শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

বুঝলেন, বিয়ের সময় আমার একটা আনক্যানি ফিলিং হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমি একজন মৃতদেহকে বিয়ে করছি।
বলেন কী মশাই। এ যে সর্বনেশে কাণ্ড! তা এরকম মনে হল কেন আপনার?
সেটাই বলতে চাইছি। পাশে বেনারসিতে মোড়া যে-মেয়েটি বসে ছিল, তার শরীরে যেন কোনও সারই নেই। মাঝে মাঝে যেন ঢলে পড়ে যাচ্ছিল, সম্প্রদানের সময় হাতটা ছুঁয়ে চমকে উঠেছিলাম, কোনও জ্যান্ত মানুষের শরীর কি এত ঠান্ডা হয়? তার আগে অবশ্য সাতপাক আর শুভদৃষ্টি হয়ে গেছে। কিন্তু মেয়েটি আমার দিকে তাকায়নি। পাশেই দাঁড়ানো এক মহিলার কাঁধে মাথা খানিকটা লটকে ছিল। মুখটা তখনও পানপাতায় ঢাকা। ভেবেছিলাম, সারা দিন উপোস আর ধকলে রোগা মেয়েটা লাতন হয়ে পড়েছে বুঝি! কুশণ্ডিকার সময় আমি অগাধ জলে। একেই বিয়ের প্রথাসিদ্ধ নার্ভাসনেস, তার ওপর একটা হিমশীতল হাত। আমারই তখন ধাত ছাড়ার উপক্রম। পারলে বিয়ের আসর ছেড়ে দৌড়ে পালাই। কিন্তু সে তো আর সম্ভব নয়, তাই কাঠপুতুলের মতো বসে বিয়ের মন্ত্র আউড়ে যাচ্ছিলাম। সে এক প্রাণান্তকর অভিজ্ঞতা মশাই! শেষ অবধি কি এরা ষড়যন্ত্র করে একটা ডেডবডিকেই বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়েছে? আমি কি কোনও ক্রিমিনাল ট্র্যাপের শিকার? এইসব আগড়মবাগড়ম ভাবতে-ভাবতে আমার মাথা ভোঁ-ভোঁ করছিল।
আহা, থামছেন কেন? এসব টেন্স সিচুয়েশনে গল্প থামাতে নেই। তাতে আমাদের টেনশন হয়।
না, এই একটু স্ট্রাটেজিক পজ দিচ্ছিলাম আর কী! মুশকিল হল, সাধারণত বিয়েবাড়িতে যেমন একটা হই-হুল্লোড় বা উৎসবের আবহ থাকে, আমার বিয়ের আসরটা মোটেই সেরকম নয় যেন, অনেকটা যেন শ্রাদ্ধবাড়ির মতো থমথমে। সকলের মুখই যেন গোমড়ামতো। যে-লোকটা মেয়েটিকে সম্প্রদান করতে বসেছিল, তার মুখ দেখে আমার মনে হচ্ছিল যেন জল্লাদ। সম্পর্কে সে নাকি মেয়ের কাকা। আমার মনের অবস্থা বুঝতেই পারছেন। ছেলেবেলাতেই আমার মা আর বাবা গত হওয়ায় আমি এর-ওর কাছে থেকে নিতান্তই অনাদরে আর তুচ্ছতাচ্ছিল্যের মধ্যে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছি। গার্ডিয়ান বলতে কেষ্টকাকা,তা তিনিও আপন কাকা নন, বাবার খুড়তুতো ভাই এবং লোকও সুবিধের নন। তা এই কাকা, মামা, পিসে বা মেসো নিয়ে তো আর বাছাবাছি চলে না মশাই! যার কপালে যেমন জোটে সেটাই মেনে নিতে হয়, কী বলেন!
তা তো বটেই! আমারও এক গনাকাকা আছে ফালতু লোক। কিন্তু বিজয়াদশমী বা নববর্ষে পেন্নাম না করে উপায় নেই। বাই দ্য বাই, আপনি কি বিয়ের আগে মেয়েটিকে দেখেননি?
না মশাই। আমার পোস্টিং বাঁকুড়ার মফসসলে। মেয়ে সুন্দরবনের বিজয়নগর গাঁয়ের। মেয়ে দেখার ঝক্কি ছিল বলে ফোটো দেখে মত দিয়েছিলাম। ফোটোয় আজকাল নানা জোচ্চুরি করা যায়, জানেন বোধ হয়। কেষ্টকাকা লোভী লোক। আমার বিয়ে বাবদ তিনি কনেপক্ষের কাছ থেকে বেশ কিছু টাকা পণ বাবদ আদায় করেছিলেন বলেও কানাঘুষো শুনেছি। আমার বিয়ে তিনিই ঠিক করেন, আমার কিছু করার ছিল না। আমাদের বাঙালদেশে একটা প্রচলিত কথা আছে, মাইনকা চিপি। শুনেছেন কথাটা?
আজ্ঞে না। চিনে ভাষার মতো শোনাচ্ছে।
মাইনকা চিপি অত্যন্ত সাব্যস্ত একটি এক্সপ্রেশন, মানুষের জীবনের গভীর জটিল সংকটের এমন লাগসই পরিভাষা আর পাবেন না। বরং শিখে রাখুন, কাজে লাগবে। তারপর যা বলছিলাম। আমি সেই বিয়ের আসরে বেশ একটা মাইনকা চিপিতে পড়ে গিয়েছিলাম।
তাই তো! এ তো মাইনকা চিপি বলেই মনে হচ্ছে! এবার আর-একটু খোলসা হোন।
এই হচ্ছি। তা নমোনমো করে বিয়েটা তো কোনওক্রমে হয়ে গেল। বাসরঘরে যে-আবহাওয়া থাকার কথা শোনা যায়, তার কিছুই ছিল না। কনের বান্ধবী বা তুতো বোনটোন কেউই নেই। বরপক্ষের দু'-একজন ছিল বটে, কিন্তু মুড ছিল না বলে তারাও মানেমানে কেটে পড়ল। তারপর মৃতদেহ বা বউ নিয়ে আমি একা। পাশেই বেনারসিতে মোড়া পুটুলিটা থুপ হয়ে বসে আছে, সাড়াশব্দ নেই, নড়াচড়া নেই।
এ তো রীতিমতো সাসপেন্স মশাই!
আজ্ঞে। কিন্তু আমি যে কত বড় বিপদে পড়েছি, তা তখনও বুঝতে বাকি ছিল। একটু পরে সাহস সঞ্চয় করে বউয়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলার চেষ্টা করলাম। প্রথমে জবাব দিচ্ছিল না। তারপর কী একটু ক্ষীণকণ্ঠে বলল। গলা শুনে সন্দেহ হওয়ায় আমি নিজেই ওর ঘোমটা সরিয়ে দিয়ে মুখের দিকে চেয়ে ভিরমি খাই আর কি!
খুব কুচ্ছিত বুঝি?
আরে না মশাই, কুচ্ছিত হলেও তো বেঁচে যেতুম। মেয়েটার বয়স মোটে বারো-তেরো বছর। কচি, নাবালিকা মেয়ে একটা! ভয়ে আমার অন্তরাত্মা ককিয়ে উঠল। আমার জেল হবে, চাকরি যাবে মানসম্মান বলতে কিছু তেমন নেই বটে, তবু যদি কিছু থেকেও থাকে তাও লোপাট হবে। মাইনকা চিপি কাকে বলে বুঝছেন তো!
ওরে বাবা, তা আর বুঝছি না! খুব বুঝছি।
কেউ যে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে তা বুঝতে পারলাম, কিন্তু সেটা নিয়ে মাথা ঘামানোর তখন সময় নেই। আতঙ্কে আমার হাত-পা শীতল, দম আটকে আসছে। একটু থিতু হয়ে মেয়েটিকে বললাম, তোমার তো বিয়ের বয়সই হয়নি! শুনে মেয়েটা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে জড়ানো গলায় যা বলল তার অর্থ দাঁড়ায়, তার বাবা জোর করে এই বিয়ে দিয়েছে। তাকে প্রচুর মারধর করা হয়েছে, দু'দিন নির্জলা উপোস রেখে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হয়েছে। আর এর পিছনের কারণ হচ্ছে জগা।
জগা! সে আবার কে মশাই?
সে বিজয়নগর অঞ্চলের কুখ্যাত ডাকাত। কোন কুক্ষণে মেয়েটির টুলটুলে মুখখানা দেখে তার মনে ধরে যায়, তাই মেয়েটি অর্থাৎ বনশ্রীর বাবাকে হুমকি দিয়ে রাখে যে সময়মতো সে এই মেয়েটিকে নিয়েই ঘর বাঁধবে। তাই অ্যাডভান্স বুকিং করে রাখল। খবরদার যেন বনশ্রীর বিয়ে অন্যত্র দেওয়া না-হয়! তার হুমকিকে ভয় খায় না এমন লোক ওই অঞ্চলে নেই। তবে বিয়ের কিছুদিন আগে জগা পুলিশের হাত ধরা খেয়ে তখন জেল খাটছিল, আর সেই ফাঁকে মেয়েটির গতি করার চেষ্টা করেছে, তার বাবা। সব শুনে আমি কিছুক্ষণ থম মেরে গেলাম, নাবালিকা বিবাহের অপরাধ তো আছেই, তার সঙ্গে ঘাড়ে চাপল জগা নামক এক ডাকাতের ভয়ও। লক্ষ করে থাকবেন যে সমাজবিরোধীদের সরকারবাহাদুর বেশিদিন জেলটেলে রাখতে চান না, ভালোবেসে ছেড়ে দেন বা স্থায়ীভাবে জামিনটামিন দিয়ে দেন। জগা জাতীয় লোকজন ছাড়া ওদেরও চলে না কিনা। তাই জগা জেলে আছে, এই সংবাদ আমাকে মোটেই স্বস্তি দেয়নি মশাই। আমি শুধু মেয়েটিকে জিগ্যেস করলাম, সে জগার প্রতি কতটা আসক্ত। কারণ, আজকাল বিয়ের বয়স বেঁধে দেওয়া হলেও প্রেম করার বয়স তো আর বেঁধে দেওয়া হয়নি! কী বলেন? নাবালিকা বা নাবালকদের প্রেমের নির্লজ্জ দাপটে আমরাই বরং জড়সড়। তা মেয়েটি তখন বলল, সে জগাকে ভালো করে চেনেও না, প্রেম দূরস্থান। তবে সে পড়াশোনা করতে চায়। বিয়ে করে সংসার করার কথা ভাবেওনি কখনও। সারা রাত মেয়েটা কান্নাকাটি করল, আর আমি হা-হুতাশ। ফাঁকেফাঁকে অবশ্য মেয়েটিকে বুঝিয়ে বললাম, আমাদের বিয়েটাই বে-আইনি, কাজেই তার কোনও ভয় নেই। পরদিন তার বাবাকে আমি বুঝিয়ে বলব।
তা বললেন?
যে আজ্ঞে। তবে আমি তেমন রোখাচোখা মানুষ নই, একটু মিনিমিনে। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে ভদ্রলোককে বিস্তর হেনস্থা হতে হত। বনশ্রীর বাবা কেঁদেকেটে বললেন, মেয়েটাকে জগার হাত থেকে বাঁচাতেই তাঁর এই চেষ্টা। কিন্তু এতে যে তাঁর মেয়েরও সুবিধে হল না, বরং আমার মতো একজন নির্দোষকে বিপদে ফেলা হল সেটা তাঁকে কে বোঝায়? বনশ্রীকে মুক্তি দিলাম বটে, কিন্তু আমি পার পেলাম না। লোকজানাজানি হয়ে গেল। আমাকে পুলিশে ধরল। আর সেই সুবাদে আমার ডাকঘরের কেরানির চাকরিটাও খোয়ালুম। একেবারে পথে বসার অবস্থা। মাইনকা চিপি ব্যাপারটা কি এখন একটু-একটু বুঝতে পারছেন?
আজ্ঞে পরিষ্কার বুঝতে পারছি। খুব লাগসই কথা মশাই! বলতেই হবে বাঙাল ভোকাবুলারিতে অনেক মণিমুক্তো ছড়িয়ে রয়েছে, যা এখনও এক্সপ্লোর করা হয়নি। তারপর কী হল মশাই, জেল খাটতে হল বুঝি?
হল, তবে বেশিদিনের জন্য নয়। আমাকে যে ফাঁসানো হয়েছিল, সেটা সবাই বুঝতে পারছিল। জেলখাটা তো তেমন সাংঘাতিক কিছু নয়, আসলে আমার কোমর ভেঙে দিয়েছিল, চাকরি যাওয়াটা। কী খাই, কোথায় মাথা গুঁজি, কার ঘাড়ে মাথা রেখে একটু কাঁদি, তার কোনও দিশাই পাচ্ছিলাম না! রাস্তায়-রাস্তায় ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াই আর মাথা পাগল-পাগল লাগে। মুখচোরা বলে আমার বন্ধুবান্ধব ও খুব কম, আত্মীয়স্বজন বলতেও তেমন ঘনিষ্ঠ কেউই নেই। কেষ্টকাকাও গা-ঢাকা দিয়েছে। আমি তখন অগাধ জলে।
বুঝতে পেরেছি, একেই বলে মাইনকা চিপি! ওঃ লা-জবাব এক্সপ্রেশন মশাই! তারপর?
রিট্রেঞ্চমেন্টের মাস তিনেক বাদে আমি যখন গেঞ্জি আর জাঙ্গিয়ার হকারি করছি, তখন তোলাবাজ কাজুর সঙ্গে আমার চেনাজানা হয়েছিল। সে তার বসের হয়ে তোলা নিতে আসত, একটু-আধটু কথাবার্তা হত। এক বিকেলে বৃষ্টি নামায় মালপত্র গুটিয়ে পোঁটলা সামলে শেডের তলায় দাঁড়িয়ে আছি। পাশেই কাজু দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিল।
হঠাৎ বলে ফেললাম, কাজু আমাকে তোদের দলে নিবি? এই উঞ্ছবৃত্তি আর পোষাচ্ছে না রে ভাই! কাজু একটা খারাপ গালগাল দেবে বলেই ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু বৃষ্টিবাবদ মনটা একটু উঁড়ুউড়ু ছিল বলেই বোধ হয়, দিল না। একটু ভারিক্কে চালে বলল, মাল কামাতে চাস? তার জন্য দম লাগে। তুই কী একটা সরকারি চাকরি করতিস না? বললাম, হ্যাঁ, পোস্টাল ডিপার্টমেন্টে। হেসে বলল, তার মানে পেটে বিদ্যে আছে। বললাম, দূর বে, কলেজ ইউনিভার্সিটিতে যা শেখানো হয়, তা লোকে তাকে তুলে রেখে ভুলে যায়, ফালতু জিনিস, কাজের নয়। জিগ্যেস করল, তুই কত ক্লাস পাশ দিয়েছিস? বললাম, হিস্ট্রির এম এ, আমাকে দেখলে মনে হয়? সে একটু চুপ থেকে বলল, হয়। এক একা বুড়ো আছে, তার একজন কম্প্যানিয়ন দরকার, শিক্ষিত ছেলে চায়। সকাল আটটা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত। বুড়োর কম্পিউটরের নলেজ নেই, সেই ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে, আর সপ্তাহে একদিন ডাক্তারের চেম্বার আর একদিন ব্যাঙ্কে নিয়ে যেতে হবে, পারবি? বললাম, পারব, কত দেবে? কাজু বলল, টুয়েন্টি কে। রাজি থাকলে কাল সকাল আটটায় এখানে দেখা করিস। নিয়ে যাব। কিন্তু নো দু'নম্বরি, মনে থাকে যেন! বুড়ো আমার এক কাজিনের মামাশ্বশুর। বেগড়বাই করলে কিন্তু তোর খবর আছে।
রাজি হলেন নাকি?
হব না মানে! পরদিন হাজির হলাম গিয়ে বুড়োর পণ্ডিতিয়ার ফ্ল্যাটে। রমেন রায়ের বয়স আশির এপিঠ-ওপিঠ। লম্বা রোগা চেহারা, ফরসাও খুব মুখে-চোখে আভিজাত্য মকমক করছে। বউ ছিলেন রোমানিয়ান, বছর বারো আগে ডিভোর্স করে পার্মানেন্টলি দেশে ফিরে গেছেন। ছেলেপুলে নেই। ফিলোসফি আর ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের মস্ত পণ্ডিত। দিনের খানিকটা সময় অন্তত লেখাপড়ার সংসর্গ করা যাবে ভেবে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। চাকরিটা কাজুর সুপারিশে হয়েও গেল। মনের মতো কাজ। রমেন রায় আর তাঁর গবেষণাধর্মী নিবন্ধগুলি হাতে লিখতে পারেন না, হাত ক্র্যাম্প। আমি সেগুলো কম্পিউটারে লিখে বিভিন্ন ফাইলে সেভ করে রাখতাম। উনি যেহেতু কম্পিউটরে কারেকশন করতে পারতেন না, সেই হেতু আমাকে সেসব নিবন্ধের প্রিন্ট আউট বের করে দিতে হত। সংশোধনের পর সেগুলো দেশিবিদেশি নানা জার্নালে ই-মেল করাই ছিল আসল কাজ। উনি দেখলাম আমার কাজে খুব খুশি। আর ডাক্তারের চেম্বার বা ব্যাঙ্কে যাওয়ার রুটিনওর্য়াক। তেমন পরিশ্রমও নয়। বিকেলে যথারীতি হকারিও বজায় রইল। আমার মনে হল, এর চেয়ে বড় সাকসেস আর কী-ই বা হতে পারে!
আপনি বেশ লড়িয়ে মানুষ মশাই!
আমি একা কেন, লড়াই কাকেই বা না করতে হচ্ছে বলুন! একটা পিঁপড়েকেও কত মেহনত করে চিনির দানা বয়ে নিয়ে যেতে হয়।
তা অবশ্য ঠিক। মাইনকা চিপিতে আমাকেও বিস্তর পড়তে হয়েছে মশাই। তখন সেগুলোরই নাম যে মাইনকা চিপি তা জানতাম না। জীবনসংগ্রাম কাকে বলে তা আমাকেও হাড়ে হাড়ে টের পেতে হয়েছে। তারপর কী হল?
একটা জিনিস খেয়াল করেছেন কি?
কী বলুন তো?
টাইম ফ্যাক্টর! সময় কিন্তু বসে ছিল না। সময় বসে থাকেও না। অনেকেই বলে বর্তমানকাল বলে নাকি কিছুই নেই, বর্তমান নাকি লজিক্যালি অসম্ভব! টেন্স নাকি মাত্র দুটো, অতীত আর ভবিষ্যৎ! সময় যেহেতু এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না, তাই নাকি বর্তমান বলেও কিছু থাকতে পারে না! সত্যি নাকি? রমেনবাবু তাই বলতেন।
থিওরেটিক্যালি তাই। তবে আমাদের সুবিধার্থে আমরা একটা ভার্চুয়াল বর্তমান কল্পনা করে নিই আর কী! নইলে ভবিষ্যৎ আর অতীতের মধ্যে কোনও গ্যাপ বা পজ নেই বলে বর্তমান বলে কিছুই দাঁড় করানো যায় না।
তাহলেই বুঝুন আমরা কত গোঁজামিল নিয়ে বেঁচে আছি! অবশ্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, আদতে টাইম বলে সত্যিই কিছু আছে কি না। টাইম বা সময় জিনিসটাই ঘোর বিতর্ক এবং প্রমাণসাপেক্ষ একটা জিনিস। অনেকের মতে সময় হল সোনার পাথরবাটি। তা যাই হোক, আমার সময় তখন বসে ছিল না। নিজেকে রাষ্ট্রে ও সমাজে কোনওরকম একটা আইডেন্টিটি দেওয়ার জন্য প্রাণপণে লড়ে যাচ্ছিলাম। কাজটা এদেশে কত কঠিন তা বুঝতেই পারছেন বোধ হয়। ঠিক সেই সময়ে এক দুপুরবেলা ফুটপাথের ভাতের হোটেলে খেয়ে সবে নিজের ঠেকে ফিরেছি, এমন সময়ে ফোন। এবং নারীকণ্ঠ।
বলেন কী মশাই!
হ্যাঁ, আমার পুরনো ফিচার ফোনটাই আমি বরাবর চালু রেখে এসেছি, বদলানোর দরকার পড়েনি। কণ্ঠটি বলল, আমি বনশ্রী। আমাকে কি আপনার মনে আছে? সত্যি বলতে মনে ছিল না। বছর পাঁচেক আগেকার শোনা নামটা ভুলেই গিয়েছিলাম। তবে সেকেন্ড দশেক বাদে মনে পড়ে গেল। বললাম, হ্যাঁ খুকি মনে পড়েছে। মনে হল খুকি বলাতে খুব একটা খুশি হয়নি। তার খবর জিগ্যেস করায় বলল, সে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে কম্পিউটরের কোর্স করেছে এবং কলকাতায় বি এস সি পড়ছে ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে। এবং বারদুয়েক যেন আমাকে শোনানোর জন্যই বলল, সে এখন উনিস ছাড়িয়ে কুড়িতে পা রেখেছে। অর্থাৎ তাকে আর খুকি মনে করার কারণ নেই।
আর জগা?
হ্যাঁ, সে কথাও হল। বলল, জগা জেলের মধ্যেই খুন হয়ে যায়। কার হাতে বা কেন তা জানা নেই। তবে শোনা গেছে পলিটিক্যাল মার্ডার।
তারপর মশাই! এ তো খুব ইন্টারেস্টিং দিকে ঘটনা টান নিচ্ছে মনে হয়।
রোমান্সের অ্যাঙ্গেল থেকে ভাবলে তাই, কিন্তু অর্থনীতি এবং আর্থসামাজিক অ্যাঙ্গেল থেকে ভাবুন, দেখবেন, মন রসস্থ হওয়ার বদলে উদ্বেগ এসে জায়গা দখল করেছে। আমি তখন থাকি কেষ্টকাকার পরিত্যক্ত গ্যারেজে। আগে সেখানে মনোহর ধোপার লন্ড্রি ছিল, সে মারা যাওয়ার তার ভাতিজা দখল নেয়। তার হাত থেকে গ্যারেজ উদ্ধার করতে আমাকেও হাত লাগাতে হয়েছিল, হকারবন্ধুদের মদতে। নাবালিকার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া এবং পণের টাকা গাপ করার অপরাধবোধের দরুন কেষ্টকাকা নামমাত্র ভাড়ায় থাকতে দিয়েছেন। একটু বৃষ্টিতেই গ্যারাজে জল ঢোকে, বাথরুম করতে যেতে হয় কেষ্টকাকার দোতলার বাথরুমে। রান্নাবান্নার বালাই নেই। ফুটপাথের হোটেল ভরসা। এখানে রোমান্সকে কোথায় ঢোকাবেন মশাই? তার ওপর ভদ্রস্থ চাকরি বা ব্যবসা করি না, সামাজিক পরিচয় বলতেও কিছু নেই।
তা অবিশ্যি ঠিক, কিন্তু খালপাড়ের ঝুপড়িতেও তো লোকে সংসার পাতে।
তা পাতে। কিন্তু পাতা উচিত নয়। আর আমার বেসিক প্রশ্নই তো হল, কোনও সভ্যভব্য দেশে খালধারের ঝুপড়ি বলে কিছু থাকবে কেন? মানুষকে ওই অধঃস্তরে নেমে যেতে দেওয়া হবে কোন আক্কেলে?
হ্যাঁ সেটাও ভাববার মতো কথা বটে।
আরও একটা বিষয় মাথায় রাখবেন, যে-সময়ের কথা হচ্ছে, তখন বনশ্রীর যেমন উনিশ আর কুড়ির মাঝামাঝি বয়স, তেমনি আমার বয়সও তেত্রিশ আর চৌত্রিশের মাঝখানে দোল খাচ্ছে, এবং সময় থেমে থাকছে না। এত বয়ঃপার্থক্যে আজকাল দাম্পত্যসম্পর্ক হওয়ার রেওয়াজ নেই। আজকালকার মেয়েরা বুড়ো বর মোটেই পছন্দ করে না, তারা চায় সমবয়সি বর, ইয়ারবন্ধুর মতো।
সেটাই তো ভুল মশাই। আমাকে দেখুন, চল্লিশেও মোটামুটি ইয়াঙ্গিশ চেহারা রয়েছে, আমার বউয়েরও চল্লিশ, কিন্তু—থাকগে ওসব দুঃখের কথা। প্রকৃতির নিয়ম বলেও তো একটা ব্যাপার আছে না কি! তাই আপনার কথাটা মানতে পারছি না।
কথাটা বনশ্রীও মানতে চায়নি।
চায়নি? বাঃ! শুনে কান জুড়িয়ে গেল। জানেন ভাই, কান জুড়নোর মতো কথা আজকাল কানেই আসে না। তবু সারা দিন এরকম কোনও কথার জন্য কান পেতে থাকি। তা বনশ্রী বললটা কী, সেটা তো বলবেন!
ফোনে বেশি কথা হয়নি। একটু লাজুক প্রকৃতির। দেখা করতে চাইল। পরের রোববার অ্যাপো। যথারীতি একটা রেস্টুরেন্টে।
দেখতে শুনতে কেমন?
খারাপ নয়, আবার ডানাকাটা পরিও নয়। নোনা জলহাওয়ার মানুষ বলে রং চাপা। চেহারা প্রায় সেই আগের মতোই রোগা, তবে মুখশ্রী ভালো। আর একটু লম্বাও হয়েছে। জগা তো আর এমনি ঢলে পড়েনি, কিছু একটা দেখেই ঢলেছিল।
আহা, এখন জগার কথা থাক না! আপনার কথা বলুন, আপনি কতটা কাত হলেন?
শালগ্রামশিলা দেখেছেন তো। আমারও সেই অবস্থা। শোওয়া-বসা সমান। কাজেই আমার রিঅ্যাকশন নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আমার সোজা থাকাও যা, কাত হওয়াও তা।
তা বললে হবে কেন, বুকে কি আর গুড়গুড়ুনি ওঠেনি!
উঠেছিল, তবে সেটা ভয় এবং দুশ্চিন্তায়। বললাম, বিয়ে করেছ? সে ভ্রূ কুঁচকে রীতিমতো বিরক্ত হয়ে বলল, ও কথা কেন বলছেন? আবার বিয়ে করতে যাব কেন? আমার বিয়ে তো হয়েই গেছে, একসঙ্গে বাসররাতও তো কাটিয়েছি! প্রমাদ গুণে বললাম, ওটা কি বিয়ে নাকি? তখন তুমি নাবালিকা ছিলে, ও বিয়ে ধরতে হয় না, ওটা আইনত বিয়েই নয়। তুমি এখনও কুমারী আছ। বনশ্রী একটু রাগ করেই বলে, আইন যেমন আছে তেমনি সংস্কারও তো আছে। জীবনটা আইন মেনে তো চলে না! আপনি আমাকে গ্রহণ করতে না চাইলে করবেন না, কিন্তু আমি নিজেকে কুমারী বলে ভাবতে পারব না। আমি সেই থেকে সিঁদুর পরি চুলে ঢাকা দিয়ে, এই দেখুন সোনায় বাঁধানো নোয়া। আর শাঁখাও ছিল, কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করতে গিয়ে বেড়ে গেছে। তাই এখন পরছি না। মা বলছে, এওদের নোয়া থাকলেই হয়, শাঁখা না হলেও ক্ষতি নেই। আমি আতঙ্কিত হয়ে বললাম, কিন্তু তখন তুমিই তো বিয়েটা মানতে চাওনি, এখন তবে মানছ কেন? বনশ্রী অবাক হয়ে বলে, কখন বললুম যে বিয়েটা মানি! জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে আপসেট হয়ে গিয়েছিলাম, আর জগার ভয়ও ছিল। কিন্তু বিয়েটা কখনও অস্বীকার করার কারণ তো ঘটেনি! আমরা ওরকমই নই। আমি বললাম, কীরকম নও? বনশ্রী বলে, এখনকার মতো নই, আমরা আগেকার মতো।
বাঃ! এই তো, শুনে কান জুড়িয়ে গেল।
না। আপনি বুড়িয়ে গেছেন। এসব কথা শুনে যার কান জুড়োয় সে আসলে সেকেলে বুড়ো!
নয় তাই হলুম মশাই। কিন্তু প্রাণটা ঠান্ডা হল। ঊষরতার মধ্যে একফালি ঘাসজমি দেখলে কত ভালো লাগে বলুন তো! তারপর এগোন মশাই, ধৈর্য থাকছে না যে!
একটা আর্থসামাজিক সংকটকে আপনি রোমান্টিক ননসেন্সে নামিয়ে আনতে চাইছেন তো! বুঝেছি। কিন্তু জীবনটা তো আর মিলনান্তক উপন্যাস নয়, নানারকম ঘাপলা আছে।
বনশ্রী কি আপনার বিয়ের কথা জিগ্যেস করেছিল?
করেনি আবার! খুব করেছিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, বিয়ে দূরস্থান আমার খাওয়াপরার সংস্থানই নেই। শুনে মুষড়ে পড়ার বদলে বেশ খুশিই হল যেন! মেয়েটা ঘাড়ে চাপতে চাইছে ভেবে তখন আমি তাকে ঠেকানোর জন্য আমার হকারি, গ্যারাজবাস ইত্যাদি যতখানি করুণ করে বলা যায় ততখানিই বললাম। কিন্তু প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া হল না। মেয়েটা আমার দারিদ্রের করুণ কাহিনি শুনেও দিব্যি নির্বিকার হয়ে পা দোলাতে-দোলাতে আইসক্রিম খেয়ে যেতে লাগল।
আপনি কিপটে আছেন তো! মেয়েটা হা-হয়রান হয়ে পতিদর্শনে এল আর তাকে শুধু আইসক্রিম খাইয়ে ছেড়ে দিলেন!
আরে না মশাই, গরিব হলেও কিপটে নই। কী খাবে জিগ্যেস করায় নিজেই বলেছিল, চানা বাটুরা আর আইসক্রিম। বেশ তৃপ্তি করে খেল। মনে হয় খুব খিদে পেয়েছিল। তখন আমি সন্তর্পণে আমার বয়সের কথাটাও একবার তুললাম। আমি যে তার তুলনায় বেশ বুড়ো, এটা খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলাম। খুব মন দিয়ে শুনলও। মুখে সিমপ্যাথিও লক্ষ করলাম। বললাম, তোমার চেহারা এত ভালো, তুমি লেখাপড়ায়ও ব্রিলিয়ান্ট, আমার মতো একজন নড়বড়ে লোককে এখনও গলায় লটকে রেখেছ কেন? সময় হলে তুমি একজন স্মার্ট, ইয়ং, ড্যাশিং পুশিং ছেলেকে বিয়ে করবে এবং সেটাই হওয়া উচিত। ওসব সিঁদুর শাঁখা কোনও কাজের নয়। ভাবলাম এবার ওষুধ ধরেছে, এতেই কাজ হবে এবং কেটে পড়বে।
কাজ হল?
হওয়া তো উচিতই ছিল। দিব্যি আইসক্রিম শেষ করে বলল, আচ্ছা, এই রেস্টুরেন্টের খাবার তো খুব ভালো, তাই না! মাঝে মাঝে তো এখানে এসে খাওয়া যায়। আপনার আপত্তি নেই তো? আমি হাঁ। এ তো আমার সঙ্গেই ঝুলে থাকতে চাইছে। আমতা আমতা করে বললাম, হ্যাঁ, তা যায়। সঙ্গে-সঙ্গে খুশি হয়ে বলল, তাহলে রোববার রোববার করে দু'জনে আসব, কেমন? শুধু এখানেই শেষ নয়, একদিন বিকেলবেলা ফুটপাথের দোকানে হকারগিরি করছি, হঠাৎ দেখি সামনে বনশ্রী সঙ্গে দু'জন বান্ধবী। বেশ বুক টান করে অহংকারের সঙ্গেই বান্ধবীদের বলল, এই দেখ, ইনিই আমার বর।
বলেন কী মশাই! বয়স যাই হোক, বনশ্রীকে আমার প্রণাম জানিয়ে দেবেন। মহীয়সী মহিলা মশাই! হাজার বছরে এক আধটা জন্মায়।
আপনি তো গদগদ হয়ে পড়লেন, কিন্তু আমার কী অবস্থা ভাবুন। দাড়ি কামানো নেই, চুল আঁচড়ানো নেই, ঘেমো শরীর। আর দু'জন আধুনিকা ঝকঝকে মেয়ে আমাকে হাঁ করে দেখছে। লজ্জায় আমি অধোবদন। তাদের একজন অবশ্য বলল, হি ইজ কোয়াইট এ ম্যাসকুলিন হি ম্যান। আর-একজনের মন্তব্য অ্যান্ড হ্যান্ডসাম অলসো!
না, একথা স্বীকার করতেই হবে যে, আপনার চেহারাখানা দিব্যি।
রাখুন মশাই আপনার চেহারা! আমি পড়লাম মাইনকা চিপিতে আর আপনি আমার চেহারা নিয়ে পড়লেন! এখানেই শেষ হলে তবু হত, তা নয়, এরপর প্রায়ই তার বান্ধবীরা দলবেঁধে আমাকে দেখতে আসত, আর পুরুষ বন্ধুদের উসকে দিয়েছিল যাতে তারা আমার কাছ থেকেই অন্তর্বাস ইত্যাদি কেনে, ফলে তারাও আসতে লাগল। একদিন বনশ্রীর সঙ্গে সেই রেস্টুরেন্টে খাওয়ার সময় বললাম, এসব কী হচ্ছে বনশ্রী! আমাকে লজ্জা দেওয়াই কি তোমার উদ্দেশ্য? মেয়ের তেজ আছে, উলটে চোপা করে বলল, হিস্ট্রির এম এ হয়েও আপনি যে হকারি করার সাহস দেখিয়েছেন, সেটা কি একটা উদাহরণ নয়? আপনার লজ্জা হচ্ছে কেন বলুন তো? আমার তো আপনাকে নিয়ে কোনও লজ্জা নেই।
না মশাই, আরও একবার বনশ্রীকে আমার আভূমি প্রণাম জানিয়ে দেবেন। এ ভাবা যাচ্ছে না।
দেব'খন জানিয়ে। এবার আমার কথায় আসি। আমি সাধ্যমতো সৎ ব্যবসা করি। কোয়ালিটি খুব ভালো, বাছাই জিনিস, দাম যতদূর সম্ভব কম, কেউ কিনে ফেরত দিতে চাইলে পুরো পয়সা ফেরত। তবে ফেরতের ঘটনা খুব কমই ঘটত। খদ্দেররা বাঁধা হয়ে যাচ্ছিল। সুতরাং আমার ব্যবসা যে খারাপ চলছিল, তা বলা যাবে না। কিন্তু রমেনবাবুর কথা আপনি নিশ্চয়ই ভুলে যাননি! আমার পরিপাটি গোছানো কাজ দেখে উনি আমার ওপর ভারী খুশি। মাঝে মাঝে কাজ ছাড়াও গল্পটল্প করতেন। বিদেশে ওঁর ভাবী স্ত্রীর সঙ্গে রোমান্সের গল্পও। আমি যে হকারি করি, তাও উনি জানতেন। কাজু ওঁকে ব্যাপারটা জানাতে বারণ করেছিল, বলেছিল, হকারি করার কথা বলিস না, ইম্প্রেশন খারাপ হবে রাখবে না তোকে। কিন্তু আমি মিথ্যে কথাটা তেমন বলতে পারি না। উনি আমাকে একদিন আমি আর কী করি জিগ্যেস করায় আমি অকপটে সব বলে দিই। উনি যে খুব একটা বিচলিত হয়েছিলেন, তা নয়। তবে বলেছিলেন, পেশা হিসেবে হকারি আইনসঙ্গত নয়। ফুটপাথ দখল করা গা-জোয়ারির মধ্যে পড়ে। উনি টিউশনিরও পক্ষপাতী নন। কারণ একই টিউশনি বিধিসম্মত কাজ নয়। দয়াপরবশ হয়ে উনি আমাকে জীবেন সেন নামে এক কর্পোরেট কর্তার কাছে পাঠান।
বাঃ! এই তো! আমি এই মোচড়টার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। এরপরই সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে যাওয়ার মসৃণ গল্প, তাই না?
একটা কথা মনে করিয়ে দিই, এটা কিন্তু আমার ওপরে ওঠার গল্প নয়, এটা একটা সম্পর্কের গল্প। তবে জীবেন সেন ঘোর পাগল লোক। আমাকে দেখেই বললেন, আপনি হো হকার, তাই না! ভেরি গুড! তার মানে আপনি একজন ফাইটার। আমি ফাইটার পছন্দ করি। কিন্তু ভাই, চাকরির দড়ি গলায় পরে নিলে মানুষ কেমন যেন গোরুর মতো হয়ে যায়। আর্থিক নিরাপত্তা ফাইটিং স্পিরিটের ঘোর শত্রু। লাইফের থ্রিল বলেও আর কিছুই থাকে না। বেতনভুকের জীবন বড়ই আলুনি। আজ বস আমার দিকে চেয়ে হেসেছেন, আজ অমুকে আমার স্যার বলে ডেকেছে, দুটো ইনক্রিমেন্ট হল আজ, এই সবই হল বেতনভুকের অ্যাচিভমেন্ট। আপনার কি পছন্দ হবে ব্যাপারটা? আমি কী বলব তা ভেবে পেলাম না। আমতা-আমতা করতে লাগলাম। উনি বললেন, ঠিক আছে, অ্যাজ এ জেশ্চার অফ অনার অ্যান্ড টু স্যালিউট এ ফাইটার আমি কাল থেকেই আপনার রেগুলার কাস্টমার হয়ে যাব। ওকে? আপনার স্টলের লোকেশনটা শুধু আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে যান। আর আপনার ফোন নম্বরটা।
এ তো আবার মাইনকা চিপিতেই পড়লেন বোধ হয়!
আমারও তাই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরদিন সন্ধ্যায় ছ'টা নাগাদ উনি ঠিকই এলেন এবং একগাদা গেঞ্জি জাঙ্গিয়া, রুমাল, আন্ডারপ্যান্ট, বারমুডা, টি-শার্ট, মোজা তোয়ালে ইত্যাদি কিনে নিয়ে গেলেন। প্রায় এক সপ্তাহ বাদে অফিসে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, বড় অর্ডার পেলে জিনিসের স্ট্যান্ডার্ড আর কোয়ালিটি বজায় রাখতে পারবেন কি? আমি মুশকিলে পড়ে বললাম, দেখুন বড় অর্ডারের জন্য আমাকে সাপ্লায়ারের ওপর নির্ভর করতে হবে। আমি এখন যেরকম বাজার ঘুরে বাছাই মাল কিনি, তখন তো তা পেরে উঠব না। বড় অর্ডার পেলে সাপ্লায়ার কী জিনিস দেয়, আর অ্যাভেলিবিলিটি কতটা, তা আগে থেকে বলা মুশকিল। উনি খুব খুশি হয়ে বললেন, অকপট সত্যিকথা বলার জন্য ধন্যবাদ। তবু আপনি বড় অর্ডারই পাবেন। টেন্ডার দেওয়ার অভিজ্ঞতা বোধ হয় নেই! ঠিক আছে ওটা আমি শিখিয়ে দেব।
ওরে বাপ রে! টেন্ডার! তার মানে আপনি তো জাতে উঠে গেলেন মশাই!
আজ্ঞে, আপনি বোধ হয় ভুলে গেছেন যে, আমি আপনাকে কোনও অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প শোনাতে বসিনি। আমি একটা সম্পর্কের কথা শোনাতে চাইছি। তখন বনশ্রীর সঙ্গে রোববারের রঁদেভুটা মোটমাট রেগুলার হয়ে গেছে। ওইদিন ঠিক জায়গায় ঠিক সময়ে আমাদের দেখা হবেই কি হবে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে রোজই ফোনে কথা বলা। প্রেমের কথা নয় মশাই। তবে নানা কথা, আগড়মবাগড়ম আর কী!
আপনি বোধ হয় জানেন না আগড়মবাগড়ম ছাড়া আর প্রেমের কোনও কথাই নেই।
তাই হবে বোধ হয়। বনশ্রীর অনেক কথার মধ্যে দিনান্তে একটা কথাই আমার মাথার মধ্যে ভোমরার মতো টক্কর খেয়ে-খেয়ে ঘুরে বেড়াত, অত ভাবছেন কেন, আমি তো আছি!
না মশাই, আমি বোধ হয় আহ্লাদে হার্টফেল করে বসব। তবু বলবেন এসব প্রেমভালোবাসার কথা নয়?
আগে শুনুন। সেই রোববার আমি জীবন সেনের প্রস্তাবের কথাটা বলতেই বনশ্রী বলল, আপনি কিন্তু চট করে বড়মানুষ হওয়ার কথা ভাববেন না। আপনি যেমন আছেন তেমন থাকলেই আমাদের চলবে। যদি তাড়াতাড়ি ওপরে উঠতে গিয়ে পা পিছলে যায়, তাহলে তো হবে না। আমার হঠাৎ একটা দুষ্টুবুদ্ধি জেগে ওঠায় বললাম, আমার পা পিছলে গেলে তুমি কি আমার কাছ থেকে পালিয়ে যাবে? একটু ভেবেচিন্তে বলল, না, আমি কোনও অবস্থাতেই আপনাকে ছেড়ে পালাব না। আপনি জগা ডাকাত হয়ে গেলেও না। তবে পরের জন্মে হয়তো আমি আর আপনার বউ হতে চাইব না। শুনে কী জানি কেন বুকটা ধক করে উঠল। মৃদু হেসে বললাম, কিন্তু ইহজন্মেই তো আমরা এখনও কেউ কারও কিছু নেই। বনশ্রী বলল, আপনাকে কারও কিছু হতে হবে না। কিন্তু আপনার যে খুদকুঁড়োটুকু আছে তার মধ্যে আমাকেও ধরে নেবেন, তাহলেই হবে। আপনার কত টাকা হল সেটা বড় কথা নয়, ক'টা মানুষ আপনার হল সেটাই বড় কথা।
নাঃ হার্টটা বোধ হয় এইমাত্র ফেল হয়ে গেল!
খুব যদি অসুবিধে না হয়, তাহলে আরও তিন মিনিট বেঁচে থাকুন। লাটাই গুটিয়ে এনেছি।
তথাস্তু।
খুব ধীরে-ধীরে যখন আমার সুসময় আসতে লেগেছে তখন একদিন বনশ্রী বলল, সুসময় কিন্তু মানুষের পতনেরও সময়। আপনার চোখেমুখে একটু দিশাহারা আনন্দের ভাব দেখছি, আমার ভয় হচ্ছে। আপনাকে সামাল দেওয়া দরকার। এখন কি আমরা একসঙ্গে থাকতে পারি? একটু ভেবে বললাম, কেন নয়? কিন্তু তোমার সঙ্গে আমার তো এখনও আইনমোতাবেক বিয়েটাই হয়নি! সে ঝংকার দিয়ে বলল, আপনি আইন কোলে করে বসে থাকুন, কিন্তু আমাকে সংসারটা করতে দিন।
দিলেন তো?
তা দিলাম। একদিন বলল, আপনি ফুটপাথের দোকানটা কিন্তু তুলে দিতে পারবেন না। মাঝে মাঝে আপনাকে হকারিও করতে হবে। অবাক হয়ে বললাম, কেন? সে বলল, তাতে আপনার বুদ্ধিবিভ্রম হবে না, মন ভালো হবে আর মাটিতে পা থাকবে। মনে-মনে একটু বিরক্ত হলাম ঠিকই, কিন্তু ভিতরে একটা ভয় যেন কবে থেকে ঢুকে বসে আছে, বনশ্রী যদি কোনও কারণে পরজন্মে আমার বউ হতে না চায়! তাই রাজি হতে হল।
অবাক করলেন মশাই! কোটিপতি হয়েও এখনও আপনি মাঝে মাঝে হকারি করেন নাকি?
কী করি বলুন, ওই একটাই যে ভয়, পরজন্মে যদি...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন