শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্যকে সেই কবে থেকে চিনি। চেনা হয়েছিল প্রয়াত স্নেহভাজন রাধানাথ মণ্ডলের মাধ্যমে। তখন রাধানাথ এবং তার সমবয়সি বন্ধু লেখকরা গল্পচক্র বলে একটি গল্পের আসর করত। গল্পপাঠ এবং আড্ডা হত সেখানে। সুচিত্রার আবির্ভাব সেই সূত্রেই। গল্পচক্রের সদস্য ছিল অনেকে। তাদের মধ্যে কয়েকজন বেশ সম্ভাবনাময় ছিল। কিন্তু ঝটিতি উত্থান ঘটল সুচিত্রার। হঠাৎ দেশ আনন্দবাজার রবিবাসরীয় এবং পরবর্তীকালে নানা বড় কাগজে তার লেখা বেরোতে থাকে।
এই উত্থানটি স্বতন্ত্র বটে, কিন্তু কোনও আকস্মিক ভাগ্যবলে ঘটেনি। সুচিত্রা যে তার লেখক বন্ধুগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কলমধারী, তা তার এক-আধটা লেখা পড়েই বুঝতে পারা গিয়েছিল।
ছোটখাটো ভারী মিষ্টি চেহারার মেয়েটি তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একজন ভারিক্কী গেজেটেড অফিসার। মুখে প্রায় সর্বদাই পান এবং হাসি। সুচিত্রার হাসিটা দেখলেই আমার মনটা যেন জুড়িয়ে যেত। সত্যিকারের হৃদয়খোলা হাসি তো আজকাল বিশেষ দেখি না। আর হাসিখুশি মানুষ কার না পছন্দ?
সুচিত্রার গল্প উপন্যাসের প্রকৃত মূল্যায়ন উপযুক্ত মানুষ উপযুক্ত সময়ে করবে। সেই প্রসঙ্গে যাওয়াটা এখনই ঠিক হবে না। তবে আমার স্ত্রী আমাকে প্রায়ই সুচিত্রার লেখার ভূয়সী প্রশংসা করে পড়তে তাগাদা দিতেন। আমি নানা ব্যস্ততার মধ্যে সমসাময়িক লেখকদের লেখা সবসময়ে পড়ে উঠতে পারি না। গিন্নির প্ররোচনায় সেবার শারদীয়া দেশ-এ সুচিত্রার সদ্য প্রকাশিত উপন্যাসটি পড়ে ফেললাম। এবং ভারী অবাক হয়ে গেলাম। একথা স্বীকার করি যে লেখায় সুচিত্রা বড় একটা ভাষা, প্রকরণ বা শৈলী নিয়ে তেমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেনি, তার লেখার ধরণ ছিল সাবেকী। কিন্তু গদ্যটি ছিল ভারী সরেস। যে উপন্যাসটি পড়লাম তা একজন কলেজের অধ্যাপক এবং তার সহকর্মী, পরিবার, সমাজ, ও সময়কে নিয়ে। কী যে ম্যাজিক ছিল তার বর্ণনায় কী বলব। আমার গিন্নিই সুচিত্রাকে ফোন করে আমার ভালো লাগার কথা জানালেন, আমার সঙ্গে কথা হল, সুচিত্রা বালিকার মতো খুশি হয়েছিল।
একটা সময়ে কম বয়সে আমি সংগ্রামী পাঠক ছিলাম, কত সময়ে পড়তে পড়তে রাত কেটে গেছে প্রায়। কিন্তু ক্রমে কাজ এবং নানা কারণে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া বা অন্যান্য ব্যস্ততায় পড়া লাটে উঠেছে, আর সেটা আমার কাছে খুবই দুঃখের ব্যাপার।
আমি খুব বেশি পড়ার সময় পাইনা বটে, কিন্তু সাহিত্য জগতের খবর তো পাই। সুচিত্রার প্রথম আবির্ভাবের পর কয়েকটি গল্প এবং উপন্যাসের ব্যাপক প্রশংসা আমাদের কানে আসতে থাকে। একজন নতুন লেখিকার বরাতে এরকম সাধুবাদ জোটা খুব সাধারণ ব্যাপার তো নয়। ওর লেখার ভিতরে যে অন্তরঙ্গ চিত্র ফুটে উঠত তা এক কথায় নিবিড় এবং পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষ।
সুচিত্রা লহমায় বাঙালি পাঠক পাঠিকার হৃদয় জয় করে নিয়েছিল। দেশ দফতরে মাঝে মাঝে হাজির হত সে। তাকে দেখলেই মনে হত, এ যেন আমার স্নেহের সহোদরা, আমাকে সে তার ব্যাগ খুলে পান-জর্দা খাওয়াত। পরে পান ছেড়ে পান মশলা ধরেছিল। তার কাছে তাও বহুবার খেয়েছি।
একবার একজন অ্যাকটিভিস্ট মেয়ে আমাকে বলেছিল, তারা তাকে একটি নারীবাদী সভায় নিয়ে যেতে গিয়েছিল। সুচিত্রা তাকে নাকি বলেছিল, হ্যাঁ রে তোরা কি পুরুষ মানুষদের দেখতে পারিসনা। কিন্তু ভাই, কিছু মনে করিস না, আমি কিন্তু আমার বরটাকে বড্ড ভালোবাসি, আমার তো পুরুষমানুষদের ওপর তেমন রাগ হয় না।
সুচিত্রা আমাদের বাড়িতেও কয়েকবার এসেছে। প্রথম প্রথম আমাকে এত সমীহ করত যে আমার সামনে সহজ হতে পারত না, আমিই তার সঙ্গে ঠাট্টা মশকরা করে তার আড় ভেঙে দিই। আমি তার কাছে তার বর মেয়ে আর ভাইয়ের গল্প শুনতাম। সুচিত্রা মনে যতই আধুনিক হোক, সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই চিরকালীন বঙ্গললনা।
আমি অস্ট্রেলিয়া গিয়ে যখন ব্লু মাউন্টেন সুইসাইড পয়েন্ট বা অন্যান্য ক্লেশদায়ক টুরিস্ট স্পট দেখে বেড়াচ্ছিলাম, তখন সেখানকার লোক পরম বিস্ময়ে আমাকে বলে আপনি পাহাড় টাহাড়ে উঠছেন, এত হাঁটছেন, আর কোনও লেখক তো এমনটা করেনি, সুনীল, সুচিত্রা, জয় গোস্বামী কেউ এত ঘোরেননি।
শুনে ফিরে এসে আমি সুচিত্রাকে বকুনি দিয়েছি, অস্ট্রেলিয়া গিয়ে ঘরে বসে থাকার মানে হয়? ও তখন হেসে বলেছিল, আসলে আমার শরীরটা তেমন ভালো ছিল না।
শরীর যে ভালো নয় তা সুচিত্রা প্রায়ই বলত। হার্টের কী একটা গণ্ডগোল ছিল, মাঝে মাঝে নার্সিহোমে ভর্তি হত বলে শুনতে পেতাম।
প্রায়ই পাড়ি দিত মেয়ের কাছে ব্যাঙ্গালোরে। দুটি নাতি নাতনী ছিল তার প্রাণ। তাদের কণ্ঠস্বর ছিল সুচিত্রার মোবাইলের রিংটোন।
চাকরিটা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছিল সুচিত্রা। লেখার রয়্যালটি থেকে তখন তার আয় ভালো, স্বামীও ভালো চাকরি করে। সিদ্ধান্তে ভুল ছিল না।
তবু আমি জিগ্যেস করেছিলাম, লেখার জন্যই সে চাকরি ছেড়ে দিল কিনা। সুচিত্রা খুব স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। তবে যা বুঝলাম, লেখাই বড় কারণ।
আশাপূর্ণা দেবীর লেখা যারা পড়েন তাঁরাই জানেন; গৃহবধু আশাপূর্ণা আশ্চর্য প্রতিভায় কি করে যেন সমাজের সব স্তরেই লেখাকে নিয়ে যেতে পেরেছেন। সুচিত্রা আশাপূর্ণার মতোই লিখত, এমন নয়। তবে আশাপূর্ণা দেবী বাংলা সাহিত্যে যে জায়গাটা আলো করে ছিলেন, সেই শূন্যস্থান ভরাট করতে পারে একমাত্র সুচিত্রাই।
নৈহাটির যে দুর্ঘটনার সুচিত্রার ডান হাত ভেঙেছিল সেটা আমার কাছে বিশেষভাবে মর্মান্তিক, কারণ সেদিন নৈহাটিতে আনন্দ বিপণি উদ্বোধন করতে যাওয়ার কথা ছিল আমারই। শেষ মুহূর্তে কি একটা বাধ্যবাধকতায় আমার যাওয়া সম্ভব হল না। আমার বদলে গেল সুচিত্রা। সেখানেই বাথরুমে যাওয়ার সময় পড়ে গিয়ে তার লেখার হাতটাই ভাঙল, খুব দুঃখ পেয়েছিলাম, অবশ্য এই হাত ভাঙার ফলে সুচিত্রা কষ্ট করে কম্পিউটারে লেখাটাও শিখে গিয়েছিল, শেষ দিকে কম্পিউটারেই লিখত বলে শুনেছি।
মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে সুচিত্রাকে গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন কালচারাল সেন্টারে দেখেছিলাম একটা পুরস্কার বিতরণী সভায়। সে শ্রোতা হিসেবে গিয়েছিল, মঞ্চে ওঠেনি, সুচিত্রা হল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে কথা হল না, তবে ভেবেছিলাম ওকে একটু বকুনি দিয়ে বলি এত মোটা হয়ে গেছ কেন? বড্ড আনফিট মনে হয়েছিল তাকে। সেই শেষ দেখা।
তার আকস্মিক চলে যাওয়াটা আজও যেন বিশ্বাস হতে চায় না। কিন্তু শরীর গেলেও তার লেখার ভিতরে সে তো খুব বেশি করে জীবন্ত রয়েছে। বেঁচে আছে তার স্বামী, ভাই মেয়ে জামাই, নাতি নাতনীর ভিতর দিয়েও। স্মৃতিতে ধ্যানে, মননে স্মরণে ধূপের গন্ধের মতো, সেও কি কম বেঁচে থাকা?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন