হারু

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পালচৌধুরীদের বাড়িতে সকালবেলায় দুধ দিতে গিয়েছিল কানাইবাঁশি।

গিন্নিমা অ্যালুমিনিয়ামের ডেকচিতে দুধ নিতে নিতে হঠাৎ বললেন, তা হ্যাঁ রে কানাই, সঙ্গে করে কাকে নিয়ে এসেছিস বল তো? তোর পেছনে ওই দাঁত বের করা হাড়গিলে চেহারার লোকটা কে?

কানাই একঝটকা পিছনটায় দেখে নিয়ে আকাশ থেকে পড়ে বলে, আমার সঙ্গে তো কেউ নেই গিন্নিমা! আমি তো কই কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা।

পালগিন্নি বিরক্ত হয়ে বলেন, আমার চোখে চালসেও ধরেনি, ছানিও পড়েনি। ওই তো—দেখ না দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘ্যাঁসঘ্যাঁস করে বগল চুলকোচ্ছে। জলজিয়ন্ত লোকটাকে দেখতে পাচ্ছিসনা! চোখের মাথা খেয়েছিস নাকি?

কানাইবাঁশি আর কথা বাড়াল না। কারণ তার মনে একটা ধন্দ আছে। পরশু গোবিন্দ তর্কালঙ্কারও এরকমই কী একটা বলছিলেন যেন। বামুনপাড়া দিয়ে হাটপানে যাওয়ার সময় হঠাৎ গোবিন্দখুড়ো তাঁর দাওয়া থেকে হাঁক মেরে বলে উঠলেন, বলি হ্যাঁরে বাঁশি, আজকাল কি বডিগার্ড নিয়ে ঘোরাফেরা করিস নাকি? তা একটা জুৎমতো বডিগার্ড পেলিনা! এ তো একেবারে ল্যাকপ্যাক সিং রে!

কানাইবাঁশি আশেপাশে কাউকেই দেখতে না পেয়ে ভারি অভিমান করে বলেছিল, খুড়োমশাই কি এই গরিবের সঙ্গে রঙ্গ করছেন? আমি দিন আনি-দিন খাই মানুষ, আমার আবার বডিগার্ড কিসের?

গোবিন্দ তর্কালঙ্কার বললেন, তবে ওটা কে রে তোর সঙ্গে? কোথা থেকে আমদানি করলি বাপু? দেখিস আবার গাঁয়ে চোরছ্যাঁচড় ঢুকিয়ে বসিস না যেন!

কথা আর গড়ায়নি, কিন্তু ধন্দটা রয়ে গেছে। সঙ্গে কেউ নেই বটে, কিন্তু দু-দুজন লোক যখন বলেছে, তখন কিছু একটা ব্যাপার থাকতেও পারে!

নবকেষ্ট বন্ধু মানুষ। ঠাট্টা-তামাশারই সম্পর্ক। বাড়ি বাড়ি গাহেকদের দুধের জোগান দিয়ে ফাঁকা বালতি দোলাতে দোলাতে বাড়ি ফেরার সময় কদমতলায় নবকেষ্টর সঙ্গে দেখা। হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, কী ব্যাপার রে কানু, তোর কি রাতারাতি অনেক পয়সা হয়েছে নাকি?

নাতো নবু! হঠাৎ একথা কইছিস কেন?

পয়সা বেশি হয়নি তো কাজের লোক রেখেছিস কোন আক্কেলে?

কানাইবাঁশি ফের আকাশ থেকে পড়ে বলে, খেপেছিস নাকি!

আমি ছাপোষা মানুষ, খেটেখুটে দুধ বেচে খাই, কাজের লোক রাখতে যাবো কোন দুঃখে? নবাবপুত্তুর তো নই রে বাপু।

তা ভালো কথা, তাহলে তোর পিছুপিছু ওই লোকটা আজকাল ঘুরঘুর করে কেন? ও তো তোর শালা সম্বন্ধীও কেউ নয়।

কানাইবাঁশি কাঁদোকাঁদো হয়ে বলে, ভাই রে, সবাই যদি এরকম আজব কথা বলে তাহলে তো বড্ড মুশকিল! আমার মাথার দোষ হয়েছে কিনা তা যে বুঝতে পারছি না। আমার পিছনে কেউ তো ঘুরঘুর করছে না রে ভাই। তাহলে তোরা কাকে দেখছিস বল তো?

কেন, ওই যে হ্যাঁংলা চেহারার বড় বড় দাঁতওয়ালা মাঝবয়েসি একটা লোক! ওই তো তোর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা খুব মন দিয়ে শুনছে। দ্যাখ না পিছু ফিরে!

তা পিছু ফিরে দেখলও কানাইবাঁশি, কেউই নেই। সে হতাশ হয়ে মাথা নাড়া দিয়ে বলে, না রে! আমাকে বোধহয় চোখের ডাক্তারই দেখাতে হবে। আমি তো কাউকেই দেখতে পাচ্ছিনা। নবু, তুই ভূত দেখছিসনা তো?

নবু বলে, ভূত দেখব কেন, দিনেদুপুরে কি ভূত দেখে কেউ?

এই বলে একটু এগিয়ে এসে হাত দিয়ে কানাইবাঁশিকে একটু পাশে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নবু অদৃশ্য লোকটার উদ্দেশ্যে বলে, ওহে বাপু, তুমি আসলে কে বলো তো? কোন মতলবে কানুর পিছনে ঘুরঘুর করছো?—অ্যাঁ, মতলব খারাপ নয়? কিন্তু তোমার নামধাম পরিচয় কী? কোথা থেকে আগমন?—সেসব বলতে চাওনা! এ তো ভালো জ্বালা হল দেখছি!

তারপর হতাশ হয়ে কানাইবাঁশির দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে নবু বলে, না রে, লোকটা বেজায় বেয়াদব। পাত্তাই দিতে চাইছে না। এখন তুই বুঝে দ্যাখ কী করবি। আমার আজ গরু কিনতে যাওয়ার কথা, বায়না করা আছে। তাই আমি চললাম।

কানাইবাঁশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ি ফিরে তার বউ ব্রজবালাকে বলল, হ্যাঁ গা, ইদানীং কি তুমি আমার আশেপাশে কাউকে দেখতে পাও? এই রোগামতো, দাঁতউঁচু মাঝবয়েসি কোনো লোককে?

ব্রজবালা অবাক হয়ে বলে, ওমা গো! তোমার সঙ্গে আর কেউ ঘুরে বেড়াবে কেন? ও কি সব্বোনেশে কথা!

কিন্তু লোকে যে বলছে আমার সঙ্গে কে একটা হাড়গিলে চেহারার লোক নাকি ঘুরে বেড়াচ্ছে! তাকে আর সবাই দেখতে পাচ্ছে বটে, কিন্তু আমি তো কই দেখতে পাচ্ছিনা।

লোকে তোমাকে নিয়ে বোধহয় রঙ্গ করছে, তুমি ওতে কান দিওনা তো! আমি হারুকে বলে দেবো'খন, সে যেন তোমার চারপাশটা নজরে রাখে।

কানাইবাঁশি অবাক হয়ে বলে, হারু? হারুটা আবার কে বলো তো?

সে কী! হারুকে চিনতে পারছ না? তোমার কি স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে নাকি?

আহা স্মৃতিভ্রংশ হবে কেন? হারু বলে কাউকেই তো আমি চিনি না।

ব্রজবালা স্তম্ভিত হয়ে বলে, চেনো না? তাহলে এই বেলা নগেন কোবরেজকে গিয়ে ধরে পড়ো। তোমার মাথারই দোষ হয়েছে গো! ওই তো হারু পূবের ঘরের দাওয়ায় বসে মুড়ি আর শশা খাচ্ছে। দেখছ না?

কানাইবাঁশি দেখছে না, সত্যিই কাউকে দেখতে পাচ্ছেনা। তবে সেটা কবুল করতে তার সাহস হলনা। তাহলে ব্রজবালা তাকে সত্যিই পাগল বলে দেগে দেবে। তাই সে আমতা আমতা করে বলে, ও। তাহলে তাই হবে বোধহয়। হ্যাঁ, ওটা তো হারু বলেই মনে হচ্ছে যেন।

কিন্তু এই মিথ্যাচার করতে হল বলে তার নিজের ওপর রাগও হচ্ছিল খুব। কিন্তু সে করবেই বা কী? হারু পুবের ঘরের দাওয়ায় বসে শশা দিয়ে মুড়ি খাচ্ছে, তার বউ দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু সে পাচ্ছেনা! তার আট বছর বয়েসি মেয়ে টুসি উঠোনের একধারে কোট কেটে একাএকা এক্কাদোক্কা খেলছিল। কানাইবাঁশি চুপ করে গিয়ে টুসির কানে কানে বলল, হ্যাঁ রে টুসি, পূবের ঘরের দাওয়ায় ওটা কে বসে আছে বল তো?

টুসি ঝামটা মেরে বলল, আহা, ওই তো হারুকাকা বসে মুড়ি খাচ্ছে। কাল কত করে বললুম, ইতুদের কুলগাছ থেকে একটু কুল পেড়ে দিতে, কিছুতেই দিল না, জানো?

আচ্ছা, হারুকাকা দেখতে কেমন বল তো?

বিচ্ছিরি! দু-চোখে দেখতে পারিনা।

হারুকাকা কতদিন যাবত এবাড়িতে আছে বলতে পারিস?

হ্যাঁ বাবা, তোমার কী হয়েছে বলো তো? এই তো তিনদিন আগে তুমি বিকেলে হারুকাকাকে নিয়ে বাড়ি এলে। তারপর মা হারুকাকাকে জিজ্ঞেস করে করে সব বৃত্তান্ত বের করল।

কানাইবাঁশি চোখ বড় বড় করে বলে, কী বৃত্তান্ত বলতে পারিস?

তুমি বুঝি জানো না?

আহা, তোর মায়ের সঙ্গে কী কথা হয়েছে তা তো আর জানি না!

ওই তো, হারুকাকা বলল, তুমি নাকি ওর জ্ঞাতি ভাই। তোমাকে চোখে চোখে রাখার জন্য সঙ্গে থাকতে এসেছে। আমি আর কিছু জানিনা।

কানাইবাঁশি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। না, তারই বুদ্ধিবিভ্রম হয়েছে! ব্যাপারটার একটা মীমাংসা না হলে শান্তি নেই।

দুপুরে খেয়েদেয়ে কানাইবাঁশি চুপিসাড়ে বেরিয়ে পড়ল। নির্জন বটতলায় এসে ঘাসের ওপর বসে কিছুক্ষণ চারপাশটা দেখে নিয়ে সতর্ক গলায় বলল, হারুভায়া কি কাছেপিঠে আছো নাকি হে?

খুক করে কে যেন গলার একটা শব্দ করল। তারপর মোলায়েম গলায় বলল, আছি হে কানাইবাঁশি।

তুমি কি যাদুটাদু জানো নাকি হে?

মোটেই না। ওকথা উঠছে কেন?

না, এই বলছিলুম আর কি! তা বাপু, ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলবে? তোমার মতলবখানা কী?

কোন মতলবের কথা কইছো হে?

বলি, আমার পিছনে লেগে আছো কেন?

কেন, তোমার তাতে অসুবিধে কি? আমি তো তোমাকে আঁচড়েও দিইনি, কামড়েও দিইনি!

তা দাওনি বটে। কিন্তু তুমি আমার চোখে গায়েব হয়ে আছ কেন? অন্য সবাই তোমাকে দিব্যি দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু আমি পাচ্ছিনা, এ আবার কীরকম রগড় হে?

দেখতে পেলে তো গলা টিপে ধরতে। আমি তোমাকে চোখে চোখে রাখছি কিনা। তাছাড়া মনে পাপ থাকলে অনেক কিছুই চোখে পড়ে না।

চোখে চোখে রাখছই বা কেন? আর পাপের কথাই বা ওঠে কোন কারণে?

তোমাকে একটা হিসেব দিই। তোমার মোটে দুটো গরু, তার মধ্যে একটাই দুধ দেয়। তাও মোটে তিন সের।। আরও দু-সের তোমাকে জোগান দেয় শিবু গয়লা। মোট পাঁচ সের দুধ তোমার সম্বল। তাহলে তুমি তিনজন গাহেককে এক সের করে, চারজন গাহেককে আধসের করে, আরও চারজনকে এক পো করে দুধ দাও কী করে?

ও তুমি ঠিক বুঝবে না। হরেদরে হয়ে যায়।

আরও কথা আছে। তোমার পোয়ার মাপ এক ছটাক কম আছে কিন্তু। আমি মেপে দেখেছি।

তুমি তো খুব বেয়াদব হে! আমার এ গাঁয়ে একটা সুনাম আছে, তা জানো?

তা জানি। তোমার গাহেকরা তোমাকে খুব বিশ্বাস করে। তুমি লোক খারাপও নয়, আমি জানি। তোমার ধর্মভয় আছে।

তবেই বোঝো। আমার সঙ্গে হিসেব করে কথা কইবে।

গত বছর পুজোর আগে তোমার বউ তোমার কাছে একজোড়া সারদা বালা চেয়েছিল, মনে আছে?

তা থাকবেনা কেন? খুব মনে আছে। তা হঠাৎ সে কথা কেন?

তুমি গড়িয়েও দিয়েছিলে, ঠিক তো?

তা তো বটেই।

সারদা বালা বাবদ রাজু স্যাঁকরার কাছে তোমার লাখখানেক টাকা বাকি পড়ে যায়। তাই না?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কানাইবাঁশি বলে, তা বটে। বাকিটা এখনও শোধ হয়নি।

আমি তো সেই কথাটাই তোমাকে ফাঁকমতো বলব বলে ঘুরঘুর করছি। ওই সারদা বালা কেনার আগে পর্যন্ত তুমি একজন ভালমানুষই ছিলে বটে। তোমার গরুর দুধে জল মিশত না। সারদা বালার পর মিশছে। ব্যাপারটা ভেবে দেখেছ? এইভাবেই কিন্তু শুরুটা হয়, তারপর পিছলে যাওয়ার রাস্তা কোল পেতেই আছে।

কানাইবাঁশি একটু ভাবল। তারপর বলল, তাহলে কী করতে হবে?

ন্যাকা সেজো না কানাইবাঁশি, কী করা উচিত তা তুমি ভালোই জানো। দুনিয়ার একটা সৎ লোক যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে ভগবানের বড় কষ্ট হয়। কথাটা মনে রেখো।

কিছুক্ষণ ঝুম হয়ে বসে থেকে কানাইবাঁশি আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, এখনো আছ নাকি হে হারু?

কিন্তু হারুর আর সাড়া পাওয়া গেল না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%