শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

আর একবার শৈশবের দিকে কিছুদিন উজিয়ে যাওয়া গেল। না, সবটাই শৈশবের চেনা জায়গা নয়। কিছু নতুন কিছু পুরনো। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন বিভাগকে ধন্যবাদ। এই পরিভ্রমণের আয়োজনটি করেছিলেন তাঁরাই। নিউ জলপাইগুড়ি হয়ে প্রথমে মিরিক। তারপর মানেভঞ্জন এবং ধোতরে হয়ে দার্জিলিং। টাইগার হিল থেকে কালিংপং ফের চড়াই। এবার লাভা। সমতলে নেমে এসে মালবাজার ছুঁয়ে জলদাপাড়া অরণ্য। তারপর মেটেলি এবং সামসিং। অতঃপর প্রত্যাবর্তন। মার্চের ২ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত এই রূপবর্ণগন্ধময় ঘটনাবহুল পরিভ্রমণটি অভিজ্ঞতায় নতুন কিছু স্বাদ সঞ্চার করল।
পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, বিহারের উত্তরাঞ্চল এবং আসামে শৈশব কেটেছে বলে পাহাড় আমার অনেকদিনের সঙ্গী। আর ওই দার্জিলিং, মালবাজার, মাদারিহাট, মেটেলি সামসিং টাইগার হিল বা কালিংপং শৈশবের মায়াঞ্জন মাখা চোখ দিয়ে দেখেছিলাম, বলে আজও এইসব জায়গা বড় টানে। মালবাজারে আমরা যখন ছিলাম তখন সন্ধের পর ফেউ ডাকাত, বাড়ির পাশেই ফুটবলের মাঠে চিতাবাঘের বাচ্চারা খেলা করেছে। কী নির্জন, কী নিঃশব্দ ছিল। বহুকাল পর গিয়ে আর সেই শৈশবের জায়গাটা খুঁজে পাওয়া গেল না ঠিকই, কিন্তু হারানো কিছু দিন আবার ফিরে এল। ভারতবর্ষে পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র রাজ্য যার বিস্তৃতি আসমুদ্র-হিমাচল। তবু পর্যটক আকর্ষণ করার মতো সংখ্যাধিক স্থান এ রাজ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। দীঘা বা বকখালির সমুদ্র, সুন্দরবন বা জলদাপাড়ার অরণ্য, কিছু পুরাকীর্তি আমাদের সম্বল। তবে দর্শনযোগ্য স্থানের অভাব অনেকটাই পূরণ করে দিয়েছে উত্তরের হিমালয়। একা দার্জিলিং শতাধিক বছর ধরে যে বিপুল পর্যটক আকর্ষণ করেছে তা খুব কম শৈলশহরের ভাগ্যেই জোটে। হিমালয়ের এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই রাজ্যের পর্যটন বিভাগ এই অঞ্চলে পর্যটন উন্নয়নে বিপুল উদ্যোগ দিয়েছেন। তার ফলেই, মিরিক, লাভা ইত্যাদি নতুন নতুন শৈলাবাস সৃষ্টি হয়েছে। তৈরি হয়েছে চমৎকার ট্রেকিং পয়েন্ট সানদাক ফু। আগে টাইগার হিল-এ থাকবার ব্যবস্থা ছিল না, দার্জিলিং বা ঘুম থেকে যেতে হত। এখন সেখানেও তৈরি হয়েছে টুরিস্ট লজ। অলস লোক ঘরে বসেই বিখ্যাত সুর্যোদয় দেখে নিতে পারেন। টাইগার হিল-এর প্রায় সমান উচ্চতায় তৈরি হয়েছে ছোট্ট ও সুন্দর শৈলবাস লাভা। ঘুম থেকে কালিম্পং যাওয়ার পথে পড়ে। লাভা টাইগার হিল-এর মতো শীতল নয়, তবে সুন্দর। পার্বত্য অঞ্চলে এরকম আরও কিছু জায়গা বেছে নেওয়া হচ্ছে অচিরেই যেগুলি পর্যটকদের পদধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠবে। রুক্ষ প্রকৃতির এইসব পাহাড়ী অঞ্চলে কিছু কৃষি, কয়েকটা চা-বাগান, সামান্য কিছু কুটির শিল্প ছাড়া আর্থিক দিকটা বড়ই শূন্য। পর্যটনই এইসব অঞ্চলের সবচেয়ে জোরালো অর্থনীতি।
সত্তরের দশকে তৎকালীন রাজ্যপাল ডায়াস মিরিকে আসেন একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে। থরবু চা-বাগান কর্তৃপক্ষের অধিকারভূক্ত এই মিরিক তখন সামান্য এক জনপদ। একটি বেশ বড়সড় জলাভূমি ছিল তখন। ডায়াস জায়গাটি দেখে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়কে এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার অনুরোধ করেন। সিদ্ধার্থশংকর অনুরোধটা ফেলেননি। সেই থেকে মিরিক জন্ম নেয়। জলাভূমি এখন রূপান্তরিত হয়েছে বিশাল হ্রদে।
সেখানে কাচতন্তুর নৌকায় বিহারের ব্যবস্থা। প্রচুর মাছ ছাড়া হয়েছে জলে। হেসে খেলে তারা বড় হচ্ছে। সেই চমৎকার হ্রদের দিকে মুখ করে পাহাড়ের গায়ে সরকারী টুরিস্ট লজ। ডরমিটরি, কুটির মিলিয়ে বহুজনের জন্য সুন্দর ব্যবস্থা। অচিরেই বেসরকারি হোটেল, দোকানপাট, ঝকঝকে বাজারে গমগম করে উঠবে মিরিক। তার বিস্তৃত আয়োজন দেখা গেল চারদিকে। দার্জিলিং-এর সঙ্গে পাল্লা টানতে না পারলেও মিরিকের নিজস্ব আকর্ষণ বড় কম নয়। মার্চের শীতেও সেখানে প্রচুর মানুষের সমাগম দেখা গেল। তবে দিনকে এসে দিনকে ফিরে যাওয়া পর্যটকই বেশি। দার্জিলিঙের ভার এবং ভিড় দুই-ই কিঞ্চিৎ লাঘব করতে শুরু করেছে মিরিক। আছে একটি আদ্যন্ত রোমান্টিক পাইনের রহস্য ও ছায়াঘন অরণ্য। ছোটখাটো ট্রেকিং করার মতো জায়গা আছে। হ্রদের ওপর একটি সুদৃশ্য সেতু এবং হ্রদের জলে কাচতন্তুর একটি অতিকায় পদ্মফুল যেটি আসলে ফোয়ারা। হ্রদের জলে পাইন অরণ্যের প্রতিবিম্ব দেখে দেখে অনেকটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। অরণ্যের ছায়ায় ছায়ায় হ্রদটিকে ঘিরে একটি চমৎকার পথ আছে। পরিক্রমার এই পথটি স্বাস্থ্য ও মন দুইয়ের পক্ষেই খুব উপকারী। শিলিগুড়ি এবং দার্জিলিঙের সঙ্গে মিরিকের সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা চমৎকার। মিরিকের প্রতি পর্যটন বিভাগের একটু পক্ষপাত আছে, আছে মিরিক নিয়ে একটু গর্বও। কারণ এই শৈলাবাসটির বীজ থেকে প্রস্ফুটন অবধি সব দায়দায়িত্বই তাঁদের ছিল। বাজীটা তাঁরা জিতেছেন। থরবু চা-বাগান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নেওয়া এই শহরের জমি এবং প্লট তাঁরাই বিতরণ করছেন। তাঁদেরই প্রত্যক্ষ খবরদারিতে আস্তে আস্তে গড়ে উঠছে চমৎকার এক শহর। দলে আমরা মোট চারজন।
চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য, আলোকময় ঘোষ এবং দেশ পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে আমি। রাজ্য পর্যটন বিভাগের ডেভেলপমেন্ট অফিসার সুধেন্দু ভট্টাচার্য ছিলেন আমাদের এই পরিক্রমার অতি দায়িত্বশীল ও প্রশ্রয় পরায়ণ অভিভাবক। আর সারথি ছিলেন ক্ষেত্রী, যাঁকে দেখতে অবিকল রাজেশ খান্নার মতো। একসময়ে ইনি বিধান রায়ের গাড়ি চালাতেন। ইন্দিরা গান্ধী, নেহরু, ম্যাকনামারা থেকে শুরু করে দেশ ও বিদেশের বহু ভি আই পি-রই সারথি হয়েছেন তিনি। বয়স হয়েছে, কিন্তু মেদহীন ছিপছিপে চেহারার গৌরবর্ণ এই মানুষটিকে কখনোই আঠাশ বছরের বেশি বয়সী বলে মনে হয়নি আমাদের। পাঁচজনে মিলে একটি চমৎকার টিম তৈরি হয়ে গিয়েছিল শিলিগুড়ি থেকে প্রথম দিন মিরিক রওনা হওয়ার পরেই। পথ আমাদের বন্ধন দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করে তুলেছিল। শেষ দিনটায় ছেড়ে আসতে কষ্ট হয়েছে।
মিরিকে লানচ। মেঘ, কুয়াশা, শীত। হ্রদের চার পাঁচশো ফুট ওপরে, পাইন বনের মুখোমুখি টুরিস্ট লজের বিশাল কাচে মোড়া ডাইনিং হল-এ বসে খাদ্যে এবং দৃশ্যে আমরা মুগ্ধ। যেখানে খাওয়ার ব্যবস্থা সেখানেই আছে সস্তার ডরমিটারি এবং ডবল বেডরুম। আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল আলাদা কটেজে। কিছুটা পাকদণ্ডী বেয়ে নামতে হয়। ছোটো ছোটো বস্তি, দাবার ছকের মতো ছোটো ছোটো সব ক্ষেতে সর্ষে, টমেটো, বেগুনের চাষ, শুয়োরের খোঁয়ার পাশ কাটিয়ে নামতে হয়। হিটার গীজার সমেত কটেজের ব্যবস্থা রীতিমতো ভালো। বিকেলে হৃদের জলে নৌকোবিহারের সময় শিবরাম চক্রবর্তীর একনিষ্ঠ ভক্ত চিরঞ্জীবের দারুণ দারুণ পানিং-এর চোটে আমরা দিশেহারা।
পাইন বন এবং পান মিলে বিকেলটা চমৎকার জমে গেল জলে। পরদিন সকালে মিরিকের রূপ আরো মুগ্ধকর লাগল। কিন্তু কপাল খারাপ। মেঘ কাটল না, কুয়াশায় ঘিরে রইল চারদিক। মিরিক-দার্জিলিং সড়কের মাঝ বরাবর সুখিয়াপোখরি একটি গঞ্জ। সেখান থেকে মনভঞ্জন এবং ধোতরে নামক দুটি জায়গায় আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি ছিল একটি জিপ। মানেভঞ্জন এবং ধোতরের কঠিন চড়াই উৎড়াই ভাঙবার পক্ষে অ্যামবাসাডারে উপযুক্ত বাহন নয়। তবে দৃশ্যাবলী মনোমুগ্ধকর।
মানেভঞ্জন ছোট একটু গঞ্জ, এখানে একটি টুরিস্ট হোটেল তৈরি হচ্ছে। এখান থেকেই সানডাক-ফু'র ট্রেকিং শুরু হয়। গগনমার্গী সেই পথটি দেখেই একটু ভয়-ভয় করে। ওই পথে নয়, ধোতরে থেকে আর একটু শর্টকাট করে আগামী মে মাসে আমাদেরও যেতে হবে সানডাক ফু, জীপের রাস্তা আছে বটে, কিন্তু ভুক্তভোগীরা বলেন, ওই সংকীর্ণ রাস্তায় যখন জীপ ঊর্ধ্বগামী হয় এবং পৃথিবী অতলে তলিয়ে যেতে থাকে তখন অন্য দুর্ঘটনা না ঘটুক ভয়ে হৃদরোগের আক্রমণ ঘটতে পারে। সুতরাং ওই ভয়ংকর পথটি পায়ে হেঁটে যাওয়াই বরং বিজ্ঞজনোচিত কাজ হবে। প্রায় বারো হাজার ফুট উঁচু সানডাক ফু নাকি হিমালয়ের কোলে এক অত্যাশ্চর্য জায়গা। সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং এভারেস্টকে হাতের নাগালে বলে প্রতিভাত হয়। মনেভঞ্জন থেকে আরও একটু ভিতরে ধোতরে, নেপাল-ভারতের সীমান্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে এঁকেবেঁকে পথ গেছে। সেখানেও তৈরি হচ্ছে টুরিস্ট হস্টেল। বহু লোকের জায়গা হতে পারবে। তবে আরাম বা স্বাচ্ছন্দের অভাব ঘটাতেই পারে। কারণ এখানে যাঁরা আসবেন তাঁরা ট্রেকিং করতেই আসবেন, প্রমোদভ্রমণে নয়। এখানকার ফরেস্ট অফিসার শ্রী লেপচা সর্বদাই হাসিখুশি এবং দারুণ রুগুড়ে। তাঁর চোখেমুখে সর্বদাই নানা রসরসিকতা মিটমিট করছে। আমাদের চিরঞ্জীব এবং আলোকের সঙ্গে তাঁর দারুণ জমে গেল। সামান্য ক্ষণের পরিচয় এত সহজ ও স্বচ্ছন্দ হয়ে যেতে পারেন যে-মানুষ বসুধায় তাঁর অকুটুম্ব বোধ করি কেউ নেই। লেপচার তদারকিতেই গড়ে উঠেছে। পান্থনিবাসটি।
ফেরার সময় সুখিয়াপোখরি পার হয়ে পাহাড়ি পথে আমাদের জিপ একটু গোলমাল করেছিল একবার। জিপ সারিয়ে কুয়াশায় আচ্ছন্ন পথে আবার রওনা হয়ে বেশ ভয়-ভয় করতে লাগল। কিছু দেখা যাচ্ছে না। অথচ সুব্বা গাড়ি চালাচ্ছে দুর্দান্ত বেগে। পার হচ্ছে অজস্র আচমকা বাঁক। মানুষ কমপিউটারপ্রতিম না হলে ওরকম সম্ভব হত না। দার্জিলিং ঢুকবার মুখে উলটোদিক থেকে আসা আর একটা জিপ আমাদের জিপকে ছোট্ট একটা গুঁতো দিয়েছিল। গুঁতোটা আর একটু জোরে হলে এবং রাস্তার আর একটু ধারে হলে শ'তিনেক ফুট নিচু থেকে আমাদের ভাঙাচোরা দেহ তুলে আনতে হত। এই দুটি ঘটনার পর আমাদের ভ্রমণবিলাসী এলানো ভাবটা কেটে গেল। আমরা বেশ টান টান হয়ে বসলাম। অন্তত আমি। আশৈশব পাহাড়ের ছায়ায় ছায়ায় বড় হয়েও আজ আমি চারতলার ছাদ থেকে নিচের দিকে চাইতে পারি না, গা শিরশির করে, খাদের ধারে দাঁড়ালে তো কথাই নেই। তাই সংকীর্ণ গিরিপথের ওই টক্করটা আমাকে যৎপরোনাস্তি নাড়া দিয়েছিল।
দার্জিলিং-এর কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। শেষবার এই শহরে এসেছিলাম বোধহয় ষাটের দশকে। একবার ঘুম থেকে মাঝরাতে হেঁটে টাইগার হিল-এ উঠেছিলাম, সেই অভিজ্ঞতা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। দার্জিলিং-এ কম করেও ত্রিশ চল্লিশবার এসেছি। এবার এলাম দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে। কিন্তু পাহাড় বড় একটা পাল্টায় না। পাহাড়ি শহরেরও পরিবর্তন তেমন চোখে পড়ার মতো নয়। কিছু বাড়ি-ঘর আর দোকানপাট বেড়েছে। বেড়েছে লোকও। ভয়ও সেইখানেই। দার্জিলিং-এ অত্যধিক জনসমাগম যে সুখকর বা স্বাস্থ্যপ্রদ হবে না সেটা ইংরেজরা ভালোভাবেই বুঝেছিল। এ শহরটা তাই তৈরি হয়েছিল হাজার কুড়ি লোকের বাসোপোযোগী করে। হিলকার্ট রোড বা ন্যারোগেজের ট্রেনও খুব বেশি ভারবাহী নয়। ব্রিটিশ আমলে যা ছিল তার চেয়ে হিলকার্ট রোডকে আর একটু চওড়া করা হয়েছে বটে, কিন্তু যে পথে আগে ছোট্ট হাফটন ট্রাকের চেয়ে বড় ট্রাকের প্রবেশাধিকার ছিল না সে পথে এখন অবিরল ভারী ভারী গাড়ি চলছে। সেই নিরবচ্ছিন্ন কম্পন ও চাপে প্রতিবছর ধস নামছে বিভিন্ন জায়গায়। বাড়ছে দুর্ঘটনা। সুধেন্দুবাবু নিজস্ব প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই আমাকে এসব বোঝাচ্ছিলেন। দার্জিলিং-এ যাওয়ার পথটির বাস্তবিকই আমূল সংস্কার দরকার। প্রয়োজন শহরের জনবসতির বিকেন্দ্রীকরণও। ম্যাল-এ এখন মেলার ভিড়। পথঘাট রীতিমত ভিড়াক্রান্ত। তাও এটা সিজন নয়। সিজনে তাহলে কী অবস্থা হয় আজকাল? দার্জিলিং-এ একরাত্রির বিরামের পর আমরা রওনা হলাম টাইগার হিল। চূড়া থেকে মাত্র দু-কিলোমিটার আগে তৈরি করা হয়েছে একটি টুরিস্ট লজ। রাত্রিবেলা গাড়ি থেকে নামতেই উত্তরমেরুর আবহাওয়ার আঁচ পাওয়া গেল। সম্ভবত অনেকেই এই আশ্রয়স্থলটির খোঁজ রাখেন না বা রাখলেও এখানে এসে থাকার উৎসাহ পান না। তবে ম্যানেজার তামাং সাহেব বললেন, আসে সাহেবরা। সারা বছর তারাই দখল করে থাকে ঘর। শীত গ্রীষ্ম সব ঋতুতেই। এখন অবশ্য একজন সাহেব ছাড়া আর কেউই নেই। সেই সাহেব নিউজিল্যান্ডের তরুণ কচি স্টিভ জেফরে। তার সঙ্গে আলাপ জমে উঠতে মোটেই দেরি হল না। সেই ফাঁকে সে শুনিয়ে দিল তাঁর পাঁচ-পাঁচটি কবিতা। তার চেয়েও বড় কথা স্টিভ ঈশ্বর ভূত এবং উফো মানে। উফো বা আকাশে রহস্যময় উড়ন্ত চাকীর ঝাঁক সে নাকি স্বচক্ষে দেখছে। তার গার্ল ফ্রেন্ড যোগ শিখছে পণ্ডিচেরীতে। স্টিভ চষে বেড়াচ্ছে সারা ভারতবর্ষ। সে ভালো হোটেলে থাকে না, কথায় কথায় ট্যাকসি চড়ে না। বেশ গরিবের মতো ঘুরছে। তামাং সাহেব ভূত পোষেন, সাপ পোষেন। স্টিভ আর তামাং-এ বেশ ভাবসাব হয়ে গেছে। স্টিভ কেন এত দেশ থাকতে ভারতবর্ষে তার কষ্টে জমানো পয়সা খরচ করতে এল? একটুও না ভেবে সে জবাব দিল, কাঞ্চনজঙ্ঘার জন্য। শুধুমাত্র কাঞ্চনজঙ্ঘার জন্য।
একটি পাহাড়ের প্রেম যে এত প্রগাঢ় হতে পারে তা জানা ছিল না। সারাদিন স্টিভ কবিতা লেখে বিষয় বিচিত্র। যোগিনী, ফ্রেন্ডশীপ, পোয়েট্রি এই সব। তেমন উঁচু মানের কবিতা না হলেও স্টিভের মানসিকতায় ভারতীয়ত্বের অনুপ্রবেশ গভীরভাবেই ঘটে গেছে।
পরদিন সকালে শীতের তীব্রতা কিছু কম ছিল। মেঘ আর কুয়াশার চারদিক সমাচ্ছন্ন, তারই মধ্যে আমরা টাইগার হিলের চূড়োয় উঠে দেখি, সেখানে রাসমেলার ভিড়। এমনকী অনেকে এসেছেন শীতবস্ত্র ছাড়াই। এইসব গরম মানুষকে দেখে ভারী হিংসে হল। কিন্তু যা দেখতে আসা সেই বিশ্রুত সূর্যোদয় বা আকাশের ময়ূরকণ্ঠী বর্ণালী দেখা হল না। কুয়াশার আবছায়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা মলিনভাবে একটু দেখা গেল মাত্র। এভারেস্ট চোখের আড়ালে রয়ে গেল। মার্চে এরকম আবহাওয়া থাকবার কথা নয়। কপাল ঘুম হয়ে কালিম্পং-এ রওনা হওয়ার পথেও সেই কুয়াশা আর মেঘ ঘিরে রইল আমাদের অনেক দূর অবধি। লপচু চা-বাগানের কাছ বরাবর পৌঁছে আবার রোদ্দুরের দেখা পাওয়া গেল। পথটি চমৎকার। পর্যটকদের আনাগোনা কম। তিস্তা উপত্যকায় নামবার একটু আগে একটি পাহাড়চূড়ায় লাভারস মীট নামে রোমান্টিক একটি অবজারভেটারি আছে। শাল ও শিশু গাছের ছায়া ও নির্জনতায় সেখানে দাঁড়ালে কয়েক হাজার ফুট খাড়া নিচে দেখা যায় তিস্তা ও রঙ্গিতের সঙ্গমস্থল। রঙ্গিতের সবুজাত স্রোত মিলিত হয়েছে তিস্তার রূপোলি ধরায়। উজ্জ্বল দুই পাহাড়ি নদীর মিলনদৃশ্য লাভারস মীট থেকে পটে আঁকা ছবি যেন।
উত্তরবঙ্গে যে জায়গাটি পর্যটকদের দ্বারা সবচেয়ে উপেক্ষিত এবং যে জায়গাটি আমার মতো আরও কিছু মানুষের খুব প্রিয় তার নাম কালিম্পং। এই পাহাড়ি শহরটির সর্বাঙ্গে বাঙালিয়ানার ছাপ আছে, আর আছে দুর্লভ নির্জনতা। পরিচ্ছন্ন এই শহরটির নাম রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন। আমার দেখা এই একমাত্র শৈলশহর যেখানে ধানক্ষেত, বাঁশগাছ, কলার ঝাড় এবং পাইনবন একাকার হয়ে গেছে। আমরা যে চমৎকার সরকারি ট্যুরিস্ট লজে উঠলাম তার ম্যানেজার অমিতাভ দত্ত মনাস্টারি যাওয়ার পথে একটি অসাধারণ জায়গায় নিয়ে গেলেন। খাড়া পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে নিচে তাকালে তিস্তার স্রোত এবং অতিকায় এক উপত্যকা চোখে পড়ে। খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে টিকটিকির মতো নামতে পারলে (রোজ অসংখ্য পাহাড়ি ছেলে-মেয়ে এই পথে নিচে নেমে কাঠ সংগ্রহ করে আনে) মা কালীর জিবের মতো একটা চ্যাটালো পাথরের ওপর দাঁড়ানো যায় ওই পাথরটার আমরা নামকরণ করলাম, সুইসাইড পয়েন্ট। সুধেন্দুবাবু এই জায়গাটিকে পর্যটক আকর্ষণ করার যোগ্য করে তুলবেন বলে আমাদের কথা দিলেন।
মেঘ ও রোদ্দুরের খেলা চলছেই। দিগন্ত পর্যন্ত কখনোই দৃষ্টি প্রসারিত হয় না। তবু কালিম্পং আমাকে ভিন্ন এক গভীর ও গোপন দৃশ্য দেখাচ্ছিল, বাল্যকালে একবার বাবার সঙ্গে এসেছিলাম এখানে। ফরাসি এক খ্রিস্টান সন্ন্যাসিনী ট্রেনে শিলিগুড়ি হয়ে কালিম্পং আসছিলেন। পথে তাঁর সব মালপত্র চুরি যায়। তিনি রেলের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলেন। এসব ক্ষেত্রে রেল সাধারণত ক্ষতিপূরণ দেয় না। কিন্তু সন্ন্যাসিনী এবং বিদেশিনী বলেই বোধহয় তাঁর দাবি রেল, মেনে নেয়। রেলের প্রতিনিধি হিসেবে বাবা এসেছিলেন ক্ষতিপূরণের টাকা তাঁর হাতে তুলে দিতে। কালিম্পং তখন আরও জনবিরল, আরও নিস্তব্ধ। ফরাসি সেই সন্ন্যাসিনী চেক হাতে পেয়ে যে আনন্দের হাসি হেসেছিলেন তা আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান। সেই সরল উজ্জ্বল হাসিটি যেন কালিম্পংকে আরও সুন্দর করে তুলেছিল। সেইবার রবীন্দ্রনাথের বাড়ি চিত্রভানুতে গিয়ে প্রতিমা দেবীকে দেখি। এমন সার্থকনামা মহিলা জীবনে খুব বেশি দেখিনি। সস্নেহে বলেছিলেন, দেখ, তোমার ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখ।
কালিম্পং থেকে লাভা আবার চড়াই। রাস্তা চওড়া, মসৃণ। লাভার উচ্চতা টাইগার হিল-এর সমান। শহর হিসেবে এখনো মর্যাদা পায়নি। তবে বেশ বড়সড় গঞ্জ। বনবিভাগের একটি সুদৃশ্য ও আরামদায়ক লজ আছে। অচিরেই পর্যটন বিভাগ এখানে গড়ে তুলবেন তাঁদের অতিথিনিবাস। দার্জিলিং-এর ভিড় কমাতে লাভা যে খুব সহায়ক হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঠিকমতো গড়ে উঠলে এটি হবে দ্বিতীয় দার্জিলিং। লাভার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপরিসীম। নিবিড় গাছপালায় ছাওয়া এই জনপদটিতে ইতিমধ্যে কিছু কিছু ভ্রমণবিলাসীর আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে।
জলদাপাড়া অরণ্যকে অরণ্য বলা যাবে কিনা সেটা ভেবে দেখা দরকার। কদিন আগেই মধ্যপ্রদেশে বান্ধবগড় অরণ্যে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে এখানে তা হওয়ার উপায় নেই। রাজপথের পাশে এবং সামরিক ছাউনির গা ঘেঁষে অবস্থিত বলে এই অরণ্যের আরণ্যক চরিত্রের অনেকটাই হানি ঘটেছে। মাঝে মাঝে বিস্তৃত অঞ্চল বৃক্ষহীন পড়ে আছে। তবে বৃক্ষের অভাব পূরণ করেছে সতেজ নিবিড় ও দীর্ঘ ঘাসের বন। এমনই ঘন যে আমরা হাতি সমেত তার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। এরকম ঘাসবন আর কখনো দেখিনি। বিশ ত্রিশ বছর আগেও ডুয়ারস ও তরাই জুড়ে যে নিবিড় জঙ্গল ছিল ইতিমধ্যে তা নির্মম কুঠারের ঘায়ে পিছিয়ে গেছে অনেক। নতুন গাছপালা লাগানোর কর্মসূচী তেমন গুরুত্বের সঙ্গে রূপায়িত হয়নি বলে উত্তরবঙ্গের আরণ্যক চরিত্র ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে। বাঘ বা অন্য জন্তু-জানোয়ারের জন্য ততটা নয়, যতটা জলদাপাড়ার খ্যাতি গণ্ডারের জন্য। আর আছে আশেপাশের জঙ্গলে বুনো হাতি। হাতিদের অত্যাচারের কথা প্রায়ই খবরের কাগজে বেরোয়। এই বিপুল শরীরী বুদ্ধিমান প্রাণীটি সুরসিকও বটে। জলদাপাড়ার বুনো হাতিরা এখনও পোষা হাতি বা হস্তিনীর সঙ্গে প্রেম-প্রণয় করে যায়। পোষা হাতি বা বুনোদের টানে ঘর ছেড়ে কিছুদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হয়। উত্তরবঙ্গের হাতিরা যেমন সুরসিক তেমনি সুরাসিকও বটে। শ্রমিক বস্তিতে হানা দিয়ে তারা প্রায়ই হাঁড়িয়া ডাকাতি করে খেয়ে যায়। মাত্র কয়েকদিন আগে একটি বুনো হাতি জলদাপাড়ার ফরেস্ট অফিসে হানা দিয়ে এক মাহুতের বউকে মেরে ফেলেছিল। সেই হাতিটা পাগল না সুস্থ তা স্থির করা যায়নি। তাই অরণ্যে ঢোকার আগে আমাদের বারবার হাতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। কিন্তু হাতির ভয় আমার ছিল না। আমার ছিল শৈশবে দেখা উত্তরবঙ্গের জন্য গভীর বেদনাবোধ। এখন বাঘ বা নেহাত বাঘের পায়ের ছাপটুকু দেখতে কত পরিশ্রম করতে হয়। সে আমলে বিন্নাগুড়ি টি এস্টেটে আমার এক মামি সন্ধের পর রান্নঘরে রান্না করছেন, পোষা কুকুরটা দরজায় বসে, এমন সময় বাঘ এসে চোখের পলকে কুকুরটাকে নিয়ে গেল। ভোর রাত্রিতে জলদাপাড়ার ফরেস্ট লজ থেকে হাতিতে সওয়ার হলাম। তারপর সাড়ে চার ঘণ্টার একটানা অরণ্যচারণ। একজোড়া গণ্ডার অত্যন্ত নির্ভয়ে দেখা দিল এবং প্রায় পোষা গণ্ডারের মতোই পর্যটকদের ক্যামেরার জন্য নানারকম পোজ দিয়ে গেল আধ ঘণ্টা ধরে। জলদাপাড়ায় ময়ূর অসংখ্য। নীলগাই, সম্বর আছে, তবে মুষ্টিমেয়। বাঘ মাত্র ছ'টা। বুনো শুয়োর আছে। ঘুরতে-ঘুরতেই কানে এল সামরিক বাহিনীর চাঁদমারির শব্দ। মনটা খারাপ হয়ে গেল। জলদাপাড়াকে আর একটু গভীর ও বৃহৎ অরণ্যে পরিণত করা বড় প্রয়োজন। চাই শুধু আর একটু উদ্যোগ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন