একবিংশ অধ্যায়

কমলেশ কুমার

বসিরের ট্রাকের গতি এখন ঘণ্টায় একশো কুড়ি। পরশুর আগের দিন থেকে সে ক্লান্তিহীন চালিয়ে আসছে। মুম্বাই থেকে কলকাতাগামী এনএইচ সিক্সটাকে এখন মাখনের মতো মনে হচ্ছে বসিরের। দীর্ঘ ক্লান্তিতে চোখদুটো যেন জুড়ে আসছে। কিন্তু মালগুলো ঠিক সময়ে পৌঁছতে না পারলে ওর জীবন পর্যন্ত চলে যেতে পারে। কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার লেথপোরায় ওর ট্রাকটা লোড করা হয়েছিল চার-পাঁচদিন আগে। বেশ কিছু হ্যান্ড-গ্রেনেড, সাতাশি পিস পিস্তল, আমেরিকান এম ৪ আধা-স্বয়ংক্রিয় কার্বাইন, চিনে তৈরি স্পেশাল বুলেট, আর প্রচুর বারুদে ওর ট্রাক ভর্তি রয়েছে। এই স্পেশাল বুলেট ভারতীয় সেনাদের জন্য তৈরি বিশেষ বুলেটপ্রূফ জ্যাকেট ভেদ করতে সক্ষম। কিষেনগঙ্গা নদী পেরিয়ে একটা টিউবে ভর্তি করে পাকিস্তান থেকে ঢুকেছে অস্ত্রগুলো। সীমান্তের ওপার থেকে ড্রোন দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল নদীর তীরে। হ্যান্ডেলরা সেগুলো বহন করে এনে টিউবে চাপিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিল জলে।

বসির জানে, জৈশ মুখপাত্র রবিউল আল হিলালের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মাওদায়িত্বপ্রাপ্ত মুথুকুমারনের সখ্যর কথা।

বছর তিনেক আগে তিরিশজন যুবক নানা সময় কাশ্মীর থেকে পাড়ি দিয়েছিল পাকিস্তানে। সেখানে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরে ভারতে এসে বিভিন্ন নামে ভুয়ো সংস্থা খুলে বসে। এরা মূলত ছড়িয়ে রয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মুজফরাবাদে। পাকিস্তানের রাওয়ালপিণ্ডিতে আর ইসলামাবাদেও রয়েছে কয়েকজন। অত্যন্ত সক্রিয় এই তিরিশজন জঙ্গির একজন হল বসির নিজে। সীমান্ত পেরিয়ে আমন্ড, ড্রাই ফ্রুটস আমদানির আড়ালে ওর সংস্থা নিরাপত্তারক্ষীদের সতর্ক প্রহরা এড়িয়ে অবাধে উপত্যকায় চালান দেয় অস্ত্র, মাদক-সহ অনেক কিছুই।

রবিউল আল হিলাল পশ্চিমবঙ্গের এই অপারেশনের জন্য বসিরকেই বেছে নিয়েছে। কাজটা এমনকিছু কঠিন নয় ওর কাছে। ট্রাকভর্তি অস্ত্রভাণ্ডারটা পৌঁছে দিতে হবে পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম মহকুমার ফুলাকেন্দু নামে এক আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামে। মালগুলো মিলিয়ে মুথুকুমারন একটা সই করে দিলেই ওর কাজ শেষ। আবার তিন-চারদিনের মধ্যেই ও ফিরে যাবে মুজফরাবাদে।

শুধু অস্ত্রপাচারের কাজেই নয়, উপত্যকার নানা জঙ্গি সংগঠন আর বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের কাছে আর্থিক সাহায্যও পাঠানো হয় বসিরের মতো এজেন্টের হাত ধরেই। এদের বিশ্বস্ততা আর কর্মকুশলতা প্রশ্নাতীত।

বসির জানে,জীবন হলো পেন্সিলে আঁকা এক ছবির নাম, যার কোনও অংশ রাবার দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। জীবনটাকে উপভোগ করতে গেলে ঝুঁকি নিতেই হয়, আবার ঝুঁকি কেটে গেলেই জীবন হয়ে ওঠে খুশবুময় গোলাপবাগ। ট্রাক কাশ্মীর থেকে ছাড়ার পর প্রতিদিন বারো ঘণ্টা করে পথ চলেছে বসির। রাতের নিস্তব্ধতা ওকে বাড়তি মনোবল দেয় সবসময়। সকাল সাতটা বাজলেই কোনও ধাবায় ঢুকে স্নান খাওয়া সেরে ঘুম। বিকেলের পর ঘুম ভেঙে আবার রওনা হওয়া। বিগত কয়েকদিন এভাবেই কাটছে ওর সময়।

ট্রাকের মধ্যে পিচবোর্ডের বিশাল বিশাল বাক্স বসানো রয়েছে কয়েকটা। প্রতিটা বাক্সে ঠাসা রয়েছে গোলা-বারুদ আর অস্ত্র। প্রতিটা বাক্স অর্ধেক ভর্তি রয়েছে এসবে, বাকি অর্ধেক বাচ্চাদের নতুন ঝকঝকে ইংরেজি বই। ধরা পড়লে বলা হবে মুম্বাইয়ের এক বড় ইংরেজি প্রকাশন সংস্থা পশ্চিম মেদিনীপুরের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের বাচ্চাদের জন্য বিনামূল্যে এই বইগুলো পাঠিয়েছে। একটা নামী প্রকাশন সংস্থার ভুয়ো রসিদ বসিরের পকেটে রয়েছে। সেখানে বইয়ের নাম ধরে ধরে বিস্তারিত বর্ণনাও লেখা রয়েছে। ট্রাকটা ওপর থেকে কালো পলিথিনের ছাউনি দিয়ে মোড়া রয়েছে।

বসির জানে, বউ নিয়ে সন্দেহ থাকলেও, বই নিয়ে সচরাচর কেউ সন্দেহ করে না। পৃথিবীতে এই একটা জিনিসের কদর বিরাট।

বসির নিজেও যথেষ্ট পড়াশোনা-জানা ছেলে। ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তে জৈশ জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ-পরিচিতি গড়ে ওঠে ওর। বালাকোটে জঙ্গিডেরায় ও স্বেচ্ছায় চলে যায়। ওদের গোপন ডেরায় প্রায় সাতশো জঙ্গির থাকার মতো ব্যবস্থা ছিল। অভিজ্ঞ জঙ্গিদের পাশাপাশি শিক্ষানবিশ নতুন জঙ্গিরাও একইসঙ্গে থাকত।

পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের কোলে ঘন জঙ্গলে ঘেরা ছিল বসিরদের গোপন আস্তানা, কী ছিল না সেখানে! ঘর, ডরমেটরির পাশাপাশি সুইমিংপুল, প্রশিক্ষণ শিবির, জিম। সারাদিনের রুটিনমাফিক ওঠাবসা ছিল ওদের। পরিমিত খাবারদাবার, ডাক্তারী পরীক্ষার সব ধরনের বন্দোবস্ত ছিল ওখানে। ওই প্রশিক্ষণ শিবিরের প্রশিক্ষক ছিল অভিজ্ঞ আফগানরা, যারা ইউএসএসআর-এর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল পাকিস্তানের যুব সম্প্রদায়ের হয়ে।

ওই আস্তানায় জঙ্গিদের অস্ত্র, বিস্ফোরক, সুইসাইড বোম্বিং, ভারী যানবাহন চালানো রণ কৌশলের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত।

কুনহার নদী পাশ দিয়ে বয়ে যেত প্রশিক্ষণ শিবিরের। নদীর মধ্যে হাত-পা বেঁধে ফেলে দেওয়া হত ওদের। নিঃশ্বাস না নিয়ে দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকতে হত।

বসির একটা দোকানে সাইনবোর্ডে লেখা দেখল, গোদিবন্ধচক। ওর সিটের তলায় লুকোনো ম্যাপটা বের করে আনল ও। এখান থেকে উত্তর-পূর্ব বরাবর রাস্তাটা ধরতে হবে। আরও ঘণ্টাখানেক গেলে ওড়িশার বর্ডার চকসুরিয়াপদা পড়বে। জামসলা হাইস্কুলটা পার করতে পারলেই পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে যাবে ও। জামসলা হাইস্কুল থেকে ফুলাকেন্দু গ্রামে পৌঁছতে বড়জোর মিনিট দশেক।

বসির নিশ্চিন্ত হয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিল। ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়ায় ওর মেজাজটা ফুরফুরে হয়ে গেল এক নিমেষে।

আজ জরুরি একটা বৈঠক ডেকেছে মুথুকুমারন। ওদের দলের মহিলা ব্রিগেডের প্রধান কমলিনী সরেনকে বিনা নোটিশে গতকাল রাতে তুলে নিয়ে গিয়েছে রাজ্য পুলিশ আর কোবরা বাহিনীর সম্মিলিত টিম। বড়সড় একটা হামলা এবার না ঘটাতে পারলে ওদের ওপর থেকে গ্রামের মানুষের আস্থা একেবারেই চলে যাবে।

''আজ থেকে ঠিক সতেরো দিন পরে শালবনিতে জিন্দাল শিল্পগোষ্ঠীর ইস্পাত প্রকল্পের উদ্বোধন করতে আসছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বপ্রিয় সেন। এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরও সেদিন থাকার কথা।'' মুথুকুমারনের মুখটা কঠোর হচ্ছে ক্রমশ। চোয়ালটা শক্ত হলে মুথুকুমারনের দিকে তাকাতে অস্বস্তি হয় আবেন-সহদেবদের। ভোন্ডুডিহির জঙ্গলে সদ্য ভোরের আলো ফুটছে এখন। পাখিরা কিচিরমিচির শব্দ করে জেগে উঠছে ক্রমশ। কিছু বনমোরগ মাটিতে খুঁটে-খুঁটে পোকামাকড় খেতে ব্যস্ত।

সেসব দিকে নজর নেই কারোর। প্রেমিকাকে হারিয়ে অঘোর মুষড়ে পড়েছে। ও বুঝে উঠতে পারছে না, পুলিশের কাছে আগাম খবর না থাকলে কমলিনীকে ওইভাবে গ্রেপ্তার করা কীভাবে সম্ভব! তবে অঘোর সূর্যদার ওপর ভরসা রাখে। সূর্যদা নিশ্চয়ই একটা পরিকল্পনা বের করবে। কমলিনীকে ফিরে পেতে প্রয়োজনে আত্মঘাতী হামলা চালাবে অঘোর। সকলের স্থিরদৃষ্টি এখন মুথুকুমারনের দিকে নিবদ্ধ।

একটু সময় নিয়ে মুথুকুমারন আবার বলল, ''জিন্দাল শিল্পগোষ্ঠীকে আমরা চাইনি মন থেকে। না-চাওয়ার পিছনে বেশ কিছু কারণও ছিল আমার। আমাদের লড়াইয়ের একটা বড় অংশ ছিল এই কারখানা-বিরোধী। তা সত্ত্বেও বিশ্বপ্রিয় সেন আসছে সেই কারখানার উদ্বোধনে। তার সামগ্রিক ভাবমূর্তি এখন বুর্জোয়া প্রতিনিধিদের সপক্ষে কথা বলে। সমাজের বিলাসবহুল মানুষদের সঙ্গে তার ওঠাবসা। কৃষক আর বঞ্চিত সম্প্রদায় নিয়ে তার বিশেষ মাথাব্যথা দেখি না এখন। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে রাজভবনে বিশ্বপ্রিয় সেনের সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের ছবিতেই বার্তাটা স্পষ্ট ছিল। সেই প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে রাজ্যের ও ভিনরাজ্যের প্রথম সারির শিল্পপতিরা উপস্থিত ছিল। ২০০৬ সালেই সরকার অভিমুখ বদলে শিল্পায়ন ও জমি অধিগ্রহণের রাস্তায় হাঁটা শুরু করে। কৃষকের হাতে জমি দেওয়ার আন্দোলন থেকে বেসরকারি শিল্পের জন্য কৃষকদের জমি অধিগ্রহণ নীতি বড় হয়ে দাঁড়ায়। যে-সরকারের কাছে শিল্পদপ্তর ছিল দুয়োরানীর সমান, সুয়োরানীর মর্যাদা ছিল ভূমি ও ভূমিরাজস্ব দপ্তর ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তর, সেখানে নিজেদের ইচ্ছেমতো ছবিটা বদলে দিল তারা। এর ফলে জঙ্গলমহলে আমাদের মা-ভাই-বোনেরা চরম বঞ্চিত হল। তাদের দুঃখের দিন কাটার কোনও উপায় খুঁজে পাচ্ছি না আমি। এই কারণেই আমি ঠিক করেছি...''

অঘোর দেখল, সূর্যদার কপালে অনেকগুলো ভাঁজ। আরও কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল সূর্যদা।

ও কী বলতে যাচ্ছিল তার আন্দাজ করে অঘোর বলল, ''কিন্তু দিন পনেরো পরে তো শিলদার ইএফআর ক্যাম্প অপরেশন রয়েছে আমাদের!''

''জানি!'' মুথুকুমারন বলল, ''কিন্তু এই সুযোগটাও হারাতে চাইছি না আমি। শিল্পায়ন নীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগকে রাজ্যে আনার বিরাট একটা উদ্যোগ শুরু হয়েছে। কয়েকদিন আগে রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী ঘোষণা করেছে, যারা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উদ্যোগ না নেওয়ার কথা বলছে তারা আজকের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু আমি খুব ভালভাবে বুঝতে পারছি, এভাবেই গোটা রাজ্যটাকে ওরা একটু-একটু করে বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেবে। রাজ্যে কৃষির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম নিয়ে ওদের কোনও শিক্ষা হয়নি। পানাগড়, অণ্ডাল ও খড়গপুরে একাধিক শিল্প পার্ক গড়ে তুলতে চাইছে তারা। রাজ্যে নতুন করে লগ্নি করতে চাইছে টাটা, হিতাচি, ম্যাটিক্স, ট্র্যাক্টর ইন্ডিয়ার মতো সংস্থারা। কিন্তু একটা জিনিস ওরা বুঝতে পারছে না, বর্ধমান, হুগলি ও পূর্ব মেদিনীপুরের উর্বর কৃষিজমিতে হাত দেওয়া ভুল হচ্ছে ওদের। কৃষককে জমির বদলে শুধুই মূল্য ধরে দিলে হবে না। তারা বুঝতে চাইছে না, কৃষকের ভবিষ্যতের উপার্জন আর অনেক আবেগ জড়িয়ে থাকে জমিকে ঘিরে।''

দুলাল হেমব্রম একটা দাঁতন নিয়ে দাঁতে ঘষছিল এতক্ষণ। লুঙ্গির কোঁচাটা কোমরের কাছে গুঁজে মাটিতে এক থাবড়া থুথু ফেলে ও বলল, ''রাজ্যের শ্রমজীবী ও কৃষিজীবী মানুষরাই যে বর্তমান সরকারের মূল ভিত্তি, যার জোরে ওরা এত বছর ধরে রাজত্ব করছে, সেটাই ভুলতে বসেছে। এর একটা বড়সড় শিক্ষা ওদের হওয়া দরকার।''

দুলালকে সমর্থন করে মুথুকুমারন পুনরায় বলল, ''তাছাড়া যেভাবে বর্তমান রাজ্য সরকার নিয়ম-নীতি না মেনে একের পর এক কাজ করে চলেছে, যেভাবে বিরোধী দলের কার্যালয়ে ভাঙচুর হচ্ছে, যেভাবে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মিথ্যা অভিযোগে হয়রান করা হচ্ছে, যেভাবে রাজ্য জুড়ে টাকা নয়ছয় হয়ে চলেছে এসবের বিরুদ্ধে এবার সত্যিই রুখে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। এই সরকারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও ঘনীভবনের প্রবণতার কারণে ছোটখাট কারখানার জায়গায় দৈত্যাকায় আধুনিক শিল্প, আর ধনকুবের শিল্পপতির জন্ম হচ্ছে, যা আমরা সমর্থন করতে পারি না। কৃষিকে অবহেলার চোখে কেন দেখবে ওরা? ওরা কি বাংলায় সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়?''

সহদেব দেখল মুথুকুমারনের কালো কপাল জুড়ে বিনবিনে ঘাম জমতে শুরু করেছে।

লক্ষ্মীরতন বলল, ''তাহলে কী করণীয় আমাদের, সূর্যদা?''

লক্ষ্মীরতনের প্রশ্ন শুনে ওর চোখের দিকে খানিক্ষণ তাকিয়ে রইল মুথুকুমারন। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ''সিএমকে নিকেশ করে দেব আমরা। আমাদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, আর না-পাওয়ার যন্ত্রণা কিছুটা হলেও জুড়োবে তাহলে। যারা জঙ্গলমহলের মাটিতে দুটো ভাতের অভাবে মারা যাচ্ছে প্রতিদিন, তারাও পরলোকে গিয়ে একটু শান্তি পাবে হয়তো, আর যারা ভরসা রাখে আমাদের কাজের ওপর, তারাও নিশ্চয়ই খুশি হবে।'' একটু থেমে অঘোরের দিকে তাকিয়ে মুথুকুমারন বলল, ''শিলদা ইএফআর ক্যাম্প অপারেশনের কাজ কতদূর এগোল অঘোর?''

''আমাদের বাহিনীর একশো দশজনকে বাছাই করে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে সূর্যদা। ঝাড়খণ্ড আর ওড়িশা থেকে আমাদের কিছু বন্ধু এই কাজে যোগ দিয়েছে। ওরা গেরিলা যুদ্ধে আগে থেকেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ক্যাম্পের ভিতরের খবরাখবর নিয়মিত আমাদের হাতে আসছে। ওখানে প্রতিদিন পালা করে আমাদের লোকেরা বাইরে থেকে পাহারা দিচ্ছে। জওয়ানদের গতিবিধি লক্ষ করছে। আশা করি, দিন পনেরোর মধ্যে আমরা হামলা চালাতে পারব।''

মুথুকুমারন খুশি খুশি গলায় বলল, ''শিলদা ইএফআর ক্যাম্প বেলপাহাড়ি থানার অধীনে। বেলপাহাড়ি থানাতেই কমলিনীকে আটক করে রাখা হয়েছে। দ্যাখো, সেদিন যদি ওকে ছাড়িয়ে আনতে পারো!''

কথাটা শুনে অঘোরের চোখদুটো আবেগে ছলছল করে উঠল, সেদিকে না তাকিয়ে মুথুকুমারন আবার বলল, ''কাশ্মীর থেকে আজকেই ট্রাক ভর্তি অস্ত্র ঢুকছে ফুলাকেন্দুতে। জৈশ মুখপাত্র রবিউল আল হিলাল আমার আবেদনে সাড়া দিয়ে প্রচুর গোলাবারুদ পাঠাচ্ছে আমাদের জন্য। এজন্য একটা টাকাও তারা নিচ্ছে না। তাদের কাছে আমরা ঋণী থাকব সারাজীবন। দিন তিনেক আগেই বসির নামে এক জঙ্গী নিজে গাড়ি চালিয়ে ফুলাকেন্দু আসছে। ওখানে ধানি কিস্কু আর শিবু বাস্কে অপেক্ষা করছে। আমাকে মিটিং শেষ করে যেতে হবে ওখানে। সবকিছু মিলিয়ে নিয়ে সই করতে হবে আমাকে। সুতরাং বাড়তি অস্ত্রের জন্য আর চিন্তা করতে হবে না। যদি ইএফআর ক্যাম্প আর সিএম অ্যাটাক দুটো হামলাই কয়েক দিনের ব্যবধানে চালানো যায়, কেমন হয়? তবে আগে সিএমের উপরে অপরেশনটাতে জোর দাও। শোনো, কারখানা উদ্বোধন করে বিশ্বপ্রিয় সেন আর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঈশ্বরলাল গুপ্তার কনভয় বাড়ুয়াহাটির কাছে কলাইচণ্ডী খালের উপর দিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে। এটুকু তথ্য শুধু তোমাকে দিয়ে দিলাম অঘোর। বাকিটুকু বুঝে নিও।''

সামান্য একটু চিন্তা করে অঘোর বলল, ''খড়গপুর আইআইটির একটা ছেলে সম্প্রতি আমাদের সঙ্গে কাজে যোগ দিয়েছে। ও ডাইরেকশনাল ল্যান্ডমাইন বানাতে অত্যন্ত দক্ষ। টিউবওয়েলের পাইপ কেটে মাইন বানায় ও। প্রচণ্ড শক্তিশালী সেই বিস্ফোরক মুহূর্তের মধ্যে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তুমি চিন্তা করো না সূর্যদা, ওদিকটা দেখে নিচ্ছি আমি।''

অঘোরের কথা শুনে মুথুকুমারনের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

শিরশির করে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া এসে লাগছে গায়ে। সকালের নরম রোদে ভোন্ডুডিহির জঙ্গলটা কাচের মতো স্বচ্ছ লাগছে। মিটিং শেষ করে উঠতে যাচ্ছিল মুথুকুমারন, বেলু মাহাতো ছুটতে ছুটতে ঢুকল জঙ্গলে। এক হাত জিভ বের করে হাঁফাচ্ছে সে।

সামান্য একটু দম নিয়ে ভয়ার্ত চোখে বেলু বলল, ''কাশ্মীর থেকে আসা বারুদ-ভর্তি ট্রাকটা চকসুরিয়াপদা দিয়ে ঠিক সময়েই ঢুকেছিল। পিন্ড্রাশোল পেরিয়ে করকোটার কাছে আসতেই প্রচণ্ড জোরে একটা মাইনবিস্ফোরণ হয়। মাইনটা বোধহয় আমাদেরই পুঁতে রাখা। ট্রাকটাতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। ড্রাইভারের দেহটা ছিন্নভিন্ন হয়ে রাস্তার উপরেই পড়ে আছে। রাজ্য পুলিশ আর কোবরা বাহিনী ঘিরে ফেলেছে পুরো এলাকাটা!''

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%