শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

বছর দশ-বারো আগে আমাকে যেতে হয়েছিল রামচন্দ্রের বনবাসের পথ পরিক্রমায়। অযোধ্যা থেকে শুরু করে দুই পর্যায়ে আমি ধনুষ্কোটি পর্যন্ত গিয়েছিলাম।
সাধারণ ভাবে ঘুরে বেড়াতে আমার যে খুব ভালো লাগে তা নয়। ঘুরে বেড়াবার নেশা যাকে বলে, তেমন কোনও নেশা আমার নেই। তবে বিভিন্ন কাজে আমাকে বহু জায়গাতেই যেতে হয়েছে এবং সেই যাওয়া যে খুব খারাপ লেগেছে এমনও নয়। বনবাসে বিসর্জিত হবার পর রামচন্দ্র যে দীর্ঘপথ অতিক্রম করেছিলেন—চিহ্ন ধরে ধরে আবার সেই পথটিকে পুনরাবিষ্কার—এই কাজটির মধ্যে রোমাঞ্চ ছিল, কিছু অ্যাডভেঞ্চারও ছিল।
মুশকিল হল, রামচন্দ্র বলে সত্যিই কেউ ছিলেন কি না, তিনি সত্যিই বনবাসে গিয়েছিলেন কি না, কোন পথে গিয়েছিলেন, এ সমস্ত নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। বাস্তবে কী ঘটেছিল তা তো আমার জানা নেই। তবে এই পথ পরিক্রমায় বেরোনোর আগে আমাকে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করতে হয়েছিল।
যাত্রা শুরু করেছিলাম অযোধ্যা থেকে। এখন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে খারাপ লাগছে না, কিন্তু তখন মনে হয়েছিল অযোধ্যাবাস খুব সুখের হবে না। একেই তো শহরটা ভীষণ ঘিঞ্জি। তার ওপর সেদিন রামনবমীর জন্য অসম্ভব ভিড়। আমি এক সাধুর আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছিলাম। হোটেল টোটেল ইত্যাদির ভালো ব্যবস্থা অযোধ্যায় ছিল না, কাজেই সাধুর আশ্রমটি খুব ভালো না-হলেও চলে গিয়েছিল। অযোধ্যা থেকে শুরু করে ভরদ্বাজ মুনির আশ্রম—অর্থাৎ এলাহাবাদে, তারপর চিত্রকূট, মধ্যপ্রদেশের খানিকটা অঞ্চল—আমার প্রথম পর্যায়ের পরিক্রমা এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
আজকে পিছনে তাকিয়ে যখন ভাবি, মনে হয়, এই পরিক্রমের মধ্যে একটা অন্য মাত্রা যোগ হয়েছিল। নিছক ভ্রমণ তো এটা নয়, জায়গা দেখা নয়, একটা উদ্দেশ্যমূলক অনুসন্ধান। এবং সেটা করতে গিয়ে আমার মধ্যে অন্যরকম একটা কিছুর সঞ্চার হয়েছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আমি প্রথম আবিষ্কার করি, হিন্দিবলয়ের একটা বিশাল অংশ রামচন্দ্রকে যে এত জানে, কথায় কথায় রামচন্দ্রের এত উল্লেখ করে, এর পিছনে একজন কবির মস্ত অবদান আছে। তিনি কবি হিসাবে কত বড় সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, তুলসীদাস একজন ভক্ত এবং কবি। রামচন্দ্রকে নয়, এই পরিভ্রমণে বেরিয়ে আমি আবিষ্কার করলাম তুলসীদাসকে।
আমার আরেক মস্ত লাভ বিভিন্ন ধরনের মানুষের সান্নিধ্যলাভ। সাধারণ মানুষ সবাই। ছোট হোটেলওয়ালা, রিকশাওয়ালা, টাঙাওয়ালা, হোটেলের বয়-বেয়ারা-বাবুর্চি, এরকম আরও বহু মানুষ, যাদের সঙ্গে আমাকে যেচে আলাপ করতে হয়েছিল আমার পরিক্রমা সংক্রান্ত তথ্যের প্রয়োজনে। আমার জীবনে এই সফরটাতে আমি পেয়েছি যাকে বলা যায় সম্পদ সঞ্চয়ের সুযোগ। আমার নিজের ভেতরে যে কতকগুলো অজ্ঞানতা ছিল, সেই অজ্ঞানতাও কেটেছে এই অভিজ্ঞতার ফলে।
গুহক রাজার রাজধানী শৃঙ্গবেরপুরে গিয়েছিলেন রামচন্দ্র। কথা হল এই শৃঙ্গবেরপুরটা কোথায়। এলাহাবাদে আমি বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও জানতে পারলাম না। কিন্তু ইউ পি ট্যুরিজমের একটি মেয়ে আমাকে শেষ পর্যন্ত একটা সন্ধান দিল। এটা এলাহবাদ থেকে ৪০-৫০ কিলোমিটার দূরে। বলল, কছৈড়ি থেকে বাস ছাড়ে। সেখান থেকে লালগোপালপুরের বাসে চলে যান। শৃঙ্গবেরপুর পথেই পড়বে। বাসরাস্তা থেকে হাঁটাপথ। টাঙাও পাবেন।
টাঙা অবশ্য ছিল না। দীর্ঘপথ রোদের মধ্যে হেঁটে পৌঁছলাম শৃঙ্গবেরপুরে। এত ক্লান্ত হয়েছিলাম যে ওখানে পৌঁছে প্রায় শুয়ে পড়ার মতো অবস্থা। উত্তরপ্রদেশের মানুষরা অতি সরল এবং অতিথিবৎসল। পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই ফল-টল, পানীয় ইত্যাদি নিয়ে এল কয়েকটি ছেলে।
শৃঙ্গাবেরপুরে নদী আছে—গঙ্গা, কিন্তু এই শৃঙ্গবেরপুরেই রামচন্দ্র এসেছিলেন কি না তা আমি জানি না। নদী তার খাত বদল করে সরে আসতে পারে। ঘাট আছে। মন্দির আছে, ভালোই বসতি আছে। সেখানে একটা খননকার্য চলছিল। কুষাণ আমলের বা ওই সময়কার বহু নিদর্শন মাটি খুঁড়ে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সেটা গুহক রাজার রাজধানী কি না সেটা তো বলার কোনও উপায় নেই। ওখানে রামচন্দ্রের খড়ম আছে, মন্দির আছে। শৃঙ্গবেরপুর একটা তীর্থক্ষেত্রেও হয়ে উঠেছে। ভালোই লাগবে, তবু একটা খটকা থেকেই যায় যে সেটাই আসল শৃঙ্গবেরপুর কি না।
অযোধ্যাও তাই। যে অযোধ্যাকে নিয়ে এত বিবাদ বিসম্বাদ সেই অযোধ্যাই যে আসল অযোধ্যা এ-কথা কে বলবে। একটা কিংবদন্তী আছে যে সম্রাট বিক্রমাদিত্য অযোধ্যাকে পুনরাবিষ্কার করেন। বিক্রমাদিত্য নাকি শিকারে গিয়েছিলেন, হঠাৎ দেখেন সরযূর ওপারে একজন কালো মানুষ কালো ঘোড়ায় চেপে নদীতে নামছে। নদীতে নেমে সে ডুবে গেল, এপারে যখন উঠল তখন সেও সাদা তার ঘোড়াও সাদা। তখন বিক্রমাদিত্য খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কে? সেই লোকটি উত্তর করল, আমি প্রয়াগরাজ। মানে, প্রয়াগের দেবতা। যত পাপীতাপী প্রয়াগের জলে স্নান করে, তাদের কলুষে আমি কালো হয়ে যাই। সেটা পরিষ্কার করার জন্যই আমি সরযূতে ডুব দিই। এরপর প্রয়াগরাজ বিক্রমাদিত্যকে বললেন, তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছো, এটাই হচ্ছে পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের রাজধানী অযোধ্যা। তুমি এই নগরীকে পুনরুদ্ধার করবে। কপিলা গাই বা ওরকমই স্বর্গের কোনও গাভী যেখানে যেখানে দাঁড়াবে এবং তার বাঁট থেকে দুধ ঝরে পড়বে বুঝবে সেখানেই প্রাচীন অযোধ্যার কোনও না কোনও চিহ্ন রয়েছে। মজা হল, বিক্রমাদিত্য নিজেই এমন একটা চরিত্র যে মিথলজিতে তাকে যেমন ভাবে খুশি ব্যবহার করা হয়েছে। সেই অর্থে রামচন্দ্রের বনবাসের পথটাও অনেকাংশেই মিথ। আমি সেই মিথকেই, মায়ামারীচকেই অনুসরণ করে গেছি।
তবে হ্যাঁ, চিত্রকূটে সেই পাহাড়টা তো আছে, যেখানে উনি বসবাস করতেন। চিত্রকূট থেকে শুরু করে মধ্যপ্রদেশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল বিশাল দণ্ডকারণ্য। সে-সব গাছ সাফ হয়ে গেছে, অরণ্য নির্মূল হতে হতে ওড়িশার এক কোণে সামান্য কিছু জায়গায় টিকে আছে। চিত্রকূট থেকে অবশ্য আর কিছু প্রামাণ্য নিদর্শন পাওয়া যায় না, আসলে চিত্রকূটে তেমন কোনও বসতি ছিলও না।
পঞ্চবটী, মানে নাসিকে, সীতাগুম্ফা রয়েছে। সেখান থেকেই নাকি সীতাহরণ হয়েছিল। সেগুলো যদিও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে নাসিকের তীর্থক্ষেত্র হিসাবে প্রসিদ্ধি রয়েছে, কারণ ওখানে কুম্ভমেলা হয়। কিন্তু জলের অভাব। শিপ্রা নদী একটা শুকনো নালার মতো বয়ে যাচ্ছে। একটা বেসিন করে রাখা আছে। লোকজন সেখানেই স্নান করে।
নাসিকে আরও একটা জিনিস দেখেছিলাম, ওরা বলে পাণ্ডব গুম্ফা। আসলে বৌদ্ধ শ্রমণদের গুহা। পাহাড়ের মাথায় প্রায় হাজার খানেক ফুট ওপরে। শ্রমণরা বেশ কষ্ট করেই থাকতেন সেখানে। জলের অভাব ছিল। বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য পাথরের চৌবাচ্চা তৈরি করে রাখা হয়েছিল। বৌদ্ধরা চলে যাওয়ার পর এটাকে পাণ্ডবগুম্ফা নাম দিয়ে প্রচার করা হয় যে পাণ্ডবরা এখানে ছিলেন অজ্ঞাতবাসের সময়। এইরকম বহু মিথ আমরা অল্প অনুসন্ধান করেই বাতিল করে দিতে পারি। কিন্তু এটা বোঝা যায় যে ওই মিথগুলোর একটা প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর প্রবলভাবে রয়েছে।
তুঙ্গভদ্রার তীরে যেখানে এখন তুঙ্গভদ্রা বাঁধ তৈরি হয়েছে, সেখানে ছিল বিজয়নগর-বাহমনি রাজ্য। ও জায়গাটা এমনিতেই ভ্রমণকারীদের কাছে খুব প্রিয়। বিজয়নগর-বাহমনি রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ ওখানে আছে। দুর্লভ পাথর দিয়ে তৈরি নানারকম কনস্ট্রাকশন সেখানে রয়েছে। অন্য একটা পাথর দিয়ে টোকা দিলে কোনওটা থেকে বাঁশির আওয়াজ হয়, কোনওটা থেকে মৃদঙ্গের আওয়াজ হয়। একটা আস্ত পাথর কেটে রথ তৈরি করা আছে। এখানেও মিথ আছে যে, সীতাহরণের সময় ওইখানেই রাবণের সঙ্গে জটায়ুর লড়াই হয়েছিল। ওখানকার লোকেরা পাথরের দুটো দাগ দেখায়—একটা সোনালি দাগ একটা রূপোলি দাগ। টানা চলে গেছে বহুদূর পর্যন্ত। সে দুটো দাগ অবশ্য সত্যিই আছে। জটায়ু রাবণকে আক্রমণ করলে রাবণ সীতাকে রথ থেকে নামিয়ে একটা গুহায় আটকে রেখেছিল। সীতাকে টেনে আনার সময় গয়নার ঘষায় ওই সোনালি দাগটা পড়ে। আর রুপোলি দাগটা পড়ে তাঁর শাড়ির ঘষায়।
এই জায়গাটাকে আমরা বলতে পারি কিষ্কিন্ধ্যা। সেখানেই রাবণের সঙ্গে জটায়ুর লড়াই হয়েছিল এবং এখান থেকেই রামচন্দ্র বানরসেনা সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু এরপর থেকে রামচন্দ্রের পথের কোনও দিকনির্দেশ পাওয়া দুরূহ। আর কোনও তীর্থক্ষেত্র পাওয়া যাবে না, যেখানে রামচন্দ্র বসবাস করেছিলেন বলে মিথ চালু আছে।
ধনুষ্কোটি—এখনকার রামেশ্বরমের কাছে। এখান থেকেই রামচন্দ্র সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। এখানে রামচন্দ্রের বসবাসের কিছু নিদর্শন দেখানো হয়। ধনুষ্কোটি পর্যন্ত আগে ট্রেন যেত। আমরা সে অবধি যেতে পারিনি। কারণ ঝড়ে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। রামেশ্বরম পর্যন্ত গিয়েছিলাম।
উত্তর ভারতে রামচন্দ্রের যে প্রভাব, দক্ষিণ ভারতে তা কিন্তু নেই। এই পরিক্রমায় আমি বেরিয়েছিলাম সম্পূর্ণ একা। নিজের মালপত্র নিজেকেই বইতে হত। খাওয়ার কষ্টও ছিল বেশ কিছু জায়গায়। তবুও এটা আমার কাছে বেশ মনোরম স্মৃতি হয়ে আছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন