শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

টেঁপির সঙ্গে পাঁচুর প্রেম তো আজকের ব্যাপার নয়। বহুকাল ধরেই ঘটে আসছে। কখনও তাঁদের নাম ছিল আদম ও ইভ বা রোমিও ও জুলিয়েট, লায়লা এবং মজনু, রাধা এবং কৃষ্ণ বা নিতান্তই রামী এবং চণ্ডীদাস। কেউ কেউ বলেন, ওরাই ঋজি আর রিচি, প্রকৃতি আর পুরুষ।
কিন্তু টেঁপির সঙ্গে পাঁচুর বিয়ে হয়তো হল না। টেঁপির বাবা ধরে বেঁধে তার বিয়ে দিল তেলকলের মালিক জনার্দনের সঙ্গে। দেখা গেল, পাঁচ বছর বাদে টেঁপি দিব্যি খোকাখুকি, শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে ডেঁড়েমুশে সংসার করছে। পাঁচুও বলতে নেই, টেঁপির বিয়ের পর কিছুদিন হু-হু বুক আর রুখু মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে শেষ অবধি একটা চাকরি জুটিয়ে একদিন টোপর পরে ফেলল। বছর না ঘুরতেই ঘরে শব্দ উঠল, ট্যাঁ।
পৃথিবীর জনসংখ্যা ঠিক এইভাবেই বাড়ে। শোপেনহাওয়ারমশাই একথাটাই বলতেন, বাপু হে, প্রেম থাক বা না থাক, নরনারীকে নানা মোহ আর রোমহর্ষে প্ররোচিত করে প্রকৃতি ওই একটি কাজই আদায় করে নেয়।
রিপ্রোডাকশন। প্রেম থাকলেও বাচ্চা হবে, না থাকলেও হবে। শোপেনহওয়ার প্রেমকে ল্যাটা বলেননি বটে, কিন্তু যথেষ্ট হ্যাটা করেছেন, সন্দেহ নেই। এই লিভিং টুগেদারের যুগেও তাঁর মতামতকে বেশ আধুনিক মনে হয়।
এখন কামে আর প্রেমে যখন একটা মহা ভজখট্ট লেগে গেছে, কোনটা কী তা যখন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, এবং পশ্চিমের শ্রদ্ধেয় সাহেবগণের হোঁৎকা শরীরের চাপে প্রেম যখন নাভিশ্বাস তুলে চিঁচি করছে, তখন অর্থাৎ তার অভিপ্রেত মৃত্যু ঘটবার অনতিপূর্বেই প্রেম বস্তুটির একটা ব্যবচ্ছেদ হওয়া ভালো। আসলে সে ছিল কিনা কোনোদিন সেই প্রশ্নটাই ভাইটাল। সে আছে কিনা আদৌ সেই গুরুতর প্রশ্নও উঠবে। কামের অস্তিত্ব বিষয়ক কোনও ঝামেলা নেই, প্রমাণের অপেক্ষাও সে রাখে না। সে ছিল, আছে, অবশ্যই থাকবে। কিন্তু বেচারা প্রেম? সে তো ভাবের ঘুঘু, ঝোপের পাখি, হাওয়ার নাড়ু, কিংবদন্তীর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মসলিন, নেই-মামা, অশ্বডিম্ব। সে ছিল কিনা, আছে কিনা তা কে বলে দেবে আমাদের? হাতের ছাপ ফেলে যায়নি, রেখে যায়নি অন্য কোনো সূত্রও। শার্লক হোমসমশাইও আতসকাচ নিয়ে চতুর্দিকে নিরীক্ষণ করতে করতে বলে উঠতে পারেন, ভায়া ওয়াটসন, এই একটা রহস্য যার কিনারা স্বয়ং শার্লক হোমসেরও সাধ্যের বাইরে। একজনকে আমি খুব ঘনিষ্ঠভাবে চিনি যে প্রায় সেই বাল্যকাল থেকে অতিশয় ঘন ঘন এর-ওর-তার প্রেমে পড়ে যেত। নানা বালিকা বা কিশোরীর নানা রকমের আকর্ষণ কারও চোখ ভালো, কারও হাসি সুন্দর কারও গানের গলা দারুণ মিষ্টি। একসঙ্গে বহুজনের প্রেমে পড়ে যেতে কোনও বাধাই তো নেই। এই ক্রমান্বয়ে প্রেমে পড়ে যেতে থাকা থেকে সে কিন্তু পরেও রেহাই পায়নি।
সভয়ে সত্যি কথাটা বলতেই হয়, পুরুষেরা যথাযথ একগামী নয়। বহুগামিত্ব তারা সেই আরণ্যক যুগ থেকে রক্তে বহন করে আসছে। কোনও নারীর জন্য যখন সে উন্মাদ হয় তখন তার ণত্ব ষত্ব জ্ঞান থাকে না ঠিকই, তাকে না পেলে হয়তো আত্মহত্যা করে, মদ খায়, সাধু হয়ে যায়, বিপ্লবীদের দলে নাম লেখায়, দেশের কাজে নেমে পড়ে, কবিতা লিখতে শুরু করে বা পাগলও হয়ে যায়। তবু বলি, এহ বাহ্য। সেই নারীকে সে লাভ করলেও কিছুদিনের মধ্যেই অন্যতর মহিলাদের প্রতি তার ছোঁক ছোঁক করার প্রবণতা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দেখা দেয়। মহিলারা কতটা গুরুতরভাবে প্রেমে পড়ে যেতে পারেন তা বলা শক্ত। কোনও মহিলা আজ অবধি আমার প্রেমে পড়েননি বলে এ বিষয়ে আমার কোনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। তবে শুনেছি তারাও যখন পড়েন তখন সাংঘাতিকভাবেই পড়েন এবং ণত্ব ষত্ব জ্ঞান তাঁদেরও থাকে না। পুরুষদের মতো তাঁরা হ্যাঁংলা নন বলেই এরকম ঘটনা আকছার ঘটে না, এই যা।
ভালোবাসা কথাটার অর্থ, যাকে ভালোবাসা যায় তার ভালোতে বাস করা। অর্থাৎ তার যাতে যতটা ভালো হয় তাই করা। এই তত্ত্বের মধ্যে কাম বলে কোনও বস্তুই নেই। এই বিংশ শতকের শেষভাগে ক্ষয়িষ্ণু মানবতাবোধ, খণ্ডিত দৃষ্টি ও হৃদয়বত্তায় দেউলিয়া মানুষের পক্ষে এই সংজ্ঞা গ্রহণ করা শক্ত। এই ভালোবাসার কিছুটা আভাস পাওয়া যায় বাৎসল্যে আর পাওয়া যায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা দম্পতির মধ্যে কখনো-সখনো।
কৈশোরে যৌবনে প্রেমে পড়া বা প্রেম হওয়ার মতো সহজ আর কীই বা হতে পারে! কিন্তু সেই অঘটন অনেকটাই ফেনিল, ফাঁপানো এবং ক্ষণস্থায়ী। যদি রোমিওর সঙ্গে জুলিয়েটের বিয়ে হয়ে যেত তাহলে যেমন একটি অনবদ্য সাহিত্যকীর্তি থেকে আমরা বঞ্চিত হতাম তেমনি অন্যদিকে হয়তো দেখা যেত, রোমিও আর জুলিয়েটের মধ্যে চুলোচুলি ঝগড়ার চোটে বাড়িতে কাকপক্ষী বসতে পারছে না। রোমিও হয়তো ভিন্ন মহিলার প্রতি গোপন প্রণয়ে মত্ত হয়ে পড়ত। জুলিয়েট বেচারী চোখের জলে রুমালের পর রুমাল ভিজিয়ে ফেলত। কে জানে কী হত। সোডা, বীয়ার বা শ্যাম্পেনের বোতল খুলবার সঙ্গে সঙ্গে যে ভসভসে ফেনা উপচে পড়ে রোমান্টিক ভালোবাসা ঠিক ওরকম।
তারপর থিতোয়, লেভেল নামতে থাকে তলার দিকে। নামতে নামতে অনেক সময় তা লোপাট হয়ে যায়, অনেক সময় তলানী একটু থাকে। আর যদি মিলন না ঘটে তবে অনেকদিন অবধি সুগন্ধীর শূন্য শিশির মতো সুবাস একটু থেকেই যায়। একটু রেশ। বিরহান্ত প্রেম বুকে নিয়ে কত মানুষ তো আমৃত্যু নিঃসঙ্গ থেকে গেছেন। এক বয়োবৃদ্ধ প্রবীণ সাহিত্যিক আজও তার সাক্ষী। আদি মানব ও আদি মানবীর জন্মের পর থেকেই নানাভাবে রচিত হয়েছে, বিবর্তিত হয়েছে তাদের সম্পর্ক। কখনো দেহগন্ধময়, কখনো ভাব-রহস্যে ভরা। আজও সেই একই গল্প বারবার কথিত হয়, বারবার ঘটে যায় সেই আদি ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। সাহেবরা রোমান্টিক প্রেমকে প্রায় কুলোর বাতাস দিয়ে তাড়িয়েছে, আর সেই তারই অভাববোধ থেকে গোগ্রাসে পড়ছে রোমান্টিক প্রেমের ফিনফিনে গল্প 'লাভ স্টোরি'। বারবারা কার্টল্যান্ডের বই যে লাখো লাখো বিকোয় তার কারণও কি নয় এই অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস!
দেহগন্ধহীন প্রেমকে এই যুগে বারংবার লাঞ্ছিত হতে দেখি। মেয়েদের শরীরের বিজ্ঞপ্তিতে ভরে গেল চারপাশ। পুরুষের পৌরুষ কমে গিয়ে বাড়ছে লোলুপতা। ওই ধ্যানের প্রেমকে কোন অস্থির হৃদয় পিঁড়ি পেতে বসতে দেবে? কার ধৈর্য আছে সারা জীবন ধরে সযত্নে পরিচর্যা করবে ওই বিরহ-ক্ষতের। গোপন ওই রক্তক্ষরণ যে আস্তে আস্তে হয়ে ওঠে ঝরা বকুলের মতো পবিত্র ও সুন্দর তা নিরীক্ষণ করার মতো অর্ন্তদৃষ্টি আর কোথায়? যার আছে সে বিরহান্ত প্রেমের টুপটাপ পুষ্পবৃষ্টি সারা জীবন ধরে উপভোগ করতে পারে। যন্ত্রসভ্যতার যত বাড়বৃদ্ধি হয় ততই কি কমে যায় মানুষের ভাবাবেগ? আজকাল শোক কমেছে, আবেগ কমেছে, বেড়ে গেছে হিসেবী বুদ্ধি। কত অনায়াসে এখনকার কিশোর-কিশোরীরা পরস্পরের সঙ্গে খোলামেলা মেলামেশা করে, পরস্পরকে তুই-তোকারি করে! অলিখিত একটা নীতিও আছে তাদের, বন্ধুকে বিয়ে করতে নেই। সেটা একরকম বিশ্বাসঘাতকতা। দুটো একটা ছুটছাট হয়ে গেলে বন্ধুরা দুয়ো দেয়। মেয়েদের রহস্য পুরুষের কাছে, পুরুষের রহস্য মেয়েদের কাছে আর তা তেমন দূরের জিনিস নয়। রহস্য নেই বলেই সেই রোমহর্ষ নেই, নেই লজ্জারুণ থরোথরো প্রথম স্পর্শের বিদ্যুৎপ্রবাহ। দেহগন্ধহীন যে প্রেম শেষ অবধি শুভ্র ও উজ্জ্বল তা হল দম্পতির বিবাহিত জীবনের একেবারে শেষভাগে। যখন ছেলেরা প্রতিষ্ঠিত এবং নিজস্ব পরিবারে সুস্থিত, মেয়েরা ভিন্নতর সংসারের কত্রী, যখন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধার ছুটির সময় হল, তখন। 'থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার' দুজনের দুজন। তখন দুজনকে ঘিরে মৃত্যুর ছায়া ঘনিয়ে আসছে ক্রমে, পৃথিবীর সঙ্গে বাঁধন ছেঁড়ার সময় হল, পিছনে গোধূলির মতো বিস্মৃতির ভিতরে হারিয়ে গেছে পায়েচলা পথের মতো স্মৃতির রেখাটি। মনে পড়ে, কত কী মনে পড়ে, কত কী মনে পড়ি-পড়ি করেও পড়ে না। রণক্লান্ত দুটি প্রাণ তখন সত্যিই পরস্পরের কাছে কখনো পাখি, কখনো বাসা। তখন ভালোবাসা নিষ্কলঙ্ক, তুষার শুভ্র।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন