শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ভিড়ের ভিতরে এক-আধটা অচল সিকি বা আধুলি চলে যায়। কে আর অতটা খুঁটিয়ে দেখছে! বিশেষতঃ ভীড়ের মধ্যে কন্ডাক্টর যখন নিজেই টালমাটাল, গেট-এর কাছে ফুটবোর্ডে দাঁড়ানো লোকগুলোর কে যে ভাড়া ফাঁকি দেওয়ার তালে আছে সেই দিকেই তার চোখ, তার ওপর স্টপে স্টপে লেডিজ-এর নামা-ওঠার জন্য দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে সে বিরক্ত—সে সময়ে সে বড়জোর হাতে পাওয়া পয়সাটাকে এক নজর দেখে। তারপরেই টিকিট আর খুচরো ফেরত দিয়ে ছাড়বার ঘণ্টি বাজায়। দু-কদম এগিয়ে আর একজনকে বলে দাদা আপনারটা হয়েছে? কাজেই চলে যায় এক আধটা অচল আধুলি বা সিকি। কে অত খেয়াল করে! একটা দুটো-তিনটে ট্র্যানজ্যাকশন কিংবা তারও বেশি চলে যায় অচল মুদ্রা। ঠিক সেইরকম ভিড়ের মধ্যে কেউ কাউকে ঠিকমতো দেখে না বলেই—কিছু কিছু অচল মানুষ চালু থাকে। অনেকদূর পর্যন্ত চলে যায় তাদের ট্র্যানজ্যাকশন। তারা বিয়ে করে, ছেলেপুলেও হয়।
আধুলিটা চলেই গেল। কন্ডাক্টর খেয়াল করল না। হাতে ফেরত এল পঁয়ত্রিশটা পয়সা আর পনেরো পয়সার একখানা টিকিট। বেশ তৃপ্তি বোধ করেন রামচন্দ্র রায়। অচল পয়সা জেনে-শুনে চালানোর বেপরোয়া ভাব। ধরা পড়লেও আবার একটু অভিনয়।
—এটা পাল্টে দিন।
—কেন?
—সীসে মশাই।
তখন ভ্রূ কুঁচকে 'কই দেখি' বলে উল্টে-পাল্টে সেই চেনা মুদ্রাটিকে দেখা। 'যত সব ঠকবাজ' বলে অনিদিষ্টভাবে একজনকে গালাগাল দিয়ে পয়সাটা পাল্টে দেওয়া।
রামচন্দ্র প্রস্তুত ছিলেন সেই অভিনয়ের জন্য। মনে মনে মহড়াও দিচ্ছিলেন। কিন্তু ছোকরা কন্ডাক্টর পয়সাটা একবার দেখল মাত্র। পরীক্ষা করার সুযোগ ছিল না। চলে গেল আধুলিটা। একটা ট্র্যানজ্যাকশন।
ত্রিশবছর আগে এত ভিড় ছিল না। একথা সবাই জানে। কিন্তু সবাই কি জানে যে ত্রিশ বছর আগে এত সহজে অচল পয়সা চলত না। বোধহয় মানুষ তখন পয়সা উল্টে-পাল্টে দেখার সময় পেত। বোধহয় লেন-দেন কম ছিল বলে মানুষের হাত দিয়ে মুহুর্মুহু পয়সা এখনকার মতো চলত না। তখন মানুষ পয়সার সৌন্দর্য দেখতে জানত বোধহয়। নাকি, এখনকার চেয়ে, তখনকার মানুষের অনুভূতিপ্রবণতা বেশি ছিল! পয়সা হাতে ছুঁয়েই তারা টের পেত কোনটা চালু, কোনটা নয়। কে জানে! ত্রিশ বছর আগে রামচন্দ্রের বয়স ছিল তেরো। এবং সেই বয়সে রামচন্দ্র পয়সা তেমন চিনতেন না। কারণ, ত্রিশ বছর আগে তেরো বছর বয়সেও মানুষের শৈশব থাকত। তাদের জন্য কেনাকাটা করতেন অভিভাবকরা। রামচন্দ্রের বাবা হরিশচন্দ্র অচল পয়সা চিনতেন, জানতেন হিসেব লিখতে, আর কখনো ঠকতেন না। তাঁর গোল ফ্রেমের রোল্ডগোল্ডের চশমার পিছনে একজোড়া পরিষ্কার চোখ ছিল—সে চোখে ঘটনাপ্রবাহের স্বচ্ছ ছায়া বা প্রতিবিম্ব পড়ত। সন্ধ্যের মুখে বাজার করতে গিয়েও তিনি কখনো কানা বেগুন ব্যাগে তুলে আনেননি। রামচন্দ্র ভেবে পান না ত্রিশ বছর আগে মানুষের কি ছিল! কিন্তু কিছু একটা ছিলই, যা এখনকার মানুষদের নেই। তবে একথা ঠিক যে, মানুষের সঙ্গে মানুষের এত ঘষাঘষি তখন ছিল না। ঘষাঘষিই কি মানুষের সহজাত অনুভূতিকে একটু ভোঁতা করে দেয়?
অনেকক্ষণ আধুলিটির জন্য একরকম আত্মপ্রসাদ বোধ করলেন রামচন্দ্র। পরশুদিন থেকে ওটা তার নানা দুশ্চিন্তার মধ্যে একটা ছিল। ব্যাপারটা প্রথম ধরেন তার স্ত্রী। কয়লাওয়ালাকে পয়সা দিতে গিয়ে ফিরে এসে বললেন—এটা পাল্টে দিতে বলছে। দ্যাখো তো, অচল নাকি!
অচলই। চিন্তিত মুখে রামচন্দ্র বললেন—তাই দেখছি। রেখে দাও পকেটে, ট্রামে-বাসে কোথাও চলে যাবে।
স্ত্রী নিঃসংশয় মুখে মৃদু হেসেছিলেন। রামচন্দ্রের ওপর তাঁর বিশ্বাস আছে।
'লেডিজ সিট, লেডিজ সিট' বলে কন্ডাক্টর চেঁচায়। রামচন্দ্র জানালার ধারে সিট থেকে বাইরের দিকে চেয়ে হাতিবাগানের মোড়ে একটা সিনেমা হল-এর গায়ে বিশাল হোডিংয়ে সুন্দর একটা মেয়ের মুখ দেখছিলেন। দেখতে দেখতে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল—তেতাল্লিশ বছর বয়সে বাঙালিরা বুড়ো। তাঁর শালা চূণী কিছুদিন জার্মানিতে হাতুড়ি পিটিয়ে এসেছে, গত একবছর ধরে সে কেবল তার জার্মানির গল্প একে ওকে শোনায়। সে প্রায়ই বলে—'জামাইবাবু, ওদেশের লোক চল্লিশ বছরের পর বিয়ে-শাদীর কথা ভাবে, আর তার আগে পর্যন্ত ফূর্তি লোটে এন্তার। সে যে কী ফূর্তি! জাইবাউ!' শেষ দিকে চূণীর মুখ রসস্থ হয়ে যাওয়ায় পুরো 'জামাইবাবু' কথাটা উচ্চারণ করতে পারে না, গল গল করে হাসতে থাকে। কথাটা প্রাণে লেগে আছে রামচন্দ্রের। তেতাল্লিশ বছর বয়সটা যে কিছু না—সেইটে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। ঘাড়টা একটু কেতরে, ঘুরিয়ে তিনি হোডিংয়ে সুন্দর মুখখানা দেখতে দেখতেই ওই চিৎকার শুনলেন। টারমিনাস থেকেই উঠেছেন রামচন্দ্র—সেই বাগবাজার থেকে, লেডিজ সিটের আওতা ছেড়ে যতদূর সম্ভব এগিয়ে বসেছেন, তবু ওই চিৎকার শুনে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিটের ওপরের দিকটায় চোখ তুললেই অবাক এবং বিরক্ত হয়ে দেখলেন ইংরিজিতে লাল অক্ষরে 'মহিলা এবং শিশু' লেখাটা তার দিকে চেয়ে আছে। দোষটা তাঁরই, দেখে বসেননি। দোতলা বাসের নীচের তলাটা এরা ক্রমেই 'লেডিজ স্পেশাল' করে দিচ্ছে। না, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা যাচ্ছে না। আর তার বাবা হরিশচন্দ্র এই ঠিক ভুলটা অবশ্য করতেন না। 'দেশে মেয়েছেলের অভাব নেই' বিড় বিড় করে এই কথা বলতে বলতে লো প্রসারের আরামপ্রিয় শরীরখানা ঠেলে তুললেন রামচন্দ্র, খাওয়ার পর এক ঘটি জল খেয়েছিলেন, সেই জল গলা পর্যন্ত ঢক ঢক করে উঠল। ভিড় ফুঁড়ে যে দুটো মেয়েছেলে এল তাদের দিকে একবার আড়চোখে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি, তারপর আবার বিড় বিড় করে বললেন— অভাব কেবল সুন্দর মেয়েছেলের। বলে মুখটা ফিরিয়ে নিলেন।
অচল আধুলি কিংবা লেডিজ সিট—সব ব্যাপারেই তাঁর হরিশ্চন্দ্র রায়ের কথা মনে পড়বেই। ত্রিশ বছর আগে তেতাল্লিশ বছর বয়সের হরিশ্চন্দ্র এইসব ভুলভ্রান্তি করতেন না। তখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়নি, গঙ্গায় ইলিশ আসত এবং আনাজপাতিতে কেমিক্যাল সারের গন্ধ পাওয়া যেত না। হরিশ্চন্দ্র রায়ের রোল্ডগোল্ডের চশমার ফ্রেমের পিছনে একজোড়া পরিষ্কার চোখ ছিল। মাদ্রাজি নারকোলের মতো লম্বাটে মাথাটির ভিতরে ছিল শীতল চিন্তাশক্তি। তেতাল্লিশ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি বাগবাজারের প্রকাণ্ড দোতলা বাড়িটা সম্পূর্ণ করেন, দুটো গম-পেষাই কল করেন এবং একটি গোপন কিন্তু ফলাও বন্ধকী কারবার খোলেন। এমন কি জজ কোর্টের উকিল হরিশ্চন্দ্র চিৎপুরে একটি সুন্দরী রক্ষিতাকেও মাসোহারা দিতেন। এর ফলে কিছু কথা উঠেছিল ঠিকই, তবু রামচন্দ্রের মা ও বাবার সম্পর্ক ভালোই ছিল। হরিশ্চন্দ্রের দূরদৃষ্টির কথা ভাবলে রামচন্দ্রের দীর্ঘশ্বাস স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে। রক্ষিতাটির কথাই ধরা যাক। যখন আত্মীয়-স্বজনরা এসে হরিশ্চন্দ্রের স্বভাবদোষের কথা বলাবলি করতেন, তখন সেই ছেলেবেলায় রামচন্দ্রেরও ভারী মন খারাপ লাগত। কিন্তু এখন, তাঁর নিজের বয়স যখন তেতাল্লিশ তখন রামচন্দ্র তাঁর স্ত্রীকে দেখে হরিশ্চন্দ্রের রক্ষিতা রাখার প্রয়োজনটাও খুবই স্পষ্ট বুঝতে পারেন। তিন নম্বর বাচ্চার পর গিন্নি কোলবালিশের মতো আগাপাশতলা সমান হয়ে গেছেন, মুখখানায় চর্বির জোয়ার, নাক মুখ চোখ খুঁজে বের করতে হয়। যৌবনোচিত কাজকর্মের কথা তুললে গিন্নি শীতল মনোভাব দেখান। এই থেকেই এ সব বয়সে বাঙালি ঘরে অশান্তি শুরু হয়। হরিশ্চন্দ্র সে অশান্তিকে দূরে রাখতে পেরেছিলেন। বন্ধকী সোনার গয়না আর গঙ্গস্নানে মাকে খুশি রেখেছিলেন। তাঁর দূরদৃষ্টির আরেক প্রমাণ আছে। নিজের ভবিষ্যৎ বোধহয় সিনেমার মতোই দেখতে পেতেন। নিজের মৃত্যুও। তেতাল্লিশ বছর বয়সেই তিনি বাড়ির দোতলায় উঠে একতলায় দু-ঘর ভাড়াটে বসালেন, হঠাৎ গম-পেষাই কল দুটো বিক্রি করে নগদ টাকা তুলে ফেললেন, বন্ধকী কারবার গুটালেন, স্ত্রীর সঙ্গে জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট করলেন, একজন আর্টিস্টকে দিয়ে নিজের একখানা চমৎকার অয়েলপেইন্টিং করিয়ে বৈঠকখানায় টাঙিয়ে দিলেন। তারপর মারা গেলেন। কিন্তু এমনই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সেই মৃত্যু যে পরিবারটার কোন কষ্টই হল না।
রড ধরে দাঁড়িয়ে দোল খেতে খেতে লাল অক্ষরে লেখা 'লেডিজ অ্যান্ড চিল্ডেরেনে'র দিকে তাকিয়ে রামচন্দ্র ভাবেন, তিনি কি অন্ধ? তিনি কি হরিশ্চন্দ্র রায়ের সন্তান? বাবার সেই দূরদৃষ্টি তাঁর কই! এখনো, এই তেতাল্লিশ বছর বয়সেও তাঁর হাতে অচল মুদ্রা চলে আসে। টারমিনাসেও লেডিজ সিটে বসে পড়েন ভুলে, এবং আশ্চর্যের বিষয়—সিনেমার হোর্ডিংয়ে মেয়েছেলের মুখ দেখেন। চূণীর কাছে জার্মানির সমুদ্রতীরে রোদে পড়ে থাকা ছাল-ছাড়ানো খাসীর মতো হুমদো মেয়েছেলে দেখার গল্প শোনেন হাঁ করে। নিজেকে তাঁর অবিকল একটি অচল মুদ্রা বলে মনে হয়। লোকের অন্যমনস্কতার সুযোগে সংসারে চালু আছেন। কয়েকটা ট্র্যানজ্যাকশনের পরই শেষ হয়ে যাবেন।
সব কিছুর জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে দায়ী করতে তাঁর ভালো লাগে। ওই যুদ্ধটাই তাঁর সঙ্গে হরিশ্চন্দ্রের এই তফাতের কারণ। হয়তো ওই অ্যাটমবোমটাই মস্তিষ্কে, চোখে, দূরদৃষ্টিতে এইসব গোলমাল ঘটাচ্ছে।
স্ত্রীর অবশ্য তাঁর ওপর অগাধ বিশ্বাস। অচল আধুলিটা যে তিনি চালাতে পারবেন তা যেন স্ত্রী ধরেই নিয়েছিলেন। এরকম ছোটখাটো কৃতিত্ব তাঁর কয়েকটা আছে। যেমন, বাড়িটা। দু-ভাইয়ের নামে বাড়ি। রামচন্দ্র আর বামচন্দ্র। বামচন্দ্র ছেলেবেলা থেকেই বাউন্ডুলে। অল্পবয়সে মদ ধরে, রেস খেলে একশা। তার ওপর বিয়ের বছর পাঁচেক বাদে খবর বেরোল যে সে আর একটা বিয়ে করেছিল বছর ছয়েক আগেই। সেই বউ বাড়ি বয়ে এসে খুব চেঁচামেচি করে গেল একদিন, সঙ্গে দু-তিনটি ছেলেপুলে। এইসব কারণেই ধারকর্জে তলিয়ে গিয়েছিল রামচন্দ্র। পাওনাদাররা যখন পুলিশে দেয় সে সময়েই রামচন্দ্র নগদ ছ'হাজার টাকা দিয়ে বামচন্দ্রের অংশ নিজের নামে লিখিয়ে নেন। বামচন্দ্র সেই টাকা পেয়ে কিছু ধার শোধ করে। কিছু ফূর্তি করে ওড়ায়। বছর খানেক পরে রামচন্দ্র তাকে সপরিবারে তুলে দেন। খোলামেলা বিশাল দোতলাটা তখন তাঁর একার। নীচের পুরোনো ভাড়াটে তুলতে কিছু কম করেননি রামচন্দ্র, ভূতের ভয় দেখিয়েছেন, মেথরকে পয়সা দিয়ে রাত-বিরেতে গু ঢালিয়েছেন বারান্দায়, গুণ্ডা লাগানোর ভয় দেখিয়েছেন এবং অবশেষে বিরক্ত হয়ে তারা উঠে গেছে। বাবার আমলে চল্লিশ টাকা ভাড়া ছিল, এখন সেখানে আড়াইশো করে দুটো ফ্ল্যাট থেকে পাঁচশো টাকা ইনকাম। মাদ্রাজি ভাড়াটে। খুব গোপনে বাবাকেলে বন্ধকী কারবারটা আবার খুলেছেন তিনি। দু-একটা টাকার মুখ দেখেছেন, দু-চার রতি সোনা থেকেও যাচ্ছে। সেই কারণেই তাঁর ওপর স্ত্রীর অগাধ বিশ্বাস।
কিন্তু নিজেকে তেমন বিশ্বাস করেন না রামচন্দ্র। হরিশ্চন্দ্রের সঙ্গে তুলনায় তিনি কিছুই না। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সেই হরিশ্চন্দ্র বাগবাজারে প্রকাণ্ড বাড়ি হাকিয়েছিলেন, তেষট্টি বা তিয়াত্তর পর্যন্ত টিকে থাকলে মনুমেন্ট বা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বানিয়ে ছাড়তেন। আর রামচন্দ্র এখনো পৈতৃক বাড়িতে পড়ে আছেন, বামচন্দ্র মাঝে মাঝে মদ খেয়ে এসে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পাড়ার লোকজনকে জানিয়ে গালাগালি দিয়ে যায়; পুরনো ভাড়াটে বেনামা চিঠিতে নির্বংশ হওয়ার অভিশাপ দেয়। এইসব উঞ্ছবৃত্তি করে তাঁকে টিকে থাকতে হচ্ছে। ওই বয়সেই হরিশ্চন্দ্রের রক্ষিতা, আর রামচন্দ্র সেই বয়সে এখন সিনেমার হোডিংয়ে দেখে আর চূণীর রসস্থ মুখে শুনে মেয়েছেলের আস্বাদ নেন। বন্ধকী কারবারে হরিশ্চন্দ্র পড়তি জমিদার কি উড়নচণ্ডী বড়লোকের ছেলে ধরে এই বয়সেই পঞ্চাশ-ষাট ভরি ঘরে তুলেছিলেন, রামচন্দ্র বড়জোর পিতলে আংটি, পাতলা দুল, সুতোর মতো হার—কয়েকটা এরকম ফঙ্গবেনে জিনিস ঘরে তুলেছেন। না, নিজের ওপর রামচন্দ্রের বিশ্বাস নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধটাই সব নষ্টের গোড়া। ত্রিশ বছর আগে, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়নি তখন যে অমনোযোগী, অসতর্ক বা অন্যমনস্ক মানুষ ছিল না, তা নয়। ছিল। কিন্তু হরিশ্চন্দ্র রায় তা ছিলেন না। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলেরা পাছে বাপের অয়েলপেইন্টিং করতে গিয়ে ঠকে যায় সেই ভয়ে তিনি নিজের অয়েলপেইন্টিং করে রেখে যান। তাঁর ছেলে হিসেবে রামচন্দ্রেরও অসতর্ক বা অন্যমনস্ক হওয়া উচিত নয়। তবু যে তিনি অসতর্ক এবং অন্য মনস্ক তার কারণ বোধ হয় এই যুদ্ধটা। সীটের ওপর লাল অক্ষরে লেখা 'লেডিজ অ্যান্ড চিল্ডরেন' দেখে তিনি নিজের জিব কামড়ালেন। সত্যিই কি তিনি হরিশ্চন্দ্রের সন্তান? নাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধই তার পিতা?
অথচ আশ্চর্য এই যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধটা তাঁর লড়াই ছিল না।
হাতদুটো ভেরে গেছে। এসপ্ল্যানেড থেকে হাঁটতে হাঁটতে তিনি টের পাচ্ছিলেন হাত দুটোর সাড় নেই। মাথা ঝিম ঝিম করছে। পা একটু একটু কাঁপছে। লো প্রেসার। প্রেসার থাকলে সেটা লো থেকেই হাই হতে সময় লাগে না। চাপটা থাকবেই! তেতাল্লিশেই গিয়েছিলেন হরিশ্চন্দ্র। সেটা ভাবলে বুকটা কেমন চাপ ধরে যায়। আবার ভাবেন, হরিশ্চন্দ্রের কিছুই তো তিনি পাননি, তেতাল্লিশের ফাঁড়াটা কি আর পাবেন?
হিন্দুস্তান বিল্ডিংসের পিছনের অ্যানেক্সে তাঁর অফিস। এয়ার-কন্ডিশনড। প্রাইভেট আমলে ঢুকেছিলেন রামচন্দ্র। চাকরিটা তখন চাকরিই ছিল। পাঞ্চিং মেশিন সারাদিন হড় হড় করে চলত। একদিন পৌনে পাঁচটায় মেশিন বন্ধ করে হাত ধুয়ে এসেছিলেন বলে ইনচার্জ হালদার তাঁকে সাড়ে ছ'টা পর্যন্ত আটকে রেখেছিলেন। সেই দিন আর নেই। এখন এগোরোটায় চা দিয়ে যাওয়ার পর কর্মচারীরা কাজে হাত দেয়। টিফিনে ফিশ খেলার আসর বসে। তিনটে থেকে অফিসের ভাঙন শুরু হয়। মাইনে বাড়াতে কিছু কষ্ট করতে হয়নি। বছর বছর বেড়ে যায়। চারশোতে ঢুকেছিলেন। বিনা আয়াসে এখন সাতশোর কিছু উপরে পান।
অফিসে এসে একটু বিশ্রাম নিলেন রামচন্দ্র। ডানা দুটোয় সাড় নেই যেন। পা দুটো সেইরকমই কাঁপছে, মাথাটা ঝিমঝিম। এক গ্লাস জল খেলেন। পাশেই ভটচায। জিগ্যেস করলেন—বোনের বিয়ে হয়ে গেল?
—আপনি গেলেন না!
—ক'দিন ধরেই শরীরটা ভালো নেই হে ভটাচায, কেমন যেন সব ভুল-ভাল হয়ে যাচ্ছে।
ভটচায চোখ তুলে বলে—কীসের ভুল-ভাল?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে রামচন্দ্র বললেন—কে যেন একটা অচল আধুলি গছিয়ে দিল সেদিন, লেডিজ সিট না দেখে বসে পড়লাম বাসে আজ। এসব কেন হচ্ছে বলো তো! ব্যাটারা এত বেশি অ্যাটম বোমা ফাটাচ্ছে বলে নাকি! বলেই তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর কথাবার্তা কিছু আবোল-আবোল হয়ে যাচ্ছে। মনে যা আসে তা বলতে নেই। সে সব বলে পাগলেরা।
ভটচায চোখ গোল করে বলে—আপনার মতো প্র্যাকটিকাল মানুষের আবার এসব ভুল হয় নাকি।
—বয়স। বলে চুপ করে থাকেন রামচন্দ্র, তারপর আস্তে আস্তে কেবল নিজেকে শুনিয়ে বলেন—বয়স না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
—বয়স আর এমন কী? যা স্বাস্থ্যখানা রেখেছেন, আবার বিয়ে দিয়ে আনা যায়।
রামচন্দ্র হাসেন—চেহারা আর কী দেখলে! তেতাল্লিশে ওদেশের লোক তো সত্যি সত্যিই বিয়ে করে, ওদের স্থিরযৌবন।
—শীতকালের দেশ তো।
—তা হবে, বোনের বিয়েতে কী দিলে-থুলে?
—নগদই চলে গেল দু-হাজার, আর দশভরি গয়না, ফার্নিচার...
—ধার হয়ে গেল?
—হাজার চারেকের মতো।
খানিকক্ষণ এসব কথাবার্তা বললেন রামচন্দ্র, কিন্তু শরীরটায় যুৎ পাচ্ছিলেন না। কাজের তাড়া নেই, এজেন্টদের কমিশনের সময় পার হয়ে গেছে। সে সময়টায় একটু খাটনী গেছে, ইনচার্জকে গিয়ে বললেন—আজ আর মেশিনে হাত দিচ্ছি না।
—কেন?
—শরীর ভালো নেই।
ইনচার্জ ছোকরামত, হেসে বলল—বসে থাকুন। শরীর ভালো বোধ করলে করবেন।
হালদারের আমল কেটে গেছে। এখন চাকরি আর ঠিক চাকরি নেই, স্থুল স্ত্রীর মতোই অভ্যাসজাত, শীতল, এবং বিশ্বস্ত। তাই ফিরে এসে চেয়ারে বসলেন রামচন্দ্র। স্ত্রী একজোড়া চপ্পল আনার জন্য কাগজে ডান পায়ের মাপ দিয়ে দিয়েছেন, একবার পকেট থেকে কাগজটা বের করে দেখলেন, ডান পায়ের ছবি, মাঝখানে লেখা—লাল রং এনো কিন্তু। কাগজখানা বার করে দেখলেন। আবার রেখে দিলেন পকেটে। মেয়েটার জন্য একটা আপেল নিয়ে যাওয়ার কথা। সেটা ভাবলেন। হরিচন্দ্র রায়ের আয়েলপেইন্টিটাও মনে পড়ল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথাও। ত্রিশবছর আগেকার পৃথিবীর কথা ভাবতে ভাবতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং হরিশ্চন্দ্র রায়ের কথা ভাবতে ভাবতে চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়লেন।
যতদূর মনে পড়ে, তিনি এসপ্ল্যানেড থেকে একটা চলন্ত বাসে উঠবার চেষ্টা করছিলেন। নিউমার্কেটের উল্টোদিকের ফুটপাথ থেকে স্ত্রীর জন্য সস্তায় একজোড়া চপ্পল কিনেছেন, সেই জুতোর বাক্স বাঁ বগলে, বাঁ হাতে একটা কাগজের ঠোঙায় রাঙা একটা আপেল। এইসব নিয়ে তিনি একটা বাসে হান্ডেলে ডান হাতে ধরে পা-দানীতে উঠে পড়েছিলেন, রোজ যেমন যান। কিন্তু রোজ তো সবার সমান যায় না। এক-একটা দিন আসে যা অন্য সব দিনের থেকে আলাদা। পা-দানীতে উঠে গেছেন, ভিতর থেকে একজন তখন স্টপ ভুল করায় তাড়াতাড়ি নেমে আসছে। ধাক্কাটা জোরেই খেলেন রামচন্দ্র, দু-হাত তুলে বাতাস ধরলেন, তারপর কিছু মনে নেই।
একটুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য জ্ঞান ফিরল। দেখেন এক দোকানের সিঁড়িতে শুয়ে আছেন। চারদিকে লোকজন জমে গেছে। তাঁর চোখে জলের ঝাপটা দেওয়া হচ্ছে।
আস্তে আস্তে উঠে বসে জিগ্যেস সরলেন—কী হয়েছে?
ভিড় থেকে একজন বলল—তেমন সিরিয়াস কিছু না। বাস থেকে পড়ে গিয়েছিলেন, জোর বেঁচে গেছেন।
তিনিও বুঝতে পারলেন, তেমন কিছু হয়নি। মাথার পিছনটা ব্যথা করছে, কনুই দুটো ছড়ে গিয়ে জ্বালা করছে, বুকে একটু ধুকুপুকুনি, অল্প একটু শ্বাসকষ্ট। এ ছাড়া তেমন কিছু না।
একটা বাচ্চা ছেলে একপাটি চটি কুড়িয়ে এনে বলল—এটা বোধহয় আপনার। তাঁরই। চটি পায়ে দিয়ে উঠলেন, পকেট দেখলেন, সব ঠিক আছে। মানিব্যাগ, রুমাল, চাবি, বুকপকেটে কলম, হাতে ঘড়ি। কিছুই খোয়া যায়নি।
এমনকী আপেলটাও পাওয়া গেল। এক ভদ্রলোক সহৃদয় ভাবে ঠোঁঙাটা কুড়িয়ে এনে দিলেন—এ আপেলটা বোধহয় আপনারই, বাড়ির কারো জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন!
তিনি আপেলটা নিয়ে ধন্যবাদ দিয়ে দেন। একজন জুতোর বাক্সটা কুড়িয়ে এনে দেয়। তাকেও ধন্যবাদ দেন। মানুষ কত ভালো—এই কথা ভেবে তিনি ওঠেন। তারপর স্বাভাবিক মানুষের মত বাস-স্টপে গিয়ে দাঁড়ান। বাঁ-বগলে জুতোর বাক্স, বাঁ-হাতে আপেলের ঠোঁঙা। হাতে হাতঘড়ি এখনো চলছে টিকটিক। পকেটে মানিব্যাগ, রুমাল, চাবি। সব ঠিক আছে, একটা বাসও আসছে।
বাসে উঠতে যাবেন, হঠাৎ খেয়াল হল—আরে! আমার বাসের নম্বর কত? মনে পড়ছে না তো!
পিছিয়ে দাঁড়ালেন, মনে করবার চেষ্টা করলেন। তখন পর পর কতগুলি প্রশ্ন তাঁর মনে ছ্যাঁকা দিয়ে গেল—আমার বাসের নম্বর কত? আমি কোথায় থাকি? আমি কোথা থেকে আসছি? আমি কে?
অবাক—খুবই অবাক হয়ে দেখলেন, প্রশ্নপত্রটি খুবই কঠিন। আউট অফ সিলেবাস। একটা উত্তরও তার জানা নেই, নিজের নাম-পরিচয়ের জন্য তাড়াতাড়ি মানিব্যাগ খুললেন তিনি, যদি কোন চিরকূটে লেখা থাকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন