শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

কলকাতার বইমেলা যখন প্রথম শুরু হয়েছিল, তখন চূড়ান্ত আশাবাদীও এর সাফল্য বা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশা করেনি। কিন্তু ব্যাপারটা ছিল ভারি অভিনব। আমরা তখন তরুণ কলমচি। তাই যেতুম আড়ে আড়ে দেখতে আমাদের বই কেউ ঘাঁটে কি না, হতাশ হতে হত। বইমেলায় তখন তেমন ভিড়ও হত না। কৌতূহলী কিছু মানুষ আসত মাত্র। খুব সোচ্চার ছিল লিটল ম্যাগাজিনের ছেলেরা। তারা ঘুরে ঘুরে ইচ্ছুক বা অনিচ্ছুকদের জোর করে পত্রিকা গছানোর চেষ্টা করত। আড্ডার পরিসর কিন্তু ছিল বেশ, গার্ডেন আমব্রেলার নীচে চেয়ার পাতা থাকত, সেখানে আড্ডা দিত, সুনীল-শক্তি-সন্দীপনরা।
ভিক্টোরিয়ার গা ঘেঁষে, রবীন্দ্রসদনের উল্টো দিকের সেই মেলাটি দু-তিন বছরের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বোঝা গেল, বই মানুষকে টানে, বইমেলা নিতান্ত শৌখিন সার্কাস নয়।
আমি বইমেলায় বরাবর একটু কমই গেছি, তার কারণ আমি ভিড়-ভীতু মানুষ, প্রচুর জনসমাগম আমার কাছে বেশ একটা অস্বস্তিকর ব্যাপার। তবে মাঝে মাঝে গিল্ড কর্তৃপক্ষ লেখক-পাঠক মুখোমুখি বসানোর অনুষ্ঠান করতেন, সেখানে সমরেশ বসু বা বুদ্ধদেব গুহর জনপ্রিয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। তারপরেই সুনীল এবং শক্তি থাকত, প্রবীণ লেখকরা সেই আসরে থাকতেন না।
রিলে প্রথায় গল্প বলার একটা অনুষ্ঠানও চালু ছিল। সেটাতে আমি কখনও যেতাম না, তুষার রায় বা তারাপদ রায়েরও বেশ একটা জনপ্রিয়তা ছিল কিন্তু, আর ছিল সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়েরও।
বইমেলা ব্যাপারটা যে সাহিত্যজগতে কতটা অনুকূল হয়েছে, তা আজকের বইমেলার তুমুল জনপ্রিয়তা দেখেই বুঝতে পারি। মানুষকে বইমুখী করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি কাজটি করেছে এই বইমেলা। এখন গাঁ-গঞ্জে অবধি বইমেলা হয়। লেখকদের বাদ দিলেও ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, কর্পোরেট সকলেই বইমেলায় নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন।
স্থানান্তরিত হতে হতে বইমেলার অধুনা ঠিকানা মিলনমেলা। এ জায়গাটা আমার কিছুমাত্র খারাপ লাগে না। যথেষ্ট পরিসর, ব্যবস্থাপনা রীতিমতো ভালো, তবে পরিচ্ছন্নতার কিছু অভাব রয়েছে-যেটা সহজেই মিটিয়ে নেওয়া যায়।
আমার সেই কুণ্ঠা আজও আছে। অনুষ্ঠানের প্রয়োজন না হলে আমি বইমেলায় যাই না, এখনও ভয় পাই। কিন্তু ভিড় যে হয়, হচ্ছে এই খবর কিন্তু আমাকে খুশিই করে, বইয়ের জয়কেই সূচিত করে এই জনসমাগম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন