শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

দিয়োগা মারাদোনা প্রয়াত হলেন এই দুঃসংবাদ অনেককেই বিষণ্ণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে মারাদোনা যেদিন ফুটবলের মাঠ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন, সেদিনই জাদুকর মারাদোনার ভার্চুয়াল মৃত্যু ঘটে গিয়েছিল। শুধু শরীরে বেঁচে থাকাটাই তো প্রতিভাধরদের বেঁচে থাকা নয়, তাঁরা বেঁচে থাকেন কর্মকাণ্ডের ভিতর দিয়ে। তবে কর্মকাণ্ড শেষ হলেও তাঁরা বেঁচে থাকেন প্রেরণা হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে, উদাহরণ হিসেবে। মারাদোনাও তাই ছিলেন। কিন্তু অবসর নেওয়ার পর মারাদোনা বেঁচে থাকার ন্যুনতম শর্তগুলোও পালন করতেন না। হয়ে উঠেছিলেন মাদকাসক্ত, উচ্ছৃঙ্খল, অস্থির। মাত্র ষাট বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণের কথাই নয়।
মাত্র পাঁচ ফুট সাড়ে চার ইঞ্চি উচ্চতার মারাদোনা আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের উচ্চতার ধারেকাছেও নন। গাঁট্টাগোট্টা চেহারার মারাদোনা কিন্তু উচ্চতার খামতি কখনও বুঝতেই দেননি আমাদের। লোকে ছিয়াশির বিশ্বকাপের কথাই বলে, কিন্তু মারাদোনার বিস্তর খেলা দেখার সুবাদে এই ক্ষিপ্র, চতুর, কুশলী ফুটবলারের সাধু ও অসাধু নানা উপায়ে গোল করার ও করানোর ঘটনা দেখেছি। মুগ্ধ হয়েছি মারাদোনার আশ্চর্য গতিবেগ ও পায়ের শিল্প, শরীরের ভারসাম্য শটের নির্ভুল নিশানা দেখে। প্রায় পেলের মতোই গ্রেসফুল, জর্জ বেস্টের মতোই তাঁর ভৌতিক ড্রিবলিং। তবু এক-এক চুলের তফাতে আমি এগিয়ে রাখব পেলেকে এবং জর্জ বেস্টকে। আমার পছন্দের তিন নম্বর হলেন মারাদোনা। জর্জ বেস্ট ওয়ার্ল্ড কাপ খেলার সুযোগ পাননি আয়ারল্যান্ডের খেলোয়ার ছিলেন বলে। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবে খেলতেন। সত্যিই তাঁর খেলায় অলৌকিত্বের স্পর্শ ছিল। আর পেলে তো ফুটবল নিয়ে যা খুশি করতে পারতেনই। পেলের সন্মোহন থেকে আমি এখনও বেরতে পারিনি।
মারাদোনা এঁদের থেকে খুব পিছনে নন। বরং এঁদের গায়ে-গায়েই তাঁরও অবস্থান। তবে মারাদোনা খুব সাধু খেলোয়াড় যে নন, এটা তাঁর বড় ভক্তকেও স্বীকার করতে হবে। ছিয়াশির বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলার সময় মারাদোনা যে হাত দিয়ে গোল করেছিলেন তা এখন 'হ্যান্ড অফ গড' হিসেবে কুখ্যাত। তবে ইংল্যান্ড বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও রেফারি গোলটি বাজেয়াপ্ত করেননি। এর ঠিক চার মিনিটের মাথায় মারাদোনা সেই পাঁচজন প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে বাঁ-পায়ের টোকায় জয়সূচক গোলটি করেছিলেন, যা শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে আজও বিবেচনা করা হয়। এই ম্যাচটি আমি সরাসরি দেখেছিলাম, সেই ঘোর আজও চোখে লেগে আছে।
'হ্যান্ড অফ গড' তাঁর একমাত্র চৌর্যবৃত্তি নয় কিন্তু। বহু ম্যাচে দেখেছি তিনি নির্দ্বিধায় হাত দিয়ে বল থামিয়ে পায়ে নিয়ে দৌড়চ্ছেন, বা পড়ে গিয়ে হাত দিয়ে বল ঠেলে পাস করে দিচ্ছেন। বেঁটে বলেই বোধ হয় তাঁর এসব কারসাজি রেফারিরা বুঝতে পারতেন না। আর তিনি তো অপরাধ কবুল করার লোকই নন। শুধু 'হ্যান্ড অফ গড' বলে তিনি যে গোলটিকে দাবি করেছিলেন সেটি ক্যামেরায় ধরা পড়ে যাওয়ার, পরে স্বীকার করে নেন। এসব সত্ত্বেও মারাদোনার অবস্থান এতই উচ্চতায় যে তাঁর সাত খুন মাপ হয়ে যায়। ছিয়াশির বিশ্বকাপের ফাইনালের কথাই ধরি। আর্জেন্তিনা আর জামানি দুই-দুই গোলে সমান যাচ্ছে, এমন সময় খেলার শেষের দিকে গোটা জার্মান দল চেপে ধরেছে আর্জেন্তিনাকে গোল হয়-হয়। ঠিক সেই সময়ে ধূর্ত মারাদোনা নিজেদের ডিফেন্স থেকে বল ধরে মাঝমাঠে ফাঁকায় ঠেলে দিলেন বলটাকে, বোধ হয় যোগসাজশ ছিলই, ঠিক একটা চিতাবাঘের মতোই ক্ষিপ্র বুরুচাগা পিছন থেকে দৌড়ে বলটাকে তাড়া করে এগিয়ে আসা গোলকিপারের মাথা টপকে বল নিয়ে গিয়ে গোল করলেন। অনবদ্য সেই গোল। ভোলা যায় না। বুরুচাগার যতটা কৃতিত্ব, ততটাই মারাদোনারও।
খেলা থেকে অবসর নেওয়ার পর মারাদোনা ক্রমে নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে থাকেন। ভুলভাল জীবনযাত্রার জন্য তাঁর মজবুত শরীরও ভেঙে পড়তে থাকে। মাদকাসক্তি বাড়ে, বাড়ে নানা অসুস্থতাও। বেশ কয়েকবার হাসপাতালে যেতে হয়েছে তাঁকে। মোটা, থলথলে অপটু হয়ে পড়তে থাকেন। তার মধ্যেই নানা বিতর্কিত মন্তব্য করে বসতে থাকেন। তাঁর আগ্রহ দেখে কিছুদিনের জন্য তাঁকে আর্জেন্তিনীয় দলের কোচও করা হয়েছিল। কিন্তু ভালো খেললেই ভালো প্রশিক্ষক হওয়া যায় না, এটা প্রমাণিত সত্য। এই ভুল পেলে করেননি। মারাদোনার কোচিংও তাই আর্জেন্তিনাকে এগিয়ে দিতে পারেনি।
সন্দেহ নেই যে, মারাদোনা ফুটবলকে অনেক কিছু দিয়েছেন। কিন্তু কখনও আর একটা মারাদোনা বা আরও একটা পেলে বা আরও একজন জর্জ বেস্ট হয় না, হবেও না। এই এক মুশকিল, একজন সুপারস্টারের বিকল্প জন্মায় না। তাই তাঁরা যে যাঁর মতো এক ও অদ্বিতীয় থেকে যান। তাঁদের নকল করা যেতে পারে, কিন্তু বিকল্প হওয়া সম্ভব নয়। তাই এঁরা যে যাঁর মতো একা নিঃসঙ্গ। আর এটাই এঁদের ট্র্যাজেডিও। লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেলে যখন আর নিজের জয়ধ্বনি শোনা যায় না, যখন তাঁকে নিয়ে আর সেই মাতামাতি নেই, যখন জলপ্রপাতের মতো অবসাদ চলে আসে। আর এই পরিবর্তন যিনি শান্ত ও দৃঢ় মানসিকতায় গ্রহণ করতে পারেন, তিনি রক্ষা পান, যেমন পেলে। মারাদোনা বোধ হয় সেটাই পারেননি। পারলে মাদক নিতে হবে কেন তাঁকে? কেন এত বিষয়ে কথা বলতে হবে? কেনই বা অপটু শরীরেও নিতে হবে জাতীয় দলের প্রশিক্ষকের ভূমিকা?
তবু মারাদোনাকে উপেক্ষা করা যায় না, অশ্রদ্ধা আসে না, মারাদোনা নামটা শুনলেই মাথা নোওয়াতে ইচ্ছে করে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন