শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

কোনো কবি-সাহিত্যিককে নিয়ে এমন হইচই হয়েছে বলে আমার জানা নেই, যা হয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে। এই দু'জন সম্পর্কে এমন কিছুই আমার জ্ঞাত নয় যা জনসাধারণ জানেন না। এই হইচই ঘটবার হয়তো দরকার ছিল। পঞ্চাশের দশকে গণদরবারে সাহিত্য যে ম্রিয়মানতায় ভুত তা গা-ঝাড়া দিয়ে কাটিয়ে উঠেছে এই দুই অতি সফল যুগপৎ কবি ও গদ্যকারের কল্যাণে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে সম্প্রতি বঙ্কিম পুরস্কার দেওয়ায় কিছু বির্তকের সৃষ্টি হয়েছে, কেউ কেউ খুশি হয়নি। কিন্তু আমার তো মনে হয় গত দুই যুগ ধরে সুনীল গদ্যে পদ্যে যা লিখেছে তাতে পুরস্কার তার অবশ্যই পাওনা হয়।
কবি-স্বভাবের মধ্যে সুনীলের যে সুতীব্র বেদনাবোধ ও রহস্যময়তা আছে তা আমাকে বরাবর তীব্রভাবে আকর্ষণ করেছে। তার কিছু কবিতা আছে যা ভালো-মন্দ বিচারের ঊর্ধ্বে। জীবনানন্দের প্রভাবে আচ্ছন্ন পরবর্তী কবিতা প্রজন্মেও সুনীল অতি স্বতন্ত্র, অতি আধুনিক। সবচেয়ে বড় কথা তার কবিতার বই বেরোলে লোকে কাড়াকাড়ি করে কেনে, যেমন কেনে শক্তির। অর্থাৎ সুনীল ও শক্তি বাঙালি পাঠককে আধুনিক কবিতার মেজাজে মেজাজি করে তুলতে পেরেছে। কবিতামনস্কতা জন্ম নিয়েছে তার ফলে এবং অগুন্তি তরুণ কবি অনুপ্রাণিত হয়েছেন তাদের দ্বারা। এই সফলতা এক যুদ্ধ জয়ের মতোই।
খুব সম্প্রতি সুনীলের 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' গ্রন্থটি হাতে পেয়ে পড়তে শুরু করি এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন হয়ে যাই। অনেক কবিতাই আগে পড়া, তবু আবার পড়েও দারুণ লাগছিল। শুধু শব্দের খেলা তো নয়, কবিতার পিছনে যে মনটি ক্রিয়াশীল তা পারিপার্শ্বিক সম্পর্কে কত সচেতন, মানুষ সম্পর্কে কত আগ্রহী। গভীর অনুসন্ধিৎসায় কত প্রগাঢ় তার প্রমাণ ছত্রে ছত্রে।
মানুষ হিসেবেও সুনীল অত্যাধিক সৎ, অনুদ্ধত, প্রাণবান এবং স্নেহশীল। এই গুণাবলীর সমন্বয় একটি মানুষের মধ্যে আজকাল কদাচিৎ দেখা যায়। লেখার জন্য নয়, লেখা ছাপানোর জন্যও নয়, সুনীলের ব্যক্তিগত আকর্ষণও প্রতিদিন তার কাছে বহু লোককে টেনে আনে। আশ্চর্য নয় যে এই সব মানুষের মধ্যে বহু ললনাও থাকেন। জনপ্রিয়তার খেসারত তাকে বড় কম দিতে হয় না। আবার এ কথাও বলে রাখা ভালো, জনপ্রিয়তা, খ্যাতি অর্থ, প্রেম কোনো কিছু অর্জনের জন্যই তার কোন সচেতন প্রয়াস নেই। বিগত দুই দশক ধরে দেখে তার সম্পর্কে আমার এই অভিজ্ঞতা।
গদ্যকার সুনীল সম্পর্কে দু-চারটি কথা। খুব কম লেখকই নিজস্ব স্টাইল, নিজস্ব গদ্যভঙ্গি তৈরি করে নিতে সক্ষম হন। কাজটা সহজও তো নয়। অতীতের সমস্ত উত্তরাধিকারকে স্বীকার করেও তার প্রভাবমুক্ত থেকে নিজস্বতা তৈরি যে কত কঠিন তা ভুক্তভোগীই জানেন। সুনীল তা অনায়াসে পেরেছে। তার উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, প্রবন্ধ, আলোচনা ও ছোটগল্প এক সুস্নিগ্ধ, বোধযোগ্য, তীক্ষ্নধার গদ্যে সমৃদ্ধ। বেশি লেখে বলে তার বিরুদ্ধে অনেকের ক্ষোভ আছে। কিন্তু বেশি লিখেও তো সে ফুরিয়ে যাচ্ছে না, পেছিয়ে পড়ছে না।
ধনেপুত্রেও সে লক্ষ্মীলাভ করেছে। ভাগ্য নয় নিরলস উদ্যম, ধৈর্য, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং নিষ্ঠা, জীবনযাপনের প্রতি তীব্র ভালোবাসাই তাকে জয় এনে দিয়েছে। বৃহত্তর জয় এল বলে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন