ করব।''

ভোরের আলো না-ফোটা বাড়িগুলোতে বউ-বাচ্চারা জেগে উঠল। ঘুমচোখে তাকিয়ে দেখল, চারিদিকে জলপাই রঙের পোশাকপরা পুলিশে ছয়লাপ।

এবারের টিমে অন্তত তিনশো জন কমান্ডো রয়েছে, যারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঘাতক ফোর্সের সদস্য ছিল। নিধনকারী এই বাহিনী অত্যন্ত আক্রমণাত্মক একটি বাহিনী। প্রতিটা ব্যাটেলিয়নে এই বিশেষ কমান্ডো বাহিনীকে মোতায়েন রাখা হয়। ইন্ডিয়ান আর্মির সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ক্ষিপ্র জওয়ান হওয়ায় এই ঘাতক বাহিনী যে-কোনও সময়, যে-কোনও পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে।

এই অঞ্চলের সব বাড়িই প্রায় মাটির। টিনের অথবা তালপাতার ছাউনি।

জরাজীর্ণ একটা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল ততোধিক জরাজীর্ণ এক বৃদ্ধ। একজন জওয়ানের সামনে এসে বলল, ''এটা কি মাওবাদী খোঁজার কোনও সঠিক পদ্ধতি হচ্ছে? ভোররাতে বাচ্চা-বুড়ো, ছেলে-মেয়ে সকলের ঘুম ভাঙিয়ে এ-কাজ করতে পারো কি তোমরা?''

কথাটা শুনে জওয়ান কিছু বলল না, বৃদ্ধের মাটির ঘরটাতে ঢুকল। ছোট্ট একটা তক্তা পাতা ছিল সেখানে। তক্তাটা হাত দিয়ে টেনে তুলে উল্টে দিল সজোরে। তক্তাটা গিয়ে পড়ল মাটির দেওয়ালটার উপরে। দেওয়ালটার অর্ধেকটা ভেঙে ধ্বসে গেল সঙ্গে সঙ্গে।

জওয়ান বাইরে বেরিয়ে এসে বলল, ''তল্লাশি চালানোর প্রয়োজনে আমরা এটাও করতে পারি। কেমন!''

গতকাল সন্ধের দিকে হঠাৎ খবর আসে বিনপুরের কুশবনির জঙ্গলে ল্যান্ডমাইন পেতে রাখা রয়েছে। সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কালভার্টে তল্লাশি চালিয়ে তাজা ল্যান্ডমাইনটি উদ্ধার করে কোবরা বাহিনী । কালভার্টের নীচে টিফিন বাক্সে করে ল্যান্ডমাইন রাখা ছিল। সব মিলিয়ে ওজন আট থেকে দশ কেজি । কালভার্টের পাশের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ল্যান্ডমাইনটিকে নিষ্ক্রিয় করা হয় ।

আসলে বিদ্বেষ আরও বিদ্বেষের জন্ম দেয়। ঘৃণার আবহে বাস করতে করতে সেখানে কখনও ভালোবাসার পদ্ম যেমন ফোটানো যায় না, একইভাবে মাওবাদীদের রক্তচক্ষুর সামনে পড়ে কোবরা বাহিনীও নামসংকীর্তন শুরু করবে না কখনও। কিন্তু নির্বিচারে আক্রমণ, সাধারণ মানুষের ওপর প্রবল নিপীড়ন এগুলোও মেনে নিতে পারল না গ্রামবাসীরা। ভাতভাঙ্গার প্রতিটা বাড়িতে তল্লাশি চালাল কোবরা। কারোর ঘরের দেওয়াল ভাঙল, কারোর দরজা টেনে খুলে দিল। বাঁশের খুঁটির উপর ভারী বুট দিয়ে লাথি মেরে ঝুরঝুর করে ঝরিয়ে দিল তালপাতার পচে-যাওয়া ছাউনি।

শিশুরা ভয়ে জড়িয়ে ধরছিল মায়েদের। বুড়োবুড়িরা অশক্ত দেহে সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করছিল ওদের সামনে। যুবকরা রাগে গর্জন করতে করতে বদলা নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করছিল। রাগে গর্জন করলেও মুখে কেউ কিছু বলে উঠতে পারল না।

প্রতিটা গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ঘুরে তারা মুথুকুমারনের খোঁজ করল। অদ্ভুতভাবে একটা লোকও মুথুকুমারনকে চেনে, বা নিদেনপক্ষে নাম শুনেছে বলে কেউ স্বীকার করল না। শুধু মুথুকুমারন কেন, মাওবাদীর কোনও ছোট-বড়-মাঝারি মাপের কোনও নেতাকে তারা খুঁজে তো পেলই না, তাদের গতিবিধি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অন্ধকারেই রয়ে গেল।

ভাতভাঙ্গাতে বাহিনীর যে-দলটি অনুসন্ধান করতে ঢুকেছিল, অসংখ্য ঘরবসত ভেঙেচুরে দিয়ে, বহু লোককে চড়-থাপ্পড় মেরে আশাহত হয়ে সেদিনের মতো ফেরার সিদ্ধান্ত নিল।

আসলে নিরক্ষরতাও মানুষের জীবনের একটা বড় অভিশাপ। এতগুলো নিরপরাধ মানুষের ওপরে এত ধরনের অত্যাচার চালালেও কেউ সামান্যতম মুখ খুলতে পারল না ভয়ে। আসলে নিরক্ষরতা মনের মধ্যে একটা অভাবনীয় ভয়ের জন্ম দেয়। সেই ভয় গোটা শরীর আর মনে মাকড়সার জালের মতো প্রভাব বিস্তার করে। সেই জাল কেটে নিজের অধিকারটুকুর কথা বলে উঠতে পারে না সকলে। একটা গণতান্ত্রিক দেশে বিনাকারণে সকলের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে সেনাবাহিনীর লোক, এমন উদাহরণ ভারতে খুব বেশি নেই। যদিও, ওদের কাছে পুরোটা বিনাকারণ নয়, যেহেতু মাওবাদীরা এইসব গ্রামের মাটি থেকেই খাদ্য আর জল পেয়ে বেঁচে থাকে, জঙ্গলের মুক্ত বাতাসে তারা বিপ্লবের অক্সিজেন সংগ্রহ করে, সেইসব গ্রামেরই মানুষ হয়ে কেন তারা চিনতে পারবে না তাদের, এই ছিল আধা সামরিক বাহিনীর প্রশ্ন।

এইসব গ্রামের মানুষগুলোর অভুক্ত পেটে বিদ্যা থাকলে আকুতির রংটাও আগুনের মতো হতে পারত। নিজের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াইয়ে চোখের উপর চোখ রেখে কথা বলার অধিকার জন্মাত ওদের, কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-যোগাযোগের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া আর খাদ্যের জন্য ছটফট করতে করতে একদিন বুড়ো হয়ে যাওয়া মানুষগুলো নিজের ইচ্ছায় বা চিন্তায় নতুন কিছুই ভাবতে পারে না।

আজ খোলামেলা আকাশে ঝকঝকে সূর্যটা উঠে পড়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। এমন রোদেলা দিনের সঙ্গে জঙ্গলমহলের পরিবেশগত একটা বৈপরীত্য রয়েছে। চারিদিক থমথম করছে। ঝড়ের পূর্বাভাস তো এরকমই হয়।

''মানুষের সমতা ও সমানাধিকারের বিষয়টি মাওবাদীদের কাছে একমাত্র বিচার্য। আবার রাষ্ট্র চায় একটা স্থিতিশীল সমাজ গড়তে। জঙ্গলমহলের এইসব গরিব মানুষগুলো সকলে শারীরিক কিংবা মানসিক ভাবে সমান নয়। কিন্তু রাষ্ট্র যদি সকলকে সমান ভাবতে শিখত, সহযোগিতার হাত সহজেই বাড়িয়ে দিত, তাহলে খুব সহজেই গড়ে উঠতে পারত একটা কার্যকর স্থিতিশীল ভালোবাসার সমাজ।'' কথাটা গত তিনদিন আগে বিনপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে বলে গেলেন রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলনেত্রী সুচেতনা বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রায় এক ঘণ্টা বক্তব্যে তিনি আরও বললেন, ''প্রাকৃতিক সম্পর্ক স্থিতিশীল। অন্যদিকে কৃত্রিম শৃঙ্খলাবদ্ধ সম্পর্ক ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকে। শৃঙ্খলায় একতাবদ্ধ রাখতে দরকার সুনির্দিষ্ট জীবনমুখী বিশ্বাস আর তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বন্ধন। বর্তমানে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের নামে সমান অধিকারের চর্চা এখনও পর্যন্ত মানুষের উদ্ভাবিত সেরা বিশ্বাস। অন্যদিকে সব ধর্মই মানুষের জয়গান গেয়েছে। তাই সকল ধর্মের জাগতিক কল্যাণকর বাণী সবাই মর্মে-মর্মে উপলব্ধি করতে পারলেই গড়ে উঠবে একটি সুন্দর সাম্যের পৃথিবী। জঙ্গলমহলের মতো অনুন্নত এলাকাগুলোতে যদি খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানকে সুনিশ্চিত করা যায়,তাহলে বিজ্ঞানের ভিত্তিভূমির উপর দাঁড়িয়ে ভালোবাসার মন্ত্রে নতুন ধর্মীয়-পৃথিবীর জন্ম দেওয়া সম্ভব।''

বিরোধী দলনেত্রীর বক্তব্য শুনতে সেদিন পঞ্চাশটা গ্রামের লোক একসঙ্গে ভিড় করেছিল।

কোবরা বাহিনী যখন ভাতভাঙ্গার একেবারে শেষপ্রান্তে এসে উপস্থিত হল, সকালের রোদ লুটোপুটি খাচ্ছে মোরাম রাস্তার ওপরে। ওরা ওদের সাধ্যমতো চমকে-ধমকে মাওবাদীদের বড় বড় চাঁইদের মাথাগুলো টেনে বের করতে চেয়েছিল। কিন্তু কার্যত কিছুই না পেয়ে চরম হতাশ হয়ে রুটমার্চ করতে করতেই ওরা ফিরে আসছিল, যদিও আসার আগে সবকটা বাড়িতে ওরা বলে এসেছে, ''আমরা আবার আসব। প্রতিদিন আসব। দেখি তোরা কীভাবে ওদের প্রোটেকশন দিতে পারিস!''

গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে আসতে গিয়েই দেখল চরম বিপত্তি। মোরাম রাস্তার মাঝখান বরাবর চওড়া করে কাটা। গাড়ি তো চলবেই না, হেঁটে পার হওয়াও খুব অসুবিধাজনক।

রিতেশ বিশ্রী একটা গালাগাল দিল। অপর একজন জওয়ান রাস্তার ধারে এসে দেখল অন্তত তিনফুট চওড়া করে কেটে দেওয়া হয়েছে রাস্তা। ইট আর মোরাম, কাদা আর মাটি ছেদড়ে পড়ে রয়েছে চারিদিকে।

কোবরা বাহিনী খুব ভাল করেই জানে, মাওবাদীদের দাপটে লালগড় এবং সংলগ্ন এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। এমনিতেই গরিব মানুষগুলোর রুটিরুজি আরও বিপন্ন হয়েছে। কেন্দুপাতার ব্যাবসা থমকে গিয়েছে, শালপাতা ডাঁই হয়ে গরিবের ঘরে জমা হয়ে রয়েছে, কিন্তু কেনার লোক নেই। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার কাজও ব্যাহত হচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের কাজ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এককথায় পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়ার কয়েকটি ব্লকে মাওবাদীরা কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এযুদ্ধ দারিদ্রের বিরুদ্ধে ঘোষিত হলেও কার্যক্ষেত্রে তা গরিবের বিরুদ্ধেই হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এপি মহেশ্বর কাল সমস্ত জওয়ানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এক দীর্ঘ বক্তব্য রেখেছিলেন, ''মাওবাদীদের আন্দোলন যে আদৌ অনুন্নয়নের বিরুদ্ধে উন্নয়নের দাবিতে নয়, তা দিনের আলোর মতো আজ স্পষ্ট। মাওবাদীদের প্রকাশ্য সংগঠন জনসাধারণের কমিটি যে তেরো দফা দাবি কয়েকদিন আগে প্রকাশ করেছে, এবং তা নিয়ে আন্দোলন চালাচ্ছে, তার দিকে চোখ বোলালেই এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। দাবিগুলোর মধ্যে আছে, অ্যাডিশনাল পুলিস সুপার বীতরাগ চক্রবর্তীকে কান ধরে ওঠবোস করতে হবে, নাক খত দিতে হবে, রাজ্যে সিআরপিএফ ঢোকানো যাবে না , পুলিশের টহল বন্ধ করতে হবে, মাওবাদী অভিযোগে ধৃতদের ছেড়ে দিতে হবে, মাওবাদীদের অন্যতম নেতা দুলাল হেমব্রমের বিরুদ্ধে তোলা সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার করতে হবে ইত্যাদি। এই দাবিপত্রের একটি দাবিও উন্নয়ন সংক্রান্ত নয় কিন্তু! সবই হল মাওবাদীদের খুনের রাজনীতির সুবিধা ঘটানোর জন্য তোলা দাবি, পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করার দাবি। যদিও রাজ্যের অনেক বুদ্ধিজীবীই মাওবাদীদের আন্দোলনের মধ্যে আদিবাসীদের উন্নয়নের দাবি দেখতে পেয়েছেন। যদিও মাওবাদীদের কর্মতৎপরতা যত বেড়েছে, জঙ্গলমহলের উন্নয়নের কাজ ততই ব্যহত হয়েছে। আন্দোলনের নামে জঙ্গলমহলের হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে যা আদিবাসীদের সংস্কৃতির সঙ্গে কোনও মিল নেই।''

রিতেশ সহ পাঁচজন জওয়ান ধীরে ধীরে নেমে আসছিল কাটা রাস্তাটার নীচে। ওরা কুড়ি জনের দল হলেও রিতেশ ওদের এই দলের কমান্ডিং অফিসার। ওদের সকলের হাতে রয়েছে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন কার্বাইন। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে ডিআরডিও সম্প্রতি তৈরি করেছে এটা। এই কার্বাইন থেকে মাত্র এক মিনিটে সাতশো বুলেট ছোড়া যায়। এটা গ্যাসচালিত সেমি অটোমেটিক হাতিয়ার। কার্বাইন ব্যারেল রাইফেলের চেয়েও এটা আকারে ছোট। তবে শক্তি অনেক বেশি। মাওবাদীদের সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ঝাঁঝরা করে দিতে এর জুড়ি মেলা ভার।

রিতেশের নেতৃত্বে অন্য জওয়ানরা পা টিপে টিপে নেমে এল কাটা রাস্তাটার মধ্যে। ডাহুক আর বুলবুলিরা তিড়িং-বিড়িং করে লাফালাফি করছে এদিক-ওদিক। শীতের সময় কুয়াশামোড়া ভোরের এই গ্রামকে মনে হয় ধোঁয়ায় ডুবে থাকা গ্রাম। শীত চলে যাওয়ার পরও গ্রামে কুয়াশার এই দৃশ্য অনেক দিন থেকে যায়। কিন্তু এখন বর্ষা পেরিয়ে শরৎ আসতে চলল। চাষ না-হওয়ার দুঃখ নিয়ে মাঠের পর মাঠ রিক্ত পড়ে আছে খোলা আকাশের নীচে। শূন্য শালবন ঝিরঝিরে হাওয়ায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে একাকী। অন্যান্য দিন হলে বিভিন্ন পেশার মানুষের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ত, কিন্তু আজকের দিনটা আলাদা। আজ অনেক ভোর থেকে বাহিনী নির্বিচার গুলি চালিয়ে তিনজনকে মেরে ফেলেছে, একইসঙ্গে অত্যাচারে অত্যাচারে অতিষ্ঠ করে তুলেছে এলাকাবাসীদের।

অত্যন্ত সন্তর্পণে রিতেশরা পথ চলছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। কেটে দেওয়া রাস্তাটা পেরিয়ে যেতেই প্রবল শব্দে কেঁপে উঠল চারিদিক। ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধে ভর্তি হয়ে গেল সকালের নির্মল বাতাস।

কোবরা বাহিনীর কুড়িজন জওয়ান তাদের পেশাদারী দক্ষতায় শূন্যে লাফ দিয়ে বহু উঁচুতে উঠে গেল। সেখান থেকে পাক খেতে খেতে পড়ল তিরিশ ফুট দূরের একটা নয়ানজুলিতে। রিতেশ চিৎকার করে উঠল, ''বিওয়্যার অফ ল্যান্ডমাইনস! টেক ইওর পজিশন। কুইক।''

সকলে কার্বাইন উঁচিয়ে পুব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণে তৎক্ষণাৎ পজিশন নিয়ে নিল, কিন্তু শুনশান চারিদিক। কাউকেই চোখে পড়ল না। দু'একটা শূকর আর ছাগলছানা চরে বেড়াচ্ছে জঙ্গলের ধারে ধারে। কাটা রাস্তাটার মাঝখান থেকে হাওয়ায় উড়ে এল একটা হাতেলেখা জীর্ণ পোস্টার, তাতে টকটকে লাল কালিতে লেখা, ''বাংলা থেকে সিআরপিএফ দূর হটো। নাহলে ফল ভুগতে হবে।''

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%