কমলেশ কুমার
শালবনির উত্তর দিকে চন্দ্রকোনা রোড, দক্ষিণে মেদিনীপুর, পূর্বে কেশপুর, পশ্চিমে ঝাড়গ্রাম। আজকে চন্দ্রকোনা রোডের দায়িত্বে রয়েছে দুলাল হেমব্রম। ওর অধীনে বেশ কিছু সশস্ত্র মাওবাদী ঘোরাফেরা করছে সকাল থেকেই। কেশপুর আর ঝাড়গ্রামের দায়িত্বে আছে হপন কিস্কু এবং দুখিরাম মাণ্ডি। মুথুকুমারনের নির্দেশে শালবনির গোটা এলাকাটা ওরা ঘিরে ফেলেছে আজ। তারা প্রত্যেকেই সাদা পোশাকে জনগণের সঙ্গে মিশে থাকায় আলাদা করে নজরে পড়ছে না। আজ দুপুরেই জিন্দালগোষ্ঠীর কারখানা উদ্বোধনে আসছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বপ্রিয় সেন। মুথুকুমারনের নির্দেশে নিখুঁত হামলার ছক বানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঈশ্বরলাল গুপ্তাকেও একইসঙ্গে নিকেশ করে দেওয়ার কথা। দিন দশেক আগে গোলাবারুদ ভর্তি ট্রাকটাতে আগুন লেগে যাওয়ার পর কোবরা বাহিনী আর রাজ্য পুলিশ আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে। যে-কোনও লোককে দাঁড় করিয়ে যে-কোনও মুহূর্তে সার্চ করা হচ্ছে। কোথাও কোনও পোস্টার পড়লেই সেখানে ছুটে যাচ্ছে কোবরা বাহিনী। তার সঙ্গে চলছে অকথ্য অত্যাচার। মাওবাদীযোগ থাকার সন্দেহে লাঠি দিয়ে নির্বিচারে পেটান হচ্ছে গ্রামবাসীদের।
শালবনি এলাকাটা মুলত কৃষিনির্ভর। এখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের বসবাসই বেশি। গোদাপিয়াশালে সিমেন্ট কারখানা হয়েছে একটা। বেশকিছু লোকজন ওখানেও কাজ করছে।
শালবনির উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে তমাল আর কংসাবতী নদী। মুখ্যমন্ত্রী আসার কারণে পুলিশের স্নিফার ডগ এই দুই নদীর চারপাশে, বিভিন্ন ব্রিজের নীচে বারবার তল্লাশি চালিয়েছে।
আজকের গোটা অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সহদেব মুর্মূকে। সকলে নিজের নিজের পোস্টিং বুঝে নিয়েছে। পরিকল্পনাটা এমন কিছু জটিল নয়। শালবনিতে জিন্দাল শিল্পগোষ্ঠীর ইস্পাত প্রকল্পের উদ্বোধন সেরে কলকাতা ফিরতে গেলে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়কে বাড়ুয়াহাটির কাছে কলাইচণ্ডী খালের উপর দিয়েই যেতে হবে। কিন্তু শালবনি থেকে এটা বেশ খানিকটা দূরে হওয়ায় পুলিশের নজর এদিকে থাকবে না। ডাইরেকশনাল ল্যান্ডমাইন পাতা থাকবে মাটির নীচে। তিনটে গাড়িকে টার্গেট করা থাকবে। মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়ের সাতটা গাড়ি আগে আগে যাবে। আট নম্বর গাড়িতে থাকবেন বিশ্বপ্রিয় সেন। আট নম্বর গাড়িটাকে লক্ষ্যবস্তু করে সবকিছু প্রস্তুত রাখা হয়েছে ওখানে। আবেন হাঁসদা আর ধানি কিস্কু ওই এলাকার তিন কিলোমিটারের মধ্যে থাকবে। বিস্ফোরণ চালান হবে ঈশ্বরলাল গুপ্তার ওপরেও। প্রয়োজনে ঈশ্বরলালের পাইলট কারের নিরাপত্তা কর্মীদেরও তছনছ করে দেওয়া হবে। শালবনি থেকে কনভয় রওনা হলেই সহদেব ফোন করে জানাবে আবেনকে। চার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত তার পেতে রাখা হয়েছে। বিদ্যুতের সংযোগ ঘটালেই অকাল দীপাবলী নেমে আসবে শালবনিতে। কথাটা চিন্তা করে নিজের মনেই একবার হাসল সহদেব।
ও জানে, অঘোর আর তার সহযোদ্ধারা মিলে কেমন মাইন বানিয়েছে। শুধু তাই নয়, আরও দুটো পরিকল্পনা করে রেখেছে ওরা। ঘটনাস্থলে অতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুতের একটা তার ফেলে রাখা হয়েছে। বিস্ফোরণের ফলে সেটা ছিঁড়ে যাবে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় যখন মুখ্যমন্ত্রী আর কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসহ অন্যান্য নিরাপত্তারক্ষীরা মাটিতে নেমে ছটফট করবে, তারা সকলেই মারাত্মকভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হবে। বিস্ফোরণে কেউ কোনও কারণে বেঁচে গেলেও এই পদ্ধতিতে তারা নিকেশ হবেই। আরও যে পরিকল্পনাটা নেওয়া হয়েছে, সেটাও সহদেবের কাছে খুবই মজাদার। হামলার খবর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়লেই কাছাকাছি সবকটা থানা থেকে ফোর্স ছুটে যাবে। বেলপাহাড়ি থানার পুলিশও পুরো ফোর্স নিয়ে ওখানে চলে আসতে চাইবে। তারা কিছুদূর চলে এলেই ওখানেও ভয়াবহ একটা বিস্ফোরণ ঘটানো হবে। কেউ হতাহত না হলেও যাতে রাস্তাটা উড়ে যায়। পুলিশ ইচ্ছে করলেই যেন আর থানায় ফেরত যেতে না পারে।
শিলদা ইএফআর ক্যাম্পে হামলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে গেলে কমলিনীকে ছাড়াতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাই সিএম অ্যাটাকের দিনেই ওকে লকআপ থেকে তুলে নিতে হবে।
সিদ্ধান্ত মতো বেলপাহাড়ি থানার কাছে অঘোর-সহ তিনজন অপেক্ষায় থাকবে। ওরা থানায় ঢুকে প্রয়োজনে গ্রেনেড চার্জ করে গুটিকয়েক পুলিশকর্মীদের হটিয়ে দিয়ে কমলিনীকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে। সূর্যদা নির্দেশ দিয়েই দিয়েছে, দিন দশেক পরে শিলদা ইএফআর ক্যাম্প হামলার পুরো দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে কমলিনী সরেনের হাতে।
সহদেব শালবনির সভাস্থলে চলে এসেছে দুপুরেই। আস্তে আস্তে ভিড় জমতে শুরু করছে সভাস্থলে।
বর্ষা শেষ হয়ে গেলেও কে বলবে শরৎ আসতে চলল! ভ্যাপসা গরমে টেকা দায়।
সহদেবের আজ সকাল থেকেই মনের মধ্যে একটা উদ্বেগ ঝাঁকুনি দিয়ে যাচ্ছে। এমনিতে ব্যবস্থা সব তৈরি। পুলিশের সন্দেহের বাইরের জায়গাতেই পেতে রাখা হয়েছে মারাত্মক শক্তিশালী মাইনগুলো, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ওপর হামলা বলে কথা! গোটা দেশ টলে যাবে এখবর শুনলে। একটু এদিক-ওদিক হলেই সবকিছু অর্থহীন হয়ে যাবে। ওদের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষগুলো এমনিতে সরল, কিন্তু ঘা খেতে-খেতে যেদিন ওরা ফুঁসে ওঠে, সেদিন রাষ্ট্রের হাজার রক্তচোখও তা সামাল দিতে পারে না। আজ সেই দিন।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বপ্রিয় সেন জেড প্লাস ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পান। কোনও ব্যক্তির ওপর হামলার আশঙ্কার সম্ভাবনা বিচার করে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চারটে স্তরে ভাগ করা হয়। তার মধ্যে জেড প্লাস সর্বোচ্চ স্তর। এরপর পর্যায়ক্রমে রয়েছে জেড, ওয়াই এবং এক্স।
সহদেব জানে, জেড প্লাস নিরাপত্তার বেষ্টনীতে সুরক্ষিত রাখা হয় রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতি, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান, রাজ্যগুলোর রাজ্যপাল, আর মুখ্যমন্ত্রীদের। দেশের সর্বোচ্চ সুরক্ষা স্তর জেড প্লাস ক্যাটাগরিতে কোনও ব্যক্তির সুরক্ষায় নিযুক্ত থাকে পঞ্চান্নজন নিরাপত্তারক্ষী। তাদের মধ্যে দশজন থাকে এনএসজি কম্যান্ডো ও পুলিশকর্মীরা। প্রত্যেক কমান্ডো মার্শাল আর্ট আর বিনা অস্ত্রের যুদ্ধেও পারদর্শী হয়। প্রতিটা কমান্ডোর কাছে থাকে এম পি ফাইভ বন্দুক আর যোগাযোগের জন্য আধুনিক গ্যাজেট।
তাছাড়া আজকে মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার কারণে রাজ্য পুলিশের চোদ্দোশো কর্মীকে বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হয়েছে বলে খবর। এর সঙ্গে রয়েছে কয়েক কোম্পানি কোবরা কমান্ডো। আর একজনের কথা ওরা ভুলতেই বসেছে প্রায়, বীতরাগ চক্রবর্তী। সূর্যদার ধাতানি খেয়ে সেই যে লোকটা একঘরে হয়ে গেল, তারপর আর গলার আওয়াজই শোনা যায় না তার। যদিও সহদেব খুব ভালোভাবে চেনে বীতরাগকে। তার মতো ধুরন্ধর ব্যক্তিত্ব গোটা দেশে হয়তো হাতেগোনা কয়েকজন আছে। বীতরাগ চক্রবর্তী যে হাতগুটিয়ে চুপচাপ বসে থাকার মানুষ নয়, সেটা খুব ভালো করেই জানে সহদেব।
আর এইসবকিছুর কারণে ও একটু চিন্তাগ্রস্ত।
কিছুদিন আগে রাজ্যের বিরোধী দলনেত্রী সুচেতনা বন্দ্যোপাধ্যায় শালবনিতে এসেছিলেন। সেদিনও সহদেব উপস্থিত হয়েছিল এই মাঠে। গনগনে আগুনে গলায় সুচেতনা বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন বর্তমান সরকারের কাছে পরপর কয়েকটা প্রশ্ন রেখেছিলেন, ''স্বাধীনতার এত বছর পরেও কেন রাজ্যের মানুষকে অভুক্ত থাকতে হবে? কেন একশো কিলোমিটার পথ পেরিয়ে মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছতে হবে? উচ্চশিক্ষা থেকে জঙ্গলমহলের মানুষ কেন বঞ্চিত থাকবে? এত দীর্ঘ সময় সরকারে থেকেও আপনারা কেন একটা ভালো পাকারাস্তা বানাতে পারলেন না? কেন পানীয়জলের কষ্টে হাহাকার করবে রাজ্যের একটা বৃহত্তম অংশ?'' প্রশ্ন করা থামিয়ে উত্তরগুলো নিজেই দিয়েছিলেন তিনি, ''অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায়-সুরক্ষা, যুব, খাদ্য, কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ রাস্তা জল এসসি-এসটিদের জন্য নুন্যতম আয়, দরিদ্রদের বিনামূল্যে রেশন, ছাত্রছাত্রীদের জন্য সাইকেল, শিক্ষার্থীদের জন্য ক্রেডিট কার্ড প্রকল্প, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি এইসবকিছুর অঙ্গীকার করে গেলাম আমি। আগামী বিধানসভা ভোটে আমাদের দলকে বিপুল ভোটে জয়ী করুন, বাকিটা আমি বুঝে নেব। আমি কথা দিয়ে যাচ্ছি, পাহাড় হাসবে, জঙ্গলমহলও হাসবে। আদিবাসী মানুষ তার সব অধিকার ফিরে পাবে। বিনামূল্যে রেশন, বার্ধক্যভাতা, বিধবাভাতা সবকিছু চালু করব আমি।''
সহদেবের চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় হুটার বাজিয়ে সামনের মাঠে ঢোকার কারণে। চারিদিকে পুলিশে-পুলিশে ছয়লাপ হয়ে গেল। কেন্দ্রের আর রাজ্যের বাহিনীরা পজিশন নিয়ে নিল দ্রুত। বিশ্বপ্রিয় সেন সাদা রঙের অ্যাম্বাসাডার থেকে নেমে উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে হাত তুলে নমস্কার করলেন। তারপর দ্রুততার সঙ্গে তিনি কারখানার মূল দরজায় ফিতে কেটে মঞ্চে এসে বসলেন। বরণপর্ব সারার পর সঞ্চালকের আহ্বানে মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে বিশ্বপ্রিয় সেন বরাবরই আকর্ষণীয়। গলা খাঁকারি দিয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন, ''বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে যে নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছে তার জন্য সম্পূর্ণরূপে দায়ী মাওবাদীরা। এই যে এত এত মানুষকে ওরা নিয়মিত খুন করছে, তারা কারা! খোঁজ নিয়ে দেখুন, নিহতদের বেশিরভাগই আমাদের দলের সমর্থক, নেতা, কর্মী। কয়েকজন পুলিশকর্মীকেও খুন করেছে তারা। সাঁকরাইল থানার ওসিকেও তারা অপহরণ করেছিল। খুনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী দলটা নিরীহ গ্রামবাসী কিংবা ডাক্তার, নার্সদেরও ছাড়েনি। সামগ্রিকভাবে দেখলে নিহতদের বেশিরভাগই গরিব খেতমজুর, ছোট কৃষক, সামান্য দোকানদার বা গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। একটু তলিয়ে ভাবলেই বুঝতে পারবেন, মাওবাদীরা যাদের জন্য মুক্তি আন্দোলনের কথা বলে, আদপে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মাওবাদীদের দাপটে গরিব মানুষগুলোর রুটি রুজি আরও বিপন্ন হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের কাজ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। একশো দিনের কাজের মতো সরকারি প্রকল্পগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আপনারা চোখ-কান খোলা রাখলেই বুঝতে পারবেন, সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে মাওবাদীরা কার্যত গরিবমানুষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সরকারের কাছে যে দাবিপত্র পেশ করেছে তারা, তা আসলে তাদের রাজনৈতিক হিংসা চালিয়ে যাওয়ার ছাড়পত্রের আবেদন। একই কারণে যে-কারখানার উদ্বোধন করা হল আজ, সেই নির্মীয়মাণ ইস্পাত কারখানা তৈরিতেও তারা বাধা দিয়েছে। অথচ গোটা প্রকল্পটাই অনুর্বর জমিতে হচ্ছে। ইস্পাত কারখানা হলে বহুসংখ্যক আদিবাসী যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থান হতে পারে। এই উন্নয়ন মাওবাদীদের পছন্দ নয় বলেই পরিবেশের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে এই প্রকল্প বন্ধ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।''
বিশ্বপ্রিয় সেন রুমাল দিয়ে তার ফর্সা মুখটা মুছে নিলেন একবার। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, ''মাওবাদীদের সঙ্গে আমাদের দলটার তফাৎ আছে। মাওবাদীরা আদিবাসীদের উন্নয়নকে স্তব্ধ করে দিয়ে সভ্যতার চাকাকে পিছনের দিকে ঘোরাতে চায়। আর আমরা শালবনিসহ জঙ্গলমহলের উন্নয়নের সুযোগ সকলের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। বিজ্ঞান আর আধুনিক ব্যবস্থাকে প্রতিটা ঘরে পৌঁছে দিতে চাই আমরা।''
কথাটা শুনে সহদেব মনে মনে হাসল। বিড়বিড় করতে করতে বলল, ''কিন্তু কীভাবে! ঘরে ঘরে বিদ্যুৎই তো পৌঁছাতে পারেননি এখনও!''
বিশ্বপ্রিয় সেন বলে চলেছেন, ''আমরা জানি উন্নতি কীভাবে করতে হয়। এখানে যে-উন্নয়ন হবে, তার সুফল আদিবাসীরা পাবেন, তার ফলে তাদের শ্রেণিচেতনার বিকাশ ঘটবে, শ্রেণিসংগ্রাম আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যে-মাওবাদীরা কিউবা, ভিয়েতনাম, চিনকে তাদের অর্থনৈতিক নীতির জন্য সংশোধনবাদী আখ্যা দেয়, পশ্চিমবঙ্গে আমাদের সরকারকে তারাই পুঁজিবাদী বলে গালিগালাজ করে। একটার পর একটা খুনখারাপি চালিয়ে প্রয়োজনে ঝাড়খণ্ড আর ওড়িশা সীমানাকে ব্যবহার করে তারা ইচ্ছেমতো পালিয়ে যেতেও সক্ষম হচ্ছে। জঙ্গলমহলের ভৌগোলিক এলাকাও মাওবাদীদের তৎপরতায় সহায়ক হয়েছে। আর তাদের এই নৃশংস আন্দোলনে সহায়ক হয়েছে বর্তমান বিরোধী দল। তাদের প্রচ্ছন্ন মদত ছাড়া মাওবাদীদের এই বাড়বাড়ন্ত কখনওই সম্ভব হত না। অদ্ভুতভাবে এব্যাপারে বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হাত মেলাতে মাওবাদীরাও কোনওরকম দ্বিধা করেনি। আমি আপনাদের বলব বন্ধু, জঙ্গলমহলকে সুরক্ষিত করতে সামনের বিধানসভা নির্বাচনে আমাদের বিপুল ভোটে জয়ী করুন। বিরোধী দলকে ক্ষমতায় আনলে গোটা রাজ্যে মাওবাদী কার্যকলাপ আরও জোরদার হবে। অসংখ্য খেতমজুরের স্বার্থে, তপশিলী ও অনগ্রসরশ্রেণিভুক্ত মানুষের স্বার্থে, কৃষি আর শিল্পের স্বার্থে, সর্বোপরি আমাদের রাজ্যের সবধরনের উন্নয়নের স্বার্থে সকলে একজোট হয়ে আমাদেরই ফিরিয়ে আনুন। আমরা মানুষের পাশে ছিলাম, আছি, থাকব।''
কথাগুলো বলে, সকলকে নমস্কার জানিয়ে, মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। তাঁর পিছু পিছু নিরাপত্তাকর্মীরাও ছুটোছুটি শুরু করে দিল। কিছু সাংবাদিক তাঁর বাইট নিতে ছুটে গেল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে সহদেব দেখল, গাড়ির দীর্ঘ মিছিল নিয়ে কনভয় এগোতে শুরু করেছে। আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল হুটারের শব্দে। মিনিট তিনেক বাদে ফাঁকা একটা মাঠের দিকে চলে এল সহদেব। সভাশেষে ছড়ানো-ছিটানো কিছু লোকজন পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও পুলিশের লোক কেউ আর কাছাকাছি নেই। চারিদিকটা ভাল করে দেখে নিয়ে নিশ্চিন্ত হল সহদেব, তারপর প্যান্টের পকেট থেকে ছোট্ট মোবাইলটা বের করে আনল ও। মনে করে করে আবেনের নম্বরটা ডায়াল করতেই আবেন ফোনটা ধরল।
''মিশে গেল সব কিছু।'' সংক্ষেপে বলল সহদেব।
প্রত্যুত্তরে আবেন বলল, ''এদিকেও বৃষ্টি নেই কোথাও!''
সূর্যদার নির্দেশে কিছু কিছু কথা কোডে বলার নিয়ম ওদের। সহদেবের কথাটার অর্থ, কনভয় রওনা হয়েছে। আবেনের কথার অর্থ, চিন্তা নেই। আমি প্রস্তুত আছি।
ফোনটা কেটে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না সহদেব। গোদাপিয়াশালের গভীর জঙ্গলের দিকের রাস্তাটা ধরল ও। প্রায় ঘণ্টাদেড়েক হাঁটার পর একটা ছোট্ট বাজার চোখে পড়ল। দু'চারজন লোক শাকসবজি নিয়ে বসে রয়েছে সেখানে। একটা চায়ের দোকানও রয়েছে। গুটিগুটি পায়ে সেখানে এসে বসল সহদেব। ছোট্ট একটা টিভি চলছে দোকানটাতে। বাংলা খবর হচ্ছে।
সহদেব দেখল, পাঁচ-সাতজন খদ্দের সেই টিভিটার দিকে হাঁ করে নিশ্চল তাকিয়ে আছে। দোকানদারেরও অন্য কোনওদিকে মনোযোগ নেই।
সহদেব বেঞ্চিতে নিশ্চিন্ত মনে বসে টিভিতে চোখ রাখল। সংবাদ-পাঠিকা বলে চলেছেন, ''অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বপ্রিয় সেন। শালবনির কাছে এক বড়সড় মাইন হামলায় সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা। রাজ্য পুলিশের কাছে আগাম খবর থাকায় সেই কনভয়ের মধ্যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কিংবা কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রী কেউই উপস্থিত ছিলেন না। শেষ মুহূর্তে পুলিশ তাঁদের গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে ফাঁকা কনভয় কলকাতার উদ্দেশে রওনা করায়। মাওবাদীদের ভয়ঙ্কর হামলার ছক সম্পূর্ণভাবে বানচাল করে দিল রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ...''
আরও কিছু বলে চলেছিলেন পাঠিকা, সেসব কথা আর কানে ঢুকল না সহদেবের। অবিশ্বাস, উদ্বেগ আর আতঙ্কে কান-মাথা ঝাঁ- ঝাঁ করে উঠল ওর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন