নক আউট

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

মফসসলবাসী এক বাঙালি বালকের জীবনে বক্সিংয়ের কী-ই বা ভূমিকা থাকতে পারে? তবু এই অচেনা খেলাটিকে ভালোবাসতে বাধ্য করেছিলেন, জো লুই। শুধু মুষ্টিযোদ্ধা নন, কৃষ্ণকায়দের আত্মমর্যাদাবোধেরও প্রতীক। আর এই খেলাটিকে সর্বোচ্চ শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যিনি, তিনি ক্যাসিয়াস ক্লে। ১৯৬০-এ রোম অলিম্পিকে লাইট হেভিওয়েট স্বর্ণপদকজয়ী ক্যাসিয়াস দীর্ঘকায় এবং সুপুরুষ। পেশাদার মুষ্টিকদের চেহারায় যেমন বন্য আগ্রাসন থাকে, চোখে ক্রুরতা, তা ক্যাসিয়াসের কখনওই ছিল না। একটু যেন কবির মতো দেখতে। একটু আধটু কবিতাও লিখতেন যে।

জো লুইয়ের পর কিছু দিন আমি বক্সিংয়ের খবরে তেমন কৌতূহল বোধ করতাম না। কারণ তখন শ্বেতকায় রকি ম্যার্সিয়ানো রাজত্ব করছেন হেভিওয়েট বক্সিংয়ে। এই ডানহাতি মুষ্টিক যত দিন বক্সিং করেছেন একতরফা জিতেছেন লড়াইয়ের পর লড়াই। অবশেষে অপরাজিত রকি অবসর নেন। আর তাঁর শূন্যস্থানে উঠে আসেন ফ্লয়েড প্যাটারসন—আর এক জন অতি আকর্ষণীয় মুষ্টিযোদ্ধা। ফ্লয়েড শুধু ভালো লড়িয়েই নন, অতিশয় ভদ্রলোকও। কিন্তু সোনি লিস্টনের মতো এক দানবীয় চেহারার বক্সার এসে প্যাটারসনের যে হেনস্থা করেছিলেন তা কহতব্য নয়। সোনির ওই বিপূল চেহারা আর আসুরিক শক্তিমত্তা আমার তেমন পছন্দ ছিল না। মনে মনে চাইতাম লিস্টন হারুন। কিন্তু তাঁকে হারাবে কে? কাগজে লিস্টনের একটা ছবি দেখেছিলাম, লড়াইয়ের আগে এক ডাক্তার তাঁর বুকে স্টেথো লাগিয়ে পরীক্ষা করছে। সোনির পাশে ডাক্তারটিকে পুতুলের মতো লাগছিল।

যে উঠতি ছোকরা অবশেষে লিস্টনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সার্কিটে উঠে এল, সে ক্যাসিয়াস ক্লে। গড়পড়তা বক্সারদের তুলনায় ছিপছিপে, ছ'ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা আর বেজায় বাক্যবাজ। মুখে মুখে ছড়া কাটায়, রঙ্গরসিকতায়, টিটিকিরি ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যে দড়। আর মুখের জোরেই সে তখন অনেকটা খ্যাতি পেয়ে গেছে। সে নাকি বলে বলে নির্দিষ্ট রাউন্ডে প্রতিপক্ষকে নক আউট করে। তার কয়েকটা এ রকম চেতাবনি অবশ্য মিলেও গেছে। লিস্টন আর ক্লে-র সেই লড়াইয়ের রেকর্ডিং আমি একাধিক বার দেখেছি। দানব আর কবির লড়াই যেন। লিস্টন তেড়ে যাচ্ছে, আর লতানে গাছের মতো শরীর হেলিয়ে সরে সরে যাচ্ছে কবি ক্লে। শরীরটাই যেন ছন্দোবদ্ধ কবিতা। আর তারই ফাঁকে ফাঁকে কেউটের মতো বাঁ-হাতের ছোবল লিস্টনকে নড়িয়ে দিচ্ছে, হতভম্ভ করে দিচ্ছে। প্রথমটায় মনে হচ্ছিল বেড়াল আর ইঁদুর। পরে কে বেড়াল আর কে ইঁদুর তা বোঝা যাচ্ছিল না, তবে সপ্তম রাউন্ডে লিস্টন আর তার টুল ছেড়ে উঠল না। দুজনের বিরাট লড়াইটা অনেকেই বলে, 'সাজানো'। হতেও পারে। তবে যে ঘুসিটা ক্লে মেরেছিল সেটার দ্রুততা অবিশ্বাস্য। সে নিজে বলেছিল, ওটা ফ্যান্টম পাঞ্চ। প্রথম রাউন্ডেই লিস্টন নক আউট।

ক্যাসিয়াস ক্লে নামটা আমার ভারী পছন্দ ছিল। কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করে ক্লে হলেন মহম্মদ আলি।

আলি সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান করতে অস্বীকার করায় মার্কিন সরকার তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তাঁর জেল ও জরিমানা হয়। মামলা লড়ে জেল এড়ালেও বর্ণময় ক্রীড়াজীবনের বারোটা বাজল। সর্বোচ্চ আদালত সর্বশেষে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল বটে, কিন্তু এক জন বক্সারের জীবন ততক্ষণে অনেকটাই ঢলে গেছে।

বক্সিং-এর মূল মঞ্চ থেকে এই নির্বাসন কতটা দুর্বিসহ, তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। কিন্তু আলির যুক্তিও তো অকাট্য, আমি কেন ভিয়েতকংদের বিরুদ্ধে লড়ব, আমাকে তো তারা কখনও নিগার বলেনি! বহু দূরের এক দেশের অচেনা লোকেদের কেনই বা তিনি শত্রু ভেবে লড়াই করতে যাবেন?

এই ব্যক্তিগত লড়াইয়ের পাশাপাশি কালো মানুষদের অধিকারবোধ নিয়েও তো তাঁর আর এক ধরনের লড়াই ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং নানা সংগঠনে ঘুরে ঘুরে তিনি বিস্তর বক্তৃতা দিয়েছেন। আলি মুখর ছিলেন, অসামান্য বাগ্মীও ছিলেন। তাঁর ছিল সূক্ষ্ম রসিকতাবোধ। অন্য মুষ্টিযোদ্ধাদের মতো তিনি কেবল মুঠোসর্বস্ব ছিলেন না।

নিজের ধর্ম, নিজের পরিচয়কে আলি কতটা মর্যাদা দিতেন তার একটা ঘটনা হল, নর্টন নামে এক জন প্রতিপক্ষ তাঁকে ইচ্ছে করেই মিস্টার ক্লে বলে উল্লেখ করেছিলেন। রিং-এর নর্টনকে নক আউট করার আগে এক-একটা ঘুসি মেরে তিনি জিগ্যেস করতে থাকেন, হোয়াট ইজ মাই নেম?

খেতাব হারিয়ে হেভিওয়েট মুষ্টিযুদ্ধে দু-দু'বার ফেরত আসার নজির একমাত্র আলির। তাঁর মুষ্টিক জীবনের শেষ দিকটায় অবিসংবাদী চ্যাম্পিয়ন ছিলেন জর্জ ফোরম্যান। এই ভয়ংকর মুষ্টিযোদ্ধার ধারেকাছে কেউ ছিলেন না। বয়সও অনেক কম। বলা হত, ফোরম্যান অপরাজেয়, বিধ্বংসী। আলি ফোরম্যানকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জায়গায় যখন উঠে এলেন, সকলেরই ধারণা হয়েছিল, আলি—বুড়ো আলি ফোরম্যানের সামনে স্রেফ উড়ে যাবেন।

১৯৭৪ সালে লড়াই হয়েছিল জাইরেতে, আফ্রিকায়। শুধু এই একটি লড়াই নিয়ে নরম্যান মেলার আস্ত একটা বই লিখেছেন। বইটা আমি কিনেওছিলাম। বইটার নাম ছিল 'দ্য ফাইট'। সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি এবং ঘটনার আনুপুঙ্খ বিবরণ পড়তে গিয়ে মাঝে মাঝে চোখে জল এসে যায়। দড়ির ওপর শরীরের ভর দিয়ে ঝুল খেয়ে খেয়ে মার এড়ানোর সেই কৌশলকে আলি নিজেই বলতেন 'রোপ আ ডোপ' ফোরম্যান তাড়াতাড়ি লড়াই শেষ করার জন্য প্রথমে থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বটে, কিন্তু ঘুষিগুলো হাওয়ায় ভেসে গেল বার বার আলিকে ছুঁতেই পারল না। ষষ্ঠ, সপ্তম রাউন্ডে যখন ফোরম্যান একটু ক্লান্ত, একটু মন্থর, তখনই দড়ির আশ্রয় ছেড়ে উঠে এলেন আলি। সেই চিরন্তন কালান্তক আলি, বিস্মিত ফোরম্যান এই আলিকে চিনতেন না। নক আউট।

আলি ছিলেন সর্ব অর্থে এক ক্লান্তিহীন যোদ্ধা। বক্সিং রিং এবং তার বাইরেও বক্সিং-এর নানা আঘাতের শিকার হয়ে বহু বছর তিনি শরীর ও বোধবৃত্তিতে খানিকটা পঙ্গু হয়ে কাটালেন, তাঁর বকবকানি বহু দিন শুনি না। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ায় পৃথিবীটা অনেক বর্ণহীন আর নিস্তব্ধ লাগছে। চোখ বুজলেই শুনতে পাই, 'দে অল মাস্ট ফল, ইন দ্য রাউন্ড আই কল' শুনতে পাই, 'আই অ্যাম দ্য গ্রেটেস্ট।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%