পুতুলওয়ালা

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

একটা চটের বস্তা কাঁধে নিয়ে আধবুড়ো লোকটা প্রায়ই পুরোনো জিনিস কিনতে আসে। পুরোনো বাসন, অচল ঘড়ি, অকেজো হারমোনিয়াম, ভাঙা দা, কুড়ুল, বা বাতিল বইপত্র যাই হোক। লোকটা ভারী রোগাভোগা, এলোথেলো চুল, রুখু দাড়ি, গায়ে ময়লা একটা গেঞ্জি, পরনে চেককাটা সবুজ বা নীলরঙা লুঙ্গি, পায়ে তাপ্পিমারা একজোড়া চটি। কিন্তু নিত্যি নিত্যি তো আর লোকের ঘরে বিক্রি করার মতো জিনিস থাকে না, তবু লোকটা আসে। তারপর হাঁফ ছাড়ার জন্য বলাইদের বাড়ির খোলা বারান্দায় বসে একটু জিরোয়। একটু জল চেয়ে খায়, তারপর কোথায় যেন চলে যায়।

আজও এসেছে লোকটা। বলাইদের বাড়ির বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে কখন অজান্তে ঘুমিয়ে পড়েছে। আজ রোববার বলে দোকানপাট বন্ধ, তাই বলাইয়ের বাবা হরি সামন্ত আজ বাড়িতেই আছে। সে দুপুরবেলা ভাত খেয়ে পান মুখে দিয়ে পিক ফেলতে বারান্দায় এসে দেখে লোকটার পাশে রাখা চটের বস্তার খোলা মুখ দিয়ে ভারী সুন্দর টুকটুকে একটা পুতুলের মুখ বেরিয়ে আছে। যেন খুব অবাক হয়ে চারপাশটা দেখছে, আর তার মুখে ভারী একটা খুশিয়াল হাসি।

হরি সামন্ত বিষয়ী মানুষ। দুনিয়ার ব্যবসাবাণিজ্য ছাড়া সে আর কিছুই তেমন বোঝে না। না বোঝে গানবাজনা, না বোঝে শিল্পসাহিত্য, না বোঝে দয়াধর্ম। পয়সাই তার মা-বাপ, পয়সাই তার ঠাকুরদেবতা, পয়সাই তার জানমান। তবে আজ যেন তার কী একটা হল! পুতুলটা দেখে আর চোখ সরাতে পারল না। অবাক হয়ে দেখতে লাগল। দেখতে লাগল তো দেখতেই লাগল। একবার যেন মনে হল, পুতুলটার চোখ পিটপিট করছে, একবার মনে হল, পুতুলটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকেও একবার আড়চোখে দেখে নিল, আর-একবার মনে হল, পুতুলটা যেন হঠাৎ একটা হাত বের করে হরি সামন্ততে হাতছানি দিয়ে ডেকেই হাতটা লুকিয়ে ফেলল। চোখের ভুলই হবে, তবু হরি সামন্ত ব্যাপারটা উড়িয়ে দিতে পারল না। সাত-পাঁচ ভেবে লোকটাকে ঘুম থেকে তুলে বলল, ওহে বাপু, পুতুলটা কি বেচবে নাকি?

লোকটা হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে অলস গলায় তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে, কেন, আপনি কিনবেন নাকি?

যদি ধরো কিনতেই চাই?

লোকটা এবার একটু উদাস হয়ে বলে, আজ্ঞে ও পুতুল বেচবার জন্য নয়। পদ্মপুকুরের বনেদি রায়বাড়ির জিনিস। অনেক কষ্টে, অনেকবার টানা মেরে তবে পুতুল হাসিল করা গেছে। এখন ও পুতুল হাসনগঞ্জের বড়মানুষ গোপেনবাবুর জিনিস। তিনি দু-হাজার টাকা হেঁকেই রেখেছেন।

পুতুলের দাম দু-হাজার শুনে হরি সামন্তর একটু মূর্ছামতো হল। মিনিট দুই বাদে মূর্ছা কাটিয়ে উঠে হরি বলে, কত যেন বললে বাপু? আরেকবার বলবে নাকি?

আজ্ঞে দু-হাজার! তার ওপর রাহাখরচ বাবদ আরও শ'দেড়েক ধরে রাখুন। মোট গিয়ে বাইশশোয় দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, কর্তা! একটু সামলে কর্তা, ফের যেন মূর্ছা যাবেন না।

হরি মূর্ছা গেল না বটে, কিন্তু বড়মানুষের মূর্খামি দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, আমি তো ভেবেছিলাম বিশ-বাইশ টাকা হলেই তুমি পুতুলটা বেচতে রাজি হয়ে যাবে।

আজ্ঞে আমি গরিব মানুষ এমনিতে ও পুতুল বিশ-বাইশেই হয়তো বেচে দিতুম, কিন্তু এ হল চুক্তির ব্যাপার। তার ওপর গোপেনবাবু ভারী মেজাজি মানুষ কিনা, যা তাক করে দেগে রেখেছেন তা না-পেলে কুরুক্ষেত্র করবেন। পয়সাওয়ালাদের মেজাজ কেমন হয় তা কি আর বলে দিতে হবে কর্তা?

কথাটায় একটু আঁতে লাগল হরি সামন্তর। কারণ পয়সাওয়ালা লোক সে নিজেও, তবে তার ঠাঁটবাট নেই বলেই সে তেমন কল্কে পায় না। লোকে তাকে কেষ্টবিষ্টু বলে ভাবলই না কখনো! গলাখাঁকারি দিয়ে সে বলল, তা তোমার সেই বড়মানুষ গোপেনবাবু কি পাগল?

পাগল হতে যাবেন কোন দুঃখে?

পাগল না হলে কোনো বিষয়ী মুরুবি মানুষ কি দু-হাজার টাকা কবুল করে পুতুল কেনে হে?

গোপেনবাবুকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেন না যেন কর্তা! যেমন পয়সা তেমনি দিলদরিয়া মেজাজ। অনেকে পয়সা করে বটে, কিন্তু হাত দিয়ে জল গলে না। তা গোপেনবাবু তাদের মতো পিচেশ নন। বাপের ব্যাটা বললে বলতে হয় বটে গোপেনবাবুকে! পুতুল দিয়ে তিনি কী করবেন তা তিনিই জানেন। আমরা আদার ব্যাপারী, জাহাজের দাম জেনে কী হবে বলুন।

তা তিনি তাঁর পয়সার গরম দেখাতে হাতি কিনতে পারতেন, জাহাজ কিনতে পারতেন, হাওড়ার পোল বা কুতুবমিনার কিনতেই বা বারণ করেছে কে? তা বলে একটা পুঁচকে পুতুলের জন্য দু-হাজার টাকা!

তার সঙ্গে রাহাখরচটাও ধরবেন কর্তা!

তাও নাহয় ধরলুম, কিন্তু ব্যাপারটা কি বেজায় বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না, বাপু?

তা বাবু, আমরা গরিবগুরবো মানুষ, আমাদের কি বড় মানুষদের বিচার করা সাজে? তাঁরা কখন কী করবেন, কেন করবেন, তা আমি বলব কী করে বলুন!

তা বটে।

লোকটা বিদেয় হল বটে, কিন্তু পুতুলটার কথা হরি সামন্ত ভুলতে পারল না। এরকম জ্যান্ত পুতুল সে জন্মে দেখেনি। আহা, পুতুলটা কিনতে পারলে সে বাইরের ঘরের আলমারিটায় সাজিয়ে রাখত। সবাই দেখে ভারী অবাক হত।

কিন্তু পরের রবিবার লোকটা এসে বলল, বাবু পুতুলটা শেষ অবধি গোপেনবাবু কিনলেন না কেন?

হরি অবাক হয়ে বলে, সে কী হে! তা কিনলেন না কেন?

ব্যবসা জিনিসটাই এরকম কিনা। আজ রাজা তো কাল ফকির! তা গোপেনবাবু বললেন, তাঁর নাকি হঠাৎ একটা বড় রকমের লোকসান হয়েছে। এখন দু-হাজার টাকার পুতুল কেনার ক্ষমতা তাঁর নেই। বললেন, পুতুল তো ছাড়, আগামীকাল বাড়িতে হাঁড়ি চড়বে কি না তাই সন্দেহ। তা পুতুলটা এখনো বিক্রি হয়নি। আপনি নিলে কিছু কমসমে ছেড়ে দেব।

তা কততে ছাড়বে বলে ভেবেছ বলো তো!

আপনি হাজার টাকা ফেললেই হবে।

ওরে বাবা! হাজার টাকায় পুতুল কি তোমার সস্তা হল? না বাপু, আমার এখনো ভীমরতি হয়নি যে, হাজার টাকা জলে দেব। দেখো গিয়ে গোপেনবাবুর মতো আর কোনো আহাম্মককে খুঁজে পাও কি না।

হরি সামন্ত বিরক্ত হয়ে ঘরে চলে এল। কিন্তু দুপুরে খাওয়ার পর পানের পিক ফেলতে বারান্দায় গিয়ে দেখল, ঠিক আগের রোববারের মতোই লোকটা ঘুমিয়ে পড়েছে আর বস্তার খোলা মুখটা দিয়ে সেই পুতুলটা উঁকি মেরে হরির দিকে চেয়ে যেন কিছু বলতে চাইছে।

হরির যেন মনে হল, পুতুলটার চোখ তাকে বলছে, আমাকে তোমার কাছে রাখবে?

হরির বিষয়ী মনটাও একটু দ্রব হল। তার দুটো ছেলে আর দুটো মেয়ে আছে। তবু তার কেন যেন মনে হচ্ছে এই পুতুলটা তার একটা হারিয়ে যাওয়া ছেলে। হরি আজ আর লোকটাকে ঘুম থেকে তুলল না। বেশি গরজ দেখালে বিপদ, লোকটা দাঁও মারার চেষ্টা করবে। তবে সে তক্কে তক্কে রইল। ঘণ্টাখানেক বাদে লোকটা ঘুম থেকে উঠলে সে বলল, পুতুলটা যদি হাজার টাকায় বেচতে না পারো তবে আমার কাছে এসো।

লোকটা ভ্যাবলা চোখে চেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল, তারপর বলল, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। স্বপ্ন দেখলুম, পুতুলটা মানুষের গলায় আমাকে বলছে, আমাকে তুমি এই বাড়িতেই রেখে যাও। তা বাবু, আমি ধর্মভীরু মানুষ, দুনিয়ার ভালোমন্দ তেমন বুঝি না, বিষয়বুদ্ধিও নেই। তাই ঠিক করেছি ও পুতুল আমি অমনি আপনাকে দিয়ে যাব। আপনাকে দাম দিতে হবে না।

হরি থতোমতো খেয়ে বলে, এমনি দেবে! তোমার তো তাতে লোকসান হবে বাপু!

ফিরিওলা লোকটা হেসে বলে, না কর্তা লোকসান কীসের? আমার লাভলোকসানের হিসেব আপনার মতো নয়। মন যাতে সায় দেয়, যাতে আনন্দ পায়, তাতেই আমার লাভ। হাজার টাকায় কি সেই আনন্দ কেনা যাবে কর্তা? নিন, এই পুতুলটা আপনার কাছেই রেখে দিন।

বিনিমাগনায় পুতুলটা পেয়ে আনন্দের চেয়ে অবাক ভাবটাই বেশি হল হরি সামন্তর। লোকটাকে কি পাকেপ্রকারে ঠকিয়ে দিল? লোককে ঠকাতে তার একটা আনন্দ হয় বটে, কিন্তু এখন সেই আনন্দটা হচ্ছে না কিন্তু। যাই হোক হরি সামন্ত পুতুলটা আলমারিতে রেখে দিল। বেশ পুতুল! সুন্দর পুতুল!

কিন্তু হঠাৎ তার বাড়ির লোক টের পেতে লাগল, হরি সামন্ত লোকটা যেন পালটে গেছে। বিষয়বুদ্ধি খুইয়ে বসেছে, তা নয়। কিন্তু আগে তার দয়াধর্ম বলে কিছু ছিল না, দানধ্যানের কাজও মাড়াত না, বাড়িতে ভিখিরি এলে তাড়িয়ে দিত, মানুষ দায়দফায় এসে হাত পাতলে মুখ ফিরিয়ে নিত। এখন আর তা নয়। হাত খুলে দানধ্যান করতে লেগেছে, পরের আপদে-বিপদে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, ভিখিরিরা এ বাড়িতে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, ভিখিরিরা এ বাড়িতে আসা ছেড়েই দিয়েছিল, এখন আবার আসতে লেগেছে।

এমন অবস্থা হয়েছে যে তার বাড়ির লোকই এখন হরি সামন্তকে যেন ঠিক চিনে উঠতে পারছে না। হরি সামন্ত নিজে বেশ মনের সুখেই আছে। আজকাল তার খিদে হয়, ভালো ঘুম হয়, বিষয়চিন্তা করতে করতে মনে আনন্দ বলে কিছু ছিল না, এখন মাঝে মাঝে তার আনন্দও হচ্ছে। তবে একটাই দুঃখ। সে ঠিক করে রেখেছে, সেই পুতুলওলাটা এলে তাকে বলবে, এই বয়সে তোমাকে আর কষ্ট করে ফিরি করে বেড়াতে হবে না। তুমি আমার কাছেই থেকে যাও, তোমার জন্য থাকার ঘরও ঠিক করে রেখেছি। তা সত্যি বাড়ির একটা ঘর ফিরিওলার জন্য সাজিয়েও রেখেছে বটে হরি সামন্ত।

কিন্তু ফিরিওলা অনেকদিন হল আসছে না। কী হল কে জানে! তবে এলে আর তাকে ছেড়ে দেবে না হরি সামন্ত। সে তৈরি হয়ে আছে মনে মনে।

দিন যায়, ফিরিওলা আসে না। ফিরিওলা আর আসে না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%