সৌমিত্র

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেকবছর আগে কফিহাউসে। আমি তখন সবে মাত্র ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়েছি আর সৌমিত্রর অভিনয় জীবন সবে শুরু হয়েছে। তখন কফিহাউসের দিকে প্রায় বসে আড্ডা মারতাম, মূলত সকালের দিকেই। তখন সৌমিত্র আর নির্মাল্য আচার্য সম্পাদিত 'এক্ষণ' কাগজে আমি টুকটাক লিখতাম। কাজেই সবমিলিয়ে একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের বলয়টা আলাদা, ও অভিনয় জগতের মানুষ আর আমি লেখালেখি জগতের। তাই নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ খুব একটা হত না।

তার পর আমারও কাজের চাপ বাড়ায় কফিহাউসে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়, তখন দেখাসাক্ষাৎ আরও কমে গিয়েছিল। পরবর্তী ক্ষেত্রে আমার গল্প থেকে নির্মিত ছবিতে সৌমিত্র অভিনয় করেছে। তখন আবার নতুন করে দেখাসাক্ষাৎ-কথাবার্তা শুরু হল। তবে আমাদের মধ্যে বরাবরই একটা পারিবারিক বন্ধুত্ত্বের সম্পর্ক ছিল। ও আমার ছেলেমেয়েকে খুব স্নেহ করত, আমিও করতাম। মানুষ সৌমিত্র আমাদের বড়ই আপন ছিল। আর অভিনেতা সৌমিত্র সম্পর্কে নতুন করে আর কী বলি!

সে তাঁর অভিনয় জীবনে কত রকমের চরিত্র যে করেছে, আর এত সুন্দর ভাবে করেছে তা আর নতুন করে বলার নেই। তবে শুধুই অভিনয় জগতে নয়, বাস্তবেও সৌমিত্র একজন ভার্সেটাইল মানুষ। সে একাধারে কবি, আবৃত্তিকার সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার আরও কত কী! অনেকরকম গুণ ওঁর মধ্যে ছিল আর মানুষ হিসেবেও চমৎকার। আর কী প্রাণশক্তি! কাজ করতে ভীষণ ভালোবাসত। এই ৮৫ বছর বয়সেও অদম্য উৎসাহে কাজ করে গিয়েছে। আসলে ও অভিনয়টাকে খুব ভালোবাসত। আমি একবার জিগ্যেস করেছিলাম—'তোমার জীবনের ফার্স্ট প্রায়োরিটি কি?'

সে বলেছিল—'অভিনয়। অভিনয়ের জন্য আমি সবকিছু করতে পারি।'

আরও একটা অসাধারণ গুণ ছিল সৌমিত্রর, আবৃত্তি করা। কী চমৎকার আবৃত্তি করত। একবার আমরা দিল্লি গিয়েছিলাম একটা অনুষ্ঠানে। সেখানে কয়েকটা আবৃত্তি করেছিল। মনে হয়েছিল, ওঁর কণ্ঠে কবিতাগুলো যেন অন্য মাত্রা পেল! সেবার আমাকে বারবার বলেছিল নাটক লিখতে, সে অভিনয় করবে। কিছুদিন আগেই অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের ছবি 'মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি'-র প্রমোশনে আমাদের বাড়ি এসেছিল। সেদিন অনেক কথা হয়েছিল, অনেক স্মৃতিচারণা। এমনকী আমি বেরিয়ে আসার পরেও সৌমিত্র আমার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বসে অনেকক্ষণ ধরে গল্প করছিল।

একবার ওঁর জন্মদিনে ওঁর জীবনের ওপর একটা নাটক করেছিল। আমি আমন্ত্রিত ছিলাম। তবে নাটকের কিছু দৃশ্য দেখে খুব মন খারাপ হয়েছিল। স্টেজে উঠে বলেওছিলাম—'এরকম নাটক তুমি আর কোরো না। আমার মন খারাপ হয়ে যায়। তোমাকে এখনও অনেকদিন থাকতে হবে আমাদের মধ্যে।'

সব মিলিয়ে সৌমিত্র একজন বর্ণময় মানুষ ছিলেন। ওঁর ব্যক্তিগত জীবনে নানান দুঃখ থাকা সত্ত্বেও এতবছর বয়স পর্যন্ত ও যেভাবে কাজ করে গেছে সেটাই শেখার। এরকম একজন সফল মানুষ বাংলা তথা ভারত তথা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন! আপামর বাঙালির কাছে এটা খুবই কষ্টের। আর আমি তো আমার বন্ধুকে হারালাম, তাই কষ্টটা আরও বেশি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%