মৃত্যু ও মায়ের কষ্ট

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

এই একজন মানুষ থাকে এক কথায় বলা যায় চমৎকার। গড়পড়তা আর পাঁচটা মানুষের সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেলা যায় না। তার কারণ তার আচার আচরণের সহজ স্বাভাবিকতা, সব কিছুতেই প্রখর মাত্রাজ্ঞান, বুদ্ধিমিশ্রিত সারল্য, সকলের প্রতি মনোযোগ ও তুচ্ছকেও গুরুত্ব প্রদানের কয়েকটি দুর্লভ লক্ষণ রয়েছে। এই মানুষটি যখন যেটা মনে হয় সেটাই করে। কিন্তু করে খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। দীর্ঘদিন এই মোটাসোটা আহ্লাদী ধরনের চেহারার মানুষটিকে আমি লক্ষ্য করে আসছি। কায়াটি সামান্য স্থুল বটে, কিন্তু ভিতরের মানুষটি সম্পূর্ণ অন্যরকম।

১৯৫৯-৬০ সাল নাগাদ বোধ হয় আমাদের পরিচয় হয়েছিল। সুনীল তখন কৃত্তিবাস বের করে, তৎকালীন তুর্কী তরুণ কবি সাহিত্যিককে নিয়ে বেশ একটা গণ্ডগোলের বন্ধুগোষ্ঠী পাকিয়ে তুলেছিল। সুনীলই মধ্যমণি ছিল এমন বলছি না। আসলে মধ্যমণি ছিল কে নয়? শক্তি, সন্দীপন, শ্যামল, তারাপদ, শঙ্কর সবাই। আমরা কয়েকজন সেই বৃত্তের ভিতরে না হলেও পরিধির ধার ঘেঁষেই ছিলাম। বলা বাহুল্য সেইসব আড্ডার ধ্রুব স্থানটি ছিল কলেজ স্ট্রিটের প্রথাসিদ্ধ কফি হাউস বা ইউনিভার্সিটির আনাচ-কানাচ এবং অন্যত্রও। সব জায়গার খবর আমার জানা নেই।

আর একটু বুড়ো হওয়ার পর সুনীল বা সমকালীন বঙ্গসমাজকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করা যাবে। কিন্তু ১৯৬১ সালে জামশেদপুরে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের কথা না বললেই নয়। অনুষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মাথায় ভূতই চেপে থাকবে। সেবার তারা গাদাগুচ্ছের অনামী কবি-সাহিত্যিককে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে গেলেন। নামকরা বলতে আমাদের পালের গোদা একমাত্র সুভাষ মুখোপাধ্যায়। আর সবই ডিম ফুটে বেরাচ্ছে বা বেরিয়েছে। অ্যালেন গিনসবার্গ আর পিটার ওরলভস্কি সেই দলে জুটে গিয়েছিল। দুঃখের বিষয় আমরা কেউই তেমন কথাবার্তা বলতে পটু নই। বক্তৃতা দিতে উঠলে হাঁটুতে হাঁটুতে করকত্তাল বাজে। সেই সুযোগে স্বর্গতা পূরবী মুখার্জি আমাদের তুলোধোনা করলেন। তাঁর দোষও ছিল না। কেউ কেউ তাঁকে উসকেও দিয়েছিল। যাই হোক সকলের মুখ রক্ষা অবশেষে করেছিল সুনীল। আজও যে সুনীল খুব ভালো বক্তা তা নয়। কিন্তু সেদিন সেই ১৯৬১ সালের এক সন্ধেবেলা সে বলেছিল ভারী অদ্ভুত। চালাকি নেই, কপটতা নেই, সাজানো-গোজানো কৃত্রিমতা নেই, স্পর্ধা নেই। কী লিখতে চায় তরুণেরা, কেন লিখতে চায় তারই একটি হৃদয়স্পর্শী আন্তরিক সত্যভাষণ। অনেকের চোখে জল এসেছিল।

সেদিনের সেই ভাষণটির ভিতর দিয়ে সুনীলের ভিতরকার চেহারাটা যেমন ফুটেছিল তেমনি আজও তার কোনও কোনও লেখায় ভিতরকার অকপটতা প্রকাশ পায়।

লোকে ভাববে এ হল পরস্পরের পিঠ চুলকোনো। কিন্তু আদৌ তা নয়। সুনীল এবং আমি পরস্পর ঘনিষ্ঠ বন্ধু নই। এমনকী আমাদের গোষ্ঠীগত দায় দায়িত্বও নেই। আমাদের গোষ্ঠীও (যদি কিছু থেকে থাকে) আলাদা। আমি তার হিতাকাঙ্ক্ষী বটে, কিন্তু সেজন্য তাকে খামোখা ওপরে তোলার কোনও প্রয়োজন নেই।

কবি সুনীল স্ব-বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল বটে, গোষ্ঠীপ্রধানও তাকে বলা যায়। কিন্তু তাকে তার গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠতম কবি না বললেও অপরাধ হয় না। তার পাশাপাশি শক্তি, উৎপল, বিনয়, সমানে পাল্লা দিয়েছে। এই গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ কবি কে তা আজও নিরূপিত হয়নি বোধ হয়। অনেকে শক্তিকে দেখিয়ে দেয়। হবে বোধ হয়। আমার কাছে সকলেই প্রিয়, আলাদা আলাদা রকমে।

'মৃত্যু ও মায়ের কষ্ট পরস্পর বিপরীত দিকে ছুটে যায়' এই পঙক্তির মধ্যে আবার সেই সত্যসন্ধ মানুষটিকে আবিষ্কার করা গিয়েছিল। মাতৃভক্তির নৈতিক ও সামাজিক মূল্য সম্পর্কে সুনীল সচেতন কিনা জানি না। কিন্তু এই পঙক্তি যে লেখে সে মায়ের দুধ খেয়েছিল বটে।

যতদূর মনে পড়ে, সুনীলের যে গদ্যটি আমি প্রথমে পড়ি তার নাম 'রানী ও অবিনাশ' খুব নাড়াচাড়া খাওয়ার মতো লেখা। কিন্তু রানীর সবটুকু রহস্য উন্মোচনের জন্য অবিনাশ যে কেন তার দেহভোগের বায়না ধরেছিল তা আজও আমার কাছে রহস্য। দেহভোগ দিয়ে সবটুকু মেয়েটাকে জানা যাবে এ সুনীলের কেমনতর ফিলজফি বাপু? তা তবু নতুন চোখা চালাক কথা আর বেশ হায়ালজ্জাহীন প্রসঙ্গ আমাদের টেনেছিল খুব।

আমার পড়া সুনীলের পরের গদ্যটি মারাত্মক। 'সোনালী দুঃখ' যারা পড়েননি লেখাটা পেলে পড়ে নেবেন। একটি বিদেশি লোককথাকে অবলম্বন করে এত সুন্দর লেখা যায় তা না পড়লে বিশ্বাস হবে না।

মারকিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করে ফিরে এসে সুনীল তার প্রথম উপন্যাসটি প্রকাশ করে। আমরা বাধিত হলাম 'যুবক যুবতীরা' উপহার পেয়ে। পরবর্তী উপন্যাস 'আত্মপ্রকাশ' যথার্থই তার আত্মপ্রকাশকে সূচীত করেছিল। এই দুই উপন্যাসে আমাদের সমকালীন এবং অতি পরিচিত কবি-সাহিত্যিকদের কয়েকজনকে বেশ স্পষ্ট চেনা যায়।

তারপর থেকে সুনীল আর পেছু ফিরে তাকায়নি। সর-সর করে এগিয়ে গিয়ে বাংলা কথাশিল্পের প্রথম সারির লেখকদের পাশাপাশি নিজের জায়গাটি করে নিয়েছে। অথচ সে নিজেই কবুল করে, গদ্য লেখে লিখতে হয় বলেই। গদ্যে যে যথেষ্ট মনোযোগী নয়, কবিতাই তার প্রকৃত অবলম্বন।

কথাটাকে আজ আর গুরুত্ব না দিলেও চলে। কবি সুনীলকে যে চেনে তার শতগুণ চেনে কথাশিল্পী সুনীলকে। গদ্যে সুতরাং তাকে মনোযোগী হতেই হয়েছে এতদিনে। মনোযোগী না হলে কি 'খরা'র মতো অসাধারণ ছোট গল্প লেখা যায়?

সুনীলের ছোট গল্পের তুলনায় উপন্যাসের সংখ্যা বোধ হয় বেশি। কিন্তু সে যদি আরও ছোট গল্প লিখত তাহলে আমরা আরও লাভবান হতাম নিশ্চিত। ছোটগল্পে তার একটা আলাদা মুন্সিয়ানা আছে যা 'গরম ভাত' বা 'দেবদূত' অথবা 'বারোহাটের কানাকাড়ি' গল্পে জ্বলজ্বল করে ওঠে। তার পরিণত মানসিকতার এই দুটি সৃষ্টি আমার স্মৃতির ভাণ্ডারে চিরকাল থেকে যাবে।

আমাদের অকাল-প্রয়াত বন্ধু শংকর চট্টোপাধ্যায় সুনীলের বিয়ের পর একবার জনান্তিকে আমাকে বলেছিল, সুনীলের কপালটা দেখলেন? যে মেয়েটার সঙ্গে ভাব করে বিয়ে হল সে মেয়েটাও কপালজোরে বামুন! ওর হবে না তো কার হবে?

সুনীলের কপাল সম্পর্কে আমার তেমন কিছু জানা নেই। তবে যেটুকু জানি তা হল সে অসম্ভব পরিশ্রমী। চেহারাটা আহ্লাদী হলেও নিজেকে সে খুব একটা আহ্লাদে রাখে না। পায়ের তলায় চাকা বাঁধাই আছে। হিল্লি-দিল্লি করে বেড়াতে দেখি। এই বয়সে তার উপন্যাসের সংখ্যা যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে সেটাও বিস্ময়কর। বিনা শ্রমে তা তো লেখা হয়ে ওঠেনি। অনুমান করি, বিরলে সে নিশ্চিত কুলির মতোই খাটে।

অতীব বন্ধুৎবৎসল, উদার, খানিকটা বিষয়-বিরাগী সুনীল মানুষ হিসেবে যেমন চমৎকার, লেখক-হিসেবেও তেমনি ধারালো।

ধনে পুত্রে যশে প্রতিষ্ঠায় তার লক্ষ্মী-সরস্বতী লাভ হোক।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%