শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

নবনীতার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঠিক কবে অথবা কীভাবে, সেটা ঠিক মনে নেই কেননা সে প্রায় ষাট বছর আগেকার কথা। কিন্তু সেই প্রথম দেখা হওয়ার পরেও মাঝখানে অনেকগুলো বছর দেখা হয়নি। বিয়ের পর সে বিদেশে থাকত। তারপর তো অনেক ঘটনা ঘটল আর ও কলকাতায় ফিরে এসে 'ভালো-বাসা'য় থাকতে শুরু করল আর যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা শুরু করল। তখন ওর সাথে মাঝে মাঝে দেখাসাক্ষাৎ হত। আরও একটা মজার ব্যাপার নবনীতা নিজে গাড়ি চালিয়ে যাদবপুরে যেত। সেই আমলের পক্ষে এটা অনেক আধুনিকতার পরিচয়। একবার একটা অনুষ্ঠানে আমি ঠাট্টা করে বলেছিলাম, 'নবনীতা গাড়ি চালিয়ে চলে যেত। আর আমরা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে হাঁ করে দেখতাম। তখন মনে হত যে, ও দুটি চোখে তাৎক্ষণিকে পরশপাবকই যৎসামান্য।' কথাটা শুনে নবনীতা খুব হেসেছিল।
আমার সঙ্গে দেখা হলেই অনেক কথা বলত নবনীতা। কথা বলতে ভালোবাসত। কোনও আজেবাজে কথা নয়, আসলে ওর কথা শুনতে আমি ভালোবাসতাম। ও যেমন হাসত, হাসাতেও পারত।
নবনীতার লেখা সম্পর্কে আমি বরাবরই কনসাস ছিলাম, কেননা নবনীতা বড় ভালো লিখত। কবিতা-গল্প উপন্যাস তো বটেই, ও ছোটদের জন্যও গল্প লিখেছে প্রচুর। অনেকেই জানেন না, ও অসাধারণ রূপকথা লিখতে পারত। আমি ওর রূপকথার বই পড়েছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। ও তো ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের মধ্যে লালিত পালিত। নরেন্দ্র দেব-এর লেখা আমি পড়েছি। রাধারানী দেবী অপরাজিতা ছদ্মনামে লিখতেন। আমি একবার 'দেশ' পত্রিকার জন্য ওঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, ওঁর আশি বছর বয়স যখন।
নবনীতা তো ভীষণ সুন্দরী ছিল, বিদূষী ছিল। বিদেশে পড়াশোনা করেছে। সবমিলিয়ে বর্ণময় একটা চরিত্র। আরও একটা স্বভাব ওঁর দেখেছি, ঘুরতে খুব ভালোবাসত। সারা পৃথিবী ও যে কত বার করে ঘুরেছে, তার ঠিক নেই। দুরারোগ্য রোগে ভুগছে জেনেও এখানে ওখানে চলে যেত। আসলে ও অকুতোভয় মেয়ে। হাঁটতে খুব অসুবিধা হত। লাঠি নিয়ে ঘুরত। কিন্তু শরীর নিয়ে ওর আলাদা কোনও 'আহা উহু' ছিল না। কোনও অভিযোগও করত না। ওর মানসিকতা, রুচি, তীব্র জেদ—সব দিক দিয়েই ওকে ভালো লাগত আমার। ওর কথা বলে শেষ হবে না।
নবনীতা খুব বড় মনের মানুষ ছিল। লোকজন খুব ভালোবাসত। ওঁর মেয়েরা কর্মসূত্রে বাইরে চলে যাওয়ার পর খুব একা হয়ে গিয়েছিল। তখন ওর বাড়িতে অনেক আশ্রিতা থাকত। তাদেরকে সে মেয়ে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসত। এই যে লোককে আপন করে নেওয়া, এটাই একটা বড় ব্যাপার ছিল।
আমি মাঝে মাঝে রসিকতা করে বলতাম, নবনীতা হল এমন এক জন মানুষ যার পুরো পরিবারই বিখ্যাত! বাবা বিখ্যাত, মা বিখ্যাত, স্বামী বিখ্যাত, মেয়েরাও খ্যাতিনামা। এক অদ্ভুত ধরনের খ্যাতিমান পরিবার, যে পরিবারের সকলেই বিখ্যাত। ওরা যার যার নিজের ক্ষেত্রে বিখ্যাত।
ও দীর্ঘ দিন হাঁপানিতে ভুগেছে। ইনহেলার নিয়ে ঘুরত। অথচ শরীর নিয়ে কিছু জিগ্যেস করলে হয়তো বা বিরক্ত হত, বলত, ও কিছু না। আসলে, শারীরিক কোনও সমস্যাকেই ও বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাইত না। এই যেমন আলাস্কার মতো জায়গায় নবনীতার মতো হাঁপানি রোগী চলে গেল। ঘুরেও এল। ও একাধিকবার আলাস্কায় গিয়েছে।
ওঁর সঙ্গে শেষ দেখা প্রায় দেড়বছর আগে, একটা অনুষ্ঠানে। মনে আছে, আমি গাড়ি নিয়ে ওঁর বাড়ির সামনে অপেক্ষা করছি। ওঁর নামতে অনেক দেরী হচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে দেখলাম সেই চেয়ারে বসে সিঁড়ি দিয়ে নামল। আর নামার পরেও বাড়ির দরজা থেকে গাড়ি পর্যন্ত আসতেও অনেক সময় লাগল। আমি দেখেই আঁতকে উঠে বললাম, 'এ কি অবস্থা হয়েছে আপনার!' ও কোনও উত্তর না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। শরীর খারাপ নিয়ে কিছু বলতেই চাইত না।
ওর এই চলে যাওয়াটা অপূরণীয় ক্ষতি। ওকে নিয়ে আলাদা কোনও আদিখ্যেতা ছিল না, কিন্তু শ্রদ্ধা করতাম। নবনীতা এক বর্ণময় চরিত্র। নবনীতার কলমটা থেমে গেল। আরও কিছু দিন ওর কলম চলতে পারত। এই চলে যাওয়া ব্যক্তিগত ক্ষতি এবং বাংলা সাহিত্যের পাঠক হিসেবেও এক অপূরণীয় ক্ষতি বলে মনে করি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন