শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে তা ভাবিনি কখনও। কিছুদিন আগেই দেখা হয়েছিল। কাজ নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল, জিগ্যেস করলাম, এখন দিনে কত ঘণ্টা কাজ করো? জবাবে বলল, এখন বেশি চাপ নিই না ভাই, দিনে চার ঘণ্টা শুটিং করতে পারি, তার বেশি নয়।
অভিনয় একটা শারীরিক পরিশ্রমের কাজও বটে, কারণ তাতে আউটডোর আছে, মেক আপ আছে, রিহার্সাল আছে, রিটেক আছে, ডাবিং আছে। পঁচাশি বছর বয়সেও সৌমিত্র অবশ্য সক্রিয় ও সজীব ছিল। বিজ্ঞাপনের কাজও বিস্তর করছিল। এই সক্রিয়তার দরুনই হয়তো শরীর ও মনে ভালোই ছিল, আবার কে জানে এত কাজের সূত্রেই কোভিড সংক্রমণ হল কি না। এটা না-হলে সৌমিত্রকে আমরা আরও কিছুদিন পেতাম।
ষাট বছরেরও বেশি হবে, আমি তখন লজ্জাজনক বেতনে কলকাতার নিম্মমানের একটা স্কুলের মাস্টার, আর সৌমিত্র তখন উঠতি নায়ক। শুধু নায়কই নয়, বিশ্ববরেণ্য সত্যজিৎ রায়ের ছবির নায়ক। তবু সেই সময়েই সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠিত দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও তার সঙ্গে কফিহাউসের সূত্রে আমার একটু বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। সৌমিত্র সকালের দিকে ঘণ্টা দেড়েক-দুয়েকের জন্য কফিহাউসে আসত, তার তখনকার প্রিয় বন্ধু নির্মাল্য আচার্যর সঙ্গে আড্ডা দিতে, আমরাও থাকতাম তখন। নির্মাল্য আর সৌমিত্রের সম্পাদনায় তখন এক্ষণ পত্রিকা বেরোচ্ছে। আমি মুখচোরা, আনস্মার্ট বলে বেশি কথাবার্তা বলতাম না, তবে চুপ করে শুনতাম আর অনুধাবন করতাম। সৌমিত্রর সেন্স অফ হিউমার ছিল তীক্ষ্ন, কণ্ঠস্বর দারুণ ভালো, উচ্চারণ, লাজবাব। আর চেহারার কথা তো বলারই নয়।
আমি তার অভিনয় নিয়ে তেমন কিছু বলিনি, অভিনয়ে তার প্রায় স্বভাবগত দক্ষতা, কাজেই বলাটা বাহুল্যমাত্র। শিশির ভাদুড়ীর কাছে তালিম নিয়েছে, আকাশবাণীতে ঘোষকের কাজ করছে, অতি দক্ষ আবৃত্তিকার। সব দিক দিয়েই তৈরি মানুষ।
বাঙালি সুদর্শন নায়কদের মধ্যে লালিত্য ও কমনীয়তা বেশি মাচো বা কর্কশ পৌরুষ কিছু কম। উত্তমকুমারকে ধরেই বলছি। মেদবর্জিত কেঠো সৌন্দর্য বাঙালি নায়কদের নেই, সেটা তাদের খামতি বলে গণ্য করা যায় না, সেটা এ দেশের জলবাতাসেরই প্রভাব। তৎকালে বলিউডের নায়কদেরও কেউ হলিউডের মাচো নায়কদের মতো নয়। রাজ কাপুর, দিলীপকুমার বা দেব আনন্দ, সবাই একইরকম লালিত্যবহুল চেহারার। সত্যজিৎ যখন 'অভিযান' ছবি করলেন, তখন রাফ অ্যান্ড টাফ নায়ক হিসেবে সৌমিত্রকেই বেছে নিলেন। এটা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল সৌমিত্রের পক্ষে। আশ্চর্যের বিষয় মেক আপ আর অভিনয়ের জোরে সৌমিত্র যা অভিনয় করল তা আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। তার চেহারা বা চরিত্রে যে ওই উগ্র কঠোর চরিত্রের ছায়াও নেই সেটা সে বুঝতেই দেয়নি। কফিহাউসে আমি তাকে কথাটা বলায় ভীষণ খুশি হয়ে কফি খাইয়ে দিল। চরিত্রটি নিয়ে যে সে নিজেও টেনশনে ছিল তাও স্বীকার করল।
কফিহাউসের আড্ডা থেকে আমাকে বিদায় নিতে হয়েছিল কাজ এবং সংসারের দায়িত্ব চলে আসায়। সেই থেকে সৌমিত্রের সঙ্গে দেখাশুনো হত না। তার এবং আমার কাজের ক্ষেত্রও তো আলাদা। দীর্ঘকাল যোগাযোগ হয়নি। কিন্তু দীর্ঘদিন পরে আবার নানা অনুষ্ঠানে দেখা হতে লাগল, আমার কাহিনি নিয়ে তৈরি বেশ কয়েকটা ছবিতে অভিনয়ও করেছে সে। 'মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি'-র প্রমোশনমূলক একটি লাইভ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে কিছুদিন আগে সে আমাদের বাড়িতে এসেছিল। কত কথাই যে হল। আমার ছেলেমেয়ে আর বউমার সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করল। সেদিন অন্য একটি অনুষ্ঠানে যেতে হবে বলে আমি বেরিয়ে যাওয়ার পরও সে বেশ কিছু সময় আমার পরিবারের সঙ্গে কাটিয়েছিল।
বছর দেড়েক আগে আমি আর সৌমিত্র এক অনুষ্ঠানে একইসঙ্গে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। ঢাকায় একই হোটেলে ছিলাম আমরা। তখনও ভালোই আড্ডা হয়েছিল দুদিন। একটি চ্যানেল থেকে আমাদের দুজনকে একসঙ্গে বসিয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিল।
ইদানীং মাঝে মাঝে বলত, বুঝলে, শেষটা দেখতে পাচ্ছি তো তাই একটু ভাবনা হয়। নিজেকে নিয়ে আত্মকথনের ভঙ্গিতে তার করা একটা নাটক দেখতে গিয়েছিলাম পৌলমীর আমন্ত্রণে সৌমিত্রের আশিতম জন্মদিনেই বোধহয়। নাটকের শেষে তার হাতে পুষ্পস্তবক তুলে দেওয়ার কথা আমার। তখনই সর্বসমক্ষে বললাম, এত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কথা ভাবছ কেন তুমি? হে নাবিক, হে নাবিক, জীবন অপরিমেয় বাকি।
সৌমিত্র চলেই গেল। একটু ফাঁকা লাগছে। একটু বিষাদ ছেয়ে আছে মন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন