শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

গোবিন্দপুরের মেলায় গেছেন নাকি কখনো! বড় জম্পেশ মেলা মশাই। আড়েদিঘে যেমন পেল্লায়, জাঁকজমকেও একেবারে হরিপদ। চোখের পলকই পড়তে চায়না মশাই। যেদিকে চোখ ফেরাবেন সেদিকেই চমক। সরেস জিনিস যদি চান তাহলে চক্ষু মুদে গোবিন্দপুরের রাসের মেলায় চলে যাবেন। রাধাগোবিন্দজিউয়ের ঠেকে একবার নমো ঠুকে মেলায় সামিল হয়ে গেলেই হল। ফুরফুর করে সময়টা কেটে যাবে দেখবেন।
তোর তো ট্যাঁকের অবস্থা গুরুচরণ, তা তুই মেলায় গিয়ে করিসটা কি?
আজ্ঞে, মেলায় তো ট্যাঁকের বিলিব্যবস্থা করতেই যাওয়া কিনা। কেনারাম না হলুম, বেচারাম হতে তো দোষ নেই! কী বলেন?
তা ঠিক। কিন্তু বেচিস কি? মামলোত না থাকলে ব্যবসাই বা হয় কি করে? হ্যাঁ রে, চুরি ধারি শুরু করলি নাকি?
করলেই বা দোষ কি বলুন? ভগবান যদি তাই কপালে লিখে দিয়ে থাকেন তো আমার আর কি করার আছে বলুন দিকি। তবে এ ঠিক চুরির বৃত্তান্ত নয়। বলতে নেই, লোকের ভাগ্যবিচার করে ইদানিং আমার দুটো পয়সা হচ্ছেও।
বলিস কী! তুই তো খুনে লোক দেখছি। তুই জ্যোতিষী শিখলি কবে?
আজ্ঞে গরিবদের কত কী মুষ্টিযোগ শিখে রাখতে হয় তার কিছু ঠিক আছে বরেনবাবু! কোনটা কাজে লেগে যায় কে বলবে। এই তো সেদিন কুঁড়েপুকুরের মাঝবয়সী একজনাকে প্রথমেই বললুম, আপনার সময়টা তো ভালো যাচ্ছে না মশাই! লোকটা শুনে সটান পা জড়িয়ে ধরল, ঠাকুরমশাই, আমাকে বাঁচান।
বলিস কি রে! লোকে তোর কথা বিশ্বাসও করে? তা তুই কী করে বুঝলি যে লোকটার সময় খারাপ যাচ্ছে?
কারই বা সময় ভালো যাচ্ছে বলুন! ভিড়ের মধ্যে কথাটা চারিয়ে দিয়ে দেখুন, সবাই মাথা নেড়ে বলবে, সময়টা ভালো যাচ্ছে না মোটেই। তারপর ধানাই পানাই করে দুর্যোগের মুষ্টিযোগও বাতলাতে হয়। পাঁচু গোসাঁইয়ের কাছে তালিম নিয়েছিলুম কিনা। ওঁরও ওইরকম কায়দা ছিল। প্রথমেই পিলে চমকে দিয়ে পরে ধীরে ধীরে সুতো ছাড়া। সব কাজেরই তো একটা ধাঁচা আছে মশাই।
তোর কথাটা বাপু, ফেলে দেওয়ার মতো নয়। যা দিনকাল পড়েছে তাতে টিকে থাকার জন্য মানুষকে দিনে-রেতে মাথা ঘামিয়ে যেতে হচ্ছে। তা পাঁচু গোঁসাইয়ের নামে বিধবার সম্পত্তি গাপ করার একটা নালিশ হয়েছিল বলে শুনেছিলুম যেন!
তা মিছে শোনেননি কর্তা! নালিশ একটা হয়েছিল ঠিকই। তবে মোকদ্দমা গড়ানোর আগেই সেই বিধবা অবলাবালা পটল তুলে ফেলল যে! বাঁচা-মরা তো আর মানুষের হাতে নয়! অবলাবালার ভাইপো নিমাই কয়েকদিন লাফালাফি করে রণে ভঙ্গ দেয়। আর সম্পত্তি বলতেও তো আর তোষা বালাখানা নয়, একটা কুঁড়ে ঘর আর তিন বিঘে জমি। নিমাই তাই আর মামলার পিছনে টাকা ঢালেনি। সে নেশাখোর মানুষ, ট্যাঁকেরও তেমন জোর নেই কিনা।
তা পাঁচু গোসাঁই যে কবে জ্যোতিষী শিখল কে জানে বাপু! আমি তো বরাবর তাকে পয়সাওয়ালা মদন বিশ্বেসের পিছনেই ঘুরঘুর করতে দেখলুম।
ঠিকই দেখেছেন! দু-দুটো পেট্রল পাম্প আর হাটখোলার পাইকিরি কারবারে মদন একেবার টাকায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। তার মোসাহেবও মেলা। তা তাদের মধ্যে পাঁচু ঠাকুরও ছিলেন বটে। তবে তেমন সুবিধে হয়ে ওঠেনি। বড়লোকেরা লোক চেনে বলেই বড়লোক হতে পারে। তারা আমাদের মতো তো নয়।
কথাটা জব্বর বলেছিস। বড়মানুষেরা আমাদের মতো আহাম্মক হলে কি লোক চরিয়ে খেতে পারত? তা পাঁচু গোসাঁইয়ের বৃত্তান্তটা কী বলবি তো!
পাঁচু গোসাঁইয়ের যে দুখানা সংসার তা জানা আছে তো! একটা জগাছায়, আর একটা কোগ্রামে। তা কোগ্রামের ছোট বউয়ের ওপরেই টান ছিল বড্ড। তা বউটা হঠাৎ একদিন সাপকাটিতে ভোকাট্টা হয়ে যাওয়ার মনের দুঃখে চারটে গ্যাদড়া বাচ্চাকে বড় বউয়ের জিম্মা করে দিয়ে পাঁচু ঠাকুর বিবাগী হওয়ার ফিকিরে ছিলেন। সেই সময়ে ফুলপুকুরের জটাবাবার সঙ্গে দেখা। তা তিনিই কোষ্ঠী বিচার করে বললেন, তোর সন্ন্যাসের যোগই নেই। তুই বরং জ্যোতিষী শিখে সংসার থেকে একটু গা আলগা হয়ে থাক। তা সেই থেকে পাঁচু ঠাকুর ওই বিদ্যেয় হাত পাকিয়ে ফেলেছেন। আমি তাঁর শাগরেদী করে দু-পয়সা কামাচ্ছি বই তো নয়।
এ তো লোক ঠকিয়ে খাওয়া রে!
কী যে বলেন বরেনবাবু! লোক ঠকাতে যাবো কোন দুঃখে? বিদ্যে বেচে খাওয়া কি আর চুরি-ডাকাতির মধ্যে পড়ে? তাহলে তো ইস্কুল কলেজে গন্ডায় গন্ডায় চোর -ডাকাত। তবে কিনা কোনো বিদ্যেই নির্দোষ নয়, তাতে ছিদ্র থাকবেই। গণনায় ভুলচুক তো হতেই পারে। কি বলেন! পাঁচটা বললুম, হয়তো তিনটে মিলল।
বুঝেছি। তা গোবিন্দপুরে রাসের মেলা নিয়ে কী বলছিলি যেন।
যে আজ্ঞে, বড় জব্বর মেলা মশাই। পিলপিল করছে লোক। আর বিকিকিনি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। ব্যাপারীরা কাছা খুলে বেচছে, আর খরিদ্দারেরা পাগলের মতো কিনছে। লাখো লাখো টাকার মাল চোখের পলকে গস্ত হয়ে যাচ্ছে। চক্ষু সার্থক। কত বড় বড় ব্যাপারী গোবিন্দপুরের মেলায় একটু জায়গা পাওয়ার জন্য হেদিয়ে মরছে। দশ বিশ হাজার ঢালতেও রাজি, কিন্তু মাথা কুটলেও জায়গা মেলা ভার।
বটে! তাহলে তুই জোটালি কী করে? হাটের কর্তারা কি তোর বেয়াই লাগে?
সে একটা বৃত্তান্তই বটে। আমার মতো চুনোপুঁটির কি সেখানে নাক গলানোর উপায় আছে? পাকা কাঁঠালে মাছি পড়ার মতো অবস্থা। তা হয়েছিল কি, মাস দুই আগে গাজনপুরের এক যজমানবাড়ি থেকে সন্ধের মুখে বাড়ি ফিরছিলাম। বৃষ্টিবাদলার দিন। জলেকাদায় চারদিক থিকথিক করছে, তার ওপর অন্ধকার। সঙ্গে বাতিটাতিও নেই। তবে কিনা আমার অভ্যেস আছে বলে তেমন অসুবিধে হচ্ছিল না।
পাথরডুবির রথতলা পেরোনোর সময় হঠাৎ কোথা থেকে একটা লোক উদয় হয়ে আমার পিছুপিছু আসছিল। দিনকাল ভালো নয় বলে আমি একটু পা চালিয়ে হাঁটছিলুম, লোকটা পিছন থেকে হাঁক মেরে বলল, ওহে বাপু, আমি বুড়ো মানুষ, হাঁটুর জোর নেই, একটু আস্তে হাঁটো, দুটো কথা কইতে কইতে যাই।
তা আমি ভাবলুম, চোর-ডাকাত হলেই বা কি! আমার ট্যাঁক তো ঢুঢু। তাই রাস টেনে বললাম, তা কর্তা যাবেন কোথায়! আর এই দুর্যোগে বেরিয়েছেনই বা কেন।
তা তিনি আমার পাশে পাশে হাঁটা ধরে বললেন, আর বোলোনা হে! আদায়-উশুলেই বেরোতে হয়। পাওনাগণ্ডা ফেলে রাখলেই ফর্সা। তাই এই দুর্যোগ মাথায় করেই বেরোতে হয়েছিল। আমার আবার ছেলে নেই কিনা! তিনটেই মেয়ে, আদায় উশুল কে করে বলো।
আমি একটু ভয় খেয়ে বললুম, তা কর্তা, সঙ্গে টাকাপয়সা আছে নাকি?
উনি বললেন, তা আছে বাপু। তোমাকে আগেই বলে রাখি, যদি ডাকাত হয়ে থাকো তবে মেরে কেটে নিওনা। চাইলেই দিয়ে দেবো। এ বয়সে মারধর খেতে পারব না বাপু। আমি বড় ভিতু মানুষ।
আমি বললুম, সে ভয় নেই। গরিব হলেও লোক তেমন মন্দ নই।
লোকটা হাঁটতে হাঁটতে বলল, তোমাকে তো বলেইছি যে আমি বড় ভিতু মানুষ। আমার সবচেয়ে বেশি ভয় অশরীরীদের। তুবি বাপু আমাকে কাটাখালির সাঁকোটা পার করিয়ে দিও। ও জায়গাটার খুব বদনাম শুনি।
আমি বললুম, তা বদনাম আছে কর্তা, একজন বৌ মানুষ ডুবে মরেছিল কিনা। অনেকে অনেক কিছু দেখতে পায় বটে ওখানে।
লোকটা ভারি ভয় খেয়ে বলল, আমি কিছু দেখলে হার্ট ফেল হয়ে যাবে বাপু, তুমি আমাকে একটু সাঁকোটা পার করিয়ে দিও।
আমি বললুম, কিন্তু আমি ততদূর যাবো না মশাই। তার আগেই নন্দপুরের তেমাথা থেকে বাঁয়ে ঘুরে ঘুসুরি গাঁয়ে যাবো, সেখানেই আমার বাড়ি কিনা।
লোকটা বলল, বাপু হে! আমার হার্ট ফেল হলে তোমার কিন্তু নরহত্যার পাপ হবে। কিছু মনে কোরো না আমি তোমাকে পুষিয়ে দেবোখন।
আমার বুক এখনই দুরদুর করতে লেগেছে। দেখলুম বুড়োমানুষ বড্ড লাতন হয়ে পড়েছেন, অতি ভয়ে মানুষ অক্কাও পায় শুনেছি। তাই বললুম, তা না হয় কাটাখালির সাঁকো আপনাকে পার করিয়ে দিলুম। কিন্তু আমার যে দুনো রাস্তা ফিরে আসতে হবে। তা তিনি আমার হাতে পায়ে ধরেন আর কী।
কী আর করা, খাল পার করিয়ে একটু এগিয়ে দিয়ে যখন ফিরতে যাচ্ছি উনি আমার হাত ধরে বললেন, বাপু, তুমি বড় সাচ্চা লোক, এই নাও পাঁচশোটা টাকা রাখো।
আমি টাকাটা ফিরিয়ে বললুম দূর মশাই! এর জন্য কেউ টাকা নেয় নাকি? যান তো বাড়ি যান।
উনি ছাড়লেন না। বললেন, ঠিক আছে, টাকা না নিলে না নেবে, কিন্তু এই দুর্যোগের মধ্যে আর বাড়ি ফিরে কাজ নেই। এই কাছেই আমার বাড়ি রাতটা কাটিয়ে কাল সকালে বাড়ি ফিরলেই হবে।
একটু গাইগুঁই করেছিলেন বটে, তবে ভেবে দেখলুম, প্রস্তাবটা মন্দ নয়। আমার তো তিন কুলে কেউ নেই যে বাড়িতে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে আছে আমার জন্য।
তা রাজি হয়ে থেকে গেলুম বুড়োর বাড়িতে। গিয়ে চোখ ট্যারা। পেল্লায় বাড়ি, লোক লস্কর, ধানের মড়াই, গোশালা, হইহই কাণ্ড। পাকা ঘরে বিজলি বাতি জ্বলছে। রাতে গরম খিচুড়িতে ঘি ঢেলে সঙ্গে বেগুনি পাঁপড়ভাজা পোস্তর বড়া দিয়ে ভোজ। সে এক কাণ্ডই বটে। রাতে দিব্যি তক্তপোশে মশারি খাটানো বিছানা। এক রাত্তিরের জায়গায় পাক্কা চারদিন জামাই আদরে থাকতে হল মশাই।
তা হ্যাঁ রে, বৃ,ত্তান্ত যা বললি তাতে শেষ অবধি বুড়ো তোকে জামাই করে নেয়নি তো!
না বরেনবাবু, বৃত্তান্তটা ওদিকে গড়ায়নি। বুড়োর তিন মেয়েরই বিয়ে হয়ে ছেলেপুলে অবধি হয়ে গেছে। তবে মহিম পোদ্দার সোজা লোক নয়। পঞ্চায়েতের মাথা, একবার নাকি এম এল এ হতে গিয়ে ভোটে হেরে যায়। তাছাড়া অনেক কমিটি টমিটির মেম্বার। সাতপুর গাঁ তো গোবিন্দপুরের কাছেই। তা মহিমবাবুই মেলা কমিটিকে বলে কয়ে একটা জায়গায় বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন। দিব্যি গ্যাঁট হয়ে বসে কিছুদিন রোজগার করলুম মশাই। তাবিজ, কবচ, পাথরও বিক্রি হয়েছে মন্দ নয়।
দূর আহাম্মক! আর একটু গুছিয়ে নিতে পারতি তো! মহিম পোদ্দারের নাম আমরাও জানি। শাঁসালো লোক। গোবিন্দপুরের রাসমেলায় জায়গা পাওয়ার চেয়ে আর বেশি কিছু বাগাতে পারলি না?
তা যা বলেছেন। বাগিয়ে তো নেওয়াই যায় মশাই। তবে কিনা ওসব করলে রাতে ঘুম হয় না, মশার মতো কী যেন কুটকুট করে কামড়ায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন