শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

অল্প কিছুদিন আগে একটি মাসিক পত্রিকায় বিমল কর তাঁর কয়েকজন তরুণ লেখক-বন্ধু এবং নিজেকে নিয়ে একটি স্মৃতিকথা লেখা শুরু করেছিলেন। সেটা আত্মজীবনী নয়, আবার তরুণ লেখকদের সাহিত্যের বিচার বা মূল্যায়নও নয়। সেটা স্মৃতিকথাই। বিমল কর তাঁর স্মৃতিকথা লিখছেন এটা জেনে অনেকেই হয়তো বিস্মিত হবেন, ভেবে দেখবেন এটা কোন সাল এবং এই সালে কার কত বয়স হল। কেননা লোকে স্মৃতিকথা লেখে বয়সের এমন একটি চূড়ায় এসে, যেখান থেকে গড়ানে অতীতটাকে দেখা যায় ঢালু হয়ে নীচে সবুজ একটা উপত্যকায় গিয়ে মিশেছে। বয়সের রঙে ধূসর বর্ণ এসে গেলে মানুষ তখন সবুজ উপত্যকার গল্প শোনাতে বসে যায়। বিমল কর কি সেই চূড়া স্পর্শ করলেন? অথচ এই তো সেদিন বাঙলা ছোট গল্পের আসর তোলপাড় করে নামলেন বিমল কর, এখনো সবুজ বিদ্যুৎ চমকে উঠছে তার লেখায়, তবু স্মৃতিকথা কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কারো কারো মনে পড়তে পারে যে তিনি কিছুদিন আগেই একটি গল্প লিখেছেন—'সংশয়'। বিষয়বস্তু, কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর এক ভদ্রলোক ফিরলেন বিদায়-অভিনন্দনে-পাওয়া একরাশ জিনিসপত্রের উপহার নিয়ে। সেইসব উপহারের মধ্যে ছিল একখানা অদ্ভুত সুন্দর দেয়াল-ঘড়িও। গল্পের শেষে দেখা যায় মাঝরাতে ঘুম ভেঙেছে প্রবীণ দম্পতির দেয়াল-ঘড়ির ছোট পাখিটা আটকে গেছে একটা ঘরে আর নড়ছে না, সময় থেমে আসছে দুজনেরই জীবনে। অসহনীয় সেই মাঝরাতে স্বামী-স্ত্রীর মাঝখানে আকুল প্রশ্ন তোলপাড় করে ওঠে—সর্বশেষ বিদায়ের দিনে তাঁরা পরস্পরকে কী দেবেন! কোন সে উপহার? প্রশ্নের উত্তর গল্পের মধ্যে ছিল না। অন্তর্মুখী বিমল কর হয়তো এর উত্তর এখনো খুঁজে পাননি, কেবল প্রশ্নটিকেই পেয়েছেন। ইদানীং তাঁর লেখায় মাঝে মধ্যে এরকম প্রশ্ন এসে যায়। মনোযোগী পাঠক সামান্য বিস্মিত হয়ে ভাবে—কার কত বয়স হল! তবু বয়সের দিক থেকে বিমল করকে প্রবীণ বলা যায় না। পঞ্চাশের ঘর এখনো স্পর্শ করেননি, এখনো বাঙলাদেশে তাঁর সেইসব পূর্ব সুরীরা আসর জমিয়ে রেখেছেন, যাঁরা সস্নেহ হাস্যে বলতে পারেন—বিমল! বিমল তো ছেলেমানুষ!' সাহিত্যের আসরে, সভায়, পত্রিকার অফিসে সেইসব পূর্বসূরীদের সঙ্গে দেখা হয়। বিমল কর জ্যেষ্ঠের মর্যাদা দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, মাথা নীচু করে বিনীত হয়ে কথা বলেন, সলজ্জ হাসেন। তাঁকে ছেলেমানুষের মতোই দেখায়। তাঁর মাথায় একরাশ কালো চুল, দীর্ঘ শীর্ণ শরীরে বার্ধক্যের কোনো কুঞ্চন লক্ষ্য করা যায় না, এখনো তিনি হাসি নিয়ন্ত্রণ করতে শেখেননি, আপাত-গম্ভীরে বিমল কর হাসির কারণ ঘটলে হেসে বেদম হয়ে পড়েন এখনো। বিমল কর প্রবীণ যা সমবয়স্কদের সঙ্গে ঠিকমতো মিশ খেলেন না এখনো, তাঁর প্রিয় সঙ্গী এবং বন্ধু সেইসব তরুণ অখ্যাত লেখকেরা যাঁদের সঙ্গে নিজের কথা মিশিয়ে তিনি তাঁর স্মৃতিকথা লেখা শুরু করেছেন। তাই তাঁকে সঠিক প্রবীণ বলা যায় না। হয়তো এ কথাই ঠিক যে অনেক সময়েই লেখকের সঙ্গে তাঁর লেখার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। যে বিমল কর আড্ডা মারেন হাসেন, কথা বলেন, আর যিনি 'পূর্ণ অপূর্ণ' লেখেন তাঁর হয়তো আলাদা।
যতদূর মনে পড়ে বিমল করের প্রথম গল্প পড়েছিলাম 'পার্ক রোডের সেই বাড়ি'। কোনো শারদীয় সংখ্যায় বেরিয়েছিল। তখন আমার বয়ঃসন্ধি। গল্পের নায়িকা চন্দনার বিয়ে হচ্ছে না, দিদির বাড়িতে দূর প্রবাসে রয়েছে সে। বিয়ের যোগাযোগের জন্যই সেখানে রাখা হয়েছে তাকে। ফাঁকা নিঃঝুম বাংলো বাড়িটার সুন্দর সব জিনিসপত্র, কেতাদূরস্ত চাল চলনের মধ্যে সে ক্রমশ হাঁফিয়ে উঠছে। মুক্তি নেই। এইটুকুই গল্প। যার মধ্যে সত্যিকারের গল্প কিছু নেই, কেবল আছে ছবির পর ছবি, প্রবল প্যাশনেট পরিবেশ-বর্ণনা, টুকরো টাকরা স্মৃতির সঙ্গে কখনো বা পাখির ডাক, কখনো দুপুরের নির্জনতার সামান্য একটু প্রাকৃতিক বর্ণনা। তবু চন্দনার জন্য বড় উদ্বেগ বোধ করলাম। স্মৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী বাসা নিল চন্দনা, আমার অনেক নিঃসঙ্গ দুপুর কেটেছে কল্পনায় চন্দনার দিদির সেই নির্জন বাংলো বাড়ির আনাচে কানাচে—হাতে হাত রেখে। তখনকার তরুণ লেখক বিমল কর একজন পাঠক পেলেন। বাঁধা পাঠক। আত্মজা, উদ্ভিদ, আঙুরলতা সেই পাঠককে ক্রমপরিণত এবং আরো মনোযোগী করে তুলল। অপরিচিত বিমল করের যে চেহারা কল্পনায় আসত তা ছিল—গৌর বর্ণ, নাতিদীর্ঘ, সুপুরুষ উজ্জ্বল মুখ চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। অনেক সময়ে যেমন লেখকের সঙ্গে তাঁর লেখার মিল খুঁজে পাওয়া যান না, তেমনি পাঠকের কল্পিত লেখকের চেহারাও আসল চেহারার সঙ্গে কদাচিৎ মেলে। 'পার্ক রোডের সেই বাড়ি' গল্প পড়বার প্রায় চার পাঁচ বছর পর সাহিত্য-মশলিপ্সায় আক্রান্ত হয়ে 'দেশ' পত্রিকায় গল্প জমা দিতে গিয়ে বিমল করকে প্রথম দেখি। হতাশ হই। দীর্ঘ শীর্ণ চেহারা, রঙ শ্যাম, যাকে লাবণ্য বলে তা তাঁর চেহারার ছিল না। বরং শুষ্ক রুক্ষ একটা চেহারায় প্রথম দেখলাম। কিছুদিন আগেই তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়েছিল, কামানো মাথার সদ্য খোঁচা খোঁচা চুল উঠেছে। শোক এবং স্বাভাবিক গাম্ভীর্য তাঁর চার পাশে আমার মতো হঠকারী তরুণ যশঃপ্রার্থীর প্রায়-অগম্য একটি পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে রেখেছিল। কখনো মনে হয় না যে ইনি 'পলাশ' কিংবা 'কাচঘরে'র লেখক। সেইসব গল্পের পেলব, কুসুম-কোমল শব্দ-চয়ন, বাক্য গঠনে ললিত-ভাস্কর্য—যা আমাকে পাঠক হিসেবে মনে মনে তাঁর নিকটবর্তী করেছিল, বাস্তব লোকটিকে ঠিক ততখানি দূরবর্তী মনে হয়েছিল যখন তিনি টেবিলের ও-পাশ থেকে মাথা তুলে সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করলেন—'কী চাই?' আমার আত্মপরিচয় দেওয়ার কিছু ছিল না—তখন আমার মাত্র বাইশ বছর বয়স, মফসসলের গন্ধ তখনো আমার গায়ে, কল্পনার জগতে বসত। দুঃখ হয়েছিল—হায় ঈশ্বর, বিমল কর আমাকে চেনেন না? আমি যে তাঁর সৃষ্ট অনেক চরিত্রের নিত্যসঙ্গী, অনেকবার তিনি আমার কিশোর মনে মায়া-বিষণ্ণতা সঞ্চার করে দিয়েছেন, আমি তো সেই পাঠক যার জন্য বিমল কর লেখেন। দুপুরের খর-রোদে 'দেশ' অফিস থেকে বেরিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ভেবেছি—ইনি বিমল কর হতে পারেন। হয়তো ইনিই যথার্থ বিমল কর। তবু আমার কল্পনার বিমল করও নিশ্চিত আছেন কোথাও। সেই গৌর, উজ্জ্বল মুখ নাতিদীর্ঘ স্মিতহাস্যের বিমল কর—যিনি আমার জন্য লেখেন, যাঁকে আমি চিনি, যিনি আমাকে দেখলেই সমাদরে বলে উঠবেন—এই যে কী খবর? সেই বিমল করের সঙ্গে আমার অপরিচয়ের কোনো দূরত্ব নেই। তাই সত্যিকারের বিমল করকে আমি অপছন্দ করলাম। সেটা আরো বেড়ে গেল যখন তিনি আমার গল্প ফেরত দিলেন না-হেসে একটিও কথা না বলে। পর পর দুবার।
দুবার নাকচ হওয়ার পর বিমল করের প্রতি আমার অপছন্দের ভাব হয়তো বেড়েছিল। আর ঠিক সেই সময়ে তিনি লিখলেন 'সুধাময়', 'আর এক জন্ম অন্য মৃত্যু'; সে সময়ে তাঁর একটি উপন্যাসও আমি পড়ে ফেললাম—'ফানুসের আয়ু'। বাস্তবে যাকে রূঢ় মনে হয়েছিল, সেই লাবণ্যহীন বিমল কর আবার স্বভাবসিদ্ধ মায়াবিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন করলেন আমাকে, আমার মধ্যে অপরাহ্নের ম্লান দীর্ঘ বেলার দৃশ্য ফুটে উঠল, সেই শেষ বেলায় দেখা যায় নিঃসঙ্গ গির্জার চূড়ায় নিথর ক্রস দূরে রেল লাইন, তীর্থপতির মৃতদেহ পড়ে আছে, কখনো বা মনের মধ্যে ভেসে ওঠে রোগে জীর্ণ পাণ্ডুর একটি মেয়ের মুখ যাকে ভালোবেসে ছিল সুধাময়, কখনো বা প্রত্যক্ষ করি সেই লোকটাকে যে গাধার পিঠে চড়ে টাকার থলি হাতে বেরিয়েছে মানুষের আত্মা কিনবার জন্য। পত্রিকা-অফিসের বিমল করকে ভুলতে সময় লাগল না। নাকচ লেখক হতে পারি, কিন্তু সন্দেহ নেই যে আমি ছিলুম তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মনোনীত পরিবারের একজন—যাদের জন্য তিনি লেখেন। তখন তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখক আর দূরের মানুষ।
দূরত্বটা খুব বেশিদিন রইল না। ঘটনাক্রমে আমি তাঁর নিকটবর্তী হতে পেরেছিলাম। আগেই বলেছি তাঁর পরিমণ্ডলে ছিল কয়েকজন তরুণ অখ্যাত লেখক! তিনি তাঁর সেই সতেজ, প্রাণ-প্রচুর সঙ্গীদের মধ্যেই সবচেয়ে সহজ বোধ করতেন। সেইখানে সহজ একটি মানুষকে খুঁজে পাওয়া গেল। কোমলপ্রাণ, সৎ, বন্ধুবৎসল, অমিতব্যায়ী। তিনি ডেকে নিলেন সেইখানে আমাকে। তৃতীয় বিমল করের সঙ্গে পরিচয় ঘটল। পুরোনো দুটো ছবি সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে গেল। দেখলাম সহজ এবং বিনয়ী মানুষ অতিশয় ভদ্রলোক। জ্যেষ্ঠ সাহিত্যকের উপযুক্ত মর্যাদা কনিষ্ঠদের কাছ থেকে আদায় করতে একেবারেই সচেষ্ট নন, সবচেয়ে বড় কথা কখনো কাউকে উপদেশ দেন না। 'নিষাদ' নামে একটি গল্প লিখেছিলেন সেই সময়ে। অতি জটিল গল্প—মর্মভেদী। মনে প্রশ্ন এসেছিল আমার—অতি সহজ এই মানুষটি কি করে অত জটিল গল্প লিখলেন? বাচ্চা একটি ছেলে সারাদিন রেল লাইনের ওপর আক্রোশবশত ঢিল ছুঁড়ে যাচ্ছে। কারণ রেলগাড়িতে কাটা পরে মরেছে তার প্রিয় ছাগলছানাটি। গল্পের প্রথম পংক্তিতে ভবিষ্যদবাণীর মতো পরিণতির আভাস দেওয়া—ছেলেটি মরবে। ধূয়োর মতো ঘুরে ঘুরে এসেছে পংক্তিটি। বাচ্চা একরোখা একটি ছেলে তার প্রিয় গৃহপালিত পশুটির হন্তা সেই নিষ্প্রাণ কঠিন রেললাইনের ওপর নিষ্ফল আঘাত করে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে বিপজ্জন রেললাইনের কাছাকাছি। অথচ ছাগলছানাটির হত্যাকারী ছিল ভিন্নজন—ছেলেটির সাধ্য ছিল না সেই চক্রান্ত ভেদ করে। তাই নিয়তিই টেনে নিল তাকে। অসামান্য ছিল গল্পের শেষাংশে, একটি বর্ণনা যেখানে শেষ বেলায় চারদিকে মাঠঘাটে ছায়া পড়েছে। তবু সামান্য একটু রোদ অপেক্ষা করছে সেই জায়গাটাকে চিহ্নিত করার জন্য যেখানে কাটা পড়েছে প্রতিশোধকামী শিশুটি। তুচ্ছ ঘটনাটুকুকে লণ্ঠনের মতো তুলে ধরে তিনি—ছোট গল্পে যতখানি সম্ভব—ততখানি নিয়তির কাছে মানুষের অসহায় আত্মসমর্পণ দেখিয়েছিলেন।
'দেওয়াল' উপন্যাসের দুটি খণ্ড তখন বেরিয়েছে। পাঠকরা প্রকাশকের দরজায় হানা দিচ্ছেন—তৃতীয় খণ্ড কবে বেরোবে? এখানে সেখানে দেওয়াল নিয়ে আলোচনা শুনি। তখনো পড়া হয়নি। পড়লাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কলকাতার পটভূমিকায় বাংলায় বোধ হয় আর কোনো উপন্যাস কেউ লেখেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমি শিশু ছিলাম। তখনকার উদ্বেগ অশান্তি ভয়, আমার অস্তিত্বকে তেমন আলোড়িত করেনি। খুব উজ্জ্বল নয় তখনকার স্মৃতি। তবু মনে পড়ে—আকাশে ঝাঁক ঝাঁক এরোপ্লেন উড়তে দেখেছি, সাইরেনের শব্দে খেলা ভুলে স্তব্ধ হয়ে থেমে গেছি, দেখেছি রাস্তায় ঘাটে ট্রেঞ্চ খোঁড়া হচ্ছে। বিহারের একটা রেলশহরে মিলিটারি স্পেশাল ট্রেনে গোরাদের লাল মুখ দেখে ভয় পেয়েছি, কুড়িয়ে এনেছি তাদের ছুঁড়ে দেওয়া বিস্বাদ বিস্কুটের প্যাকেট। আজ কেরোসিন, কাল দেশলাই উধাও হয়ে যাচ্ছে বাজার থেকে। বাবার মিলিটারিতে অপশন দেওয়া ছিল। ইউনিফর্ম পরে বাবা যেতেন প্যারেড করতে, হাতে থাকত, চামড়ায় বাঁধানো ছোট্ট একটা ছড়ি। হুইশল সমেত একটা মিলিটারি পোশাক তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল আমাকে। বিহারের সেই শহরে যে রেলবাংলোয় আমরা থাকতাম তার পাশের বাড়িটাতেই ছিল মিলিটারি অফিসারদের আস্তানা। অ্যামেরিকান মিলিটারি। কোনোদিন হয়তো আমার দাদু কিংবা অন্য কেউ গ্রীষ্মকালে বাগানে বসে পাখা নাড়তে নাড়তে উচ্চ স্বরে ঘোষণা করেছিলেন—উঃ, বড় গরম। তার পরদিন সাহেবদের আস্তানা থেকেও অনুরুপ ঘোষণা শোনা যেতে লাগল, খালি গায়ে খোলা বাগানে বসে সাহেবরা চেঁচাচ্ছে—বড় গরম, বড় গরম। তখন প্রায় বাড়িতে আলোচনা শুনতাম যুদ্ধে সাপ্লাই দিয়ে কেউ কেউ অবস্থা ফিরিয়ে ফেলছে। বুঝতে পারতাম যুদ্ধ না থামলে মানুষের সুদিন আসবে না। দাদু তখন আমাকে পত্রিকা পড়তে শিখিয়ে ছিলেন। সেই শৈশবের যুদ্ধের স্মৃতি বড় হয়ে আর খুব উজ্জ্বল ছিল না, আমার কাছে। 'দেওয়াল' পড়তে পড়তে সেই স্মৃতি জাতিস্মরের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল আবার। বিমল করের লেখার একটা নিজস্ব ধাঁচ আছে। তাঁর ভাষা স্পর্শকাতর, কোমল, শব্দ ব্যবহারে তিনি অতিশয় সতর্ক—অনেক শব্দ তিনি পরিহার করে চলেন, অন্ত্যজ জ্ঞানে, রোম্যান্টিক বিষাদময়তা তাঁর ভাষায় স্বভোৎসারিত। কিন্তু তাঁর স্বাভাবিক ভাষা 'দেওয়াল' রচনায় ব্যবহৃত হয়নি। বাসু এবং তার পরিবেশ, তার স্বজন আপনদের নিয়ে নিম্ন-মধ্যবিত্তেরর সংসার এবং যুদ্ধের কলকাতা—এই সবকিছুকেই অতিবাস্তব তন্ময়তা দিয়ে চিত্রিত করেছেন বিমল কর। হুবহু ব্যবহার করেছেন সেই সব ভাষা যা সাধারণ দুঃখী মানুষেরা রাগ, ক্ষোভ, অধৈর্য এবং হতাশার সময়ে ব্যবহার করে। এই বিচিত্র উপন্যাসটিতে বিমল কর তাঁর সেই স্বভাবসিদ্ধ মায়া-বিষাদে আচ্ছন্ন করেননি আমাকে। বরং হুবহু সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কলকাতায় আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। আমার শ্রুতি এবং স্মৃতির সাক্ষ্য নির্ভরশীল হলে বলা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিয়ে যা কিছু লেখা হয়েছে বাংলা দেশে তার মধ্যে 'দেওয়াল' সবচেয়ে সত্যনিষ্ঠ এবং প্রামাণ্য উপন্যাস। উপন্যাসটির বিন্যাস বা রূপকর্মে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো চমক ছিল না, যেমন ছিল 'খোয়াই' উপন্যাসে। তবু বিমল করকে তাঁর 'দেওয়াল' উপন্যাস বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে স্থায়ীভাবে চিহ্নিত করবে।
তাঁর প্রথম লেখা যখন পড়েছিলাম তখন থেকেই জানতাম বিমল কর নতুন রকমের কিছু লেখেন—যা তাঁর আগে আর কেউ লেখেনি। পঞ্চাশ দশকের শেষ দিকে এবং ষাটের শুরুতে বিমল কর এমন কিছু লেখা লিখেছিলেন যা-তার স্বভাবসিদ্ধ আধুনিকতার মধ্যেও অভিনবত্ব এনেছিল। আর এক জন্ম, অন্য মৃত্যু 'নিষাদ' 'টেলিগ্রাম' কিংবা এই দেহ, অন্য মুখ'—এই সব ছোটো গল্পগুলি। যতদূরে জানি সে সময়ে তিনি দেওয়ালের তৃতীয় খণ্ড লিখছেন। তা ছাড়া অন্য উপন্যাসের পরিকল্পনা তাঁর কাছে শুনিনি। বরং ছোটো গল্পই ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। ছোটো গল্পই তিনি সবচেয়ে সহজে আত্মপ্রকাশ করছিলেন তখনও। যে সময়ে কিছু তরুণ লেখক বাংলা গল্পে খাত-বদলের চেষ্টা করছিলেন। মানুষের চারদিকে যেমন একটা বাইরের জগৎ রয়েছে। ঠিক তেমনই বিপুল একটা জগৎ রয়েছে। তার ভিতরেও। বাইরের জগতের কথাই হচ্ছে নিছক গল্প, আর ভিতরের কথা মনন। এ সময়ে গল্পকারদের গল্পে এই ভিতরের জগতের কথা প্রকট হয়ে উঠছিল। পাঠকমহলে শোরগোল শোনা গেল—গল্প কই? কিছু বয়স্ক লেখকও এই ব্যাপারে স-প্রশ্ন হয়েছিলেন। তরুণদের একটি গল্প-সঙ্কলন বিমল করের সম্পাদনায় এই সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল, এবং যে গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। আর এই সময়ে সম্পাদনা করেছিলেন একটি অভিনব পত্রিকা—'ছোটো গল্প, নতুন রীতি'। তখন তিনি প্রতিষ্ঠিত লেখক, সুতরাং ইচ্ছে করলে এই ব্যাপারে সে সময়ে যে বাদানুবাদ এবং বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল তা তিনি এড়িয়ে যেতে পারতেন। এড়াননি—তার কারণ, জ্যেষ্ঠ এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েও সনাতন বিরাগী বিমল কর এই সব তরুণদের সমধার্মিতা খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই বিতর্কের ঠিক মাঝখানে তাঁর মাথাটিই সবচেয়ে উঁচু হয়ে উঠল, ফলে অর্বাচীন তরুণ লেখকদের মুখপাত্র বলে সমালোচনা এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ তাঁকেই সবচেয়ে বেশি সহ্য করতে হয়। তিনি তা শান্তভাবেই সহ্য করেছিলেন। ধারা-বদলের কিংবা নতুন একটা রীতির প্রবর্তনের তীব্র ইচ্ছাতেই যে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা নয়। বরং এর মধ্যে আত্ম-আবিষ্কারের একটা প্রচেষ্টা ছিল। তৎকালীন তরুণ লেখকেরা কিংবা বিমল কর—কেউ চাননি বাংলা গল্পের সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার থেকে নিজেদের বঞ্চনা করতে। বিদ্রোহ তাঁদের কারোরই অভিপ্রেত ছিল না বোধ হয়। তবু তাঁরা পুরোনো রীতি, প্রকরণ, বিন্যাস এবং বিষয় ত্যাগ করতে চাইছিলেন—বহির্মুখীনতার চেয়ে তাঁদের কাছে স্বাদুতর ছিল নিজেদের অন্তর। তাই তাঁদের লেখায় স্ব-কৃত আত্মপ্রতিকৃতির প্রক্ষেপ ঘটছিল বারংবার, পাওয়া যাচ্ছিল স্বীকারোক্তির আভাস, চেতনামগ্ন ভাবপ্রবাহে তির্যক কিংবা বিকৃতভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল সমাজ এবং বাস্তবের খণ্ডিত দৃশ্যাবলী (মানুষের ভিতরে অতি জটিল সূত্রে অন্তর এবং বাহির গ্রথিত হয়—স্বপ্নে এবং চিন্তায় তার অদ্ভুত প্রকাশ ঘটে। যে সময়ে বিমল কর স্বোপার্জিত খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার পরিমাণে তৃপ্ত হয়ে নিজেকে পরিণত ভেবে নিশ্চিন্ত থাকতে পারতেন, ঠিক সেই সময়ে তিনি তরুণদের আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা নিয়ে আর তরফা পরীক্ষা-নিরক্ষায় মেতে উঠলেন। তাঁর লেখায় অন্তর-উন্মোচনের নূতনতর প্রয়াস দেখা যেতে লাগল। 'মানবপুত্র' লেখা হয়ে গিয়েছিল। নতুন লিখলেন 'দরজা, 'উদ্বেগ, ত্রিলোচন নন্দীর নামে ছড়া, আরো পরে লিখলেন 'সোপান', 'জননী', 'অপেক্ষা'। শান্তি কাব্যময়তায় স্নিগ্ধ পদবিন্যাসে পবিত্রতার আভাষ-মণ্ডিত ভাষায় লেখা এই সব গল্প কিন্তু অন্তর্নিহিত তীব্র, চঞ্চল, আশ্রয়, ভিখারি, এক অসহায় যন্ত্রণা, অমোঘ মৃত্যু, চেতনার দাহ, নবীনতর বিশ্বাস এবং ঈশ্বরের বিকল্প-সন্ধান, গল্পগুলিকে এক ধরনের আশ্চর্য গতিবেগ দিয়েছিল। এই গল্পগুলি ততখানি বাস্তব যতখানি বাস্তব মানুষের রহস্যবৃত অন্তর এবং তার জটিলতা। আমার মনে হয় ভবিষ্যতে যদি বিমল করের এইসব গল্প নিয়ে গবেষণা হয়, তখন তুলনা দেওয়ার দরকার হলে ঠিক বিমল করের সমধর্মী গল্পের অনুসন্ধান তাঁর পূর্বসুরীদের লেখায় করলে গবেষক ব্যর্থ হবেন। লেখক জীবনের শুরুতে 'আত্মজা' এবং 'উদ্ভিদ' লিখে তিনি মতবিরোধের সৃষ্টি করেছিলেন। পরিণত জীবনে তাঁর নতুন গল্পগুলো আবার বিতর্কিত হতে লাগল। পাঠক এই গল্পগুলিকে কী বলবেন! ভালো? না, মন্দ? ও দুটি শব্দের কোনোটিই নিশ্চিত ভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছিল না। শুধু বোঝা গেল যে লেখাগুলো খুবই নতুন ধরনের।'
যদিও গল্প নিয়েই বিমল করকে বেশি ব্যস্ত দেখেছি, তবু ইতিমধ্যে তিনি বেশ কয়েকখানা উপন্যাসও লিখেছেন। কেরানীপাড়ার কাব্য উপন্যাসে তিনি নতুন একটি প্রকরণ নিয়েছিলেন—গ্রীষ্ম বর্ষা শীত বসন্ত—এরকম পর্যায়ে ভাগ করে গোটা একটি কেরানী পাড়ার চলমান চিত্র। নায়ক বলতে বস্তুতঃ কেউ ছিল না, গোটা, কেরানী পাড়াই সেই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। 'বনভূমি কিংবা 'জীবনায়ন'—সর্বত্রই তাঁর রীতি ও প্রকরণে কিছু নতুন চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়।
সম্ভবতঃ 'সোপান' 'জননী' 'অপেক্ষা' লিখতে লিখতে বিমল কর চল্লিশ পার হয়ে গেলেন। সাহিত্যের কৃতিত্ব বিচারে বয়সটা হয়তো তেমন বিচার্য কিছু নয়। তবু উল্লেখ করলাম,—কারণ এই সময় থেকেই বিমল করের লেখায় এক রকমের পরিবর্তন এল। সেটা বয়সের জন্য কি না কে জানে। বরাবরই প্রেম তাঁর প্রিয় বিষয়। 'উদ্ভিদ' 'পলাশ' কিংবা 'জানোয়ার' গল্পের প্রেম কখনো বিকৃত ভয়ঙ্করতার কখনো ফ্রয়েডার তত্ত্বের ব্যাখ্যার, কখনো বা বিষণ্ণ শুদ্ধতার অমল লাবণ্যের ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে তার লেখায় এতকাল ঈশ্বর-চেতনা খুব প্রবল ছিল না। 'পিতৃঘ্ন' গল্পের নায়ক স্বকৃত পাপের স্বীকারোক্তির সময়ে ভুলে ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করে পরমুহূর্তেই ভ্রম সংশোধন করে বলেছে, 'ঈশ্বর' শব্দটি কথার কথা মাত্র। তদুপরি বিমল কর জীবনের সর্বত্র নিয়তির অমোঘতাকেই প্রত্যক্ষ করেছেন, মৃত্যুচিন্তায় বিক্ষুদ্ধ হয়েছেন। ব্যক্তি মানুষটি, বিষন্নতা আচ্ছন্ন করেছে তাঁকে। এ চিন্তা সব মানুষেরই, এ বোধ সকলের মধ্যে অল্প বিস্তর রয়েছে। তবু কোনো কোনো মানুষ—অনুভূতি যাঁদের মধ্যে প্রবল, যাঁরা সহজে প্রতিক্রিয়ায় আহত হন—তাঁরা আক্রান্ত হন আরো বেশি, বিষাদ রোগ সারাজীবন তাঁদের সঙ্গী হয়ে থাকে। বিমল করের এতকালের সব লেখার মধ্যেই কোনো না কোনো ভাবে এই অনুভূতিগুলোই প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে। সমাধান কিংবা সান্ত্বনা কোনোটাই তাঁর লেখায় ছিল না। নিজ অন্তরের যন্ত্রণাকে তিনি নির্মমভাবে প্রকাশ করে দিয়েছেন। ঈশ্বর কিংবা প্রেম—কোনোটাকেই তিনি এই যন্ত্রণার প্রলেপ হিসেবে ব্যবহার করেননি। তাঁর প্রেমের গল্পেও বিষণ্ণতা, তাঁর ঈশ্বরপ্রসঙ্গেও অবিশ্বাস কোনোটাকেই তিনি ঢেকে রাখেননি। কিন্তু সম্ভবতঃ চল্লিশের পর বিমল কর আত্মস্থ একটি মগ্নতাকেই চেষ্টা করছিলেন আবিষ্কার করতে। নিজের অন্তরকে উন্মোচন করে করে সম্ভবত তিনি এক উদ্দেশ্যহীন নিয়তি-নির্দিষ্ট শুন্যতাকে অনুভব করেছিলেন ব্যক্ত জগৎ ও জীবনে। অথচ শূন্যবাদ কিংবা দুঃখবাদ বোধ হয় কোনোদিনই তাঁর অভিপ্রেত ছিল না। কেননা এই বোধ তাঁকে আবাল্য কষ্ট দিয়েছে, হরণ করেছে জীবনীশক্তি, খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার মধ্যাহ্নে সঞ্চার করেছে ক্লান্তি ও অবসাদ। জীবনের কেন্দ্রবিন্দু কোথায়? কোন মঙ্গল, কোন আদর্শ, কোন প্রীতি থেকে শুরু হচ্ছে জীবন? শেষ হচ্ছে কোন পূর্ণতায়? প্রবল আত্মমুখী হয়েও নিজের মধ্যে থেকে যাচ্ছে কেন রহস্যময়তা?
আবার অনুসন্ধান শুরু হল। এবার আশ্রয়ের সন্ধানে বাসা বাঁধবার প্রয়োজনে খড়কুটোর খোঁজে তিনি ফিরে গেলেন কৈশোরে, বয়ঃসন্ধিতে। অমল এবং ভ্রমর যেন তাঁরই দুটি সত্তা। নিজেকে দুভাগ করে বিমল কর পিপাসার্ত চিত্তে সেই অমল বিশুদ্ধ প্রেমে আকণ্ঠ পূর্ণ করলেন নিজেকে, ভ্রমর হয়ে। উপন্যাসের মধ্যে সুস্পষ্ট হয়ে প্রকাশ পেল তাঁর ঈশ্বরভাবনা, ধর্মবোধ। এই ভাবনা এবং বোধ অবলম্বন করল খ্রীষ্টকে। অত্যন্ত সহজ এবং সরল গল্প—কাহিনি-প্রধান, মনোবিকলন নেই, আত্মবিশ্লেষণ নেই, যন্ত্রণা, অস্থিরতার পরিণাম নেয়নি কোথাও। মৃত্যুর ইঙ্গিতে শেষ হচ্ছে উপন্যাস, তবু তার রসাবেদন শান্ত, কেননা সেখানে প্রেম ও ঈশ্বর হয়েছেন পরস্পরের নিকটবর্তী। পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে হয়, অসহায় মানুষের সেই সনাতন সান্ত্বনার ভূমিতেই যেন ফিরে এলেন তিনি। আত্মাবিষ্কার পূর্ণ হয়ে গেল।
কিন্তু তবু বোধ হয় আরো কিছু অপূর্ণ রয়ে গেল। কৈশোরের প্রেম ঈশ্বরের সামীপ্যে যেতে পারে, তার সেই বিশুদ্ধতা আছে! কিন্তু পরিণত মানুষের? যে মানুষের জীবনে পৃথিবীর পঙ্কিলতা এবং মালিন্য এসে গেছে, যে-জীবনে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস এবং ঘৃণা? যে-মানুষ তার ভালোবাসকে ক্ষয় হয়ে যেতে দেখেছে অসহায়ভাবে? সেই অপূর্ণ মানুষকে কীভাবে পূর্ণের সন্ধান দেওয়া যায়? আবার নিজেকে খণ্ডিত করলেন বিমল কর। তিন ভাগে ভাগ হয়ে 'পূর্ণ-অপূর্ণ-র তিনটি প্রধান চরিত্র হয়ে গেলেন যেন তিনি নিজেই। 'পূর্ণ অপূর্ণ শেষ হচ্ছে একটি বিদায় দৃশ্যে—মিলনের ইঙ্গিতবহ সে দৃশ্য। কোনো উচ্ছ্বাসের প্রাবল্য নেই কিংবা ভাবাবেগের অপচয়। মানুষগুলি জ্বালাযন্ত্রণায় পুড়ে বয়সের অবিমৃষ্যকারতার গণ্ডী পেরিয়ে এমন এক পরিণতির চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎকে অবলোকন করছে, যেখানে ভালোবাসা রোমাঞ্চহীন, রহস্য শূন্য, রোমান্টিকতার লেশমাত্র ছোঁয়া সেখানে নেই। সে প্রেম কিছুটা বিশ্বাস, কিছুটা কর্তব্যবোধ কিছুটা বা অস্তিত্বের খাদ্য—এ রকম প্রেমের উপন্যাস আর বোধ হয় একটিই লিখেছেন তিনি। 'গ্রহণ'। ভুল বললাম, 'গ্রহণ' সঠিক প্রেমের উপন্যাস নয়, বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের জটিল সম্পর্কের একটি সুকঠিন কাহিনি বিন্যাস। উপন্যাসের চারটি চরিত্রকে একটি শ্বাসরোধকারী অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়ে তিনি সব সুদ্ধ কয়েকটি মানুষকে পরস্পরের জটিলতার মধে আবদ্ধ রেখে নিজে মগ্ন হয়ে দর্শকের ভূমিকায় বসে আছেন। আপাতদৃষ্টিতে রস-কষ-শূন্য। এই উপন্যাসটিতে বিমল কর নিজেকে সম্পূর্ণ নেপথ্যে রাখতে সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছেন। 'পূর্ণ অপূর্ণ' এবং 'গ্রহণ' এই দুটি কঠিন উপন্যাসের সমসময়ে একটি বড় গল্প লিখেছেন তিনি—'বালিকা বধূ। বিষয় বাল্য-প্রেম। কাহিনি অকিঞ্চিৎকর বঙ্কিমচন্দ্র, প্রভাতকুমার, রবীন্দ্রনাথের এই বিষয়ে প্রভূত রচনা রয়েছে। কিন্তু সুকৌশলে তিনি পুরো কাহিনিটিকেই ব্যবহার করেছেন একটি ভূমিকা হিসেবে। শেষ পরিচ্ছেদের ভূমিকা। আসলে ওই শেষ অধ্যায়টুকুই তাঁর নিজস্বতা, ওইখানেই তাঁর মর্মান্তিক দহন-যন্ত্রণা। ওইখানেই তাঁকে চেনা যায় নইলে এই গল্পটির অন্যত্র এবং প্রায় সর্বত্রই তিনি অনুপস্থিত। কিন্তু শেষ অধ্যায়ে তিনি স্বরাজ্যে স্বরাট। বিরহ, মৃত্যু, নিয়তি—সেই তাঁর পুরোনো বিষয় এইখানে এক কোমল লাবণ্যে, বেদনায়, মাধুর্যে অমল। একটি ভ্রমরের মতো মগ্ন বিষণ্ণ গুঞ্জন ধ্বনি তুলে নিজের উৎস সন্ধান করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনুরূগ্ন নয়, কিন্তু স্নিগ্ধ উজ্জ্বল এবং সহজ-গভীরতার আর একটি নিদর্শন। তাঁর ছোট্ট উপন্যাস 'পরিচয়।'
বিমল কর 'যদু-বংশ' লিখেছেন। সম্প্রতি এই উপন্যাসটির নাম-ডাক শোনা যাচ্ছে। তবু অনেকে বলেন যে এটা তাঁর বিষয় নয়। বিষয় ভাগ করে দিলে সাহিত্যিকের অধিকারকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। আমি তাঁর সমর্থক নই। 'যদুবংশ' যাদের নিয়ে লেখা তারা হচ্ছে উঠতি মস্তান ছেলে—যাদের মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে গেছে। নীতি, জ্ঞান, ধর্মাধর্মের বিচার নেই। আমাদের পরিবেশ-পারিপার্শ্বিক আকীর্ণ হয়ে আছে এইসব চরিত্রে। সমসাময়িক কালে এদের নিয়ে বাংলা সাহিত্যে বেশ কিছু গল্প-উপন্যাস রচিত হয়েছে। 'যদুবংশে' বিমল করও লিখেছেন। এতে তাঁর পরিবেশ সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়। তবু 'যদুবংশের' চরিত্রগুলিকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের মতো করে ফুটে উঠতে দেননি বিমল কর। অলেক্ষ্যে থেকে তাদের নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন তিনি। সূর্য কিংবা বুললির বিপথগামিতার কারণ হিসেবে নির্দেশ করেছেন, এদের ব্যক্তিগত পরিবারের পরিবেশকে। মালার বিকৃত যৌনশক্তির সঠিক কারণ দেননি। ফলে পুরো সমাজ-জীবনের বিকৃতি এবং তার কারণ উপেক্ষিত থেকেছে কিছুটা। দেশ-কাল-সমাজ স্পষ্ট বোঝা যায় না। তবু যদুবংশ কয়েকটা দিক দিয়ে অতিশয় সার্থক। কারণ এ উপন্যাসে বিমল কর আত্মশুদ্ধি এবং পবিত্রতার একটি আগ্রহ যে সমস্ত মানুষের ভিতরেই বর্তমান সেটি সুন্দরভাবে নির্দেশ করেছেন। তবু হয়তো অনেকের একটা আপত্তি থেকেই যাবে—এ উপন্যাসের পাপী ছেলেরা যেন যথেষ্ট পাপী নয়। খানিকটা যেন শুদ্ধ, কিঞ্চিৎ কোমলহৃদয়েরও বটে।
ব্যক্তিগত জীবনে বিমল কর সাদা সিধা মানুষ। নির্বিরোধী, হই-চই গণ্ডগোল পছন্দ করেন না, নিজের পরিচিত একটি নির্দিষ্ট বৃত্তেই তাঁর মেলামেশা সীমাবদ্ধ থাকে—তাঁকে অনেকটাই কুনো-স্বভাবের বলা যায়। কলকাতার রাস্তা পার হতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনকরনে, ট্রামে-বাসে উঠতে প্রায়শই অপারগ হন, ভীড়ে গণ্ডগোলে দিশেহারা বোধ করেন। রোগের ভয়ে প্রায় সময়েই তিনি অস্থির। সৎ এবং দয়ালু। তবু এই মানুষ গোয়েন্দা কাহিনির ভক্ত, অপরাধমূলক কাহিনি তাঁর প্রিয়। যুদ্ধের বই পড়া এবং সিনেমা দেখা দুই ইস্তার পুরোনো নেশা। মাঝেমধ্যে গোয়েন্দা কাহিনি লিখেছেন তিনি, ইদানীংও লিখছেন। নিজের লেখা সম্বন্ধে মাঝে মাঝে তিনি হয়তো গর্বিত (যেটা অযৌক্তিক নয়) কিন্তু কখনোই তৃপ্ত নন। অবসর সময়ে কিংবা আড্ডায় তিনি সাহিত্যের আলোচনা কমই করেন, যেটুকু করেন তার মধ্যে নিজের কৃতিত্বের প্রসঙ্গ উঠলে তাঁর মনোভাব হতাশাব্যঞ্জক হতে লক্ষ্য করেছি। মাঝেমধ্যে হাসির গল্প লিখেছেন তিনি—সিরিয়াসভাবে নয়। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে হাসির গল্পে তাঁর স্বভাব সিদ্ধি আছে। কালিদাস ও কেমিস্ট্রি—এরকমই একটি গল্প। লেখায় তিনি যতটা গম্ভীর, আলাপে ততটা নন। তিনি হাস্যপরিহাস প্রিয়। তাঁর লেখায় নিঃসঙ্গতাবোধ প্রবল, তাই বোধ হয় তিনি সঙ্গপ্রিয়, একা থাকতে কিংবা একা চলাফেরা করতে তিনি স্বচ্ছন্দবোধ করেন না। কখনো কখনো তাঁকে ধর্ম ও ঈশ্বর প্রসঙ্গে আগ্রহী হতে দেখেছি। ইদানীং তাঁর সে আগ্রহ হয়তো বেড়েছে। তাঁকে ঈশ্বর বা ধর্মবিশ্বাসী বলা যায় না, তবু যারা বিশ্বাসী তাদের প্রতি তাঁর নিবিড় কৌতূহল আগ্রহ এবং পরোক্ষ সমর্থন দেখেছি। তাঁর নিজস্ব একটা বিশ্বাসের ভূমি আছে। মানুষের সততা দায়িত্ববোধ দয়া—এগুলিই সেই বিশ্বাসের ভূমি। রাজনীতিতে তিনি অনাগ্রহী, তবে সেখানেও তাঁর একটা নিজস্ব মত আছে। কিন্তু সেটা প্রবল নয়। সাজে পোশাকে এবং আচার আচরণে তিনি খাঁটি বাঙালি। চমৎকার মোটর গাড়ি চালাতে পারেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন