শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

বাদলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল নিতান্তই ছোকরা বয়সে! তখনও আমি কোনও উপন্যাস লিখিনি বা আনন্দ পাবলিশার্স থেকে আমার বইও বেরোয়নি। সাহিত্যিক বিমল কর তখন তরুণ লেখকদের সঙ্গে সন্ধেবেলা কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের ভিতরে একটি চায়ের দোকানে আড্ডা দিতেন। সেখানেও বাদলও আসত। রং কালো হলেও ছিপছিপে, টান টান চেহারার বাদল ছিল খুবই সুপুরুষ। কিন্তু সেই যৌবনকালেও তার সাজগোজ বিশেষ ছিল না। ধুতি আর সাদা শার্ট ছিল তার মার্কামারা পোশাক। অনেক পরে বিদেশে যাওয়ার সময় সে প্যান্ট-শার্ট পরত বটে, কিন্তু আর কখনও ধুতি-শার্ট ছাড়া অন্য পোশাক পরত না। তখন বাদলের বয়স চব্বিশ-পঁচিশ, আনন্দ পাবলিশার্সে চাকরি করে।
বাদলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে বিশেষ দেরি হয়নি। তবে বাদল ছিল কাজের মানুষ। আমরা যেমন কফি হাউসে বা বিমলদার আড্ডায় দেদার আড্ডা দিতাম, বাদলের পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। কাজের ব্যাপারে সে ছিল অতি নিয়মনিষ্ঠ, কোনও ফাঁকিবাজি বা আলসেমি ছিল না, আর প্রকাশনার যে বিচিত্র কাজ তা সে পছন্দও করত। কাজের প্রতি তার এই আনুগত্য এবং ভালোবাসা এমনই পর্যায়ের ছিল, যার জন্য সে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাও দিত মেপে, কখনও কাজকে অবহেলা করে নয়। আমি থাকতাম মহাত্মা গাঁধী রোড আর রামমোহন রায় রোডের সংযোগস্থলের কাছেই, আর বাদলের কর্মস্থল ছিল ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের পাশেই একটা গলির ভিতরে গৌরাঙ্গ প্রেসে। দুরত্ব সামান্যই। অথচ আমার ঘরে কখনও বাদল এসেছে বলে মনে পড়ে না। কিন্তু আমার সেই ভাগের ঘরে বিমল কর, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গাঙ্গুলি, দেবদুলাল, জটিলেশ্বর থেকে কে আসেনি আড্ডা দিতে। সিরাজ তো অনেক রাত অবধি গল্প করত। তারপর অনেক রাতে বাস না পেয়ে হেঁটে এন্টালির বাসায় ফিরে যেত।
আমি কখনও-সখনও গৌরাঙ্গ প্রেসে গিয়েছি। তেমন কোনও কাজে নয়। আড্ডা দিতেই! সেখানে বড্ড ছোট জায়গায় বাদলকে বসতে হত। গেলে চা খাওয়াত, গল্পও করত। তার তখন অনেক বড় বড় লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ, মেলামেশা। ফণিভূষণ দেব তখন আনন্দ-র কর্তাব্যক্তি বটে, কিন্তু বাদলের ওপরেই ছিল দায়িত্ব, সে দম ফেলার সময় পেত না। যখন-তখন লেখকদের বাড়ি ছুটতে হত প্রূফ দিতে বা প্রূফ আনতে। যত দূর মনে পড়ে তখন বাদলের একটা স্কুটার ছিল। তাইতেই সর্বত্র গমনাগমন। বেশ কিছুদিন পরে সে অফিস থেকে একটা গাড়ি পেয়েছিল।
তখন বাদল কী পোস্টে চাকরি করত তা আমি জানি না। কত বেতন পেত, সচ্ছলতা ছিল কি না, তার বাড়ির কী খবর এসব আমার জানাই ছিল না। বাড়ি বা হাঁড়ির খবর নেওয়ার মতো মানসিকতাও তখন নয়। এমনকী, সে বিবাহিত কি না তা-ও জানতাম না। তবে এটুকু জানতাম সে প্রেম-ট্রেমের ধার ধারে না।
আনন্দ কোন বই ছাপবে বা না ছাপবে তা নির্বাচন করার দায়িত্ব বাদলের ছিল না। তবু তরুণ ও তরুণী কবি-সাহিত্যিকরা ধরে নিয়েছিল প্রকাশযোগ্য বই নির্বাচনে বাদলের হাত আছে। এইজন্য তাকে বিস্তর তোষামোদ সইতে হয়েছে। তরুণী কবি লেখকদের মধ্যে কেউ কেউ তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও করতে চেয়েছে। কিন্তু বাদল ছিল চাঁচাছোলা মানুষ, ভাবের ঘুঘুও নয়, রোমান্টিক ডালপালাও তার ছিল না, কাউকেই সে ল্যাজে খেলায়নি, পত্রপাঠ বিদায় করে দিয়েছে। সেইসব গল্প যখন বলত তখন আমি মাঝে মাঝে ধৈর্য হারিয়ে বলতাম, দূর মশাই আপনি বড্ড অ্যান্টি-রোমান্টিক। বাদল হ্যা হ্যা করে হাসত।
ঝাড়গ্রামের দহিজুড়ি গ্রাম আমার চেনা জায়গা। দহিজুড়ির পরেই গিধনি, যেখানে ঠাকুর অনুকুলচন্দ্রের বিশাল আশ্রম। সড়কপথে যাতায়াতের সময় দহিজুড়ি হয়েও যাওয়া আসা যায়। তেমন প্রত্যন্ত না হলেও গরিব গ্রাম, বাদল সেখানকার মানুষ। তার কোনও গ্রাম্যতা ছিল না বটে, কিন্তু তার সরল সহজ চরিত্রের মধ্যে গ্রামের নির্ভুল ছাপ ছিল। স্পষ্ট কথা স্পষ্ট করে বলে দিতে তার কোনও দ্বিধা কখনও দেখিনি। দীর্ঘদিন কলকাতায় বাস করেও সে শহুরে ভানভর্ণিতা অর্জন করেনি, ইনিয়ে-বিনিয়ে ঘুরিয়ে কথা কওয়ার অভ্যাসও তার ছিল না। ফলে কখনও কখনও তাকে রূঢ়ভাষী বা অবিনয়ী বলে কারও কারও মনে হতেই পারে। হয়েছেও। কিন্তু কাউকে সে ঝুলিয়ে রাখত না, যা বলার সপাটে বলে দিত। তাতে কিন্তু কারও সঙ্গেই তার সম্পর্ক খারাপ হত না। দহিজুড়িতে বাদল যেত পুজোর ছুটিতে। আর তখন তার বাড়িতে মাঝে মাঝেই হানা দিত তার কবি সাহিত্যিক বন্ধুরা। শক্তি, সুনীল এবং আরও অনেকে। বিস্তর হুজ্জোত-হুল্লোড়ও হত। শক্তিকে যারা জানে তারাই বুঝতে পারবে যে, এই অসামান্য প্রতিভাবান কবিটি মদ্যপান করলে কেমন বেহেড হয়ে যেত। তখন তার মুখের বা আচরণের কোনও আগলবাগল থাকত না।
বাদলের নিরীহ নিপাট পরিবারে সে যখন সেই মূর্তিতে হাজির হত তখন সিঁটিয়ে যেত সকলে। বাদল সেই গল্প যখন বলত তখন কিন্তু বিরক্তি নয়, বরং স্নেহই ঝরে পড়ত তার কণ্ঠস্বরে।
বন্ধুকৃত্য তাকে নানা ভাবে নানা সময়ে করতে হয়েছে। বাদলকে বন্ধুদের সঙ্গে বহু বার মদ্যপান করতে দেখেছি, কিন্তু কখনও একবারের জন্যও মাতাল হতে দেখিনি। বরং মদ্যপান করার পরেও নিজে গাড়ি চালিয়ে অনেক বেহেড মাতাল বন্ধুকে বাড়ি পৌঁছে দিত সে। গাড়ি বাদল চমৎকার চালাত। তবে সর্বদাই একটু বেশি গতিতে। মাথা ঠান্ডা ছিল বলেই বড় একটা অ্যাক্সিডেন্ট করেনি।
নিজের সম্পর্কে এত কম কথা বলত সে যে, সেটাও এক বিস্ময়কর ব্যাপার। তবে জিগ্যেস করলে যা বলার অকপটে বলত। রাখঢাক ছিল না পরিবারের অভাব অনটন বা সমস্যা নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করা ছিল তার স্বভাববিরুদ্ধ। নিজের জীবনসংগ্রামের কথাও সে কদাচিৎ বলত। আর তার হাসিটা ছিল দিলখোলা, আনন্দময়।
ফণীবাবু যদিও আনন্দ পাবলিশার্সের কর্তাব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু বাদলই ছিল তাঁর কার্যনির্বাহী মানুষ। ছাপাখানার সব খুঁটিনাটি কাজ বাদল হাতেকলমে করেছে। ফলে তার অভিজ্ঞতাও ছিল ব্যাপক। আর তখনকার নামীদামি বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে প্রকাশনা সূত্রেই তার ঘনিষ্ঠতা। ফলে প্রকাশনার চাবিকাঠিটি ছিল বাদলের আয়ত্তে। ফণীবাবু অবসর নেওয়ার পর তাই দায়িত্ব তারই ওপর অর্শায়। কিন্তু কর্ণধার হওয়ার পরেও তার আচার ব্যবহারের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন দেখিনি।
প্রতি বছর তাকে বিদেশে যেতেই হত। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা হত আমাদের পুজোর সময়টাতেই। ওই সময়ে বিদেশে থাকতে কারই বা ভালো লাগে। কিন্তু বাদল কখনও কর্তব্যে পরান্মুখ ছিল না। কাজ তার কাছে বরাবর অগ্রাধিকার পেয়েছে। মাঝে মাঝেই তাকে বিদেশে নানা সম্মেলনে বইয়ের সম্ভার নিয়ে যেতে হয়েছে। ইংল্যান্ডে, আমেরিকায়। হাসিমুখেই গেছে সে।
সেবার সস্ত্রীক লন্ডনে বাংলাদেশি এক সংস্থার আমন্ত্রণে আমাকে যেতে হয়েছিল। মুশকিল হল, সেই সংস্থার কর্ণধার এবং প্রধান উদ্যোক্তা হঠাৎ মারা যাওয়ায় তারা অর্থসংকটে পড়ে যায়। ফলে আমাদের ঠিকঠাক রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে তারা সমস্যায় পড়ে। প্রথমে আমরা দু-তিন দিন এক ভারতীয় বাঙালির আগ্রহে তাদের বাড়িতে ছিলাম। কিন্তু সেখানে স্থানাভাব ছিল। আমার মনে হয়েছিল সেই বাড়িতে বেশিদিন থাকলে তাদের বিব্রত করা হবে। সেই সম্মেলনে বইয়ের পসরা নিয়ে বাদলও গিয়েছিল। বাদল আমার সমস্যার কথা শুনে বলল, আরে, আমি যেখানে আছি তিনি তো পেয়িং গেস্ট রাখেন। টাকা বেশি লাগবে না। চলে আসুন। বাদলের পরামর্শে তাই নাগচৌধুরীর বাড়িতে আমরা আশ্রয় নিলাম। ব্যবস্থা বেশ ভালো। আর আমন্ত্রণকর্তারা টাকা না-দিতে পারলেও আমার কাছে যা পাউণ্ড ছিল তা দিয়েই ব্যয় নির্বাহ করা যাবে। সেইখানে দিব্যি বাদলের সঙ্গে হইহই করে কয়েকটা দিন কাটানো গিয়েছিল। আর ডিভোর্সী এবং একা নাগচৌধুরীও সেই আড্ডায় শামিল হতেন। দেখলাম, বিদেশ গমনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় বাদল নানা সুলুকসন্ধান জানে। ইংল্যান্ডে তার চেনাজানা অনেকেই ছিল, কিন্তু সে কারও আশ্রয়ের প্রত্যাশা করত না। সাধ্যমতো নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিত।
বিদেশে একাধিকবার বাদলের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কোনও উদ্বেগ নেই, সমস্যা নেই। দিব্যি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারত সে। কখনও ভুলত না যে, সে একটা কাজের দায়িত্ব নিয়ে এসেছে, বেড়াতে নয়। প্রতিদিন যথাসময়ে বইয়ের স্টল খুলে বসত এবং সারাক্ষণ ক্রেতা সামলাত। হাসিমুখে, সহৃদয়তার সঙ্গে। সময়মতো আড্ডাও দিত মদও খেত, কিন্তু কখনও কাজে ফাঁকি দিয়ে নয়। এরকম কর্মী মানুষ আমি কমই দেখেছি।
বাদলের বন্ধুবান্ধব বলতে সুনীল, শক্তি, দিব্যেন্দু, মতি, শ্যামল এবং কে নয়! অন্য দিকে নীরদ সি, সত্যজিৎ রায়, সন্তোষদা, নীরেনদা, রমাপদদা, সাগরদা, বিমলদা থেকে শুরু করে তাবৎ সারস্বত সমাজ। মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করত, হ্যাঁ বাদল, এই যে দিনরাত্রি কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে আপনার কারবার, আপনার নিজের কখনও দু'ছত্তর কবিতা বা এক-আধটা গল্পটল্প লিখতে ইচ্ছে করে না? কথাটা বলা হয়নি সঙ্কোচের বশে।
বাদল যখন ফ্ল্যাট কিনবে বলে বিধান নিবাসে ফ্ল্যাট বুক করল, তখন আমার ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্নও দেখার কথা নয়। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। যখন জানলাম ফ্ল্যাটের দাম ষাট হাজার টাকা তখন মূর্ছা যাই আর কী। পরে এসকালেশনের ফলে প্রায় আশি হাজারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ফ্ল্যাটের দাম। তিনতলার ওপরে আলো-হাওয়ার অফুরন্ত সরবরাহ। জানলা খুললেই বিধান শিশু উদ্যানের সবুজে সবুজ। বাদলের বাসাটি দেখে আমি মুগ্ধ। বউ আর দুটি মেয়ে নিয়ে সেখানে তার সুখের সংসার। বড় হলঘরটির এক ধারে বুক-কেস দিয়ে ঘেরা ছোট বসার ঘর। বাদলের বউ অতিশয় সুশীলা, ধীরস্থির, গোছানো মেয়ে। সাবেক গিন্নিবান্নিদের মতোই সংসারী। সম্ভবত হোমফ্রন্টটি নিশ্ছিদ্র নিরাপদ ছিল বলেই বাদল কাজকর্মের ওই দানবীয় শক্তি অর্জন করতে পেরেছিল। অন্তত পরিবারের কারণে তাকে কোনও উদ্বেগ পোহাতে হত না।
কবি লেখকদের যে-কোনও উদ্যোগেই বাদল শামিল থাকত। সুনীলের বুধসন্ধ্যা হোক, আত্মীয়সভা হোক বা আর যা-কিছু বাদলকে ছাড়া কারওই চলত না। লেখকদের দায়ে দফায় সংকটে, আপদে-বিপদে, অসুখ-বিসুখে বাদল সর্বদাই উপস্থিত থেকেছে। আর কারও নিমন্ত্রণেই কখনও গরহাজির থাকেনি।
আমার জীবনযাত্রা একটু আলাদা ধরনের। মদ্যপান দুরস্থান, আমার বাসায় মাছ-মাংস-ডিম-পেঁয়াজ-রসুনও ঢোকে না। ফলে আমার বন্ধুরা আমার বাড়িতে বড় একটা আড্ডা দিতে আসত না। মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্নভাবে আসত। সেভাবে বাদলও এসেছে। সে খেতে ভালোবাসত। কিন্তু আমি তাকে কী-ই বা খাওয়াতে পারি? লুচি, পরোটা, মিষ্টি কারই বা মুখে রোচে? তবু সেসব সে আদর করেই খেয়েছে। নাক সিটকোয়নি। বাদলের জীবনের দর্শনটাই ছিল যখন যেমন, তখন তেমন। সব পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতাটি ছিল তার জন্মগত।
একবার একটা ঘটনার কথা বাদল নিজেই আমাকে বলেছিল। সেটা বেশ অনেকদিন আগে। তখন তার ছোট মেয়ের বয়স বোধহয় তিন বা চার হবে। সেই মেয়েকে নিয়ে স্কুটারে করে কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে কোনও কাজে আসছিল সে। স্কুটারটি হঠাৎ স্কিড করায় বাদল গাড়ি সমেত পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। রাস্তার লোকজন ছুটে এসে তার পরিচর্যা করার পর বাদলের জ্ঞান ফিরে আসে। চোট খুব বেশি ছিল না। কিন্তু হঠাৎ সাময়িক বিস্মৃতির ফলে সঙ্গে যে তার মেয়েটি ছিল, তা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে স্কুটার নিয়ে অফিসে চলে আসে সে এবং কাজে বসে যায়।
ওদিকে তার বাচ্চা মেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদছে। লোকজন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার বাবার নামটি জানতে পারে। বাদলকে বইপাড়ায় সবাই চেনে। সুতরাং একজন ছুটে গিয়ে বাদলকে বলে, বাদলবাবু, আপনার সঙ্গে কি আপনার বাচ্চা মেয়েটি ছিল? তখন বাদলের সংবিৎ ফেরে এবং সে তৎক্ষণাৎ গিয়ে মেয়েকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
ঘটনাটি এই কারণেই বললাম যে, মেয়ের কথা ভুলে গেলেও বাদল কিন্তু তার অফিস বা কাজের কথা ভোলেনি!
অবসর নেওয়ার পর সে বেশ আনন্দেই সময় কাটাচ্ছিল। মাঝে মাঝে ফোনে কথা হত। সে বলত, ফার্স্ট ক্লাস আছি শীর্ষেন্দু। অনেক বইটই পড়ছি, আড্ডা মারছি।
সত্যিই, তার দুই মেয়ের ভালো বিয়ে হয়ে গেছে। নাতি-নাতনি হয়েছে, তার তখন অবাধ জীবন। কিন্তু নির্মেঘ আকাশে হঠাৎ ঝটিকার আভাস দেখা দেবে কে জানত। বাদলের ক্যানসার হয়েছে এ খবরটা কে যে আমাকে দিয়েছিল আমার মনে নেই। তৎক্ষণাৎ বাদলকে ফোন করলাম। বাদল অতি নিরুত্তাপ গলায় বলল, হ্যাঁ ভাই, লাংসে দুটো স্পট পাওয়া গেছে। দেখা যাক কী হয়। যেন ব্যাপারটা সর্দিকাশির মতোই তুচ্ছ জিনিস।
বাদল মুম্বই গেল। দীর্ঘ চিকিৎসা চলল। মাঝখানে একবার ফোন করতেই বলল, হ্যাঁ, ভালোই আছি। তবে কী জানেন, আমার বয়স এখন আটাত্তর, দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, দায় দায়িত্ব তেমন কিছু নেই। মরতে আমার কোনও ভয় নেই।
আমি সেটা জানি। বাদলের মতো অকুতোভয় মানুষ আমি বড় একটা দেখিনি। সবচেয়ে বড় কথা, তার যে মৃত্যুভয় নেই, একথা সে বলল এত স্বাভাবিকভাবে যেন মৃত্যু কিছুই নয়, বাজার করতে যাওয়ার মতোই একটা ব্যাপার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন