শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

লীলাদির সঙ্গে ঠিক প্রথম পরিচয় কবে হয়েছিল মনে নেই, তবে এটুকু মনে আছে খুব যে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচয় হয়েছিল এমন নয়, ক্যাজুয়ালি হয়েছিল। আসলে লীলাদি তো অভিজাত পরিবারের মানুষ, চৌরঙ্গি ম্যানসনে থাকেন আর আমি ছিলাম একদম ছাপোষা। স্কুল মাস্টারি করি তাই বরাবরই একটা জীবনযাপনগত দূরত্ব ছিল। তবে একজন পাঠকের সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত পরিচয়ের থেকেই আরও বড় পরিচয় তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে লীলাদি আমার ভীষণ ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁর পাঠক হিসেবে আমি সমৃদ্ধ হয়েছি সারাটা জীবন।
রায় পরিবারের সবার গদ্য লেখার এক নিজস্ব স্টাইল ছিল, সেটা হল ঝরঝরে গল্প বলার সহজাত দক্ষতা। সেই দক্ষতা উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, সত্যজিত রায়ের যেমন ছিল তেমন লীলা মজুমদারেরও ছিল, লীলাদিও খুব দ্রুত গল্প নির্মাণ করতে পারতেন। লীলাদির আর একটা ক্ষমতা ছিল, সেটা হলো সহজ মিষ্টি হিউমার সৃষ্টি করার দক্ষতা। এটা খুব বড় গুণ, হিউমার সকলের করায়ত্ত নয়। এটা একটা আলাদা গুণ, ওঁর পরিবারের সকলেরই ছিল। আর লীলাদির লেখায় অদ্ভুত আন্তরিকতা ছিল, এই বৈশিষ্ঠ্যটা আমি অন্য কারোর লেখায় লক্ষ্য করিনি। তবে একটা জিনিস আমি খেয়াল করেছি, লীলাদির লেখা পড়লে বোঝা যেত উনি আমাদের গ্রামবাংলাকে খুব একটা ভালোভাবে চিনতেন না। যেহেতু উনি অভিজাত পরিবারের মেয়ে, ছোটবেলা থেকেই শহরে কেটেছে তাই ঠিক গ্রাম্যজীবনটা কেমন সেটা ওঁর জানা ছিল না। একটা মজার উদাহরণ দিই, উনি গ্রাম নিয়ে লিখছেন, যখন গ্রামে সরাইখানার কথা বলছেন, কিন্তু আমাদের দেশের গ্রামে কিন্তু সরাইখানা নেই। সরাইখানা আছে বিদেশে, নানা গল্পে পড়েছি ঘোড়ায় করে এসে কেউ সরাইখানায় খাওয়াদাওয়া করল, রাত কাটালো। আমাদের গ্রামে সরাইখানা ভাবাই যায় না। আরও একটা জিনিস উনি লিখতেন যে সরাইখানায় এসে সবাই খিচুড়ি-মাংস খাচ্ছে। এই কম্বিনেশনটা নিশ্চয় ওঁর খুব প্রিয়, বারংবার সুস্বাদু খাদ্য বলতেই উনি খিচুড়ি-মাংসের কথা বলেছেন। খুব মজা পেতাম এগুলো পড়ার সময়। এপ্রসঙ্গে পদিপিসির বর্মিবাক্সের কথা বলি, এই গল্পে তাঁর অনভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। আমরা যে পরিবেশে বসবাস করি, সে প্রসঙ্গে তাঁর বাস্তব ধারণা আবছা ছিল যে কারণে গল্পটা অনেক ক্ষেত্রেই আরোপিত মনে হয়। তবুও লীলাদির লেখা আমাকে সবসময় আকৃষ্ট করত ওঁর লেখনীর কারণে। আমি যে খুব ছোটবেলায় লীলাদির লেখা পড়েছি এমন নয়, লীলাদির ছোটদের লেখাগুলো আমি পড়েছি অনেক বড় বয়সেই। সেই সমস্ত লেখার মধ্যেই জীবনকে দেখার অদ্ভূত দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছি। তবে একটা ব্যাপার, একদম মফসসলের বা গ্রামের গরিব ছেলেমেয়েরা যে পরিবেশে বড় হয়েছে, তারা লীলাদির লেখা খুব একটা উপভোগ করবে না, কেননা লীলাদির লেখায় একটা আভিজাত্যের ছাপ ছিল। যেমন 'হলদে পাখির পালক' একদম ছোটদের জন্য নয়, সবার জন্য নয়, একটু ম্যাচুয়রিটি না থাকলে সে লেখা সবাই বুঝবে না, সবাই উপভোগ করবে না।
তবে লীলাদির লেখার সঙ্গে আমার লেখার সঙ্গে একটা মজার মিল আছে, সেটা হল আমাদের ভূতেরা ভীষণ উপকারী, তারা কখনো কারোর অনিষ্ঠ করে না। লীলাদির মতো আমার লেখাতেও কোনো খুনখারাপি, নিষ্ঠুরতা নেই। আমি যেহেতু লিখছি বাচ্চাদের জন্য তাই তাদের আমি নিষ্ঠুর পৃথিবীর অনেক কিছুই আড়াল করতে চাই। তারা একদিন বড় হবে তখন সবই বুঝবে তবে যতদিন ওদের শৈশব আছে ততদিন সেটা নির্মলভাবে উপভোগ করতে দেওয়াটাই আমাদের উচিত। তাই আমি সবসময় জীবনের মজার দিকটা বাচ্চাদের সামনে তুলে ধরি। এই বৈশিষ্ঠ্যটা লীলাদির লেখাতেও পেয়েছি, পরিশোধিত হাস্যরসের মাধ্যমে উনি লেখাটাকে বিবৃত করতেন। এটা খুব রেয়ার একটা গুণ, এটাকে আমি খুব সম্মান করি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন